খতমে নবুওত এবং নব্যবাদ (একটি সমীক্ষা)

লেখক: আয়াতুল্লাহ শহীদ মুর্তজা মোতাহারী

“মুহাম্মদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রসুল এবং শেষ নবী…।” (আহযাবঃ ৪০)
ইসলামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রশ্নাকারে বিরাজমান রয়েছে।
(১) (নাসখ) বা ধর্মীয় বিধান রহিত হওয়া।
(২) (খতামিয়্যাত) বা নবুওতের পরিসমাপ্তি।
দুটি বিষয়ই সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। নাসখের বিষয়টি তো শুধুমাত্রই সময়ের সাথে জড়িত, নতুবা অন্য কোন দলীল নেই পূর্বোক্ত বিধান রহিত হয়ে নতুন বিধান চালু হওয়ার। সকল আলেমই এ বিষয়ে একমত যে, কোন শরীয়ত একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জারী থাকার পর একপর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা রহিত হওয়ার পিছনে একমাত্র রহস্য ও কারণ হল যুগের পরিস্থিতি বদলে যাওয়া। অর্থাৎ আজকের পরিভাষায় বলতে হয় যুগ জিজ্ঞাসার পরিবর্তন ঘটা। আর একথাই যদি সত্য হয় তখন নতুন প্রশ্ন জেগে উঠে। সেটা হল এই যে, সময় বা যুগের চাকা তো এখানে থেমে নেই, পরিবেশ পরিস্থিতি সব কিছুই রয়েছে। তাই শরীয়তের খতাম বা শেষ বলে কোন কথার অর্থ হয় না। নবুওতের সিলসিলাও কোন এক বিন্দুতে এসে থেমে যেতে পারে না। তাহলে খতামিয়্যাত বা নবুওতের পরিসমাপ্তি কেন?

এ প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় যে, এখানে দুটি ভিন্ন বিষয় রয়েছে। বিষয় দুটি যদি একসাথে গুলিয়ে যায় তাহলে এধরণের প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। তবে এ দুটিকে আলাদা করে ফেলতে হবে। কেউ কেউ মনে করে যে, নিছক মানব সভ্যতার মাত্রাগত উন্নতি ও বৃদ্ধির কারণেই যুগজিজ্ঞাসাগুলোও পরিবর্তন হয়ে যায়। এ জন্যে, বিজ্ঞান ও সভ্যতার নতুন মাত্রার উপযোগী নতুন নবীরও আবির্ভাবের প্রয়োজন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নিছক সভ্যতার মাত্রা বৃদ্ধি পেলেই অনিবার্যভাবে আইন ও বিধান পরিবর্তনের কারণ হয় না। মূলতঃ যে কারণে নতুন শরীয়ত এসে পুরাতন শরীয়তকে নাসখ বা রহিত করে সেটি হল এই যে, পূর্বের শরীয়তের যুগে মানুষের যে সমস্ত সত্যদীক্ষা তাবলীগের মাধ্যমে এবং বোধশক্তির দ্বারা ধারণ করার কথা তার সবটা ধারণ করার প্রতিভা, যোগ্যতা বা ধারণক্ষমতা থাকে না। কালক্রমে যখন মানুষের মধ্যে সেই বিকাশ তথা পরিপক্কতা আসে তখন আরো পরিপূর্ণতর নতুন শরীয়ত আবির্ভূত হয়। আর প্রত্যেক শরীয়তই হয় পূর্বতন শরীয়তের তুলনায় অধিকতর পরিপূর্ণ। এভাবে ক্রমান্বয়ে শরীয়তের অগ্রযাত্রা চলতে চলতে এমন পর্যায়ে উন্নীত হয় যখন আর মানুষের কোন ওহীর প্রয়োজন থাকে না। অর্থাৎ ওহীর প্রতি মানুষের যে অভাব সেটা সীমাহীন নয় বরং একটি পর্যায় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, ঐশ্বরিক শিক্ষাই বলুন আর সামাজিক ও আখলাক বা নৈতিকতার কথাই বলুন, একশ্রেণীর শিক্ষা, বিষয়বস্তু ও বক্তব্য রয়েছে যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, অভিজ্ঞতা এবং বিজ্ঞানের উর্ধ্বে। বিজ্ঞানের শক্তি দ্বারা মানুষ সেগুলোকে অর্জন করতে পারে না। আর বুদ্ধি ও বিজ্ঞান যেখানে অপারগ সেখানে ওহী মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসে। কিন্তু তাই বলে ওহীর মাধ্যমে সীমাহীন সব বিষয়াদি মানুষকে শিক্ষা দেয়ার কোন প্রয়োজন সেই। ওহীর প্রতি মানুষের নির্ভরশীলতা যেটুকু রয়েছে তা তখনই তাকে শিক্ষা দেয়া হয় যখন প্রথমত তা গ্রহণ ও ধারণ করার যোগ্যতা ও সামর্থ মানুষের থাকে এবং দ্বিতীয়ত সেটাকে সংরক্ষণ করার মত সামর্থও তার থাকে।

এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় রয়েছে যা এখানেই উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেটি হল যেসব কারণে নতুন করে শরীয়তের দরকার হয় তারমধ্যে একটি হল পূর্বতন শরীয়তের কিছু সত্য অংশ মানুষের হাতে বিকৃত বা রূপান্তরিত হয়ে পড়া। এর কারণে নবীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল পূর্ববর্তী নবীর শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করা। অর্থাৎ নবীদের শিক্ষার একটি অংশ সেই পূর্ববর্তী নবীরই শিক্ষামাত্র যা কালক্রমে মানুষের হাতে মুছে গেছে বা বিকৃত হয়ে পড়েছে। আর এটাকে মানুষের একটা সাধারণ প্রবণতা বলা যেতে পারে যে, সে যে শিক্ষকের নিকট থেকে যে শিক্ষাই গ্রহণ করুক না কেন তার মধ্যে কমবেশি করবেই-কিছু যোগ করবে বা কিছু বাদ দিবে-যাকে এক কথায় বলা যায় বিকৃতি সাধন করা। কোরআনও এ বিষয়টিকে উল্লেখ করেছে। আর মানব জীবনের অভিজ্ঞতায় তা সত্য বলে সাক্ষ্য দেয়। যেমন স্বয়ং কোরআন আবির্ভূত হয়ে তওরাত এবং ইঞ্জিলকে রহিত ঘোষণা করল। কিন্তু তাদের কিছু অংশের শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করল। অর্থাৎ মানুষের হাতে সেগুলোর বিকৃতি সাধিত হওয়ার পর কোরআন এসে ঘোষণা দিল যে, না প্রকৃত তওরাত ও ইঞ্জিলে যা বলা হয়েছে তা এখন মানুষের হাতে যা রয়েছে সেটা নয়। আমিই ঘোষণা করছি যে মানুষ তাকে বিকৃত করেছে। যেমন ইবরাহীমের (আ.) নীতিপন্থার বিষয়টিই ধরা যাক যা কোরআনে এসেছে। কোরাইশরা নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীমের (আ.) অনুসারী বলে গণ্য করত। কিন্তু শুধু যে জিনিসটি তাদের মধ্যে বর্তমান ছিল না সেটা হল হযরত ইবরাহীম (আ.) এর আসল শিক্ষা। তারা তার মধ্যে পরিবর্তন সাধন করল। বিকৃত একটি নতুন বানোয়াট জিনিসে পরিণত হল। ইরশাদ হচ্ছেঃ “আর কা’বার নিকট তাদের নামায বলতে শিস দেয়া এবং তালি বাজানো ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না।” (আনফালঃ ৩৫)

তাঁর নামায প্রকৃতই ইবাদত ছিল। ইবাদত অর্থাৎ প্রতিপালকের নকট বিনয় প্রকাশ করা। তাঁর তসবীহ, প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করা। হ্যাঁ, যদি ইবরাহীমি নামায আমাদের নামাযের সাথে বাহ্যিকভাবে ভিন্ন রূপের হয় এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কিন্তু অবশ্যই ইবরাহীম (আ.) এর নামাযও নামায ছিল। অর্থাৎ নামাযের মধ্যে যা কিছু থাকে-যিকিরসমূহ, হামদ ও ছানা প্রশংসা জ্ঞাপন, বিনয় প্রকাশ, নিজেকে তুচ্ছ করে ফেলা, তসবীহ ও পবিত্রতা ঘোষণা করা ইত্যাদি-সবকিছুই তার মধ্যে ছিল। কিন্তু তারা ঐ নামাযকে এতবেশী পরিবর্তন ও বিকৃত করে ফেলেছিল যে, কোরআন নাযিল হওয়ার যুগে সে নামায শিষ দেয়া আর তালি বাজানোর আকারে রূপ লাভ করে।
সুতরাং, প্রত্যেক নবীই যেসব কাজ করে তারমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল পূর্ববর্তী নবীদের শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করা। এ কারণে পবিত্র কোরআন হযরত ইবরাহীম (আ.) সম্পর্কে ইরশাদ করেছেঃ “ইবরাহীম ইহুদী ছিলেন না, এবং নাসারাও ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন হানীফ (অর্থাৎ সব মিথ্যা ধর্মের প্রতি বিমুখ) এবং আত্মসমর্পণকারী” (আলে ইমরানঃ ৬৭)

ইহুদীরা দাবী করত আমরা যে পন্থা অনুসরণ করি সেটাই ছিল ইবরাহীমের (আ.) যার নাম ইহুদী পন্থা। নাসারারাও একই দাবী করে বলত আমাদের পথই ইবরাহীম (আ.) এর সেই পথ। অর্থাৎ আমাদের পথটাই ইবরাহীমের (আ.) পথ তবে আমাদেরটা আরও পরিপূর্ণ যা ইবরাহীমের (আ.) পন্থাকে রহিত করে দিয়েছে। কোরআনের অন্যত্র তাই বলা হয়েছেঃ “….যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না। আপনি মুশরেকদেরকে যে বিষয়ের প্রতি আমন্ত্রণ জানান তা তাদের কাছে দুঃসাধ্য বলে মনে হয়।” (শুরাঃ ১৩)

কাজেই দ্বীন একই। স্বার্থ ও কামনার দাসত্ব করতে গিয়ে তারা জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তাতে বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি করে মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধারার জন্ম দিয়েছে। যদি মানুষের সৃষ্টি এসব বিকৃতিগুলোকে ঝেড়ে ফেলা যায় তাহলে দেখা যাবে যে, সবগুলো দ্বীনই এক, একই মূলসত্ত্বা ও একই পন্থা।

যা হোক, এতসব বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য হল যে, আম্বিয়াগণের একটি কাজ হল মূল দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করা। আর আদম থেকে খতাম পর্যন্ত সকল ধর্মের মূল এক ও অভিন্ন। যদিও বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন। প্রত্যেক নবীই যখন আসেন তার একটা কাজই হয় সংশোধন করা। অর্থাৎ বিকৃতি, পরিবর্তন আর পরিবর্ধনগুলোকে ঝেড়ে মুছে সাফ করে ফেলা। আর এখান থেকে এ প্রশ্নের জন্ম হয় যে, দ্বীন বিকৃতির এ সমস্যাটি কি কেবল শেষ নবীর পূর্বেকার উম্মতদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছিল না-কি পরবর্তী যুগের মানুষদেরও এ চরিত্র রয়েছে যে, তারাও স্বীয় দ্বীনের উপর রদবদল সৃষ্টি করে কুসংস্কারাচ্ছন্ন করে তুলবে?

নিঃসন্দেহে মানবের এ প্রকৃতি বদলায়নি। শেষ নবীর (সা.) পরেও বদলাবে না। কেননা যদি তা না হত তাহলে ইসলামে এতগুলো ফেরকা বা মাযহাব কোত্থেকে এল? এটা স্পষ্ট যে, শেষ নবীর দ্বীনের মধ্যেও বিদআত সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যারা শিয়া সম্প্রদায়ভূক্ত এবং বিশ্বাস রাখি যে, ইমাম মেহেদী সাহেবুজ্জামান (আ.ফা) আবির্ভূত হবেন, আমরা বলে থাকি (তিনি নতুন দ্বীন নিয়ে আসবেন)। একথার ব্যাখ্যাই হল এটা যে, ইসলামে এতবেশী পরিবর্তন পরিবর্ধন সাধন করা হয়েছে যে, যখন তিনি আগমন করবেন এবং তার পূর্বসূরী রসুলের (সা.) দ্বীনকে বর্ণনা করবেন তখন মানুষের মনে হবে এটা তাদের সেই দ্বীন নয়। বরং নতুন এক দ্বীন। অথচ, তিনি যেটা বর্ণনা করছেন সেটাই প্রকৃত ধর্ম। রেওয়ায়েতে রয়েছে যে, তিনি আবির্ভূত হয়ে অনেক ঘরবাড়ী এবং এমনকি মসজিদও বিনষ্ট করবেন। এমন কিছু কাজ করবেন যাতে জনগণ মনে করবে যে তিনি নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছেন।

এমতাবস্থায় মানুষের মধ্যে ওহীর মাধ্যমে পরিপূর্ণ হকিকতসমূহ ধারণ করার ক্ষমতা বা যোগ্যতা আছে কি-না সে দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং প্রত্যেক নবীই পূর্ববর্তী দ্বীনের সংস্কারকও বটে এবং মানুষের জন্য সংস্কারকের প্রয়োজন-এ দৃষ্টিকোণ থেকেই খমতে নবুওতের বিষয়টির কি ব্যাখ্যা করা যায়? এখানেও আবার দুটি বিষয় রয়েছে। একটি হল যে, সংস্কার ও সংস্কারকের প্রয়োজন সর্বকালীন এবং শেষ দ্বীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এতে কোন মতভেদ নেই। আমর বিল মারুফ ও নেহী আনীল মুনকার এটাও এক ধরণের সংস্কার। মাসুম ইমামরা বলেছেন, “প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক সময়ে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যারা বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনকারীদের বিকৃতি এবং মিথ্যাচারীদের মিথ্যাচার থেকে দ্বীনকে সংশোধন করেন।” তাই, সংস্কার এবং সংস্কারকের প্রয়োজন যে অবশ্যম্ভাবী এতে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে সেখানে যে, পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহের যুগে মানুষের মধ্যে সেই দক্ষতা বা প্রতিভা ছিল না যে, সেসব বিকৃতিকে প্রতিহত করবে এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাবে। সে কারণে দরকার ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন নবী ঐশী দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে আগমন করবেন এবং এ অসাধ্যকে সাধন করবেন। কিন্তু, খতামিয়্যাতের বা শেষ নবীর জামাতার সবচেয়ে বড় শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বতন্ত্র দিক হল যে, এ যুগ সংস্কারী শক্তি ও ব্যক্তি দ্বারা ধন্য যারা সংস্কার ও সংশোধন চালাতে সক্ষম। উপরন্তু, আমরা শিয়া সম্প্রদায়ের মতে হুজ্জাত ইবনুল হাসান সাহেবুজ্জামান ইমাম মেহেদী (আ.) সেই মহান সংস্কারক তো গায়েবে গচ্ছিত রয়েছেনই। তাঁর কোন দরকার নেই যে, একজন নবী হয়েই সংস্কার কার্য চালাবেন। বরং একজন ইমাম হিসেবেই তা সাধন করবেন। ইমাম অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও প্রকৃত দীক্ষাগুলোকে উত্তরসূত্রে লাভ করেন। অর্থাৎ মহানবী (সা.) যা কিছু জানতেন আমিরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)কে তা শিখিয়ে দিয়েছেন। তখন ইসলামের নিখাঁদ রূপটি তিনি ধারণ করবেন এবং এভাবে তারপর থেকে আমাদের একে একে বারজন ইমামের ধারায় অবশেষে ইমাম মেহেদী (আ.)ই এখন তার ধারক ও বাহক। কাজেই, নতুন করে কোন ওহীর দরকার নেই। ইমাম ঠিক ঐ জিনিসই বর্ণনা করেন যা ওহীর মাধ্যমে মহানবী (সা.) এর কাছে পৌঁছেছে।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য। যেসব সমস্যাবলীকে কেন্দ্র করে কুসংস্কার জড়িয়ে পড়েছে তারমধ্যে একটি হল খোদ দ্বীন পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি। আমি একবার “দ্বীনি চিন্তার পুনরুজ্জীবন” শীর্ষক এক আলোচনায় বলেছিলাম, অপরাপর সত্যের মতো দ্বীনের উপরেও কিছু পারিপার্শ্বিক প্রভাব পড়বেই। একটি পানির ধারা যখন ঝর্ণার উৎসমূল থেকে নির্গত হয় তখন সেটা থাকে নির্মল, পবিত্র ও শুদ্ধ। কিন্তু ভূমিতলে নেমে এসে যতই সে গড়াতে থাকবে ততই তা কলুষিত ও দুষিত হয়ে পড়বে। তবে এসব কলুষতা ও দূষণকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল যে, এক্ষেত্রেই অনেক বক্র ও জরাগ্রস্ত চিন্তার উদ্ভব ঘটেছে। যদিও সৌভাগ্যক্রমে শেষ নবীর ধর্মে এমন কিছু মাপকাঠি আমাদের নাগালের মধ্যে দেয়া হয়েছে যেগুলো দ্বারা আমরা সেগুলোকে বুঝতে ও নির্ণয় করতে পারি।

দ্বীনের তাজদীদ তথা এহইয়া সম্পর্কে হিজরী ২য় ও ৩য় শতক থেকেই মুসলমানদের মাঝে (অবশ্য প্রথমে আহলে সুন্নাতের মাঝে এবং তৎপরবর্তীকালে শিয়াদের মাঝে) চিন্তা-ভাবনার উৎপত্তি ঘটে। কেননা সময়ের তালে তালে দ্বীনের মধ্যে বিদআত সংক্রমিত হয় এবং দ্বীন পুরাতন ও জীর্ণতাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন প্রয়োজন হয় কোন সংস্কারকের। যেমন, প্রত্যেক ট্রিপ শেষে যাত্রীবাহী বাস সাফ করার দরকার হয়। কিম্বা কিছুকাল অন্তর অন্তর একজনকে প্রেরণ করেন। তিনি দ্বীনের উপরে সংক্রমিত বিকৃতি ও বিদআতের ধুলোবালির আস্তরণকে ঝেড়েমুছে ফেলেন। দ্বীন হয়ে উঠে পুণর্বার শাণিত ও স্বচ্ছ। আল্লাহ প্রত্যেক যুগে যুগে তার দ্বীনকে এভাবে নতুনরূপে উপস্থাপন করে থাকেন।

উপরোক্ত এ ধরনের বক্তব্য আমি বিভিন্ন বই কিতাবে দেখতাম। আরো দেখতাম যে, আমাদের এক শ্রেণীর আলেমকে বই পুস্তকে (মুজাদ্দিদ) নামে আখ্যায়িত করা হয়। যেমন বলা হয় যে, মীর্জা শিরাজী ছিলেন ১৪ শতকের প্রথমভাগের মুজাদ্দিদ। মরহুম ওয়াহিদ বেহবাহানী ছিলেন ১৩ শতকের প্রথমভাগের মুজাদ্দিদ, মরহুম মাজলিসী ছিলেন ১২ শতকের প্রথমভাগের মুজাদ্দীদ। মুহাক্কিক কারাকী ছিলেন ১১ শতকের প্রথম ভাগের মুজাদ্দিদ। তদ্রুপভাবে বলা হয় যে, দ্বিতীয় শতকের প্রথমভাগের মুজাদ্দিদ ছিলেন ইমাম বাকির (আ.), তৃতীয় শতকের প্রথমভাগের মুজাদ্দিদ ছিলেন ইমাম রেযা (আ.), তাবারসী….। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, আমাদের আলেমবৃন্দ এ বিষয়টিকে তাদের বই পুস্তকে বেশি বেশি উল্লেখ করেছেন। যেমন হাজী নূরী তার ‘আহওয়ালুল উলামা’ গ্রন্থে কিম্বা “রওযাতুল জান্নাত” গ্রন্থের লেখক প্রমূখ তাদের গ্রন্থসমূহে এ সকল মুজাদ্দিদদের নাম বর্ণনা করেছেন। আমি যখন দ্বীনি চিন্তার পুনরুজ্জীবন শীর্ষক বক্তৃতাখানি তৈরী করতে চাচ্ছিলাম তখন একবার আমার মাথায় আসলো যে এ বিষয়টি একটু খুঁজে বের করা দরকার। যতই অনুসন্ধান চালালাম ততই দেখলাম যে আমাদের হাদীস রেওয়ায়েতে এ ধরনের কিছুই নেই। এটাও স্পষ্ট নয় যে, এ বিষয়টির সনদও বা কি? অতঃপর আহলে সুন্নাতের হাদীস রেওয়ায়েতসমূহকেও পর্যালোচনা করলাম। দেখলাম সেখানেও কিছু নেই। শুধুমাত্র সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে একটি মাত্র হাদীস রয়েছে তার বেশি নয়। সেটাও আবার আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। হাদীসটির ভাষা হল ঃ অর্থাৎ, মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ প্রত্যেক শতকের গোড়াতে এই উম্মতের জন্যে কাউকে প্রেরণ করেন যিনি উম্মতের জন্য দ্বীনকে তাজদীদ বা নতুন করেন। আবু দাউদ ব্যতিত অপর কেউ এই রেওয়ায়েতকে বর্ণনা করেননি। এখন প্রশ্ন হল যে, শিয়ারা কিভাবে এই রেওয়ায়েতকে গ্রহণ করল? আসলে, এই রেওয়ায়েতটি হল সৌভাগ্যবান রেওয়ায়েতগুলোর মধ্যে একটি। হাদীসখানি আহলে সুন্নাতের। তারা এটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে এবং বই পুস্তকে অনেক পর্যালোচনাও চালিয়েছে। যেমন আলোচনায় এসেছে যে, মহানবী (সা.) যে বলেছেন, প্রত্যেক শত বছরের মাথায় কেউ একজন আসবেন যিনি দ্বীনকে তাজদীদ করবেন, তিনি কি দ্বীনের একটি মাত্র দিককে তাজদীদ করবেন?

অর্থাৎ দ্বীনের প্রত্যেকটি দিককে তাজদীদ করার জন্য পৃথক পৃথক মুজাদ্দিদ আসেন না-কি একজন মুজাদ্দিদ পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের তাজদীদ করেন? যেমন, কোন একজন আলেম এসে ইলম সংক্রান্ত বিষয়ে সংস্কার চালালেন।
অপর কোন একজন খলীফা বা সুলতান এসে গোটা দ্বীনকে সংস্কার করলেন। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় শতকের প্রথমভাগের সংস্কারক ছিলেন খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয, তৃতীয় শতকের প্রথমভাগের সংস্কারক হলেন হারুনুর রশীদ……। অতঃপর সপ্তম শতকের পরে এসে যখন চার মাযহাবে বিভক্ত হয়ে পড়ল তখন কি প্রত্যেক মাযহাবের জন্য একজন স্বতন্ত্র সংস্কারক আসবেন? না-কি একজন সংস্কারকই সকল মাযহাবের সংস্কারক সাধন করবেন?

উত্তরে বলা হল যে, প্রত্যেক মাযহাবের জন্য একজন স্বতন্ত্র সংস্কারক আসবেন। অর্থাৎ প্রত্যেক শতাব্দীকাল পরে হানাফী মাযহাবের জন্যে স্বতন্ত্র একজন মুজাদ্দিদ আসবেন। তদ্রুপ শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বালী মাযহাবসমূহের জন্যেও আলাদা আলাদা মুজাদ্দিদ থাকবে। অতঃপর ইসলামের অপরাপর মাযহাব সম্পর্কেও পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে শিয়াদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যেহেতু তারাও একটি মাযহাব আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন মুজাদ্দিদ থাকবে এবং সব মাযহাবের জন্য থাকবে। এখন দেখতে হবে যে, শিয়া মাযহাবের মুজাদ্দিদ কারা? গণনা করে বলা হয় মোহাম্মাদ ইবনে আলী আল বাকের (আ.) শিয়া মাযহাবের দ্বিতীয় শতকের মুজাদ্দিদ। আলী ইবনে মুসা আর রেজা (আ.) তৃতীয় শতকের মুজাদ্দিদ। শেখ কুলাইনী শিয়া মাযহাবের চতুর্থ শতকের মুজাদ্দিদ। এভাবে প্রত্যেক মাযহাবের মধ্যে এই ধারণার বিস্তার ঘটানো হল এবং এমনকি প্রত্যেক শতকের সুলতানদেরকেও একেকজন মুজাদ্দিদ হিসেবে গণ্য করা হল। এ ধারণা শিয়াদের মধ্যে সংক্রমন ঘটে। আমি বই কিতাবে অনেক খুঁজেছি। আমার মতে সর্ব প্রথম যে ব্যক্তি এই ধারণাকে শিয়ার মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটায় তিনি ছিলেন শেখ বাহায়ী। কিন্তু এটাকে একটি হকিকতের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বা উক্ত হাদিসকে সঠিক প্রমাণ করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং ‘রিজাল’ এর উপর তার লেখা ছোট একটি পুস্তিকায় যখন তিনি মরহুম শেখ কুলাইনীর উপর আলোচনা করেন তখন সেখানে বলেন যে, শেখ কুলাইনী এতবড় একজন মহান ও ব্যক্তিময় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন যে, আহলে সুন্নাত তাকে শিয়া মাযহাবের মুজাদ্দিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শেখ বাহায়ী ছিলেন একজন বিজ্ঞ পন্ডিত। আহলে সুন্নাতের বক্তব্য বিবৃতি সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত ছিলেন। কাজেই তিনি আহলে সুন্নাতের এই স্বীকৃতিকে শেখ কুলাইনীর শ্রেষ্ঠত্বের বা ফজিলতের একটি নমুনা স্বরূপ তুলে ধরতে চেয়েছেন। তার অর্থ এই নয় যে, উক্ত হাদীস বিশুদ্ধ। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন শেখ কুলাইনীর মর্যাদা এত বেশি যে, আহলে সুন্নাতও তার কথার উপর আস্থা পোষণ করে এবং তাকে শিয়া মাযহাবের মুজাদ্দীদ বলে আখ্যায়িত করে। পরবর্তীতে যারা ‘রিজাল’ শাস্ত্রের উপর লেখালেখি করেছেন তারা শেখ বাহায়ীর এই বক্তব্যকে বর্ণনা করেছেন। ক্রমান্বয়ে স্বয়ং শিয়াদেরও বিশ্বাস হতে লাগলো যে, একথা ঠিকই। আরো পরে এসে -শেখ বাহায়ীর একশত থেকে দুইশত বছর পরে- বার এবং তের শতকে কাহিনীকাররা এই হাদীসের একটি সত্য হাদীস বলে গণ্য করে এবং এই হাদীসকে মূলসূত্র সম্পর্কে নিজেরাই কোন জ্ঞান ছাড়াই বসে বসে অপর হাদীসগুলোকে ঠিক করতে লেগে যায়। (আমার মতে বার ও তের শতকের সময়কালটার চেয়ে অধঃপতনের সময় আর ছিল না। অর্থাৎ, যদি জানতে চাই শিয়াদের বই কিতাব ও শিক্ষা কোন সময়ে সবচাইতে অধঃগতি লাভ করে কিংবা গুণগত মান নি¤œ পর্যায়ে চলে যায় তাহলে বলতে হয় যে, বার এবং তের শতকেই সেটা ঘটেছিল।)
আহলে সুন্নাত শেখ কুলাইনী পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল। আর খোদ শিয়ারা আরো সামনে ১৪ শতক পর্যন্তঅগ্রসর হয় এবং বলে মীর্জা শিরাজী হলেন ১৪ শতকের শিয়া মাযহাবের মুজাদ্দীদ। কিন্তু এর দলীল কি? সেটা আর জানা নেই। এ ক্ষেত্রে সবচাইতে হাস্যকর ব্যাপার হল যে, হাজী মীর মোল্লা হাশেমী খোরাসানী তার মুন্তাখাবুত তাওয়ারীখ গ্রন্থে এবিষয়টি আলোচনা করেছেন। আর প্রত্যেক শতকের শিয়া মুজাদ্দীদদের তালিকা তুলে ধরেছেন। সেখানেও তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, কোনক্রমেই কিছুতে কিছু মিলছে না। কেননা, এমন কিছু মণীষী রয়েছেন যারা এত বেশি খেদমত করেছেন যে প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে মুজাদ্দিদ বলতে হয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে তারা কেউ শতাব্দীর প্রথমভাগে আবির্ভূত হননি। যেমন শেখ তুসীর কথাই ধরা যাক। (হয়তোবা এমন কোন আলেমকে পাওয়া যাবে না যিনি শেখ তুসীর ন্যায় শিয়া মাযহাবের খেদমত করে গেছেন। কিন্তু সমস্যা হল যে, তিনি দুই শতকের মাঝখানে পড়ে গেছেন। সে কারণে তাঁেক মুজাদ্দীদ বলা যাবে না।)
কিন্তু অপর একজন আলেমকে দেখা যায় কিছুটা নীচু পর্যায়ের আলেম হওয়া সত্ত্বেও তাকে মুজাদ্দীদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। হাজী মোল্লা হাশেমীও আহলে সুন্নাতের আলেমদের ন্যায় বলেন যে, আলেমদের হিসাব কিতাব আলাদা। সুলতানের হিসাব কিতাবও আলাদা। খলীফা ও সুলতানদের মধ্যে মুজাদ্দীদ কে কে? যে পর্যন্ত শিয়াদের কোন বাদশাহ ছিল না সে পর্যন্ত সুন্নীদের মধ্য থেকে গ্রহণ করেছেন। যেমনঃ উমর ইবনে আব্দুল আযীয, মামুন……। আর যেখান থেকে শিয়াদের বাদশাহ হল সেখান থেকে চলে আসলেন শিয়া বাদশাহদের খোঁজে। যেমনঃ আযুদুদ্দৌলো দেইলামী….। আস্তে আস্তে এক পর্যায়ে এসে পৌঁঁছুলেন নাদের শাহের নিকট। যে লোক মস্তক দিয়ে মিনার নির্মাণ করত সে হল শিয়া মাযহাবের মুজাদ্দীদ। অতঃপর বলেন, নাদের শাহের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল যে, সে ছিল একজন ভাল সেনাপতি। ভাল এক বীর বাহাদুর যতদিন অবধি ইরানের শত্রুদের প্রতি সচেতন ছিল ততদিন ভালভাবেই কার্যপরিচালনা করে, ইরানের শত্রুদেরকে হটিয়ে দেয়, হিন্দুস্থানকে জয় করে। কিন্তু তারপর থেকে রক্তপাত ঘটানোই হয় তার কাজ। সে এমনভাবে মানুষ হত্যা করত যে, কেউ কেউ মনে করে শেষ পর্যন্ত সে পাগল হয়ে যায়। আর এই লোক হবে শিয়া মাযহাবের মুজাদ্দীদ!
এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে এ জাতীয় কথা বা বক্তব্যের মধ্যে কখনো কখনো অন্য ধর্ম বা মাযহাবের মূলসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। অপর মাযহাবের লোকেরা এসে তাদের ধারণা বিশ্বাসগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। প্রতি সহস্রাব্দে একজন মুজাদ্দীদ আবির্ভূত হবেন-ধারণাটি ইসলাম পূর্ব যুগের একটি ধারণা।
প্রাচীন ইরানের যরথুস্ত্রীয়দের মধ্যে একটি বিশ্বাস ছিল প্রত্যেক সহস্র বছরে একবার একজন সংস্কারক আসেন। আমি একসময় যরথুস্ত্রীয়দের একটি বইতে পড়েছিলাম ‘হুশিদার’ হল তার উপাধি যিনি প্রত্যেক সহস্রে একবার আবির্ভূত হয়ে ইরানে সংস্কার ঘটাবেন। এছাড়া বাহায়ী সম্প্রদায়ে ঝানু মুবাল্লিগ আবুল ফযল গুলপয়গানীর লেখা ফারায়েদ নামক বইতেও আমি পড়েছি যে, তিনি বিহারুল আনোয়ার গ্রন্থের ১৩ তম খন্ড থেকে রসুলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন, “আমার উম্মত যদি সংশোধন হয় তাহলে একদিন সময় পাবে, আর যদি ফাসেক হয় তাহলে অর্ধদিবস সময় পাবে”।
অতঃপর তিনি উল্লেখ করেন যে দিনটিতে রসুলুল্লাহ (সা.) একথা বয়ান করেন সেদিনটি ছিল ঐ দিন যা কোরআনে এসেছে, “আপনার পালনকর্তার কাছে একদিন, তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।” (হাজ্জঃ ৪৭)

সুতরাং এই যে মহানবী (সা.) বলেছেন, “আমার উম্মত যদি শুদ্ধ হয় তাহলে একদিন সময় পাবে আর যদি ফাসেক হয় তাহলে অর্ধদিবস সময় পাবে” একথার অর্থ হল যদি শুদ্ধ হয় তাহলে এক হাজার বছর টিকে থাকবে আর যদি ফাসেক হয় তাহলে পাঁচশ বছর। লেখক আবুল ফযল গুলপয়গানী যিনি একজন প্রথম শ্রেণীর ভন্ডলোক তিনি অতঃপর বলেন যে, রসুলের (সা.) উক্ত হাদীসখানি বিশুদ্ধ। কেননা এই উম্মত ফাসেক হওয়ার পূর্বে শুদ্ধ ছিল। তারা হাজার বছরের বেশিও টেকসই হয়নি। কারণ ইমাম হাসান আসকারী (আ.) এর শাহাদাতকাল ২৬০ হিজরী পর্যন্ত ছিল ইলহাম নাযিলের সময়। কেননা, ইমামরা উক্ত ইলহামকেই বয়ান করতেন। এ সময়কালকেই বলা হয় ইসলামের প্রসার কাল। ইমাম হাসান আসকারীর (আ.) ওফাতের পর থেকে বলতে হয় উম্মতের আয়ুস্কাল শুরু হয়। ঐ বছরেই উম্মতের জন্ম ঘটে। ২৬০ হিজরী ইমাম হাসান আসকারীর ওফাত কাল যখন উম্মতের আয়ুস্কাল শুরু হয় তখন থেকে এক হাজার বছর পর কোন সময় হয়? ১২৬০ সাল (হিজরী)। আর এ সালই “বাব” এর আবির্ভাবের সাল (বাহায়ী মতবাদে)। সুতরাং রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার উম্মত যদি শুদ্ধ হয় তখন থেকে এক হাজার বছর পরে অপর কেউ নতুন ধর্ম এনে আমার ধর্মকে রহিত ঘোষণা করবে। আর যদি আমার উম্মত ফাসেক হয় তাহলে পাঁচশ বছর পরে সেটা ঘটবে। উল্লেখিত হাদীসখানি খুঁজে বের করার জন্যে আমি প্রথমে বিহারুল আনোয়ার গ্রন্থটি দেখলাম, কিন্তু পাওয়া গেল না। অতঃপর দেখলাম জনাব মীর্জা আবু তালেব এ হাদীস সম্পর্কে দুই তিন পৃষ্ঠা ব্যাখ্যা লিখে গুলপয়গানীর উত্তর দিতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করে বসেছেন যে, এমন হাদীস ঠিকই রয়েছে। কেননা, গুলপয়গানীর বইতে রয়েছে। অথচ তার এ বিশ্বাস হল না যে, হয়তোবা গুলপয়গানী এ হাদীসখানি নিজের থেকে বর্ণনা করেছেন। আমি যতই অনুসন্ধান করলাম, দেখলাম যে, এ ধরণের কোন কিছু নেই। তবে বিহারুল আনোয়ারে আমি একটি কথা দেখেছি কাব-উল আহবার থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সা.) থেকে নয়। সেটাও আবার অন্য আরেক ভাষায়। বলা হয়েছে যে, ইমাম মেহেদী (আ.) এর জামানায় রাজআত এর যুগে জনগণের মধ্যে যারা ভাল লোক হবে তারা প্রত্যেকে হাজার বছর আয়ু লাভ করবে। আর যদি খারাপ লোক হয় তাহলে পাঁচশ বছর। এ হাদিসটিকে কাব-উল আহবার বর্ণনা করেছেন এবং জনমানুষের সম্বন্ধেই বর্ণনা করেছেন। অপরদিকে আবুল ফযল গুলপয়গানী বলেছেন যে, এ হাদীস রুসুলুল্লাহ (সা.)’ই বর্ণনা করেছেন। কাব-উল আহবার নয়। এ বিষয়টি আমার কাছে এতই চাঞ্চল্যকর মনে হল যে অগত্যা জনাব ডঃ তাভানা এর নিকট টেলিফোন করলাম যিনি বাহায়ীদের সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান রাখেন। আমি তাকে বললাম যে ঘটনা এমন এমন। এ বিষয়ে আপনার কোন পড়াশুনা আছে কি-না। বিহারুল আনোয়ারে আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম কিন্তু কিছুই হস্তগত হল না। যেন তিনি আমাকে বললেন যে, আপনার কথাই সঠিক। এক্ষেত্রে কা’ব-উল আহবারের হাদীস ব্যতিত বাকী সবই জাল।
এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, দ্বীনের কাজে শৈথিল্য ও অসাবধানতা কতটা হানিকর। সুনানে আবু দাউদে আবু হুরায়রার বর্ণিত সেই উক্তিটি কি হৈচৈ-ই না সৃষ্টি করল আহলে সুন্নাতের মধ্যে। পরবর্তীতে শিয়া আলেমরাও তাদের বই-কিতাবে এ বিষয়টি উত্থাপন করে এবং সে বাবদ পৃথক এক অধ্যায় রচনা শুরু করে। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন জায়গায় এসে থামলো যে, নাদের শাহ হয়ে উঠলো মাযহাবের একজন মুজাদ্দিদ। এখানে আবুল ফযল গুলপয়গানী নামক এক ভন্ডের প্রতারণা সংযুক্ত হয় আর মীর্জা আবু তালিবের ন্যায় একজন বিজ্ঞ আলেমও তাকে বিশ্বাস করে নেয় যে, এ রকম কিছু রয়েছে। তিনি নিজে বিহারুল আনোয়ার খুলে দেখার অবসর পাননি যে, প্রকৃতই সেটি আছে কি নাই। এবার শত সহস্র লোক এসে মীর্জা আবু তালেবের বইকে পড়ে আর এ হাদীসটিকে মেনে নেয়।
ইসলাম ধর্মে সংস্কারক রয়েছে। কিন্তু সেটি এমনভাবে যে, একজন সামগ্রিক ও সর্বব্যাপী সংস্কারক যিনি আমাদের শিয়া আকীদা বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত হুজ্জাত ইবনুল হাসান ইমাম মেহেদী (আ.)। এই সংস্কার বিশ্বব্যাপী এবং সার্বজনীন। আমাদের এ আলোচনার সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই। আর এটি হল এক বিশেষ সংস্কার কাজ যা শুধুমাত্র বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এই দায়িত্ব সকল জনগণের উপর। বিভিন্ন সময়ে এ সংস্কারকের উদয় ঘটে। আল্লাহও এক্ষেত্রে শর্ত করে দেননি যে, এ সংস্কারকের আবির্ভাব প্রত্যেক একশ বছর অন্তর অন্তর বা দুশ বছর অন্তর অন্তর বা পাঁচশ বছর কিম্বা হাজার বছর অন্তর অন্তর ঘটবে।
অন্যান্য দ্বীন সম্পর্কে নবী আসার প্রয়োজন হত যারা পূর্ববর্তী দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করেন। আর এ কাজ নবুওতের পথে ছাড়া সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু আংশিক সংস্কার ছাড়াও একটি সামগ্রিক সংস্কারকার্য সংঘটিত হবে মহানবীর (সা.) উত্তরসূরী ইমাম মেহেদী (আ.) এর হাতে। এ হল খতামিয়্যাত সম্পর্কিত আরেকটি দিক।###

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More