শিয়া সম্প্রদায়ের নবুওত চর্চা এবং একটি প্রশ্ন

অবান্তর এক অভিযোগ উত্থাপন করা হয় শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। একান্ত মূর্খ ও শিয়া বিদ্বেষী ব্যক্তি ছাড়া যে কেউ এ ধরনের প্রশ্ন তুলতেই পারে না সে কথা বলা বাহুল্য। প্রশ্নটি হলঃ শিয়াদের আক্বীদা মতে হযরত আলীর (আ.) কাছে ওহী নাযিল করার পরিবর্তে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কাছে নাযিল করে জিব্রাইল না-কি খেয়ানত করেছেন!?

আসলে, এ ভিত্তিহীন অভিযোগকে অসার প্রমাণ করার আগে কোত্থেকে এর সূত্রপাত ঘটেছে সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করে দেখা যাক।
পবিত্র কোরআনের আয়াতমালা এবং তদসংশ্লিষ্ট হাদীসের বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইহুদীরা হযরত জিব্রাইল (আ.)কে রিসালাতের বাণী পৌঁছানোর কাজে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে বিশ্বাস করতো। কেননা, আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দেন নবুওতকে হযরত ইসরাইল (ইয়াকুব) (আ.) এর বংশে দান করতে। অথচ, তিনি আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে নবুওত দান করেন হযরত ইসমাইল (আ.) এর বংশধরকে। এ কারণে, ইহুদীদল হযরত জিব্রাইল (আ.)কে শত্রু ভাবতো। (দ্রঃ তাফসীরে ফাখর রাযী, খন্ডঃ ১, পৃঃ ৩৪৬)
আর, অর্থাৎ, জিব্রাইল খিয়ানত করেছে কথাটি তাদের শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। পবিত্র কোরআনে তাদের এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন প্রতিপন্ন করে সমালোচনার ভাষায় তাদের জবাবে নিম্মোক্ত আয়াতে হযরত জিব্রাইলকে আমিন-(বিশ্বাস) এবং সৎ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছেঃ “বিশ্বস্ত ফেরেশতা একে নিয়ে অবতরণ করেছে আপনার অন্তরে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হন।” (সূরা শুআরাঃ ১৯৪-১৯৫)
অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে, “আপনি বলে দিন, যে কেউ জিব্রাইলের শত্রু হয়- যেহেতু তিনি আল্লাহর আদেশে এ কালাম আপনার অন্তরে নাযিল করেছেন….।” (সূরা বাকারাঃ ৯৭)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ এবং সেগুলোর তাফসীর থেকে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, ইহুদীদল হযরত জিব্রাইল (আ.)কে তাদের মনগড়া কারণে শত্রু জ্ঞান করত এবং তাকে আযাবের ফেরেশতা আখ্যা দিয়ে রেসালাত পৌঁছানোর কাজে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করতো। কাজেই, জিব্রাইল খিয়ানত করেছে- এধারণাটি ইহুদীদের বিকৃত ধ্যান-ধারণা থেকেই উদ্ভূত। আর কতিপয় ব-কলম লেখক শিয়াদের প্রতি যারা দীর্ঘকালের বিদ্বেষ পোষণ করে তারা ইহুদীচক্রের মিথ্যা সুরে সুর মিলিয়ে কাপুরুষের ন্যায় শিয়াদের বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগ আরোপ করে।
শিয়াদের দৃষ্টিতে নবুওতঃ শিয়া সম্প্রদায় কোরআন ও সুন্নাহ এবং রসুলের (সা.) পবিত্র আহলে বাইতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ মোতাবেক হযরত মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (সা.) কে শুধু সত্য নবীই মানে না উপরন্তু মহান আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী তাঁকে সারা জাহানের রেসালাতের অধিকারী, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ স্বর্গীয় দূত হিসেবে পরিগণিত করে। শিয়াদের প্রথম ইমাম হযরত আলী ইবনে আবিতালিব (আ.) তাঁর অতুলনীয় বয়ানে এ সত্যের প্রতি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেনঃ “আমি সর্বান্তঃকরণে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, এক ও অদ্বিতীয় তিনি, তার কোন শরীক নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও প্রেরিত পুরুষ; সর্বশেষ নবী তিনি এবং সারা জগতের উপর আল্লাহর হুজ্জত বা প্রমাণস্বরূপ।” (দ্রঃ নাহজুস সাআদাহ, খঃ ১, পৃঃ ১৮৮, উসুলে কাফী, খঃ ৮, পৃঃ৬৭ )

হযরত ইমাম সাদিক (আ.) কে এ মর্মে বলেনঃ “মহান আল্লাহ আরব জাতির মধ্য থেকে কেবলমাত্র পাঁচজনকে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, হযরত হুদ (আ.), হযরত ইসমাঈল (আ.), হযরত শুআইব (আ.) এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) যিনি সর্বশেষ নবীও বটে। (দ্রঃ বিহারুল আনোয়ার, খঃ ১১, পৃঃ ৪২)

উল্লেখিত হাদীস দ্বারা শিয়াদের উপর আরোপিত মিথ্যা অভিযোগ স্পষ্টতঃই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট প্রতিপন্ন হয় এবং নিঃসন্দেহে হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে শেষ নবী বলে পরিচয় করে। বলা বাহুল্য, হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে নবী প্রমাণের স্বপক্ষে শিয়াদের কিতাবসমূহে যে বিরাট হাদীস রেওয়াতের ভান্ডার রয়েছে সে সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্যে ওস্তাদ জাফর সুবহানীর লেখা ‘মাফাহিমুল কুরআন’ বা অন্যান্য গ্রন্থ দেখা যেতে পারে।
অতএব, গোটা বিশ্বে শিয়া সম্প্রদায় বরং জিব্রাইল (আ.)কে ওহী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ও সৎ বলেই বিশ্বাস করে এবং হযরত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (সা.)কে সত্য নবী এবং মহান আল্লাহর সর্বশেষ প্রেরিত পুরুষ বলে মান্য করে। আর, হযরত আলী ইবনে আবিতালিব (আ.)কে কেবল তার ওসী ও জানসীন (স্থলাভিষিক্ত) হিসেবে গ্রহণ করে।

মন্দ নয় যে, এখানে নিম্মোত রেওয়ায়েতটি যা শিয়া-সুন্নী উভয়ের কাছে সমভাবে সমাদৃত এবং প্রত্যেকেই স্ব-স্ব নির্ভরযোগ্য কিতাব পুস্তকে সনদ সহকারে বর্ণনা করেছে তার সম্বন্ধে সামান্য আলোকপাত করা যাক। হাদীসখানি বা মর্যাদার হাদী নামে খ্যাত। যেখানে হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেকে সর্বশেষ নবী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে হযরত আলীকে স্বীয় ওসী এবং জানশীন হিসেবে পরিচয় করেন। উক্ত হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী ইবনে আবিতালিব (আ.) কে বলেন, “তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে আমার থেকে তুমি সেই মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছ যে মর্যাদায় হারুন ছিল মুসার থেকে।” (অর্থাৎ, হারুন যেমন মুসার খলিফা ও জানশীন ছিল, তুমিও তেমনি আমার খলিফা এবং জানশীন) কেবল এতটুকু পার্থক্য যে আমার পরে আর কোন নবী নেই।

উল্লেখিত রেওয়ায়েতটি সনদের দিক থেকে শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে ইসলামের মহান হাদীসবেত্তাদের কাছে সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণীয়। আর নিঃসন্দেহে এতে শিয়া সম্প্রদায়ের নিম্মোক্ত দুইটি বক্তব্য স্পষ্টাকারে প্রতিভাত হয়ে উঠেঃ
(১) হযরত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত নবীকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহা মর্যাদাবান। তিনিই শেষ নবী, আল্লাহ যাঁকে সারা জাহানের জন্যে চিরন্তন নবুওত দান করে পাঠিয়েছেন এবং তাঁর পর আর কোন নবী আসবে না।
(২) হযরত আলী ইবনে আবিতালিব (আ.) রসুলুল্লাহ (সা.) এর ওসী ও জানশীন এবং তাঁর উত্তরকালে মুসলমানদের খলীফা।
বিঃ দ্রঃ উল্লেখিত হাদীসখানির সনদ ও বর্ণনা অসংখ্য রয়েছে। নিম্মে উদাহরণস্বরূপ কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলঃ (১) সহীহ বুখারী, তাবুক যুদ্ধের অধ্যায়, ৬ষ্ঠ খন্ড, ৩য় পৃষ্ঠা। (২) সহীহ মুসলিম, আলীর ফাযায়েল অধ্যায়, ৭ম খন্ড, ১২০ পৃষ্ঠা। (৩) সুনানে ইবনে মাজাহ, ফাযায়েলে আসহাবে নবী অধ্যায়, ১ম খন্ড, ৫৫ পৃষ্ঠা। (৪) মুস্তাদরাকে হাকিম, ৩য় খন্ড, ১০৯ পৃষ্ঠা। (৫) মুসনাদে আহমদ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং-১৭০, ১৭৭, ১৭৯, ১৮২, ১৮৪, ১৮৫, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩২। (৬) সহীহ তিরমিযী, আলী ইবনে আবিতালিবের মানাকিব অধ্যায়, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১। (৭) মানাকিবে ইবনে মাগাযালী, ২৭, পৃষ্ঠা। (৮) বিহারুল আনোয়ার, খন্ড ৩৭, পৃষ্ঠা ২৫৪। (৯) মাআনিউল আখবার শেখ সাদুক), পৃষ্ঠা ৭৪। (১০) কানযুল ফাওয়ায়েদ, ২য় খন্ড, ১৬৮ পৃষ্ঠা।###

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More