সূরা তাগাবুনের তাফসীর

সূরা তাগাবুনে বিদ্যমান ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি
অনেক খ্যাতনামা মুফাসসিরের ভাষ্য অনুযায়ী এ সূরার মুখ্য বিষয়বস্তু হচ্ছে ইনফাক অর্থ দান-খয়রাত করা ; সূরাতে বস্তুত অর্থ-সম্পদ দান করার বিষয় আলোচিত হয়েছে| কিন্তু আমি যখন এ সূরার আয়াতসমূহের প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করি তখন এটা সুস্পষ্ট হয় যে, বিষয়গুলো শুধু এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়| কেননা, এ সূরার শেষের তিনটি আয়াত সরাসরি দান ও বদান্যতা সম্পর্কে বর্ণিত এবং অবশিষ্ট আয়াতগুলো দান ও বদান্যতার তুলনায় অন্যান্য বিষয়ের সাথে বেশি সংশ্লিষ্ট; যে বিষয়গুলো تغابن ‘তাগাবুন’ শব্দের অর্থের সাথে খুব একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়| আবার সমকালীন কিছু মুফাসসির—যাঁরা বিশ্লেষণ ও গবেষণায় বিশেষ পারদর্শী—উল্লেখ করেছেন যে, সূরা তাগাবুনের বিষয়বস্তু অনেকটা সূরা মুনাফিকুনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ| যেভাবে সূরা মুনাফিকুনে বর্ণিত হয়েছে যে, মানুষের উচিত সতর্ক থাকা, সাবধান ও সজাগ থাকা এবং আপনজন ও ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে যারা দ্বিমুখী আচরণ করে তথা প্রকাশ্যে ঈমানের ভান ধরে, কিন্তু অন্তরে কপটতা পোষণ করে তাদেরকে বিশ্বাস না করা এবং তাদের প্রবঞ্চনার শিকার না হওয়া| অবশ্য সূরার আয়াতে সুস্পষ্টভাবে এমন বর্ণনা না আসলেও মুফাসসিরগণ বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা দানে এভাবে বিবৃত করে থাকেন| যদি কারও নিকটজনদের মধ্যে দ্বিমুখী মনোভাবের লোক থাকে তারা বাহ্যিকভাবে ভাল মানুষের রূপধারণ করে, কিন্তু অভ্যন্তরে দুষ্টু চরিত্রের ও ঈমানহীন হয়, তবে এমন লোকদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা ও তাদের থেকে সাবধান থাকা জরুরি| এক্ষেত্রে উচিত হচ্ছে বিশেষ সাবধানতা ও হিকমতপূর্ণ আচরণ করা| অনুরূপভাবে সূরা তাগাবুনে পরিবার ও সন্তানাদি সম্পর্কে এভাবে ইশারা করা হয়েছে,
“নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি কেবল পরীক্ষা¯^রূপ; এবং আল্লাহর নিকটই রয়েছে মহাপ্রতিদান|” ( সূরা তাগাবুন : ১৫ )
যেহেতু এ সূরাতে إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ‘নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি কেবল পরীক্ষা¯^রূপ’— এ আয়াতটি বর্ণিত হয়েছে, সেহেতু কোনো কোনো মুফাসসিরগণের মতে এ সূরাটির মুখ্য বিষয় হচ্ছে, ধন-সম্পদ ও সন্তানাদি হলো পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যম| কিন্তু এ বিষয়টিও আমার নিকট অবাস্তব মনে হয়েছে; অবশ্য সূরার সামগ্রিক আয়াতগুলো অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করেই আমার এমন ধারণা হয়েছে| আমি যতটুকু অধ্যয়ন করেছি তা থেকে আমার নিকট যে বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে তা পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরব| তবে যদি আরও গভীর অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে সূরার বিষয়বস্তু আরও সুস্পষ্ট ও নিপুণভাবে বিবৃত করা সম্ভব| অবশ্য এ পর্যায়ে সামগ্রিকভাবে যে বিষয়টি তুলে ধরা সম্ভব তা হচ্ছে, এ সূরাটি সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়বস্তুকে ঘিরে বিবৃত হয়নি; বরং এ সূরায় কুরআনে বর্ণিত অনেক বিষয় যেগুলো একজন ঈমানদার মুসলিমের জন্য প্রয়োজন সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে| কুরআনের বর্ণনা কোনো পাঠ্য বইয়ের বর্ণনা থেকে ব্যতিক্রমী| কোনো পাঠ্য বইয়ের প্রণেতা একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে ঘিরে যখন কোনো পুস্তক প্রণয়নের কাজ শুরু করেন তখন তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্যগুলো একত্রিত করে যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে সেগুলোকে উপস্থাপন করেন এবং এক্ষেত্রে তাঁর উত্থাপিত বিষয়ের বিপরীতে যদি কোনো দলিলও তুলে ধরা হয় তবে সেগুলো খণ্ডন করেন| একজন শিক্ষক এভাবে তাঁর পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেন| একজন লেখক একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে বিভিন্নভাবে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করে সেগুলোর ভিত্তিতে উক্ত বিষয়কে উপস্থাপন করে থাকেন| কিন্তু কুরআনের বর্ণনা এমন নয়| কুরআন কোনো ধরনের ভূমিকা ছাড়াই মুখ্য বিষয়কে তুলে ধরে| এ বর্ণনা কোনো শিক্ষকের নয়, কোনো গ্রন্থ প্রণেতার নয় কিংবা কোনো উস্তাদেরও নয়; বরং এ বর্ণনা সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষিত| নিঃসন্দেহে তা অকাট্যভাবেই বর্ণিত হবে| যেমনভাবে এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ‘নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি কেবল পরীক্ষা স্বরূপ|’

Related posts

সূরা তাগাবুনের তাফসীর

সূরা তাগাবুনের তাফসীর

সূরা সাফফের তাফসীর

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More