জান্নাতুল বাকি ধ্বংস, ইসলামের ইতিহাস ধ্বংস করার অসাধু পরিকল্পনা

শাওয়াল ইসলামের ইতিহাসের এক শোকাবহ দিন আজকের এদিনে প্রায় ৯১ বছর আগে ওয়াহাবি ধর্মদ্রোহীরা পবিত্র মক্কা মদিনায় ক্ষমার অযোগ্য কিছু পাপাচার বর্বরতায় লিপ্ত হয়েছিল ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যখন পবিত্র জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদের (সা.) দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ষষ্ঠ নিষ্পাপ উত্তরসূরির পবিত্র মাজার জিয়ারত করছিলেন তখন ওয়াহাবি দুর্বৃত্তরা সেখানে ভাঙ্গচুর লুটপাট অভিযান চালায় এবং ওই নিষ্পাপ ইমামদের পবিত্র মাজারের সুদৃশ্য স্থাপনা গম্বুজগুলো মাটির সঙ্গে গুড়িয়ে দেয়

বর্বর ধর্মান্ধ ওয়াহাবিরা আরো কয়েকটি পবিত্র মাজারের অবমাননা করে এবং এইসব মাজারের গম্বুজ স্থাপনাগুলো ভেঙ্গেচুরে ইসলাম অবমাননার ন্যক্কারজনক তাণ্ডব চালায়। এইসব মাজার ছিল বিশ্বনবীর (সা.) ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, সাহাবি, স্ত্রী, বংশধর খ্যাতনামা আলেমদের

জান্নাতুল বাকি হচ্ছে সে স্থান যেখানে সমাহিত হয়েছেন বিশ্বনবীর (সা.) চাচা হযরত আবু তালিবের (রা.) স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ (সালামুল্লাহি আলাইহা) এই মহীয়সী নারী বিশ্বনবীকে (সা.) লালন করেছিলেন নিজ সন্তানের মত স্নেহ দিয়ে এবং তাঁকে কবরে রাখার আগে বিশ্বনবী (সা.) এই মহান নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নিজেই ওই কবরে কিছুক্ষণ শুয়েছিলেন। রাসূল (সা.) তার জন্য তালকিন উচ্চারণ করেছিলেন শোকার্ত কণ্ঠে

জান্নাতুল বাকি হচ্ছে সেই কবরস্থান যেখানে বেহেশতী নারীদের সর্দার তথা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (সা.) বিশ্বনবীর (সা.) ইন্তিকালের পর যে ৯০ দিন নিজে বেঁচে ছিলেন প্রায়ই সেখানে গিয়েই শোক প্রকাশ করতেন। যেখানে বসে তিনি শোক প্রকাশ করতেন সেই স্থানটিকে বল হল বাইতুল হুজন বা শোক প্রকাশের ঘর। একই স্থানে কারবালার শোকাবহ ঘটনার পর বিশ্বনবীর (সা.) নাতি শহীদদের নেতা ইমাম হুসাইন (.) নিজের পুত্র হযরত আবুল ফজল আব্বাসের (রা.) জন্য শোক প্রকাশ করতেন মুমিনদের নেতা হযরত আলীর (.) স্ত্রী উম্মুল বানিন (সা. .) এখানেই মদিনাবাসী যোগ দিতেন শোকঅনুষ্ঠানে। এখানে প্রায়ই শোক প্রকাশের জন্য আসতেন ইমাম হুসাইনের (.) স্ত্রী হযরত রাবাব (সা. .) বিশ্বনবীর (সা.) নাতনী ইমাম হুসাইনের (.) বোন হযরত জয়নাব (সা. .) উম্মে কুলসুম (সা..) নিয়মিত শোক প্রকাশের জন্য এখানেই আসতেন

ওয়াহাবিরা এভাবে ইসলামের ইতিহাসের নিদর্শনগুলো ধ্বংস করছে ঠিক যেভাবে বায়তুল মোকাদ্দাস শহরে মুসলমানদের পবিত্র প্রথম কেবলা এবং এর আশপাশের ইসলামী নিদর্শনগুলো ধ্বংসের চেষ্টা করছে দখলদার ইহুদিবাদীরা। ফিলিস্তিনের অনেক ইসলামী নিদর্শন ধ্বংস করেছে ইহুদিবাদীরা। অনেকেই মনে করেন ওয়াহাবিদের পৃষ্ঠপোষক সৌদি রাজবংশ (যারা তুর্কি খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ইংরেজদের সহায়তা করেছে এবং পুরস্কার হিসেবে হিজাজে বংশীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে) ছিল একটি ইহুদিবাদী ইহুদি গোত্রেরই বংশধর। এরা মুখে মুখে মুসলমান বলে দাবি করলেও সব সময়ই ইসলামের শত্রুদের সহযোগী

আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে ওয়াহাবি মতবাদের প্রবক্তা আবদুল ওয়াহহাব নজদি সৌদ বংশের সহায়তা নিয়ে ইবনে তাইমিয়ার বিভ্রান্ত চিন্তাধারা প্রচার করতে থাকে। তার ভুল দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নজদি অলিআওলিয়ার উসিলা দিয়ে দোয়া করা, তাদের মাজারে মানত করা শ্রদ্ধা জানানোসহ অলিআওলিয়ার মাজার কবর জিয়ারতের মত ইসলামের মৌলিক কিছু ইবাদত এবং আচারঅনুষ্ঠানকে হারাম শির্ক বলে ঘোষণা করেছিল। ফলে ওয়াহাবিরা মাজার পবিত্র স্থানগুলো ধ্বংস করে আসছে। শুধু তাই নয় নজদি তার চিন্তাধারার বিরোধীদেরকে কাফির তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব বলে উল্লেখ করত

অথচ বিশ্বনবী (সা.) নিজে কবর জিয়ারত করতেন এবং বিশেষ করে তাঁর মাতা হযরত আমিনার (সালামুল্লাহি আলাইহা) কবর জিয়ারত করতে ছুটে যেতেন। তিনি নিজের মায়ের কবরের পাশে কাঁদতেন। (আল মুস্তাদরাক, খণ্ড, পৃ.৩৫৭, মদিনার ইতিহাস, ইবনে শাব্বাহ, খণ্ড, পৃ.১১৮) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা কবর জিয়ারত কর। এই জিয়ারত তোমাদেরকে পরকালের স্মরণে মগ্ন করবে

ওয়াহাবিরা বিশ্বনবীর (সা.) পবিত্র মাজারে এবং কারবালায় হযরত ইমাম হুসাইন (.) মাজারে হামলা চালিয়ে মূল্যবান অনেক সম্পদ, উপহার নিদর্শন লুট করেছিল

ইসলামের পবিত্র ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে ওয়াহাবিরা শুধু মুসলিম উম্মাহর হৃদয়কেই ক্ষতবিক্ষত করেনি, একইসঙ্গে মানব সভ্যতার অবমাননার মত জঘন্য কলঙ্কও সৃষ্টি করেছে। কারণ, প্রত্যেক জাতি সভ্যতাই নিজের পুরনো ঐতিহাসিক চিহ্ন নিদর্শনগুলোকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সংরক্ষণ করে। জন্য বিপুল অংকের অর্থ খরচ করে থাকে জাতিগুলো। অথচ ওয়াহাবিরা ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোও ধ্বংস করে দিচ্ছে যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মগুলো এইসব নিদর্শন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। এটা ইসলাম মানব সভ্যতার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More