জাফরি ফিকাহ’র আলোকে ফৌজদারি দণ্ডবিধির রায় প্রদান ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করার কারণসমূহ (২য় পর্ব)

লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ড. আব্দুল কাইউম

আমরা ইতিপূর্বে, যেসব বিষয় বা কারণকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি দণ্ডবিধির রায়প্রদান ও রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ বিলম্ব করতে পারে তার একটা তালিকা দিয়েছিলাম। সেই তালিকার একটি বিষয় বা কারণ ছিল “রুগ্নতা বা অসুস্থতা”। বিচার বিভাগ হয়তো তার বিচারকার্যের সমস্ত পর্যায় অতিক্রম করার পর রায়প্রদান করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, একইভাবে নির্বাহী বিভাগও হয়তো রায় কার্যকর করার যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকতে পারে – ঠিক এমন সময় বিবাদী বা অভিযুক্ত পক্ষের রুগ্নতার খবর তাদের নিকট জানানো হয়েছে, কাজেই উভয় বিভাগই মানব হিতৈষীতার বিষয়টি দৃষ্টিতে রেখে তাদের নিজ নিজ করণীয়কে আপাততঃ ফাইলের নিচে চেপে রেখে দিবেন। অর্থাৎ কেউ রায় ঘোষণা করবেন না এবং যদি রায় ঘোষণা করা হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে নির্বাহী বিভাগ তা কার্যকর করবেন না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে, যেকোনো ধরনের রুগ্নতা বা অসুস্থতার খবর শুনেই কি তারা এমনটি করতে পারবেন? সাধারণভাবে উত্তর হচ্ছে, না তারা যেকোনো অসুখের খবর শুনেই নিজ নিজ কার্যক্রমকে বিলম্বিত করতে পারবেন না।

তাহলে কোন্ ধরনের অসুখ হলে তা বিলম্ব করতে পারবেন এবং কোন্ ধরনের অসুখ হলে পারবেন না -তা নিয়ে আলোচনায় আসা যাক:

জাফরি মাজহাবের ফকিহগণ এক শ্রেণীর সামগ্রিক শর্ত উল্লেখ করে বলেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণের এসব শর্ত অর্জিত হয়েছে এমর্মে নিশ্চিত হওয়া গেলেই কেবল বিচারের রায়প্রদান কিংবা রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করার সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ফৌজদারি দণ্ডবিধি এসব শর্ত অর্জিত হওয়া বা না হওয়ার ব্যাপারটিকে কোনো নির্ভরযোগ্য কিংবা আইনসম্মত চিকিৎসকের হাতে অর্পণ করেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণকে এই চিকিৎসকের অফিস বা সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। জাফরি মাজহাবের ফিকাহ শাস্ত্রে অন্যতম সামগ্রিক মানদণ্ডের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে এভাবে যে, আদালতের চুলচেরা তদন্ত ও বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাব্যস্ত হওয়া অপরাধী ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ এমন পীড়াগ্রস্ত হবেন যাতে শাস্তিভোগের শারীরিক সক্ষমতা না থাকে এবং এ অবস্থায় তাকে বা তাদেরকে শাস্তি দেয়া হলে সে বা তারা সমূহ বিপদের সম্মুখীন হতে পারে বলে অনুমিত হয়।

জাফরি মাজহাবের ফিকাহ শাস্ত্রের দেয়া এ বিলম্বকরণ সিদ্ধান্তের পেছনে দলিল-প্রমাণ হিসেবে যা ব্যবহৃত হয় তা হচ্ছে একটি হাদিসের “অনুকূল ভাবার্থ”। হাদিসটি এরূপ: “একদা ইমাম আলির (আ.) শাসনকালে, তাঁরই রাষ্ট্রাধীন বিচারালয়ের বিচারক “শুরাইকে’র” দেয়া রায় মোতাবেক এক ব্যক্তির উপর “হদ্দ” (শরঈ নির্ধারিত দণ্ড) নির্ধারিত হয় এবং এ দণ্ড কার্যকর করার জন্যে অপরাধী ব্যক্তিটিকে ইমামের (আ.) সামনে উপস্থিত করা হয়। কিন্তু তিনি (আ.) তার অসুস্থাবস্থা লক্ষ্য করে তাকে ফেরৎ দেন এবং সুস্থ হওয়ার পর আনতে বলেন।” অথচ আল্লাহর রসুল ও মাসুম ইমামগণ (আ.) “হদ্দ” কার্যকর করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করতেন এবং এক মুহূর্তও বিলম্ব করাকে অবৈধ জ্ঞান করতেন না। এ হাদিস প্রমাণ দেয় যে, হদ্দ ও শাস্তি কার্যকর করার ব্যাপারে দ্বীন ইসলামের এত গুরুত্বারোপ থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কারণ সাপেক্ষে তাঁরা (আ.) কতক ক্ষেত্রে হদ্দ ও শাস্তি প্রদানকে বিলম্বিত করেছেন। অবশ্য, এ ধরনের আরও কতিপয় হাদিস রয়েছে।
কোনো অপরাধী ব্যক্তির যদি কোনো বিশেষ অসুখ কিংবা শারীরিক দুর্বলতা থেকে থাকে এবং তাকে তার অপরাধের কারণে বেত্রাঘাত লাগানো হয় কিংবা কিছু সময়ের জন্যে জেলখানায় বন্দী রাখা হয় তাহলে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটার পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। আর এ ধরনের আশঙ্কা থেকেই, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিচারকার্যে নিয়োজিত অনেক আইনজ্ঞই এ ধরনের কোনো অপরাধীকে শাস্তিদানে বিলম্ব করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করে থাকেন।……………. (চলবে)

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুনঃ ১ম পর্ব

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More