সুরক্ষা, নেতৃত্ব এবং সাফল্য অর্জনের উপায়সমূহ

সংকলন ও ভাষান্তর: হুজ্জাতুল ইসলাম মো: আলী মোর্ত্তজা

প্রতিটি মুসলমানই দুনিয়াতে নেতৃত্ব এবং আখিরাতে সাফল্য অর্জন করতে ভালবাসে। আর এটা অর্জন করতে হলে ঈমানের সুরক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। এখানে সুরক্ষা মানে হল আত্মনিয়ন্ত্রণ করা।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি পবিত্র রমজান মাসে নিজেকে এবং তার ধর্মকে রক্ষা করবে, মহান আল্লাহ তাকে বেহেশতে হুরুল আইনের সাথে বিবাহ দিবেন এবং প্রাসাদসমূহের মধ্য থেকে একটি প্রাসাদ দান করবেন।” (কানজুল উম্মাল, ৮ম খণ্ড, পৃ: ৪৭৬)

নিজেকে এবং ধর্মকে রক্ষা করার জন্য তিনটি কাজ করতে হবে:

  • ১- জিহ্বাকে গিবত বা পরনিন্দা করা থেকে রক্ষা করতে হবে।
  • ২- ধন-সম্পদ দান করার মাধ্যমে সম্মান রক্ষা করতে হবে।
  • ৩- মানুষের কাছে কিছু চাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে।

আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন:

  • “সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে নিজের জিহ্বাকে গিবত করা থেকে বিরত রাখে”। (উয়ুনুল হিকাম, হাদিস: ২১)
  • তিনি আরও বলেছেন: “যে নিজের সম্মানকে রক্ষা করতে পারে সে মানুষের কাছে সম্মানিত হবে।” (উয়ুনুল হিকাম, হাদিস: ৪৪৩)
  • মাওলা আলী (আ.) বলেন: “যে নিজেকে মানুষের কাছে কিছু চাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে সে সম্মানিত হবে।” (উয়ুনুল হিকাম, হাদিস: ২০৪৩)
  • তিনি আরও বলেন: “সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে মানুষ দান করার মাধ্যমে নিজের সম্মান রক্ষা করবে।” (কাফি ৪র্থ খণ্ড, পৃ: ৪৯)

আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) তাঁর এক ভাষণে বলেছেন: “হে আল্লাহ! আমার মান-সম্মানকে তোমার অমুখাপেক্ষী দ্বারা রক্ষা কর ও অভাব-অনটন দিয়ে আমার ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করে দিও না যাতে যারা তোমার কাছে জীবিকা যাচনা করে তাদের কাছে আমাকে জীবিকা চাইতে হয় এবং তোমার খারাপ বান্দাদের নিকট দয়া ও অনুগ্রহ চাইতে হয়। আমি নিজে যেন তাদের প্রশংসায় ব্যস্ত না থাকি যারা আমাকে দেয় অথবা তাদেরকে যেন গালি না দেই যারা আমার প্রতি দয়া দেখায় না। অবশ্য এসব কিছুর পেছনে তুমি-ই দেয়া বা না দেয়ার মালিক। নিশ্চয়ই তুমি সকল কিছূর উপর সর্বশক্তিমান।” (নাহজুল বালাগা, খোৎবা-২২৩)

নেতৃত্ব অর্জনের উপায়সমূহ: নেতৃত্ব অর্জনের জন্য আত্মা এবং ধর্মের সুরক্ষার দৃষ্টান্তসমূহ রেওয়ায়েতে উল্লেখ করা হয়েছে:

  • ১। হিংসা না করা,
  • ২- দান-খয়রাত করা,
  • ৩- ধৈর্য এবং সহনশীল হওয়া,
  • ৪- সদাচারণ করা।
  • ৫- বুদ্ধিকে কাজে লাগানো,
  • ৬- সৎকাজ করা,
  • ৭- অসহায়দের যত্ন নেয়া।
  • ৮- অতিথিপরায়ণ হওয়া।

আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন:

  • “যে দান করবে, সে নেতৃত্ব দিবে।” (বিহারুল আনওয়ার, ৭৪তম খণ্ড, পৃ.২৮৫)
  • তিনি আরও বলেছেন: “যে সহনশীল হবে, সে নেতৃত্ব দিবে।” (বিহারুল আনওয়ার, ৭৪তম খণ্ড, পৃ.২০৮)
  • আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) আরও বলেছেন: “চারটি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয়: পাক-পবিত্রতা, আদব-কায়দা, দানশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তা।” (বিহারুল আনওয়ার ১ম খণ্ড, পৃ: ৯৪)

তিনি আরও বলেন: “সৎকর্ম করা, গরীবদের যত্ন নেয়া এবং অতিথিপরায়ণ হওয়া নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য।” (গুরারুল হিকাম, হাদিস: ৬৫৮৫)

সাফল্যের উপায়সমূহ: রেওয়ায়েতে দুই ধরণের সাফল্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে একটি দুনিয়ার আর অপরটি আখিরাতের।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, মানুষের দুনিয়ার সাফল্য ৮টি জিনিসের মধ্যে নিহিত রয়েছে:

  • ১- নিজের সাথে সন্তানের সাদৃশ্যতায়,
  • ২- সুন্দরী ও ধার্মিক স্ত্রীর মধ্যে,
  • ৩-ভালো বাহনে,
  • ৪- বড় বাড়িতে,
  • ৫- ভাল ও যোগ্য বন্ধুর মাঝে,
  • ৬- সৎকর্মশীল ও পরোপকারী সন্তানে,
  • ৭- জন্মভূমিতে বসবাস ও জীবিকা ব্যবস্থায়,
  • ৮-পত্নীর সমর্থন ও সন্তুষ্টিতে। (বিহারুল আনওয়ার, ৭৬তম খণ্ড, পৃ: ১৪৯)

আখিরাতের সাফল্য তখনই অর্জিত হবে যখন মানুষ বেহেশতবাসী হবে। আর বেহেশতবাসী হতে গেলে মানুষকে অবশ্যই মুত্তাকি ও পরহেজগার হতে হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে শেষ পরিণতি ভাল হওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। আর একারণেই হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদেরকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন: ইব্রাহীম ও ইয়াকুব এ সম্পর্কে তাদের পুত্রদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “হে পুত্রগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য এই ধর্ম মনোনিত করেছেন। সুতরাং তোমরা মুসলমান না হয়ে অন্য কোন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো না।” (বাকারা -১৩২)

একজন আন্তরিক ও দয়ালু পিতা শুধু সন্তানের বৈষয়িক স্বার্থ রক্ষারই চিন্তা করেন না বরং সন্তানদের চিন্তাধারার সুস্থতা ও বিচ্যূতিহীনতার দিকেই তিনি বেশী লক্ষ্য রাখেন। মৃত্যুর সময় আল্লাহর মনোনিত ব্যক্তিরা তাদের সন্তানদেরকে শুধু পার্থিব ধন-সম্পদ বন্টনের ব্যাপারেই ওসিয়ত করেননি, একইসঙ্গে তৌহিদ ও ইবাদতের ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়েছেন।
আর এ জন্যই হযরত ইউসুফ যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন: “হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করেছ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছ। হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে মুসলমান বা আত্মসমর্পণকারীর মৃত্যু দাও এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর।” (ইউসুফ-১০১)

পবিত্র কুরআনে প্রাচীন মিশরের দু’জন শাসকের বর্ণনা পাওয়া যায়। এদের একজন হলো ফেরাউন এবং অপরজন হলেন হযরত ইউসুফ (আ.)। ফেরাউন ছিল উদ্ধত ও অত্যাচারী। জনগণকে সে দাস হিসেবে বিবেচনা করত। সে মনে করত ক্ষমতার উৎস সে নিজেই। অপর দিকে হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন সম্পূর্ণ তাঁর বিপরীত। ক্ষমতাকে তিনি আল্লাহর দেয়া আমানত হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! আমার যা কিছু সম্বল তার সবটুকুই তোমার। জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং ক্ষমতার যতটুকু অধিকারী হতে পেরেছি তা তোমারই অনুগ্রহে সম্ভব হয়েছে। শুধু ইহকালেই নয় পরকালেও আমরা তোমার ওপরই নির্ভরশীল। হে আল্লাহ! আমি যেন তোমার অনুগত থেকেই মৃত্যুবরণ করি। আমাকে তুমি তোমার একান্ত অনুগত ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও।

হযরত ইউসুফ (আ.) এভাবে সবিনয়ে আল্লাহর কছে দোয়া করতেন। তিনি প্রকৃতই একজন আত্মসমর্পণকারী ছিলেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছার পরও তিনি এক মুহুর্তের জন্যও আল্লাহর অনুগ্রহের কথা ভুলে যাননি।

ক্ষমতা এবং সম্পদ মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে নেয়। এই দুই ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে অনেক উত্থান পতন আসে। তাই সব সময় আল্লাহর স্মরণাপন্ন হওয়া উচিৎ, তিনিই যে কোনো বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

শেষ পরিণতি ভাল হওয়ার বিষয়টি যদি গুরুত্বপূর্ণ না-ই হত তাহলে রাসূল (সা.) যখন মাওলা আলীকে শাহাদাতের সংবাদ দিয়েছিলেন তখন তিনি এই প্রশ্ন করতেন না যে, তখন আমার ঈমান ঠিক থাকবে তো? মহানবী (সা.) উত্তরে বলেছিলেন: হ্যাঁ, তোমার ঈমান সুরক্ষিত থাকবে। (তথসূত্র: ‘কুরআন ও আহলে বাইতের বাহাত্তরটি শিক্ষা’ শীর্ষক গ্রন্থ হতে সংকলিত)###

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More