জাফরি ফিকাহ’র আলোকে ফৌজদারি দণ্ডবিধির রায় প্রদান ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করার কারণসমূহ (৪র্থ পর্ব)

লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ড. আব্দুল কাইউম

এখন “তা’যির বা ভর্ৎসনামূলক শাস্তি” প্রদান বিষয়ে আলোচনা করা যাক। এ ধরনের শাস্তি বলতে সেই সব শাস্তিকে বুঝায় যে ক্ষেত্রে দ্বীন ইসলাম অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার আদেশ দিয়েছে কিন্তু তার অপরাধের জন্যে শাস্তির “পরিমাণ” ও “ধরন” নির্ধারণ করেনি; বরং এটি কাজি বা বিচারকের হাতে অর্পণ করেছে। অথবা, যদি শাস্তির কথা বলে থাকে তাহলে “সর্বোর্ধ্ব” পরিমাণের কথা বলেছে, কিন্তু “সর্বনিম্ন” পরিমাণের কথা বলেনি; অর্থাৎ কোনো অপরাধের জন্যে ১ থেকে ৯৯টি চাবুক মারার কথা বলে থাকলে, এর ভাবার্থ দাঁড়ায় এই যে, সেই অপরাধের জন্যে ৯৯টির বেশি চাবুক মারা যাবে না; কিন্তু নিম্মের দিকে বিচারক মহোদয় স্বাধীন – ইচ্ছা করলে ২টি কিংবা ৪টি অথবা ১০টি বা ২০টি ইত্যাদি চাবুক নির্ধারণ করতে পারেন। আর এ ধরনের অপরাধগুলো সাধারণতঃ লঘু অপরাধ হয়ে থাকে। যেমন: বেগানা নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক – না শারীরিক মিলন – ; বিভিন্ন প্রকারের চুরি – তবে এরও কিছু ব্যতিক্রম আছে; কাউকে অবমাননা করা – প্রভৃতি।

অপরাধী ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ যদি এ ধরনের কোনো অপরাধে জড়িত হয়ে থাকে এবং শাস্তি ভোগ করার মত তার বা তাদের শারীরিক যোগ্যতা ও সক্ষমতা না থাকে, তাহলে করণীয় কি? অপরাধী ব্যক্তি বাস্তবেই উক্ত কোনো পরিস্থিতির শিকার হলে বিচারক মহোদয় তার জন্যে চাবুকের শাস্তির পরিবর্তন করে এমন কোনো শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন যা তার পক্ষে সহনীয় হয় এবং তার অসুখের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। অনুরূপভাবে জেলখানায় বন্দী রাখার ফলে তার অবস্থার অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে, সে ক্ষেত্রেও বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। “পরিমাণ” নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বিচারক মহোদয় স্বাধীন। একইভাবে তিনি শাস্তি কার্যকরের বিষয়টিকেও ঝুলন্ত রেখে দিতে পারেন – প্রভৃতি।

ইরানের ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৫৪০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, কেউ যদি কোনো অফিস-আদালতে কিংবা কোনো সংস্থায় কোনো “মিথ্যা সত্যায়নপত্র” (মেডিকেল সার্টিফিকেট ব্যতীত) উপস্থাপন করে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধার করে বা করার চেষ্টা করে তাহলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে ৭৪টি বেত্রাঘাত কিংবা তাকে নগদ অর্থও জরিমানা করা যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আবার উল্লেখিত আইনের ২৮৩ নম্বর ধারার ‘সি’ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, অপরাধী ব্যক্তি যদি পীড়াগ্রস্ত হয়ে থাকে এবং জরিমানা হিসেবে নগদ অর্থ প্রদান করার মত তার সামর্থ্য না থাকে ও একমাত্র বেত্রাঘাতই তার শাস্তির মাধ্যম হয় এবং বেত্রাঘাতের কারণে তার রোগ বেড়ে যাওয়ার ও শারীরিক অবনতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে বিচারক মহোদয় যেন তার শাস্তি কার্যকর করতে বিলম্ব করেন!

কিন্তু অপরাধীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ার যদি কোনো সম্ভাবনা না থাকে কিংবা বিচারালয় যদি কল্যাণকর মনে করে তাহলে রায়ে উল্লেখিত বেত্রাঘাতের সমপরিমাণ বেত একত্রে আঁটি আকারে (গুচ্ছ করে) বেঁধে একবারেই তার শরীরে আঘাত করবে! আমরা ইতিপূর্বে আমাদের ২য় পর্বের আলোচনায় উল্লেখ করেছি যে, অপরাধী ব্যক্তির শাস্তি ভোগ করার মত শারীরিক সামর্থ্য আছে কি না তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব হচ্ছে কোনো নির্ভরযোগ্য কিংবা আইনসম্মত চিকিৎসকের। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এই চিকিৎসকের অফিস বা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আদালতে নিজের অবস্থা প্রমাণ করতে হবে।

যেসব অপরাধী ব্যক্তি স্বীয় শরীরের শাস্তিভোগের অপারগতা প্রমাণ করার জন্যে কোনো আইনসম্মত চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হবে তারা পাঁচভাগে বিভক্ত, যথা:

  • প্রথম দল: সেই সব অপরাধী ব্যক্তি এ দলের আওতাভুক্ত যাদের শারীরিক অসুস্থতার ব্যাপারে পূর্বাভাস ও সম্ভাবনা ব্যক্ত করা যেতে পারে। যেমন: কোনো অস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী রোগ। এ ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা, চিকিৎসার ধরন ও নিশ্চিত আরোগ্যের সময়কাল নির্ধারণ করাই যথেষ্ট এবং সাধারণতঃ রোগ সেরে যাওয়ার পর, আদালতের ঘোষিত রায় কার্যকর করতে কোনো বাধা থাকবে না।
  • দ্বিতীয় দল: এ দলের আওতাভুক্ত হচ্ছে সেই সব অপরাধী যাদের আরোগ্য লাভের ব্যাপারে নিশ্চিত অভিমত ব্যক্ত করার জন্যে সময় অতিবাহিত হওয়া প্রয়োজন। যেমন: জটিল-কঠিন হেপাটাইটিস রোগ যা পুনরায় পরীক্ষার মাধ্যমে এর চিকিৎসার সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
  • তৃতীয় দল: এ দলে সেই সব অপরাধীকে স্থান দেয়া যায় যাদের পুরাতন কোনো রোগ রয়েছে ও তারা আজীবনই অসুস্থ; কিন্তু তাদেরকে বেত্রাঘাত করার কারণে তাদের রোগের কোনোরূপ তারতম্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না; যেমন: জটিলতাহীন কোনো ডায়াবেটিস রোগ।
  • চতুর্থ দল: সেই সব অপরাধীকে এ দলের অন্তর্ভুক্ত করা যায় যাদের কোনো পুরাতন ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ রয়েছে এবং বেত্রাঘাতের কারণে এর অবনতি ঘটার ও সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে; যেমন: কোমরের ডিস্ক রোগ।
  • পঞ্চম দল: এমন সব অপরাধী যাদের শরীরের এক বা একাধিক স্থানে ক্ষত রয়েছে কিংবা শরীরের বিশেষ কোনো স্থানে রোগের জটিলতা প্রকাশিত হয়েছে; যেমন: পায়ের বাঁশি ভাঙ্গা অবস্থা।

উপরোক্ত শ্রেণীবিন্যাস হতে প্রতীয়মান হয় যে, আইনসম্মত চিকিৎসকের দৃষ্টিতে কোন্ ধরনের অপরাধী ব্যক্তি বেত্রাঘাত কিংবা বন্দীদশা সহ্য করার মত শারীরিক সক্ষমতা রাখে না তার সামগ্রীক মানদণ্ড ও দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। আর এ কারণেই আমরা বলেছি যে, বিচারক মহোদয়কে মুজতাহিদ (বিজ্ঞ) হওয়া বাঞ্ছনীয়। সাম্প্রতিককালে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব অপরাধী ব্যক্তি কঠিন হৃদ বা ধমনী, মৃগী, ফুসফুস, মেরুদণ্ড, মানসিক, মস্তিষ্ক, কিডনি ও যকৃৎ রোগ এবং বার্ধক্যের ন্যায় দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত তাদেরকেই কেবল শাস্তি মুক্তি কিংবা বিলম্বকরণ অথবা শাস্তির ধরন পরিবর্তন প্রভৃতির সত্যায়নপত্র দেয়া হয়েছে। (চলবে।)########

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More