সংকলন ও অনুবাদ: হুজ্জাতুল ইসলাম মীর আশরাফুল আলম
জুম’আর নামায হল অন্যান্য নামাযের মতো একটি ইবাদত যা শুক্রবার যোহরের ওয়াক্তে বিশেষ কিছু শর্ত সাপেক্ষে আদায় করা হয়ে থাকে এবং এই নামাযের ফযিলত হল এটাই যে, এই নামের একটি সূরা পবিত্র কোরআনে এসেছে। যেখানে মুমিনদের জুম’আর নামাযে উপস্থিত হওয়ার জন্য স্পষ্টভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে: হে ঈমানদারগণ! জুম’আর দিনে যখন নামাযের আযান দেওয়া হয়, তখন আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর, যা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা তা জানতে! (সূরা জুম’আ, আয়াত নং-৯) এটি জাহান্নামের আগুনকে শরীরের জন্য হারাম করে এবং এটি কিয়ামতের ভীতি ও আতঙ্ককে সহজ করে দেয়।
জুম’আর নামাযের গুরুত্ব ও মহত্ব অনেক যা পরবর্তী সময়ে আপনাদের সামনে বিস্তারীত ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করব। কিন্তু বর্তমানে জুম’আর নামাযের সময় কখন শেষ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তাই তার সমাধানে কিছু বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
জুম’আর নামাযের প্রথম ওয়াক্ত হল সূর্যের যাওয়াল (যাওয়াল অর্থাৎ সূর্যের ছায়া হেলে পড়া) হওয়া তথা যোহরের নামাযের প্রথম ওয়াক্ত। (মাহমুদ আব্দুর রহমান, মু’জামুল মুছতালাহাতি ওয়াল আলফাযিল ফিকহিয়্যাহ্, খন্ড-২, পৃ.-২১৬) আর সূর্যের হেলে পড়া বলতে যা বোঝায় তা হল মধ্য আকাশ থেকে পশ্চিম দিকে তার গতিশীলতা। এই হেলে পড়ার লক্ষণ হল বস্তুর ছায়া দিনের মধ্যভাগে সংক্ষিপ্ত হওয়ার পর তা পূনরায় দীর্ঘ হতে শুরু করে, (সাঈদি আবু জাইব, আলকামুসুল ফিকহি লুগাতু ওয়া ইসতালাহাত, পৃ.-১৬১, দামেষ্ক, দারুল ফিক্র) যা শরিয়তের দৃষ্টিতে যোহরের ওয়াক্ত শুরু এবং আযান দেয়ার সময়। এ ব্যাপারে ফকিহগণ সকলেই ঐকমত্য; কিন্তু এর শেষ সময় সম্পর্কে পাঁচটি মতামত রয়েছে যা নিম্নরূপ:
*যতক্ষণ যোহরের নামায পড়ার সময় থাকে ততক্ষণ জুম’আর নামাযের সময় থাকে:
১. জুম’আর নামাযের সময় যোহর-এর নামাযের সময় পর্যন্ত প্রসারিত অর্থাৎ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত। আস্ সারাইর গ্রন্থে ইবনে ইদ্রিস এবং আদ্ দুরুস ওআল্ বায়ান গ্রন্থে শাহিদে আওয়াল এই দৃষ্টিভঙ্গিটি গ্রহণ করেছেন এবং সে অনুযায়ী জুম’আর নামাযের সময় নিয়ে (মাগরিব-এর সময়ের পূর্ব পর্যন্ত) কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
* জুম’আর নামাযের সময় আনুমানিক চার ঘন্টা:
২. জুম’আর নামাযের সময়টি যাওয়ালের শুরু থেকেই সূচনা হয় এবং সূচকের ছায়া তার নিজস্ব আকার না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী থাকে অর্থাৎ প্রায় চার ঘন্টা। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ফকিহগণের মশহুর বা প্রসিদ্ধ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (মৌসুয়া’তুল ইমামিল খুয়ী, খন্ড-১১, পৃ.-১৩৭) অবশ্য আল্লামা আল-মুনতাহা গ্রন্থে (আল্ মুন্তাহা, খন্ড-১, পৃ.-৩১৮) এই মতামতটিকে সর্বসম্মত বলে উল্লেখ করেছেন এবং বর্তমান ফকিহগণের মধ্যে আয়াতুল্লাহ খুয়ী (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৮৯) এবং আয়াতুল্লাহ মির্যা জাওয়াদ তাবরিযি (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৮৯) এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ফতোয়া প্রদান করেছেন।
* জুম’আর নামাযের সময় আনুমানিক দুই ঘন্টা:
৩. জুম’আর নামাযের সময় হল যাওয়ালের শুরু থেকে সূচকের ছায়া একজন সাধারণ উচ্চতা সম্পন্ন ব্যক্তির দুই পায়ের পাতার পরিমান বা সূচকের দুই-সপ্তমাংশ; অর্থাৎ প্রায় দুই ঘণ্টা।
এই দৃষ্টিভঙ্গিটি আল্লামা মাজলিসি এবং তার পিতার পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত হয়েছিল এবং তৎকালীন ফকিহ্গণের মধ্যে ইমাম খোমেনি (রহ.) এবং আয়াতুল্লাহ ফাযেল লাঙ্করানী (রহ.) (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৭৫, মাসয়ালা নং-১৫) তা গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য ইমাম উল্লেখ করেছেন: তবে সতর্কতা এই যে, জুম’আর নামাযের কর্যক্রম যেন ওয়াক্ত শুরু হওয়া থেকে দেরি করা না হয় এবং দেরি হলে সেক্ষেত্রে সতর্কতা হল যোহরের নামায বেছে নেওয়া, যদিও সূচকের ছায়া একজন সাধারণ উচ্চতা সম্পন্ন ব্যক্তির দুই পায়ের পাতার পরিমানে ফিরে আসা পর্যন্ত জুম’আর নামাযের সময় বর্ধিত থাকার সম্ভাবনাও নেই। (তাহ্রিরুল ওয়াসিলাহ্, খন্ড-১, পৃ২১৬)
* জুম’আর নামাযের সময় এক ঘন্টা:
৪. জুম’আর নামাযের সময় যাওয়ালের শুরু থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত। স্পষ্টতই, এই ফতোয়াটি প্রথমবারের মতো প্রদান করেছিলেন তৃতীয় শতাব্দীর একজন ফকিহ যিনি “জোয়া’ফি” নামে এবং রিজালের বইয়ে “আল-সাবুনি” নামে পরিচিত ছিলেন। তবে সমসাময়িক ফকিহগণের মধ্যে আয়াতুল্লাহ মুহাম্মাদ আলী আরাকি (রহ.) (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৭৫, মাসয়ালা নং-১৫) এবং আয়াতুল্লাহ শোবাইরি যানজানি (দা.বা.) (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৯০৯, মাসয়ালা নং-৭৪৩) এ দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সামান্য পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে আর তা হল আয়াতুল্লাহ আরাকির (রহ.) ফতোয়া অনুসারে গণনার মান হল জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঘন্টা, যার অর্থ ষাট মিনিট (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৭৫, মাসয়ালা নং-১৫) এবং আয়াতুল্লাাহ যানজানির (দা.বা.) গণনার মান হল দিনের এক দ্বাদশ অংশ। (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৯০৯, মাসয়ালা নং-৭৪৩) কেননা, তার মতে বিভিন্ন ঋতুতে জুম’আর নামাযের সময় ভিন্ন হয়। উদাহরণ স্বরূপ, বছরের সবচেয়ে ছোট দিনে জুম’আর নামাযের সময় প্রায় পঞ্চাশ মিনিট এবং বছরের দীর্ঘতম দিনে জুম’আর নামাযের সময় প্রায় এক ঘণ্টা পনের মিনিট। (এখানে দিনের অর্থ হচ্ছে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত)
* জুম’আর নামায পড়তে কমের মধ্যে যতটুক সময় প্রয়োজন:
৫. জুম’আর নামাযের সময় হচ্ছে উক্ত আমলের সমান; অর্থাৎ প্রচলিত দুইটি খুতবা ও দুই রাকায়া’ত নামায পড়ার গ্রহণযোগ্য সময়। পুরাতন ফকিহগণের মধ্যে আবু আল-সালাহ হালাবী আল-কাফি ফি ফিকহ (আল্ কাফি ফিল ফিক্হ, পৃ.-১৫২) গ্রন্থে এবং ইবনে যোহাইরা গুনিয়্যাতুন্ নিযু’ (গুনিয়্যাতুন্ নুযু’, পৃ.- ৯০) গ্রন্থে এবং সমসাময়িক ফকিহগণের মধ্যে আয়াতুল্লাহগণ যথাক্রমে: আয়াতুল্লাহ গুলপায়গনি (রহ.), (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৯৭) আয়াতুল্লাহ সিস্তানি (দা.বা.), (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৮৯) আয়াতুল্লাহ বাহজাত (রহ.), (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৯০৫, মাসয়ালা নং-১) সাফি (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৯৭) এবং আয়াতুল্লাহ মাকারেম শিরাজি (দা.বা.) (তৌযিহুল মাসায়েল মারাজে’, খন্ড-১, পৃ.-৮৭৫, মাসয়ালা নং-১৫) এই দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করেছেন। (জুম’আর নামাযের সময় সম্পর্কে ফকিহ্গণের মতামত ভিত্তিক তথ্যের জন্য, দেখুন: ফোকাহাত মাদ্রাসার ওয়েবসাইট)
উপরে জুম’আর নামাযের শেষ সময় ভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে যা সংগৃহীত একটি প্রবন্ধের আলোকে অনুদিত। (জুম’আর অভিধান, আয়াতুল্লাহ্ মোহাম্মদ মোহাম্মদী রেইশাহরী (রহ.), প্রকাশের তারিখ: ১৩৯৪ পৃষ্ঠা ২৯৫ থেকে ২৯৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত জুম’আর নামাযের সময় সম্পর্কে ফকিহ্গণের মতামত) এ পর্যায়ে যেহেতু আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী (দা.বা.) ও আয়াতুল্লাহ্ সিস্তানীর (দাবা.) ফিকাহগত নির্দেশনা বেশী অনুসরণ করা হয়ে থাকে তাই নিম্ন তাদের দু’জনের ফতোয়াকে আলাদাভাবে তুলে ধরছি:
আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী (দা.বা.): জুম’আর নামাজের সময় হচ্ছে সূর্যের যাওয়াল থেকে (যোহ্রের ওয়াক্তের সূচনা) শুরু হয়ে থাকে। আর সতর্কতামুলক ওয়াজিব হল জুম’আর নামায যেন যাওয়ালের সময় থেকে এক থেকে দুই ঘন্টা পর্যন্ত না গড়ায়। এই কথাটির দুটি অর্থ হতে পারে যথা: এক থেকে দুই ঘন্টা পর্যন্ত বা এক ঘন্টা শেষ হয়ে দ্বিতীয় ঘন্টায় প্রবেশ করা অর্থাৎ বলা যেতে পারে এক ঘন্টা বা সোয়া এক ঘন্টা এর বেশী যেন না হয়। তবে যেহেতু অধিকাংশ মার্জাগণ জুম’আর নামাযকে দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ কররা ব্যপারে ঐকমত্য, সে দৃষ্টিকোণ থেকে এক দুই ঘন্টা বলতে এক ঘন্টা শেষ হয়ে দ্বিতীয় ঘন্টায় প্রবেশ করা অর্থাৎ বলা যেতে পারে এক ঘন্টা বা সোয়া এক ঘন্টা এর বেশী নয় এটা অনুমান করাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত।) যাওয়াল থেকে শুরু করে নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত এক বা দুই ঘণ্টা দেরি না করা আবশ্যক। ((https://farsi.khamenei.ir/news-content?id=27270)
আয়াতুল্লাহ্ সিস্তানী (দা.বা.): খুতবাগুলি যদি সর্বাধিক ৪০ মিনিট স্থায়ী হয়, অতঃপর পরিপূর্ণ নিয়ম-তান্ত্রিকভাবে জুম’আর নামায পড়া হয় তবে তা যথেষ্ট হবে এবং সেক্ষেত্রে যোহরের নামায পড়ার প্রয়োজন নেই। আর যদি খুতবাগুলি ৪০ মিনিট ছাড়িয়ে আনুমানিক সোয়া এক ঘন্টা স্থায়ী হয়, তবে সেক্ষেত্রে সতর্কতা অনুসারে যোহরের নামাযও পড়া আবশ্যক। আর যদি খুতবাগুলি ৭৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়, দৃশ্যত এটি যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে না এবং অবশ্যই যোহরের নামাজ পড়তে হবে এবং মুকাল্লাফ যদি বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায় তবে সেক্ষেত্রে এই নির্দেশ অনুসারে আমল করলে যথেষ্ট হবে। (https://www.sistani.org/persian/qa/01059/)
মোদ্দা কথা: জুম’আর নামাযের শেষ সময়ের ব্যাপারে মার্জায়ে তাকলিদগণের মধ্যে মতভেদ এবং জুম’আর নামাযে উপস্থিত নামাযিগণও বিভিন্ন মার্জার তাকলীদ করে থাকেন এই বিষয় দুটি বিবেচনায় রেখে আইম্মায়ে জুম’আর প্রতি আবেদন যে, জুম’আর নামায এমনভাবে আদায় করা যাতে বর্তমান সময়ের সকল মার্জাগণের ফতোয়ার প্রতিফলণ ঘটে বা তাদের ফতোয়া অনুযায়ী সঠিক হয়। এ দৃষ্টিকোণে এটাই উচিত হবে যে, মার্জাগণের ফতোয়া যেগুলি জুম’আর নামাযের সময়কে সীমাবদ্ধ করে উল্লেখ হয়েছে সেগুলোকে মানদন্ড হিসাবে গ্রহণ করা। অন্যথায়, এটি ঘোষণা করা প্রয়োজন যে যারা ওই শ্রেণীর মার্জাগণের অনুসরণ করে (যাদের দৃষ্টিতে সময়ের সীমবদ্ধতা নেই) তাদের যোহ্রের নামাযও পড়তে হবে। উপরন্তু, খুতবা সংক্ষিপ্ত করা একটি ইসলামী ঐতিহ্য। (দেখুন: খুত্বা সংক্ষিপ্ত করা এবং নামায দীর্ঘায়ীত করা নামক কিতাব, পৃ.-২৮৫।)
বি:দ্র: যেহেতু আয়াতুল্লাহ সিস্তানির (দা.বা) ফতোয়া অনুযায়ী জুমআর নামায খোতবা এবং নামাজসহ ৫০ মিনিটের বেশী হওয়া উচিত নয়, সেহেতু সকলের উচিত এই সময়ের মধ্যেই জুমআর নামাযকে শেষ করা। তাহলে সকল মারজার মতামতকে মান্য করার হবে। কেননা সর্বনিম্ন সময়কে গ্রহণ করা হলে সবার মত তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। ####