আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার : নীরব সমাজ ধ্বংসের পথে – খুলনার জুমার খুতবায় বক্তব্য মাওলানা সাইয়েদ ইব্রাহিম খলিল রাজাভী
খুলনা, ২২ মে ২০২৬ : হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা সাইয়েদ ইব্রাহিম খলিল রাজাভী বলেছেন, “আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার” (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) মুমিনের ফুরূয়াতের একটি অপরিহার্য কর্তব্য। যে সমাজে অন্যায় দেখে নীরব থাকা হয়, সেখানে অন্যায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রূপ নেয় এবং সমগ্র সমাজ ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। আজকের পৃথিবীতে মানুষ একে অপরকে নসিহত করা থেকে বিরত থাকাকে ‘সভ্যতা’ ও ‘স্বাভাবিকতা’ বলে ভাবছে—এটি অত্যন্ত ভয়ংকর প্রবণতা। খুলনার মসজিদে ওয়ালি আসরে জুমার খুতবায় তিনি এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে মাজারের পবিত্রতা রক্ষা, সালেহীনদের কবরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও মাজার ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য রাখেন তিনি। কারবালার চরিত্র গঠনের শিক্ষা ও দায়িত্বশীল আলেম সমাজের ভূমিকা নিয়েও আলোকপাত করেন এই বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা।
হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, খুলনার মসজিদে ওয়ালি আসরে জুমার খুতবায় হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা সাইয়েদ ইব্রাহিম খলিল রিজভী বলেছেন,
আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার: মুমিনের ফুরূয়াতের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ
মুমিনের ফুরূয়াতের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার; অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা।
রেওয়ায়েতে এসেছে, যে সমাজে সৎ কাজের আদেশ দেওয়া হয় না এবং অসৎ কাজের প্রতিবাদ করা হয় না, সেই সমাজ ধ্বংসের দিকে চলে যায়। কারণ যখন মানুষ অন্যায় দেখে নীরব থাকে, তখন ধীরে ধীরে অন্যায়ই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের “সভ্যতা” বনাম প্রকৃত বাস্তবতা
আজ আমরা আমাদের পৃথিবীকে এমনভাবে সাজিয়েছি যেন কেউ কারো কাজে হস্তক্ষেপ করবে না, কেউ কাউকে নসিহত করবে না, কেউ কাউকে খারাপ কাজ থেকে বাধা দেবে না। আমরা এটাকেই “সভ্যতা” বা “স্বাভাবিকতা” মনে করতে শুরু করেছি।
কিন্তু বাস্তবে এটি একটি ভয়ংকর অবস্থা। কারণ মানুষ যখন একে অপরকে ভালো কাজের দিকে ডাকবে না, তখন সমাজ থেকে দ্বীনদারিতা, লজ্জাবোধ, নৈতিকতা ও বরকত ধীরে ধীরে উঠে যাবে।
এটিই আমাদের পৃথিবী থেকে বরকত চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
দায়িত্ব শুধু আলেমদের নয়, প্রতিটি মানুষের
সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু আলেমরাই যে সৎ কাজের আদেশ দিবে আর অন্য কেউ দিবে না—বিষয়টা এমন নয়। অবশ্যই যাদের জ্ঞান বেশি, তাদের দায়িত্বও বেশি। কিন্তু এর মানে এই না যে সাধারণ মানুষের কোনো দায়িত্ব নেই।
· পিতা-মাতার দায়িত্ব রয়েছে
· পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে
· সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব রয়েছে
হাদীসে এসেছে, যারা “আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার” করে না, তাদের দোয়া কবুল হয় না। কারণ একটি সমাজকে ঠিক রাখতে হলে শুধু অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা করলেই হবে না, মানুষকে সত্য ও কল্যাণের দিকেও আহ্বান করতে হবে।
জালিমকে ঘৃণা করা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সবকিছু শুধু স্বাভাবিক অনুভূতির উপর চলে না। যেমন—আপনি কাউকে নামাজের জন্য নসিহত করবেন, এর জন্য আগে নিজের মধ্যে নামাজের গুরুত্ব থাকতে হবে। নিজের পরিবার, নিজের সন্তানদেরও আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার শেখাতে হবে।
আজকের বাস্তবতা: দায়িত্বশীলদের ভূমিকার সংকট
আজ আমরা খবরের দিকে তাকালেই দেখি—কেউ নিরাপদ নয়, এমনকি ছোট শিশুরাও না। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো, যারা দায়িত্বশীল—যেমন আলেম সমাজ, অভিভাবক সমাজ, সমাজের প্রভাবশালী মানুষ—তাদের অনেকে নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে ব্যক্তিগত প্রচারণা ও ভাইরাল হওয়ার পেছনে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সালেহীনদের সংস্পর্শে আত্মপরিবর্তন
সালেহীনদের সাথে সম্পর্ক রাখলে, চলাফেরা করলে, তাদের জীবনকে জানলে—একসময় মানুষ নিজেও সালেহীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে।
যখন আপনি কোনো মাজারে যান, কোনো সালেহ, পরহেজগার ব্যক্তির কবর জিয়ারত করেন, তখন মনে হয়—এই ব্যক্তি তো ইমাম ছিলেন না, মাসুমও ছিলেন না, তারপরও কীভাবে এত ঈমানদার, এত আল্লাহভীরু হতে পেরেছেন?
বিশেষ করে ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারের আশেপাশে গেলে, চারদিকে অসংখ্য সালেহীন মানুষের কবর দেখলে অন্তরের মধ্যে এক ধরনের অনুভূতি জাগে।
“আহা! যদি আমিও এমন হতে পারতাম…”
এটাই তো মাজারের দর্শন।
এটা শুধু একটি কবর দেখা নয়, বরং নিজের ভেতরে পরিবর্তনের অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া।
মনে আশা জাগে—
“যদি তারা পারেন, তাহলে আমিও পারবো। আমাকেও চেষ্টা করতে হবে।”
কারবালার শিক্ষা: শুধু বিলাপ নয়, চরিত্র গঠন
আজকে যখন আমরা কারবালার যুদ্ধের সঙ্গী-সাথীদের শাহাদাত ও তাদের মর্যাদা দেখি, তখন বলি—
“আহা! যদি আমি আপনাদের সাথে থাকতাম, শাহাদাত বরণ করতাম…”
কিন্তু এর অর্থ শুধু এটুকু না।
এর আরেকটি গভীর অর্থ হলো—
আমি হাবিব ইবনে মুযাহির-এর মতো হতে চাই, আমি সেই ঈমান, সেই আনুগত্য, সেই চরিত্র অর্জন করতে চাই।
এই অনুভূতিটাই মানুষ মাজার জিয়ারতের মাধ্যমেও পেতে পারে। যখন কোনো মুত্তাকি, পরহেজগার, আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির কবরের পাশে দাঁড়ানো হয়, তখন অন্তরে এক ধরনের পরিবর্তনের অনুভূতি জাগে। মানুষ চিন্তা করে—
“যদি তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারেন, তাহলে আমিও চেষ্টা করতে পারি।”
মাজারের পবিত্রতা রক্ষা: আমাদের সবার দায়িত্ব
এজন্যই সালেহীনদের কবর সংরক্ষণ করা হয়, সম্মান করা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক জায়গায় এই পবিত্র স্থানগুলোকে নোংরা পরিবেশে পরিণত করা হয়। কেউ সেখানে অশোভন আচরণ করছে, কেউ মাদক গ্রহণ করছে, কেউ এমনভাবে অবস্থান করছে যা মাজারের পবিত্রতার সাথে যায় না। এগুলো অবশ্যই দুঃখজনক এবং সংশোধন করা প্রয়োজন।
আমাদের আলিম সমাজের উচিত মাজারগুলোকে কীভাবে সুশৃঙ্খল, পরিচ্ছন্ন ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে রাখা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া এবং মানুষকে সচেতন করা।
মাজার ধ্বংসকারীদের প্রতি ধিক্কার
আর আমি ধিক্কার জানাই তাদের, যারা মাজার আক্রমণ করে, ভাঙতে চায়। তারা আল্লাহর ওলীদের মর্যাদা বুঝে না। যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অসম্মান করে, তারা মূলত নেককার মানুষের প্রভাব ও আধ্যাত্মিকতার মূল্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের পথে চলার তাওফিক দান করুন। সালেহীনদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার শক্তি দিন। মাজার ও পবিত্র স্থানগুলোর সম্মান রক্ষা করা এবং সেখানে আধ্যাত্মিক পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।