ফাজায়েল ও মহানত্ত্ব আমরা যদি হযরত আলি আকবরের (আ.) চারিত্রিক সকল ফজিলত তথা মাহাত্ম্যকে এক এক করে অনুসন্ধান নাও করি তবুও নিছক তাঁর যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যের দিকবিচারে “রসুল সদৃশ” গণ্য করাটাই হাশেমি বংশের এই তরুণের আকর্ষণীয় চেহারার প্রামাণ্য হয়ে ওঠে। আল্লাহর রসুল (সা.) যদি ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও ধীর-স্থির ব্যবহারের দিক থেকে অনুকরণীয় হয়ে থাকেন; যদি নম্রতা, বিনয় ও ইবাদত-বন্দেগির দৃষ্টিকোণ থেকে সকলের চেয়ে অগ্রগণ্য হয়ে থাকেন; যদি দানশীলতা, বদান্যতা, মানবপ্রেম ও মানুষের প্রতি স্নেহ-মমতার দিক থেকে জুড়িহীন হয়ে থাকেন এবং যদি বাচনভঙ্গির স্পষ্টতা ও বাগ্মিতার ক্ষেত্রে, বীরত্ব ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে এবং ধৈর্যের দিকবিচারে অগ্রসেনা ও অন্যের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেন তাহলে বলা যেতে পারে যে, “রসুল সদৃশ” হওয়ার কারণে এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য হযরত আলি আকবরের (আ.) মাঝেও ফুটে উঠেছিল ও প্রতিভাত হয়েছিল এবং তিনি আল্লাহর নবীর “খুলুকে আযিমের” [বিশাল চরিত্র এক দৃষ্টান্ত ছিলেন। হযরত আলি আকবর (আ.) আশৈশব যাবতীয় সৌন্দর্য মাহাত্মের এক সমষ্টি এবং আল্লাহর রসুলের (সা.) পূত-পবিত্র ইতরাতের ফজিলতসমূহের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। এমনকি মোয়াবিয়ার মত ব্যক্তিও যে রসুলের (সা.) বংশের শত্রু ছিল তাঁর মাহাত্মসমূহকে স্বীকার করত। একদা মোয়াবিয়ার সামনে এমর্মে আলোচনা উঠে যে, “দ্বানি নেতৃত্ব” দেয়ার উপযুক্ত ব্যক্তি কে? উপস্থিত ব্যক্তিরা বললো: “আপ- নিই সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি।” মোয়াবিয়া বললো: না, এমনটি নয়। বরং হুসাইন ইবনে আলির (আ.) সন্তান আলি। হচ্ছেন সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি। কেননা, তিনি একে তো রসুলের (সা.) পরিবারের লোক এবং অপরদিকে, বনি হাশিমের সাহসিকতা তাঁরই মাঝে প্রস্ফুটিত হয়েছে। আর তিনি বনি উমাইয়ার বদান্যতা গ্রহণ করেছেন এবং সাকি গোত্রের সম্মান ও মর্যাদা আত্মস্থ করেছেন।মোয়াবিয়া সিরিয়ার মাটিতে অবস্থান করেও যখন তাঁর ফাজায়েল ও সৌন্দর্য সম্পর্কে এরূপ কথাবার্তা বলে তখন তা হচ্ছে শত্রুর মুখে তাঁর সৌন্দর্যের স্বীকারোক্তি এবং এটি এ বিষয়েরই সাক্ষ্য বহন করে যে, তাঁর পরিপূর্ণতার ধ্বনি হেজাজের ভূমি ডিঙ্গিয়ে অন্যত্র পৌঁছে গিয়েছিল। একইভাবে, কারবালা ঘটনার পর যখন কুফার মজলিসে (রাজ সভা উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ এমর্মে আলোচনা করে যে, আল্লাহপাক আলি ইবনে হুসাইনকে হত্যা করেছেন তখন স্বভাবতঃই অনুমিত হয় যে, তিনি শত্রুদের নিকট আলোচ্য বিষয় ছিলেন । হযরত আলি আকবরের (আ.) সম্মানিত পিতার সঙ্গে তাঁর শিষ্টাচারপূর্ণ ও সম্মানজনক ব্যবহার এবং স্বীয় সন্তানের প্রতি পিতার অনুরাগ ও ভালবাসা প্রদর্শন – এই দুই মহান ব্যক্তির জীবনের সকল পর্যায়েই বিদ্যমান ছিল। আর এর চূড়ান্ত রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল কারবালার মরুভূমিতে – যার প্রতি আমরা এখন ইঙ্গিত করব। হযরত আলি আকবরের (আ.) পরিপূর্ণতার গুণ বর্ণনায় জনৈক আরব কবি বলেছেন: তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে দীপ্ত গুণগুলো গ্রহণ করেছেন। “প্রতিরক্ষা ও সাহসিকতায় তিনি ছিলেন হামজারূপী, বীরত্বের দিক থেকে তিনি ছিলেন হায়দার সম ভীতিপ্রদর্শন ও জাঁকজমকতার দিক থেকে তিনি ছিলেন আহমদরূপী, সৃষ্টি ও উচ্চাঙ্গ চরিত্র এবং বাচনভঙ্গির দিক থেকে তিনি ছিলেন মোহাম্মদ সম। সুন্দর অবয়ব ও সচ্চরিত্র ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শেখ মুফিদ বর্ণনা করেন: হযরত আলি আকবর (আ.) ছিলেন জনগণের মাঝে সুন্দরতম চেহারা ও উচ্চতম চরিত্রের অধিকারী। । আর কথোপকথন, আচার-ব্যবহার ও অবয়বের দিক থেকে তিনি ছিলেন তদীয় প্রপিতামহ, আল্লাহর রসুলের (সা.) সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। কতক উৎসে উল্লেখ হয়েছে যে, তিনি স্বীয় পিতামহ হযরত আমিরুল মোমেনিন (আ.) থেকে বেশকিছু হাদিস বর্ণনা করেছেন। অথচ তিনি স্বীয় শৈশবকালের মাত্র ৩ থেকে ৪টি বছর হযরত ইমাম আলির (আ.) সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তাঁর সেই শৈশবকালেই হযরত আমিরুল মোমেনিনের (আ.) বাণীর প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা ও সেগুলো বর্ণনা করাটা তাঁর অপর এক ফজিলত হিসেবে পরিগণিত হয় এবং শৈশবকাল থেকেই তিনি যে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দিক্ষা ও পূর্ণতা লাভের প্রতি মনোনিবেশ করেছিলেন – এটি তারই প্রমাণ বহন করে। আরবের কবিরা তাঁর সম্পর্কে যেসব উক্তি করেছেন সেগুলোও তাঁর বিভিন্ন ফজিলত তথা মাহাত্ম্যেরই সাক্ষী। হযরত আলি আকবর (আ.) সম্পর্কে যেসব প্রশংসামূলক কবিতা রচিত হয়েছে তারই একটিতে জনৈক কবি যুদ্ধ ক্ষেত্রে তাঁর বিভিন্ন বীরত্ব এবং উন্নত চরিত্র ও তার বংশের সম্মান-মর্যাদা বর্ণনার পর এরূপভাবে আবৃত্তি করেছেন: আদৌ তিনি স্বীয় দ্বীনের উপর দুনিয়াকে বেছে নেননি। মিথ্যার মাধ্যমে সত্যকে বিক্রি করেননি। এবং একজন মাহাত্ম্যপূর্ণ মানুষের বিভিন্ন দৃষ্টান্তের দীপ্তিকে চেনা এবং তার অনুসরণ-অনুকরণ করা উচিৎ। হযরত আলি আকবরের (আ.) সুন্দর গুণাবলী ও চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বসমূহের ক্ষেত্রে আমরা চিন্তা-ভাবনা করলে তাঁর পথে স্থিত হতে সক্ষম হব ।
723
আগের পোস্ট
