প্রতারণা ভয়ঙ্কর গুনাহ

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি হলো বিশ্বাস। পরিবার থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব—সর্বত্র মানুষের একে অন্যের ওপর আস্থা ও নির্ভরতার প্রয়োজন হয়।
কিন্তু যখন সেই বিশ্বাসের জায়গায় প্রতারণা, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি ও বিশ্বাসঘাতকতা স্থান নেয়, তখন শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। ইসলাম তাই মানুষের সাথে প্রতিটি আচরণে সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও স্বচ্ছতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার বিষয় সহজ করে দেন। (সুরা তালাক: ৪) ইসলামে আমানতদারি একটি মৌলিক নৈতিক গুণ।
কারও টাকা-পয়সা, সম্পদ, দায়িত্ব, তথ্য কিংবা কোনো গোপন বিষয়—যা কিছু মানুষের কাছে আমানত হিসেবে অর্পিত হয়, তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা ঈমানি দায়িত্ব। একইভাবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাও মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না এবং জেনে-শুনে তোমাদের আমানতের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করো না।’ (সুরা আনফাল: ২৭) ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভ করা বৈধ; কিন্তু অন্যকে ঠকিয়ে লাভ করা বৈধ নয়।
পণ্যের ত্রুটি গোপন করে বিক্রি করা, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে প্রচার করা, ওজন ও পরিমাপে কম দেওয়া, নকল পণ্যকে আসল বলে চালিয়ে দেয়া কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ক্রেতাকে প্রভাবিত করা—এসবই ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় প্রতারণা। রাসুলুল্লাহ সা: অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন, ‘যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)
কেননা প্রতারণার ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়। খাদ্য ও পানীয়তে ভেজাল মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে; ওষুধে ভেজাল গুরুতর অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে; পোশাক, নির্মাণসামগ্রী বা যানবাহনে নিম্নমানের উপকরণ মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে একজন প্রতারক কখনো কখনো শুধু একজন ক্রেতাকে ঠকায় না; তার প্রতারণার কারণে অসংখ্য মানুষ ক্ষতির শিকার হতে পারে।
তাই ইসলাম মানুষের সম্পদের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৮)
অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার নানা পথ হতে পারে। চুরি, আত্মসাৎ, প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ গ্রহণ, পণ্যের ত্রুটি গোপন করে অতিরিক্ত মূল্য নেয়া—সবই এর আওতায় পড়ে। অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু থেকে বঞ্চিত করো না।’ (সুরা আরাফ: ৮৫)
কোনো ব্যক্তি যখন অন্য মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন তার ওপর সেই দায়িত্ব পালনের বোঝা আরও বেড়ে যায়। পরিবার, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা কিংবা রাষ্ট্র—যে ক্ষেত্রেই মানুষকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হোক, সেখানে তার দায়িত্ব হলো আন্তরিকতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সততার সাথে তা পালন করা। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ যাকে কোনো প্রজার দায়িত্ব অর্পণ করেন, অতঃপর সে যদি তাদের কল্যাণ কামনা না করে দায়িত্ব পালন করে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
বর্তমান যুগে প্রতারণার ধরনও বহুমাত্রিক হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল, নকল ওষুধ, ক্ষতিকর প্রসাধনী, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক পণ্য কিংবা নিরাপত্তাহীন যানবাহন—এসবের মাধ্যমে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়। এমন প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ বাহ্যিকভাবে লাভ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা মানুষের ক্ষতি, জুলুম ও অধিকার হরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছে, যার পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে মুগ্ধ করে এবং সে তার অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে আল্লাহকে সাক্ষী করে; অথচ সে সবচেয়ে কঠিন বিবাদকারী।’ (সুরা বাকারা: ২০৪) বাহ্যিকভাবে সুন্দর কথা বলা অথচ অন্তরে প্রতারণা লুকিয়ে রাখা একজন মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।
তাকওয়া মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করে, আর সততা তাকে মানুষের কাছে বিশ্বস্ত করে তোলে। তাই একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনে এই দুই গুণ পাশাপাশি থাকা জরুরি। সে আল্লাহকে ভয় করবে, মানুষের আমানত রক্ষা করবে, প্রতিশ্রুতি পালন করবে, ব্যবসায় সত্যবাদী হবে, পণ্যের ত্রুটি প্রকাশ করবে এবং কোনোভাবেই অন্যের ক্ষতি করে নিজের লাভের পথ তৈরি করবে না।
আজকের পৃথিবীতে প্রতারণা যখন নানা আধুনিক রূপ ধারণ করেছে, তখন মুসলমানদের জন্য রাসুলুল্লাহ সা:-এর সততার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের মনে রাখতে হবে—অন্যের ক্ষতি করে কোনো লাভ প্রকৃত লাভ নয় এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ প্রকৃত সফলতার পরিচয় নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাকওয়া, সত্যবাদিতা ও আমানতদারির সাথে জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন।

Related posts

ইমামগণের সুস্পষ্ট ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা

সালাম দিয়ে কথোপকথন শুরু করার ফজিলত

কৃপণতা ও হৃদয়ের কঠোরতা

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More