ফাতেমা যাহরা (আ.) ও জীবনাদর্শের অপরিহার্যতা 

ফাতেমা যাহরা (আ.) ও জীবনাদর্শের অপরিহার্যতা   উত্তম জীবনাদর্শ হতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম দায়িত্ব রয়েছে। অনুরূপভাবে অনুকরণীয় জীবনাদর্শের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মাঝে কোন তারতম্য নেই। এখন আমরা রাসূলুল্লাহর (সা.) আহলে বাইতের মধ্যমণি খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা যাহরার (আ.) মহিমান্বিত জীবনাদর্শের উপর আলোকপাত করব। যে আহলে বাইতকে (আ.) আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সম্পূর্ণ পূতঃপবিত্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা বর্তমান যুগে এমনই এক সময় মহীয়সী যাহরার (আ.) জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি, যে যুগে নারীকে একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আজ সর্বত্র এমন প্রশ্নের মুখোমুখী হচ্ছি যে, সমাজে নারীর ভূমিকা কি এবং নারীরা কি সমাজে পুরুষদের সমান অধিকার রাখে? ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান কি? নারীরা কি নিজেদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের নিমিত্তে এ সব ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে? নাকি নারীদেরকে এ সব অঙ্গন হতে নিজেদের গুটিয়ে রেখে শুধুমাত্র গৃহের কার্যাদিতে ব্যস্ত থাকা প্রয়োজন? নারীদের পারিশ্রমিক কেমন হবে? তাদের পারিশ্রমিক কি পুরুষদের তুলনায় কম হবে নাকি সমান? পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের ন্যায্য অধিকার কিভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? যে সব কন্যা সন্তান স্বীয় পিতার গৃহে স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত কিংবা যে সব নারী স্বামীর গৃহে কড়া নজরদারী ও নির্মম শোষণে নিষ্পেষিত; তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ফিরে পাওয়ার নিমিত্তে সর্বোত্তম সমাধান কি? বর্তমানে আমাদের সমাজের চারিপার্শ্বে এ ধরনের প্রশ্নাবলীর ছড়াছড়ি। এমতাবস্থায় এ সব প্রশ্ন উত্থাপনকারীকে কী আমরা তিরস্কার ও গালিগালাজ করতে পারি? এহেন প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে কী সৃষ্ট সমস্যার সমাধান সম্ভব? না, এমনটি আদৌ সম্ভবপর নয়। বরং আমাদের করণীয় হচ্ছে প্রচলিত সমস্যাদি চিহ্নিতপূর্বক সেগুলোর মূল কারণ অনুসন্ধান করা। অতঃপর উক্ত সমস্যাদি নিরসনে কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আমাদের উচিত প্রথমে ইসলামের মর্মার্থকে অনুধাবণের পর যুগোপযোগী পন্থায় তা বিশ্ববাসীর নিকট পৌঁছে দেয়া। আমাদের উচিত চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কার্যক্ষেত্রে পদার্পণ এবং এভাবে নিজেদের চিন্তাধারা ও আদর্শকে এ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে প্রযোগ করা। কেননা চিন্তা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার জগতে ঢাল ও তরবারির কোন কার্যকারিতা নেই; বরং এখানে শুধুমাত্র বুদ্ধিমত্তা, ধীশক্তি, বিচক্ষণতা ও শিক্ষার গুরুত্ব রয়েছে। বস্তুতঃ এমন অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যাবলী ব্যতিত এ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থাকাই দুষ্কর। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মহীয়সী ফাতেমা যাহরার (আ.) জীবনাদর্শ আমাদের জীবন চলার পথে অত্যুজ্জ্বল দিশারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে। আমরা নিজেদের অস্তিত্বের গভীরতায় এ অতুলনীয় ও নজিরবিহীন জীবনাদর্শের তীব্র প্রয়োজন অনুভব করি। ফাতেমা যাহরা (আ.) এমনই এক পরিপূর্ণ ও মহিমান্বিত স্বত্তা যাঁর পবিত্র অস্তিত্বে যাবতীয় সর্বোত্তম গুণাবলীর সমাহার ঘটেছে। এ মহীয়সী নারীর জীবনাদর্শের প্রতি আমাদের প্রয়োজনবোধ আত্মা ও সত্তার সাথে সম্পৃক্ত। পরশপাথর যেভাবে তাম্রকে স্বর্ণে রূপান্তরিত করে, তেমনি তাঁর পবিত্র সংস্পর্শ আমাদের আত্মিক ও মানসিক উত্তরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। সর্বোত্তম ফজিলত ও পবিত্রতার প্রতীক নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.) রাসূলের (সা.) আহলে বাইতের (আ.) যাবতীয় ফজিলতের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আচার-আচরণ, ইবাদত-বন্দেগী, পরহেজগারিতা, মহানুভবতা, সচ্চরিত্র, ঈমান, তাকওয়াসহ যাবতীয় মহিমান্বিত গুণাবলীর সবগুলোই তাঁর জীবনাদর্শে অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে ফুটে উঠেছে। ফাতেমা এমনই পবিত্র ও মহিমান্বিত নাম; যে নামটি শোনামাত্রই আমাদের হৃদয়ের স্মৃতিপটে সর্বোত্তম ফজিলত ও বৈশিষ্ট্যাবলী ভেসে ওঠে। পবিত্রতা ও পাপশূন্যতা এমনভাবে তাঁর সত্তার গভীরে প্রোথিত হয়েছে যে, তাঁর চিন্তা, কর্ম, আচার-ব্যবহারসহ সব কিছুকেই মহিমান্বিত ও ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে রেখেছে। বাগ্মীতা ও সাহসিকতায় তিনি ছিলেন অটল ও অনড়। তিনি সত্য ও ন্যায়ের পথে ছিলেন অকুতভয় সৈনিক। তাঁর ব্যথা-বেদনা ও হাসি-কান্না সবকিছুই ছিল পবিত্র ইসলামকে

ঘিরে। তিনি ইসলামের যাবতীয় বিধানাবলীকে স্বীয় ব্যবহারিক জীবনে চমকপ্রদভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শুধু তাই নয়; তাঁর অনুকরণীয় জীবনাদর্শে ইসলামী ও মানবীয় বৈশিষ্ট্যাবলীর সুনিপুণ সমন্বয় ঘটেছে। আর এ কারণেই তিনি সর্বকালের নারীজাতির শ্রেষ্ঠ সম্রাজ্ঞীর আসনে অধিষ্ঠিত। সুতরাং আমাদের প্রত্যেকের ঈমানী দায়িত্ব হচ্ছে এ মহীয়সী নারীর ফজিলতপূর্ণ জীবনাদর্শ অনুকরণের মাধ্যমে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ হাসিল করা।

ফাতেমা যাহরার (আ.) প্রতি গুরুত্বারোপের কারণ : ফাতেমা যাহরা (আ.) আমাদেরকে জীবনের প্রতিটি স্তরে ইসলামের সরব উপস্থিতি অনুধাবনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কেননা তিনি ইসলামের মূল বাণীকে বাস্তব জীবনে সুনিপুণভাবে প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন, কাজেই ফাতেমা যাহরার (আ.) স্মরণ আমাদেরকে তাঁর পদাংক অনুসরণে অনুপ্রাণিত এবং আমাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। অনেক মানুষ আছে যাদের জীবনাবসানের সাথে সাথে তারা এ পৃথিবীর স্মৃতিপট হতে মুছে যায়। কারণ তাদের জীবন ছিল তাদের আয়ুষ্কালের সমপর্যায়ে। পক্ষান্তরে এমন অনেক মহামানব রয়েছেন যাঁরা এ পৃথিবীতে আজীবন জীবিত থাকেন। অর্থাৎ তাঁদের উত্তম কর্ম ও অবদান তাঁদেরকে ইতিহাসে অম্লান ও চিরঞ্জীব করে রাখে। নবী নন্দিনী এমন মহামানবদের মধ্যমণি। বস্তুতঃ তাঁর স্মরণ আমাদেরকে মানবেতিহাসের সর্বোত্তম মহামানবদের স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা যখন সর্বশ্রেষ্ঠ মানব তথা রাসূলুল্লাহ (সা.), আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.), জান্নাতের যুবকদের সর্দার ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইনকে (আ.) স্মরণ করি, তখন এ মহীয়সী নারীর মাহাত্ম্য আমাদের হৃদয়পটে ভেসে আসে। বস্তুতঃ ফাতেমা যাহরা (আ.) রাসূলের (সা.) সংস্পর্শে প্রতিপালিত এবং তাঁরই পবিত্র রক্ত ও মাংসে বেড়ে উঠেছেন। তিনি আমিরুল মু’মিনিন আলীর (আ.) জীবন সঙ্গী, জান্নাতের যুবকদের সম্রাট ইমাম হাসান (আ.) ও হুসাইন (আ.) এবং হযরত জয়নাবের (আ.) ন্যায় মহীয়সী নারীর শ্রদ্ধাভাজন মাতা। প্রকৃতপক্ষে তাঁর পবিত্র পরশের কারণেই তাঁর সন্তানাদিও নজিরবিহীন পবিত্র ও আদর্শ জীবন গঠনে সক্ষম হয়েছেন।

তএব আমাদের চিন্তা, কর্ম ও ব্যবহারিক জীবনে নবী নন্দিনী ফাতেমা যাহরার (আ.) সরব উপস্থিতি অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ক্রন্দন করে কিংবা অশ্রু ঝরিয়ে তাঁর প্রতি ভক্তি নিবেদন মোটেও যথেষ্ট নয়। যদিও ক্রন্দন ও অশ্রু বিসর্জন তাঁর প্রতি ভক্তি নিবেদনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সহজ পন্থা। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তাঁর আদর্শের সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। কেননা তিনি স্বীয় জীবনের প্রতিটি মূহুর্তে অপরিসীম চেষ্টা-সাধনা এবং ব্যথা-বেদনার রক্তাশ্রু ঝরিয়ে নিজেকে স্মরণীয় করেন নি; বরং তাঁর মহিমান্বিত আদর্শ ও বাণী সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। অবশ্য রাসূলের (সা.) আহলে বাইতের (আ.) সব সদস্যই এমন জীবন গড়ে তুলেছেন। তাঁরা ইসলাম ও কোরআনের বিধানাবলী সুপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের মহামূল্যবান জীবনকে অকাতরে বিসর্জন দিয়েছেন। আর এ কারণে আমরা নবী নন্দিনী ফাতেমা যাহরার (আ.) মহিমান্বিত ও নজিরবিহীন জীবনাদর্শ অত্যন্ত গর্বের সাথে বিশ্ববাসীর নিকট উপস্থাপন করি।

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More