‘পুঁজিবাদ’ শব্দটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদ সোমবার্টের লেখায় সর্বপ্রথম স্বীকৃতি লাভ করে। অধিক অর্থ উপার্জনের মূল উদ্দেশ্য থেকে পুঁজিবাদের জন্ম। পুঁজিবাদে অর্থ উপার্জনের মানসিকতা অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এই ব্যবস্থা একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি, মানবহির্ভূত পণ্য উৎপাদন, অপব্যয় ও বিলাসসামগ্রীর অত্যধিক ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। অসংযম, স্বার্থপরতা, শিশুশ্রম ও নারী নির্যাতন পুঁজিবাদেরই সৃষ্টি। মজুতদারি, সুদি কারবার, ধোঁকাবাজি ও জালিয়াতি-প্রতারণা থেকে পুঁজিবাদের জন্ম। মানবজাতির অগ্রগতিতে পুঁজিবাদের অবদান থাকলেও সমাজকে দূষিত করার ক্ষেত্রেও তার অবদান সবচেয়ে বেশি।
বিশ্বব্যাপী সহিংসতা, মন্দা, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতিসহ প্রবল মানবিক বিপর্যয় পুঁজিবাদের কারণেই ঘটছে। এর দুষ্টক্ষতে পশ্চিমাবিশ্বে আজ নীতিহীনতা, স্বার্থপরতা ও অশান্তির আগুন জ্বলছে। পুঁজিবাদ একদিকে সুদখোর, শোষক ও জালেম জমিদার তৈরি করছে, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে মজুর-কৃষকদের এক সর্বহারার দল। পুঁজিবাদের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সমাজে নানা বিশৃঙ্খলা এবং অনৈতিকতার জন্ম দিয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ধর্মকে গুরুত্বহীন এবং নীতি-নৈতিকতাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে।
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি তিনটি। যথা : ক. ব্যক্তি মালিকানা : এই অর্থব্যবস্থায় প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তি মালিকানার অধিকার রয়েছে। এই ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণও ব্যক্তিগত মালিকানায় রাখতে বাধা নেই। খ. ব্যক্তিগত লাভ : উৎপাদনের বেলায় যে উদ্যোগ কাজ করে সেটি প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত লাভ অর্জনের জন্য চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। গ. রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত : পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ব্যবসায়ী রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত। ব্যক্তি তার ইচ্ছামত ব্যবসায় পরিচালনা করবে এবং কেউ তার স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
পুঁজিবাদের ত্রুটি : অধ্যাপক হাম পুঁজিবাদের চারটি ত্রæটি উল্লেখ করেছেন। ১. পুঁজিবাদে সম্পদ ও আয়ের সমবণ্টন আর্থ-সামাজিক ক্ষমতা নিরূপণে অসমতা সৃষ্টি করে ২. পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ও সুদি কারবারের ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয় ৩. পুঁজিবাদ একচেটিয়াবাদের জন্ম দেয় এবং ৪. পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বেকার সমস্যা অপেক্ষাকৃত বেশি।
সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা : সমাজবাদী অর্থনীতি পুঁজিবাদের ঠিক বিপরীত। ব্যক্তি মালিকানার ত্রæটি সম্পর্কে কার্লমার্কস এক অসংযত চিন্তা নিয়ে অগ্রসর হন। তিনি উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময় মাধ্যমসমূহে ব্যক্তি মালিকানার বিলোপ ঘটানোর জন্য আবিষ্কার করেন এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক তত্ত¡-সমাজবাদ। এই মতবাদে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়ার ফলে পুঁজিবাদের চেয়ে আরো মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে অসম্ভব অনিয়ন্ত্রিত।
মানুষের সব অধিকারকে কেন্দ্রীভূত করার ফলে মানুষ একটি নিরেট বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে সেখানে জনগণের চিন্তা, মত ও কর্মের সমস্ত স্বাধীনতা রহিত হয়ে মানুষ যন্ত্র-মানবে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে স্বৈরতন্ত্র।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলনীতি : সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার মূলনীতি চারটি। যথা : সামষ্টিক মালিকানা : সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র নিজের মালিকানায় রাখার অনুমতি থাকলেও, উৎপাদনের উপকরণ যেমন জমি, কারখানা ইত্যাদি একক মালিকানায় রাখার অনুমতি নেই। মানে উৎপাদনের উপকরণ হবে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন। পরিকল্পনা : সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় অর্থনীতির সকল পরিকল্পনা করবে রাষ্ট্র। মানুষের আর্থিক চাহিদা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাÐের মূলনীতি সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আলোকে নির্ধারণ হবে। আর ব্যক্তি সেই আলোকে কাজ করবে। সামষ্টিক স্বার্থ : সমাজতন্ত্রে ব্যক্তি নয়, স্বার্থ দেখতে হবে সবার। ব্যক্তিবিশেষের লাভের বিষয়টি এখানে বিবেচনা করে না, সবার লাভ বা স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করে রাষ্ট্র। লাভ বা মুনাফা অর্জন সবার জন্য। তবে সেটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যক্তির জন্য নিবেদিত।
সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার ত্রুটি : সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার ত্রুটিগুলো হলো : সম্পদের ভুল মালিকানা ও অসম বণ্টন, প্রকৃত চাহিদা ও সঠিক মূল্য নির্ধারণে ব্যর্থতা, ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের সুযোগ না থাকায় এটি জনগণের মধ্যে প্রেষণা সৃষ্টিতে অকার্যকর, ভোক্তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হরণ করে বলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
ইসলামি অর্থব্যবস্থা : পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিপরীতে ইসলাম মানবজাতির জন্য একটি সুন্দর বিকল্প ব্যবস্থা উপহার দিয়েছে। ইসলামে মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে ব্যক্তিকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে এবং তার সামনে ভালো ও মন্দ দু’টি পথই খুলে দেয়া হয়েছে। ফলে মানুষ এ স্বাধীনতা একটি নৈতিক মানের ভেতর দিয়েই কেবল ভোগ করতে পারে। এ স্বাধীনতা অনিয়ন্ত্রিত নয় মোটেও। কেননা, মানুষকে তার কর্মকাÐের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা মানুষের কল্যাণের জন্যই দুনিয়ার সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। মানুষ এসব সম্পদ ব্যবহার করবে এবং এর কল্যাণ গ্রহণ করবে। তবে যাবতীয় অনৈতিকতামুক্ত হয়ে আল্লাহর এ সম্পদরাজি ব্যবহার করতে হবে। ইসলাম এমন এক অর্থব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে যাতে সমাজের সব মানুষ তা থেকে কল্যাণ লাভ করতে পারে এবং এর ফলে সমাজের মানুষের মধ্যে সকল ধরনের ব্যবধান, বৈষম্য ও শোষণ-পীড়ন দূরীভূত হয়।
ইসলামি ব্যবস্থার কারণে অর্থসম্পদ কারো হাতে জমা হয়ে থাকতে পারে না, বরং তা প্রতিনিয়ত আবর্তিত হয়ে গোটা সমাজের মানুষের প্রয়োজনে ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর নির্দেশনা হচ্ছে, ‘তোমরা সম্পদ এমনভাবে বণ্টন করবে যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তবানদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে।’(সূরা আল-হাশর, ৫৯ : ৭)।
