মুসলিম উলামা বিশ্ব পরিষদের প্রতিবেদন

মুসলিম উলামা বিশ্ব পরিষদের প্রতিবেদন
দোহা ভিত্তিক “মুসলিম উলামা বিশ্ব পরিষদ” (World Union of Muslim Scholars) বাহ্যত আলেমদের এক স্বাতন্ত্র ও স্বাধীন সংগঠন; তবে কাতার সরকারের পক্ষ হতে আর্থিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে থাকে। পরিষদের মহাসচিব জনাব ড. কাররাহ্ দাগী একজন আহলে সুন্নাতের আলেম, ইরাকের সোলায়মানিয়া অঞ্চলে কুর্দী বংশে জন্মগ্রহণ করেন। এই পরিষদ চিন্তাগত দিক হতে “ইখওয়ানুল মুসলেমীন” প্রবাহের নিকটতর, তবে সরাসরি এই বিষয়ের প্রতি কোনোরূপ ইঙ্গিত করে না এবং এই নৈকট্যের উপর ভিত্তি করেই “ইখওয়ানুল মুসলেমীনে’র” আলেমগণসহ সমগ্র বিশ্বের ইসলামী রাজনৈতিক প্রবক্তা আহলে সুন্নাতের অন্যান্য আলেমের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলে। এই পরিষদ গত ৭ই অক্টোবর’ ২০২৩ ইং হতে, ফিলিস্তীন আন্দোলনের ক্ষেত্রে একাগ্রতার সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে এবং এ যাবৎ ফিলিস্তীনের উপর আক্রমণ ও যায়নবাদী-ইহুদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র ভাষায় একাধিক প্রতিবেদন ও গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া প্রদান করেছে।
ক: ইজতিহাদ কমিটি ও মুসলিম উলামা বিশ্ব পরিষদের ফতোয়া:
২১শে অক্টোবর’ ২০২৩ খৃ., রোজ শনিবার, গাজার পশ্চিম তীরে যায়নবাদী স্বৈরাচারী সরকারের সীমালঙ্ঘন বিষয়ে ইজতিহাদ কমিটি ও মুসলিম উলামা বিশ্ব পরিষদ ১১টি উপধারাসহ এক ফতোয়া প্রকাশ করেছে যা নিম্নরূপ:
ক – ১: ফিলিস্তীন ও গাজার অধিবাসীরা যা বাস্তবায়ন করছেন তা এক শরীয়ত সম্মত ও ওয়াজিব জিহাদ।
ক – ২: নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, সাধারণ জনগণ ও সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বিশেষে সকল মুসলমানের আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী গাজা ও ফিলিস্তীনের জনগণকে সহযোগিতা করা শরঈ ওয়াজিব।
ক – ৩: ইসলামী শরীয়তের হুকুম এই যে, যে কেউ জালেম-অত্যাচারীকে সহযোগিতা করল সে অত্যাচার করল এবং যে কেউ হকদার ব্যক্তিকে সহযোগিতা করল সে সওয়াবের পথে পদক্ষেপ গ্রহণ করল। বর্তমানে বিশ্ববাসীর সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, পশ্চিমা কয়েকটি দেশ তাদের নিজ নিজ অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক, তথ্য ও প্রযুক্তিগত শক্তির মাধ্যমে যায়নবাদী দখলদারী স্বৈরাচারী সরকারকে সহযোগিতা করছে এবং এই স্বৈরাচারের প্রকাশ্য সীমালঙ্ঘন ও অত্যাচারে শরীক রয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ হতেই মুসলমানদের উপর ওয়াজিব হচ্ছে নিজেদের মধ্যকার ঐক্য-সংহতি রক্ষা করার পাশাপাশি এক সামরিক জোট গঠনের মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষাকরতঃ সীমালঙ্ঘন ও অত্যাচার প্রতিহত করা যাতে ধ্বংস ও দ্ব›দ্ব অর্জিত না হয়।
ক – ৪: সূরা: তওবা’র ৬০তম আয়াতের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা অনুসারে যাকাতের (সাদকাহ্) ৮ খাতের একটি হচ্ছে “মুজাহিদ ফী সাবীলিল্লাহ” বা আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামকারী ব্যক্তি। আর গাজার অধিবাসীরা আজ যা করছেন তা মূলতঃ আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম এবং এ কারণেই যাকাত প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে সহযোগিতা করা উচিৎ। যাকাত ছাড়াও অন্যান্যভাবে অর্থ সংগ্রহ করে গাজার অধিবাসীদের সহায়তা করা প্রয়োজন যা আর্থিক সংগ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত হবে এবং এটি মহান প্রতিপালকের সঙ্গে ব্যবসা ও লেন-দেন করার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।
ক – ৫: যে কোনো প্রকারের গণমাধ্যম, কথাবার্তা ও বক্তব্য, প্রতিবেদন ও লিফলেটের মাধ্যমে গাজার অধিবাসী ফিলিস্তিনী ভাইদের সহযোগিতা করা ওয়াজিব গণ্য হবে।
ক – ৬: আধুনিক মুসলিম ও আরব শাসকদের শরঈ দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে গাজায় অবস্থিত নিজ মুসলিম ভাইদেরকে বিভিন্ন প্রকারের সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক শক্তি এবং সূক্ষ ও স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানসমূহের মাধ্যমে সহযোগিতা করা। আর শত্রু যায়নবাদী সরকারকে বয়কট ও কোণঠাসা করার উদ্দেশ্যে চেষ্টা চালানো।
ক – ৭: এই পরিষদ এমর্মে ফতোয়া প্রদান করেছে যে, এই জবরদখলকারী যায়নবাদী স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে যে কোনো প্রকারের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং গাজার অধিবাসীদের প্রতি সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাদেরকে যে কোনো ধরনের সহযোগিতা করা হারাম ও নিষিদ্ধ।
ক – ৮: মুসলিম সরকার ও সাধারণ জনগণ সকলেরই ওয়াজিব দায়িত্ব হচ্ছে এই যায়নবাদী স্বৈরাচারী সরকার এবং গাজার বিপক্ষে তাদের সকল সহযোগীর বিরুদ্ধে যাবতীয় প্রকারের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাদিক্ষা বিষয়ক বয়কট আরোপ করা।
ক – ৯: জামাআতবদ্ধ ও ব্যক্তিগত নামাযসমূহে মুস্তাহাব কুনুত পড়া এবং এসব কুনুতে ফিলিস্তীন বিশেষত গাজার মুজাহিদগণের বিজয় ও সীমালঙ্ঘীদের পরাজয়ের নিমিত্তে দোয়া করার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা যাচ্ছে।
ক – ১০: গাজার জনগণ স্বীয় গৃহ ও ভূমি হতে উদ্বাস্তু হওয়ার বিষয়ে এই পরিষদ শতর্ক করে দিয়ে গুরুত্বারোপ করেন যে, দ্বীনইসলাম এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও কনভেনশনের ভিত্তি অনুসারে এটি এক বৃহৎ অপরাধ এবং এই নোংরা অপরাধে যেকোনো রূপরেখা ও পতাকাতলে যেকোনো ধরনের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ। এই বিষাক্ত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রত্যেক মুসলিম দেশের শাসকদের শরঈ দায়িত্ব। তারা যদি এ ব্যাপারে অনিহা দেখায় তাহলে ইহকাল ও পরকালে এই অপরাধের দায়িত্বভার তাদের কাঁধেই অর্পিত হবে।
ক – ১১: পরিশেষে ‘ইজতিহাদ ও ফতোয়া পরিষদ’ শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয়ক যেসব সংস্থা গাজার পশ্চিম তীরের মুসলিম ভাইদের সহযোগিতার ক্ষেত্রে শরঈ দায়িত্ব পালন করেছেন তাদেরকে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানান। অনুরূপভাবে মধ্যপন্থী ইহুদীজাতিসহ বিশ্বের স্বাধীনচেতা যেসব সংগঠন ও গোষ্ঠী জায়নবাদীদের বিরোধিতা করছেন এবং গাজার অধিবাসীদের উপর হিংস্র আক্রমণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তাদেরও প্রশংসা করেন।

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More