যিল হজ্জ মাসের ফজিলত

আরবী ও ইসলামী বর্ষের দ্বাদশ অর্থাৎ শেষ মাস যিল হজ্জ মাস। এ মাস সম্মানিত চার মাসের ( اَلْأَشْهُرُ الْحُرُمُ الْأَرْبَعَةُ ) অন্তর্ভুক্ত একটি মাস । উল্লেখ্য যে মশহুর অভিমত অনুযায়ী এ চার সম্মানিত  মাসের মধ্যে তিন মাস ( যিলক্বদ , যিল হজ্জ ও মুহাররম ) হচ্ছে পরপর  ,ধারাবাহিক ও ক্রমাগত  ( consecutive : مُتَّصِلَةٌ وَ مُتَعَاقِبَةٌ ) এবং একটি মাস ঐ তিন মাস হতে বিচ্ছিন্ন ; আর তা হচ্ছে রজব মাস।

ইসলামী বর্ষের এই চার মাস হচ্ছে সম্মানিত মাস যেগুলো জাহিলিয়াতের যুগে আরব বাসীদের কাছেও অতি পবিত্র ছিল। আর এ কারণেই এই চার মাসে জাহিলিয়াতের যুগে যুদ্ধ করা ছিল নিষিদ্ধ এবং সন্ধি ও যুদ্ধ বিরতি বাধ্যতামূলক ভাবে মেনে চলা হত। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনেও জাহিলী যুগে প্রচলিত এ বিধান অনুমোদন (ইমদ্বা إِمْضَاءٌ ) করেছেন । তাই ইসলামী শরিয়তে সম্মানিত এ চার মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ (করা) হয়েছে । পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে : (হে রাসূল) আপনার কাছে তারা সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করার ব্যাপারে প্রশ্ন করে , আপনি (তাদের জবাবে) বলুন : তাতে (সম্মানিত মাসে) যুদ্ধ করা গুরুতর অপরাধ (কবীরা গুনাহ) এবং (আরও যেন স্মরণ থাকে যে) আল্লাহর পথে বাধা প্রদান করা, তাঁকে (মহান আল্লাহ) অস্বীকার (কুফর) করা, সম্মানিত মসজিদ (কা’বা) থেকে বিরত রাখা এবং যারা এর প্রতিবেশী তাদেরকে বহিষ্কার করা (এ সবই) আল্লাহর কাছে আরো অধিক গুরুতর বিষয় (অপরাধ); এবং ফিতনা – ফ্যাসাদ (বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি) হত্যা থেকেও গুরুতর (অপরাধ) …. । (সূরা – ই বাক্বারাহ : ২১৭)

সম্মানিত মাসে (যুদ্ধে)র মোকাবেলায় সম্মানিত মাস (-এ যুদ্ধ) এবং (শুধু এ মাসের বিশেষত্ব নয় ; বরং) সমুদয় সম্মানিত বস্তুর (অবমাননার) ক্বিসাস (প্রতিশোধ) আছে । সুতরাং যে কেউ তোমাদের ওপর সীমালঙ্ঘন করলে তোমরাও তাদের ওপর ততটুকু সীমালঙ্ঘন কর যতটুকু তারা তোমাদের ওপর করেছে । এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আর জেনে রাখ যে, আল্লাহ মুত্তাকী (সাবধানী ও আত্মসংযমী)দের সাথে রয়েছেন । (সূরা -ই বাক্বারাহ : ১৯৪)

হে ঈমানদারগণ ! (খবরদার !) আল্লাহর নিদর্শন সমূহের সম্মান বিনষ্ট কর না , আর না সম্মানিত মাসের , না (কুরবানীর জন্য কাবায় প্রেরিত) চিহ্নহীন পশুর , আর না গলদেশে চিহ্নিত পট্টি দেওয়া পশুর , আর না যারা সম্মানিত ঘরের [ অর্থাৎ কাবার তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ ) ও যিয়ারতের (দর্শন)] সংকল্পকারী , যখন তারা নিজেদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও সন্তোষ লাভের প্রত্যাশা করছে (তখন) তাদের (মর্যাদার অবমাননা কর না)। (সূরা -ই মায়েদা : ২ )

আল্লাহ সম্মানিত গৃহ কাবা , সম্মানিত মাস , কুরবানীর সাধারণ পশু এবং গলায় চিহ্নিত পট্টি দেওয়া পশুকে মানব জাতির জন্য (কল্যাণ) প্রতিষ্ঠিত রাখার মাধ্যম করেছেন। (সূরা -ই মায়েদা : ৯৭)

সুতরাং সম্মানিত মাস সমূহে যুদ্ধ করা বৈধ নয়। তবে শত্ররা যুদ্ধ শুরু করলে প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধ করা বৈধ হবে। বিধর্মী খ্রিষ্টান যায়নবাদী পাশ্চাত্য বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও  ব্রিটেনের প্ররোচনায় ও নির্দেশে বর্বর জাহেলী সৌদি জোট  পাশ্চাত্য বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আধিপত্য প্রত্যাখ্যান কারী দারিদ্র প্রপীড়িত মুসলিম দেশ ইয়েমেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৭ বছরের অধিক কাল ধরে এমনকি সম্মানিত মাস সমূহেও সর্বাত্মক যুদ্ধ ও আগ্রাসন চালিয়েছে এবং বীর ইয়েমেনী জাতি ইসলামের দুশমনদের সেই বর্বর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ও আত্মরক্ষামূলক জিহাদ ও যুদ্ধ করেছে শত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেও । আর মহান আল্লাহ তাদেরকে (এ সব ইয়েমেনী বীর মুজাহিদ) আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্য সাফল্য ও বিজয়ও দিয়েছেন এবং বিধর্মী খ্রিষ্টান যায়নবাদী পাশ্চাত্যের সর্বাত্মক মদদ ও পৃষ্ঠপোষণা পুষ্ট সৌদি জোটকে চরম ভাবে লাঞ্ছিত , অপদস্থ ও পরাস্ত করেছেন। এই সৌদি জোট সেই জাহেলিয়াতের কাফির মুশরিক আরবদের চাইতেও জঘন্য ও নিকৃষ্ট। কারণ তারাও (জাহেলী আরববাসীগণ) সম্মানিত মাস সমূহের সম্মানে যুদ্ধ বন্ধ রাখত। অথচ বিধর্মী খ্রিষ্টান যায়নবাদী পাশ্চাত্যের পা চাটা গোলাম হওয়ার জন্যই এই জাহেলী  সৌদি জোট পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট এ বিধান লঙ্ঘন করেছে। এরা কি মুসলমান ও মানুষ নামের যোগ্য ?! এরা (সৌদি জোট) নি:সন্দেহে অপবিত্র (নাজিস) পশু অপেক্ষাও নিকৃষ্ট। এই জোট সম্মানিত এ মাস গুলোয়ও ইয়েমেনে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে হাজার হাজার নিরীহ ইয়েমেনী নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করেছে এবং জলে -স্থলে -অন্তরীক্ষে স্মরণাতীত কালের সবচেয়ে কঠোর অবরোধ আরোপ করে দুই কোটি ইয়েমেনবাসীকে ক্ষুধার্ত করে রেখেছে । অথচ সমগ্র বিশ্ব বিশেষ করে মানবাধিকারের ধ্বজাধারী পাশ্চাত্য , জাতিসংঘ ও তথাকথিত মানবতাবাদী সংগঠনসমূহ মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ বসে আছে। পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে একজন সম্মানিত মানুষকে বাঁচানো মানেই গোটা মানব জাতিকে বাঁচানো এবং একজন সম্মানিত মানুষকে হত্যা করা মানেই সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করা। কিন্তু কোথায় সে দায়িত্ব পালন কারী মানুষ ? কোথায় সেই মুসলমান ? সম্মানিত মাস গুলোর সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক ঈমানদার মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য (ফরয) ।

পবিত্র যিলহজ্জ মাস হজ্জের সুবিদিত তিন মাসেরও অন্তর্ভুক্ত। হজ্জের মাস সমূহ হচ্ছে শাওয়াল , যিলক্বদ ও যিলহজ্জ । মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন :

اَلْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُوْمَاتٌ .

হজ্জ হচ্ছে সুবিদিত মাস সমূহ (অর্থাৎ শাওয়াল , যিলক্বদ ও যিল হজ্জ – এ তিন মাসে হজ্জ সম্পন্ন ও পালন করা হয় । অথবা হজ্জের মাস সমূহ হচ্ছে সুবিদিত মাস সমূহ )  । …. (সূরা -ই বাক্বারাহ : ১৯৭ ) এই তিন মাস হচ্ছে হজ্জ নামক বিশেষ ইবাদত বন্দেগীর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আমল ও শর্ত সমূহ বাস্তবায়নের সময়কাল । তাই এ সময়কালের মধ্যে হজ্জের আ’মাল ও মানাসিক সম্পন্ন করতে ও আঞ্জাম দিতে হবে । আর তামাত্তুর উমরাহ তামাত্তুর হজ্জের অন্তর্গত । কারণ এই উমরাহ তামাত্তুর হজ্জের অংশ যদিও এদুভয়ের (তামাত্তুর উমরাহ ও হজ্জ) মাঝে হজ্জব্রত পালনকারী নাসিক ইহরাম থেকে মুক্ত থাকার (ইহলাল ) সুযোগ ও সুবিধা পায় । আর ঐ সুবিদিত মাস গুলোয় হজ্জ অনুষ্ঠিত ও পালিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে যে কেবল এ নির্দিষ্ট সময় কালের মধ্যেই হজ্জের সমুদয় আমল সম্পন্ন হওয়া অত্যাবশ্যক । তাই দুই উকূফ ( আরাফাত ও মাশ’আরুল হারামে হাজ্জীদের উকূফ ও অবস্থান ), মিনার আমল সমূহ ও মাবীত ( রাত্রিযাপন ) ইত্যাদির মতো কতিপয় আমল নির্দিষ্ট সময় সমূহে আঞ্জাম দেয়ার সাথে এ বিষয়ের কোনো বিরোধ নেই ।

বছরের শেষ মাস , সম্মানিত মাস ও হজ্জের শেষ মাস হিসেবে এবং ১লা যিল হজ্জ হযরত ইব্রাহীম খলিলের ( আ) জন্ম দিবস এবং  শাইখাইনের রেওয়ায়ত অনুযায়ী এ দিবস হযরত ফাতিমা যাহরা (আ) ও হযরত আলীর (আ) শুভ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার দিবস যার শুভ আসমানী পরিণতি হচ্ছে মানব জাতি ও মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যত নেতৃত্ব ও ইমামতের ধারা , ১১৪ হিজরীর ৭ যিল হজ্জ মহানবীর (সা) আহলুল বাইতের (আ) বারো ইমামের ৫ম মাসুম ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বিরের শাহাদাত দিবস , ৮ যিল হজ্জ তারভিয়াহর দিবস ( আর ৬০ হিজরীর ৮ যিল হজ্জ শহীদদের নেতা ইমাম হুসাইন ( আ ) হজ্জের ইহরাম ত্যাগ করে কূফার উদ্দেশ্যে সপরিবারে পবিত্র মক্কা থেকে রওয়ানা  হন এবং এই দিনই কূফায় প্রেরিত ইমাম হুসাইনের দূত মুসলিম ইবনে আকীল শাসনকর্তা উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের বিরুদ্ধে কিয়াম ( গণ অভ্যুত্থান ) করেন কিন্তু ইবনে যিয়াদ বিশেষ কূটচাল চেলে ও প্রচুর অর্থ বন্টন করে এ গণ অভ্যুত্থান বানচাল করে এবং পরের দিন অর্থাৎ ৯ যিল হজ্জ ৬০ হিজরী সালে উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নির্দেশে মুসলিম ইবনে আকীলকে উঁচু স্থান থেকে ফেলে শহীদ করা হয় । )

আরাফাতের রাত ও দিবস ( ৯ যিল হজ্জ )  , ঈদুল আযহা ( ১০ যিল হজ্জ ) , ১৫ যিল হজ্জ মহানবীর (সা) আহলুল বাইতের (আ) বারো মাসুম ইমামের দশম মাসুম ইমাম আলী আল হাদী আন নাকীর ( আ ) জন্মদিবস , গাদীর -ই খুমের দিবস ( ঈদ -ই গাদীর : ১৮ যিল হজ্জ ) হযরত আলীর (আ) বেলায়ত ও ইমামতের ঘোষণার মাধ্যমে দ্বীনে ইসলাম ও মহান আল্লাহর নেয়ামত সমূহের পূর্ণতার দিবস এবং এতদ সংক্রান্ত আয়াত (সূরা -ই মায়েদা : ৩) অবতীর্ণ হওয়া , ২০ যিল হজ্জ যাদুগরদের ওপর হযরত মূসার( আ ) বিজয় , মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহীমের ( আ ) জন্য নমরুদের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ড শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাওয়া , হযরত মূসা ( আ ) কর্তৃক ইউশা’ ইবনে নূনকে নিজের ওয়াসী ও স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করা , হযরত ঈসা (আঃ) কর্তৃক শাম’ঊন আস সাফ্ফাকে নিজের ওয়াসী ও স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করা , হযরত সুলাইমান ( আ ) কর্তৃক এ দিবসে আসিফ বারখিয়াকে নিজের স্থলাভিষিক্ত খলীফা হিসাবে সবার সাক্ষ্য ও বাইআত গ্রহণ এবং এ দিবসে মহানবী (সা) কর্তৃক সাহাবাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের প্রতীজ্ঞা ( আকদে উখূওয়ত ) গ্রহণ, মুবাহালার দিবস (২৪ যিল হজ্জ ) ও আয়াত – ই মুবাহালা অবতীর্ণ হওয়া , আহলুল বাইতের ( আ ) শানে সুরা – ই দাহর ( ইন্সান ) এবং আহলুল বাইতের ইসমাত সংক্রান্ত তাত্হীরের আয়াত ( সূরা -ই আহযাবের ৩৩নং আয়াত ) অবতীর্ণ হওয়া এবং মহানবী ( সা) কর্তৃক হাদীস -ই কিসা এবং এ দিবসে হযরত আলী (আ) কর্তৃক নামাযে রুকুরত অবস্থায় প্রার্থনাকারী ভিক্ষুককে হাতের আংটি দান এবং এর প্রেক্ষাপটে আয়াতে বেলায়েত ( সূরা-ই মায়েদা : ৫৫ ) অবতীর্ণ হওয়া এবং বিদায় হজ্জের ভাষণে হযরত রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক হাদীস -ই সাকালাইনের ঘোষণা দানের জন্য এ মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্য মণ্ডিত ।

যিল হজ্জ মাসের আলোকোজ্জ্বল এ সব দিবসের বেশ কিছু স্বতন্ত্র্য ও নির্দিষ্ট আমল আছে যা মাফাতীহুল জিনানের এবং দুআ ও যিয়ারতের গ্রন্থ সমূহে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।

সূত্র : মাফাতীহুল জিনান , মুসতালাহাতুল ফিকহ

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More