ইমাম হাসানের (আ.) যুগ এবং মাবিয়ার সাথে তাঁর সন্ধি ইসলামের ইতিহাসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর এই ঘটনা নজিরবিহীন ও যুগান্তকারী একটি ইসলামী বিপ্লবের সূচনা ছিল। ইসলামের ইতিহাসে এমন ঘটনা আর দেখতে পাওয়া যায় নি। এই বাক্য সম্পর্কে সামান্য ব্যাখ্যা দিয়ে তারপর আসল আলোচনায় প্রবেশ করব। ইসলামী বিপ্লব অর্থাৎ ইসলামী চিন্তাধারা এবং ওই আমানত যা মহান আল্লাহ ইসলামধর্ম (দ্বীন ইসলাম) নামে মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন; প্রথম পর্যায়ে এটা একটি সংগ্রাম ও বিপ্লব ছিল যা নিজেকে একটি মহা বিপ্লব ও মহা সংগ্রাম হিসেবে প্রকাশ করে। আর তা ছিল ওই সময়ে যখন মহানবী এই চিন্তাধারাকে মক্কায় ঘোষণা করেন এবং ইসলাম ও তাওহীদের শত্রুরা তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় যাতে এই চিন্তাধারা সর্বত্র ছড়িয়ে না পড়ে। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মু’মিনদের নিয়ে একটি শক্তিশালী দল গঠন করলেন এবং তাদেরকে সুসংগঠিত করে মক্কায় একটি শক্তিশালী সংগ্রাম তৈরি করলেন। আর এই সংগ্রাম ১৩ বছর যাবৎ অব্যাহত ছিল। এটা ছিল প্রথম পর্যায়ের বিপ্লব।
১৩ বছর পর মহানবী যেসকল শিক্ষা দিয়েছিলেন, যেসকল শ্লোগান দিয়েছিলেন, যে সংগঠন তৈরি করেছিলেন এবং যেসকল ত্যাগ এই পথে হয়েছিল সব মিলিয়ে তা একটি মতাদর্শ ও রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। আর তা একটি জাতির রাজনৈতিকব্যবস্থা ও জীবনব্যবস্থায় পরিণত হয়। আর এটা তখন হয়েছিল যখন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মদীনায় হিজরত করেন এবং সেখানে তার ঘাঁটি তৈরি করেন ও ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন। আর এভাবে ইসলাম একটি সংগঠন থেকে একটি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। এটা ছিল ইসলামের দ্বিতীয় ধাপ বা পর্যায়।
এই অবস্থা মহানবীর মদীনার জীবনের ১০ বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এবং পরবর্তীতে চার খলিফার সময় এবং ইমাম হাসানের যুগ পর্যন্ত চলতে থাকে। এই সময় পর্যন্ত ইসলামী একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশ পেতে থাকে। সবকিছুই একটি সামাজিকব্যবস্থার মত ছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র ছিল, সেনাবাহিনী ছিল, রাজনৈতিক কর্মকাÐ ছিল, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ছিল, বিচার বিভাগ ছিল এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও ছিল। আর এটা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। এভাবে যদি চলতে থাকত তাহলে গোটা বিশ্বে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হত অর্থাৎ ইসলাম প্রমাণ করেছে যে, ইসলামের সেই যোগ্যতা ও ক্ষমতা আছে।
ইমাম হাসানের (আ.) যুগে বিরোধী শক্তি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, তারা একটি বড় বাধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তবে এই বিরোধী শক্তি ইমাম হাসানের যুগে তৈরি হয় নি আরও আগে থেকেই তারা প্রস্তুত হয়ে ছিল। যদি কেউ বিশেষ কোন মাযহাবি চিন্তা থেকে বের হয়ে নিরপেক্ষভাবে ইতিহাসকে অধ্যয়ন করে তাহলে সে বুঝতে পারবে যে, তা মহানবীর সেই মক্কা জীবনেই তৈরি হয়েছিল। ওসমানের যুগে (যে উমাইয়া গোত্রের লোক ছিল) তখন আবু সুফিয়ান অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একটি বৈঠকে তারা সব বন্ধুরা বসেছিল। সে জিজ্ঞাসা করল: এখানে কারা আছে। উত্তরে যখন বলল: অমুক, অমুক এবং অমুক আছে। তখন সে নিশ্চিত হল যে সেখানে সব নিজেদের লোক আছে এবং বাইরের কেউ নেই। তখন আবু সুফিয়ান তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল: تَلَقَّفُوها تَلَقُّفَ الكُرَة তোমরা হুকুমতকে বলের মত করে নিজেদের মধ্যে পাস দিতে থাকবে এবং সতর্ক থাকবে তা যেন অন্যদের হাতে চলে না যায়। আর এই ঘটনাটি শিয়া-সুন্নি উভয়েই তাদের ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। এটা কোন আকিদাগত বিষয় নয় এবং আমরা বিষয়টিকে আকিদাগতভাবে আলোচনা করতেও চাই না। আর আমার এই দৃষ্টিকোন থেকে আলোচনা করার কোন ইচ্ছাও নেই। বরং শুধুমাত্র ঐতিহাসিক বর্ণনাকে তুলে ধরছি। যদিও আবু সুফিয়ান তখন মুসলমান ছিল এবং ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মক্কা বিজয়ের পরে মুসলমান হওয়া আর ইসলামের ক্রান্তিকালের সময়ে মুসলমান হওয়া এক কথা নয়। কেননা তারা ইসলামের দূর্বল সময়ে ইসলামের শত্রæ ছিল আর ইসলাম যখন শক্তিশালী হয় তখন তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বিষয়টি ইমাম হাসানের যুগে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় এবং তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যেভাবে আবু সুফিয়ান রাসূলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল ঠিক সেভাবেই মাবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ইমাম হাসানের মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে যায়। সে সমস্যা তৈরি করতে থাকে এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। আর শেষ পর্যন্ত সঠিক ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রাজতন্ত্রে পরিণত করে।
মাবিয়ার সাথে ইমাম হাসানের সন্ধি বিষয়ক আলোচনায় বারংবার বলেছি এবং বিভিন্ন গ্রন্থেও লেখা আছে যে, ওই পরিস্থিতে এমনকি আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) থাকলেও অন্য কিছু করতেন না বরং ইমাম হাসান যা করেছিলেন তাই করতেন। কেউ বলতে পারবে না যে, ইমাম হাসানের অমুক কাজে ত্রুটি ছিল। বরং তার সকল কর্মকান্ড শতভাগ সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত ছিল। রাসূলের (সা.) বংশের সবথেকে বেশী অবদান কে রেখেছিল? কার জীবন সবথেকে বেশী শাহাদাতময় ছিল? দ্বীন রক্ষার ক্ষেত্রে কার ভূমিকা সবথেকে বেশী ছিল? নিশ্চয়ই ইমাম হুসাইন (আ.)। তিনিই এই সন্ধি চুক্তিতে ইমাম হাসানের পক্ষে ছিলেন। তাহলে সন্ধি ইমাম হাসান একা করেন নি বরং ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন দু’জন মিলে এই সন্ধি করেছিলেন। তবে ইমাম হাসান সামনে ছিলেন আর ইমাম হুসাইন পিছনে ছিলেন। ইমাম হুসাইন ইমাম হাসানের এই সন্ধির সবথেকে বড় সমর্থক ছিলেন। যখন এক বৈঠকে কেউ এই সন্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলে তখন ইমাম হুসাইন তাকে কড়া ভাষায় জবাব দেন। فغمز الحسین حجر ইমাম হুসাইন হুজরকে থামতে বলেন। কেউ বলতে পারবে না যে, ইমাম হুসাইন যদি ইমাম হাসানের জায়গায় থাকতেন তাহলে তিনি সন্ধি করতেন না। কেননা ইমাম হুসাইনও সেই সন্ধিতে ইমাম হাসানের সাথেই ছিলেন। সুতরাং ইমাম হাসান যদি না থাকতেন তাহলে ইমাম হুসাইনও ওই পরিস্থিতিতে একই কাজ করতেন এবং সন্ধি হত।
ফজর/