কামালিয়্যাত তথা পূর্ণতা অর্জন অন্যান্য বস্তনিচয়ের ক্ষেত্রে যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, মানুষের বেলায় সেটার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। খোদায়ী দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের জন্য কামালিয়্যাত তথা পূর্ণতায় পৌঁছুনোই তাকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। একটি আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে তারা ব্যতীত, যাদের উপর আপনার প্রতিপালক কৃপা করেছেন এবং মানুষকে এজন্যই সৃষ্টি করেছেন। (সূরা হুদ : ১১৯) এই কৃপাই পূর্ণতা, যা মানুষের জন্য গন্তব্য।
মানুষের পূর্ণতা দুই ধরনের: ১. বাইরের পূর্ণতা যেমন সম্পদ এবং সামাজিক মর্যাদা। ২. ভেতরের তথা প্রকৃত পূর্ণতা, যেমন জ্ঞান, নৈতিক গুণাবলি এবং বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য। বাইরের পূর্ণতা থাকা বা না থাকা মানবের সারসত্তার জন্য কোনো ঘাটতি বলে বিবেচিত হয় না এবং মানুষের ব্যক্তিত্বের উপর কোন প্রভাব ফেলে না। এ কারণে এগুলোর প্রতি পছন্দ ও আগ্রহের দিক থেকে মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকে। কিন্তু প্রকৃত পূর্ণতা মানুষের মনুষ্যত্বে কোনো এক ভাবে শক্তিশালী ও তীব্র প্রভাব ফেলে এবং প্রতিটি মানুষই তার খোদায়ী ফিতরত অনুসারে এই পূর্ণতার প্রতি আগ্রহশীল থাকে। যদি কেউ এই অন্তর্নিহিত আগ্রহ এবং অভ্যন্তরীণ আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে, বুঝতে হবে সেটা তার মুখের কথা, অন্তরের কথা নয়। অথবা বিষয়টি তার কাছে কোনোভাবে অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।
তবে যে পূর্ণতাকে আল্লাহ্ চান মানুষ তা অর্জন করুক, সেটা প্রকৃত পূর্ণতা। পারলৌকিক পূর্ণতা হল সেই পূর্ণতা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনো মানুষই এর প্রতি উদাসীন থাকতে পারে না। কারণ সে ফিতরত তথা সহজাতভাবে এই ধরনের পূর্ণতা কামনা করে। যেমন অমরত্ব, বিভিন্ন প্রকার নে’য়ামত থেকে সমৃদ্ধ হওয়া এবং জীবনকে উপভোগ করা ইত্যাদি। আর আল্লাহ্ পয়গাম্বরগণের মাধ্যমে মানুষের জন্য এই পূর্ণতা অর্জনের পথ প্রশস্ত করেছেন।
এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, হিকমাতে ইলাহী তথা ঐশি প্রজ্ঞার প্রতি বিশ্বাস আমাদের আকীদার একটি প্রধানতম অংশ। যথাস্থানে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে আল্লাহ্ ‘হাকিম’ তথা মহাপ্রজ্ঞাবান। তাঁর কার্যগুলি সম্পাদিত হয় সৃষ্টিব্যবস্থায় প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং কল্যাণের উপর ভিত্তি করে এবং তিনি সবকিছুকেই একটি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, আমরা তাঁর সেই খোদায়ী উদ্দেশ্য, প্রজ্ঞা এবং সৃষ্টির রহস্যাবলি সম্পর্কে জ্ঞাত থাকি আর না থাকি।
অপরদিকে এটিও সুনিশ্চিত যে আমরা মানুষরা সর্ববিবেচনায় সীমিত ও সীমাবদ্ধ। না সৃষ্টি ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে আর না সৃষ্টির রহস্যাবলি সম্পর্কে আমাদের সম্পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু সৃষ্টির রহস্যাবলি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে বলে এটা বলা যাবে না যে সৃষ্টি অযথা বা নিরর্থক। কারণ বিশ্বজগতের স্রষ্টা সর্বজ্ঞ; জ্ঞান ছাড়া তাঁর থেকে কিছুই সম্পন্ন হয় না। অতএব, যদি মানুষের পূর্ণতার লক্ষ্য উদ্দেশ্য আমাদের কাছে স্পষ্ট না থাকে এবং আমাদের নিকট ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা না হয়, তাতে খোদায়ী হিকমাত মিথ্যা হয়ে যায় না। কারণ সেটা আমাদেরই জ্ঞানের স্বল্পতা।
আল্লাহ্ কেন মানুষকে পূর্ণতা অর্জনের জন্য সৃষ্টি করেছেন? কেন তিনি চান মানুষ পূর্ণতা অর্জন করুক? প্রথমত, মানুষের বিশুদ্ধ প্রকৃতি কি এই ধরনের সৃষ্টিকে গ্রহণ করে? প্রতিটি মানুষ কি তার শিক্ষা সহ তার কাজে দিনে দিনে উন্নতি করতে এবং পরিপূর্ণতা অর্জন করতে চায়, নাকি সে আরও খারাপ হতে চায়?
দ্বিতীয়ত, যদি আল্লাহ্ পূর্ণতা অর্জনের জন্য কোনও সত্তা সৃষ্টি না করেন, তবে এটি তাঁর খোদায়ীত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি পরম পূর্ণতার আধার। আর পরম পূর্ণতার দাবি হলো, তিনি গোটা জগতব্যবস্থা সৃষ্টি করবেন একজন সুদক্ষ শিল্পী ও সুনিপুণ চিত্রকরের ন্যায় সম্ভাব্য সর্বোকৃষ্ট উপায়ে। আর মানুষকে সৃষ্টি করবেন পূর্ণতা অর্জনের জন্য এবং চাইবেন যেন মানুষ স্বাধীনভাবে চলে এবং পূর্ণতা অর্জন করে। এখানে প্রশ্ন আসে যে, মানুষের পূর্ণতা অর্জনে আল্লাহ্র চাওয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? এর উত্তর হলো, এই বিষয়টির দুটি দিক। একটি দিক মানুষের সাথে সম্পর্কিত, যে মানুষ পূর্ণতা গ্রহণ ও অর্জনকারী। আরেকটি দিক আল্লাহ্র সাথে সম্পর্কিত, যিনি পূর্ণতা দানকারী, করুণার আধার।
আল্লাহ্ নিরঙ্কুশ অনুগ্রহশীল, সর্ব করুণাময়। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ, নিরভাব। একারণে মানুষ সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ্র উদ্দেশ্য এটা নয় যে তাঁর নিজের কোনো ফয়দা হাসিল হবে। কারণ তাঁর কোনো অভাবই নেই। বরং তাঁর উদ্দেশ্য মানুষকে ফয়দা দান করা। তিনি চান মানুষ পূর্ণতা অর্জন করুক এবং এই পথে খোদায়ী পুরষ্কারসমূহ পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠুক। যেমনটা সূরা হুদের ১১৯ নং আয়াতে ইশারা করা হয়েছে।
কিন্তু যে দিকটি আল্লাহ্র সাথে সম্পর্কিত। কোন্ কারণে আল্লাহ্র ইচ্ছায় স্থির হলো যে তিনি পূর্ণতা অর্জনের জন্য বিশ্বজগত ও মানুষকে সৃষ্টির করলেন? এ কাজ করার পেছনে তাঁর নিজের কোনো অভাব বা প্রয়োজন ছিল না, তদুপরি তিনি চেয়েছেন তাদেরকে উপকার করতে?
দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে যে কারণটি আল্লাহ্র বস্তুনিচয় সৃষ্টির উপলক্ষ্য হিসাবে কাজ করেছে সেটা স্বয়ং খোদার সত্তা ও পূর্ণ গুণাবলির প্রতি তাঁর প্রেম। একারণে তিনি সৃষ্টিচরাচরকে সৃষ্টি করলেন এবং অস্তিত্বে প্রকাশ দান করলেন। একটি হাদীসে কুদ্সী’র মধ্যে বর্ণিত হয়েছে: “আমি একটি গুপ্তধন ছিলাম। তাই আমি পরিচিত হতে চেয়েছিলাম, একারণে আমি সৃষ্টিকূলকে সৃষ্টি করেছি যাতে আমি পরিচিত হই। ” (বিহারুল আনোয়ার, খ. ৮৪, পৃ. ১৯৯) যদিও এই লক্ষ্য প্রতিটি সৃষ্টিসত্তাকে সৃষ্টি করে অর্জিত হয়, কারণ প্রতিটি সৃষ্টিসত্তা ঈশ্বরকে চিনে এবং তাঁর তাসবিহ জপে।
তবে, মানুষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছে, এবং তা হল যেহেতু আল্লাহ্ সকল পূর্ণতার আধার, তাই সমস্ত সৌন্দর্যময় গুণাবলি যেমন জ্ঞান, শক্তি, উৎফুল্লতা, চিরন্তনতা ইত্যাদি তাঁর রয়েছে। আর আল্লাহ্র নিজ সত্তার প্রতি ভালোবাসার সূত্রে মানুষের খেলাফত সম্পর্কিত আয়াতগুলির উপর ভিত্তি করে, খোদায়ী ইরাদা এটার ওপরে স্থির হয়েছে যে, পৃথিবীতে তাঁরই মতো একজন মূর্ত প্রকাশ এবং প্রতিনিধি সৃষ্টি করবেন, যে সত্তায়, গুণে ও কাজে হুবহু তাঁর মতোই হবে। তাই তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। (দ্রঃ তাফসিরে তাসনিম-আয়াতুল্লাহ্ জাওয়াদি আমুলী)
বলা বাহুল্য, আল্লাহ্ যে সৃষ্টিকে এই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তার ক্ষেত্রে যেমনভাবে তাঁর আপন সত্তার প্রতি প্রেমের দাবিই এই সৃষ্টির কারণ হয়েছে, একইভাবে আল্লাহ্র আপন গুণাবলি এবং পূর্ণতার প্রতি খোদায়ী প্রেমের দাবি হচ্ছে যে মানুষ স্বাধীনভাবে খোদায়ী পূর্ণতা অর্জন করবে এবং আল্লাহ্ ন্যায় তাঁর জ্ঞান, শক্তি, চিরন্তনতা এবং পূর্ণতার মূর্ত প্রকাশ হবে। আর অধিকাংশ একত্ববাদী আদর্শের অনুসারীদের জন্য এই পূর্ণতার প্রকাশের দৃশ্যপট হচ্ছে বিচারের দিন।
অতএব, যদি কেউ নবিগণের পথ অনুসরণ করার মাধ্যমে মানবিক পূর্ণতা অর্জন না করে, তবে সে নিজেকে ওই খোদায়ী প্রেম থেকে দূরে রেখেছে। অবশ্য পূর্ণতার স্তরগুলি ভিন্ন ভিন্ন এবং মানুষরাও তা অর্জনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হয়। পয়গম্বরগণ এবং মাসুম ইমামগণ (আঃ) এই স্তরগুলির সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছেন।
অতএব, মানুষের পূর্ণতার স্তরসমূহে পৌঁছুনোর উদ্দেশ্য হচ্ছে তার খোদায়ী রহমতে পৌঁছুনো এবং খোদায়ী চিরন্তন নে’য়ামতসমূহ থেকে সমৃদ্ধ হওয়া আর আল্লাহ্র নৈকট্যপ্রাপ্ত হয়ে পরম প্রশান্তি লাভ করা। অপরদিকে আল্লাহ্র জন্য মানুষের পূর্ণতায় পৌঁছুনো থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁর আপন সত্তার প্রতি প্রেমভক্তি, তিনি চান জগতে তাঁরই ন্যায় মূর্তপ্রকাশ ও দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে, যে হবে তাঁর মতোই জ্ঞান, শক্তি ও চিরন্ততার অধিকারী। এটাকে বলা হয় ‘মাযহারিয়াত’ এর মকাম। পয়গাম্বরগণের পথ অনুসরণ ব্যতীত এই মকামে পৌঁছুনো সম্ভবপর নয়। নেহায়েত কম সংখ্যক মানুষই মাযহারিয়াতের মকামে পৌঁছুতে পারে।
বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় রজব, শা’বান ও রমজান – এই তিনটি মাসে, মানুষের জন্যে এই মাযহারিয়াতের মকামে পৌঁছার অধিক সুযোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে। একজন মানুষ এই মাসগুলিতে ইচ্ছা করলে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করতে পারে।