শব-ই-মেরাজ এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

লেখক : অধ্যাপক ডাঃ আজিজুল হক আব্দুল্লাহ, ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট চিকিৎসক

‘শব’ কথাটির অর্থ ‘রাত্রি’। ‘মেরাজ’ অর্থ ‘উর্ধ্বগমন’। এককথায় ‘শব-ই-মেরাজের’ অর্থ ‘উর্ধ্বভ্রমনের রাত্রি’। প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় সেটা এবং কেন? কিভাবে তা সংঘটিত হয়েছে? এই বিশেষ পরিভাষাটি একটা বিশেষ ব্যক্তির রাত্রিকালীন একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য অবিস্মরনীয় হয়ে আছে। এই ব্যক্তিটি হলেন শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং রাত্রিকালীন এই বিশ্বচরাচরের প্রভ‚ ও পালনকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীনের দীদার বা সাক্ষাৎ লাভের জন্য উর্ধ্বাকাশে যাত্রা। (পবিত্র মহামহিম তিনি যিনি তাঁর বান্দাহকে একরাতে তাঁর কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য মাসজিদুল হারাম থেকে নিয়ে যান বরকতময় পরিবেশপূর্ণ মসজিদুল আকসায়। (সূরা বনীইসরাইল, আয়াত-১)।

যেহেতু মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতা সীমাবদ্ধ তাই এই ভ্রমন নিয়ে সেসময়কার এমনকি এখনকার মানুষের মনেও নানারকম প্রশ্নের উদ্রেক করে। তিনি সপ্ত আসমান ঘুরে পুনরায় পৃথিবীতে এসে দেখেন তখনও তার ভোরের ওজুর পানি গড়াচ্ছে। তাহলে কি এই ভ্রমন স্বপ্নযোগে হয়েছিল, নাকি আধ্যাত্মিক বা আত্মিকভাবে হয়েছিল, নাকি শারিরীকভাবে হয়েছিল? যদি স্বপ্নযোগে হত তবে ঐসময়ের কাফের, মুশরিক ও নওমুসলিম কারোর মনে কোন প্রশ্ন সৃষ্টি হত না। স্বপ্নে কতকিছুই না ঘটতে পারে। যদি আধ্যাত্মিক বা আত্মিকভাবে ঘটে থাকে তবে তো কোন যানবাহনের প্রয়োজন হত না কারন, আত্মার চলাচলে কোন যানবাহনের দরকার হয় না। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে, নবীকরীম (সাঃ) যেরূপভাবে বলেছেন বা আল্লাহতায়ালা কোরআন শরীফে যেভাবে বর্ণনা দিয়েছেন যে, তিনি স্বশরীরে মেরাজে গিয়েছিলেন সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনতে হবে। (নিশ্চয় সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল, দেখেছিল সিদরাতুলমুনতাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তদদ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি এবং সীমালঙ্ঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে। (সূরা নজম, আয়াতঃ ১৩-১৮)।

প্রকৃত ঈমানদারগণ সেসময়ে নবীজির (সাঃ) মেরাজের কথা শ্রবণের সাথে সাথে বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করেন। কিন্তু তবুও বিরুদ্ধবাদীরা এ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও বিদ্রুপ করতে থাকে।
তারপরও মানুষ আল্লাহর মেধাবী জীব কাজেই তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনার বিশ্লেষণ ব্যাখা চায় এবং ঐতিহাসিক ভিত্তি ছাড়াও তারা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তালাশ করে।

শব-ই-মেরাজের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিঃ আধুনিক জীববিজ্ঞানীরা বারবার পরাভ‚ত হওয়ার পরও অজৈব থেকে জৈব পদার্থ সৃষ্টি এবং ডিএনএ এর সংযোজনের মাধ্যমে ক্রমোসোম তৈরী ও একটি কোষ সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোষের মত অবয়ব ও উপাদান সন্নিবেশিত করতে সফল হচ্ছে কিন্তু তাকে সচল করতে পারছে না। অর্থাৎ তাতে প্রাণসঞ্চার করতে পারছে না। বহুপূর্বেই বিবর্তনবাদের প্রবর্তক চার্লস ডারউইন একথা স্বীকার করেছেন যে, এমন একটা কিছু আছে যেটার দ্বারা তাতে প্রাণ সঞ্চারিত হয় কিন্তু সেটা কিভাবে আবিষ্কার হতে পারবে তা তিনি বলে যেতে পারেন নি। এই “Starting Switch” বা ‘প্রাণ সঞ্চারই’ হচ্ছে ‘জীবন’। এটা এখনও আল্লাহতায়ালার কাছেই আছে মানুষের আয়ত্তে তিনি সেটা এখনও ছাড়েননি। ছাড়লে কি হবে, কি নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে জীবজগতে তা আমরা এখন বলতে পারবোনা।

এখন Recombinant DNA technology মাধ্যমে ঔষধ, ভ্যাকসিন অনেক কিছু আবিষ্কার হচ্ছে। Test-tube baby ছাড়াও cloning করে somatic cell থেকে একই অবয়বের একই রকম একই প্রজাতির আরেকটি প্রাণী তৈরী করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এইসবগুলোই living creature এর উপর ভিত্তি করেই হচ্ছে। কোন non-living থেকে living creature সৃষ্টি করা এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে সম্ভব হয়নি।

বিবর্তনবাদীদের মতে genetic mutation এর ফলে নতুন নতুন species এর জন্ম হয়। এভাবে এককোষী প্রাণী থেকে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে উন্নত প্রাণী এবং এর এক পর্যায়ে সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ প্রজাতির জন্ম হয়েছে। এর পক্ষে অনেক অসার যুক্তি তারা দেখিয়ে থাকেন। এর মধ্যে একটা যুক্তি হচ্ছে, যদি মানুষ সৃষ্টিকর্তার বিশেষ সৃষ্টি হবে তবে অন্যান্য সৃষ্টির মত কোষ-কলা, রক্ত, হাড়, মাংসের সাথে অন্যান্য জীবের এত মিল কেন?

এর উত্তর এই যে, আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীন যে মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন জীবজগৎ বা প্রাণীজগৎ তা যখন তিনি ‘কুনফায়াকুন’ (হয়ে যাও) বলেছেন তখন তার গোলাম অনু-পরমানু, জৈবিক-অজৈবিক সকল fundamental particles ও পদার্থসমূহ একত্র হয়ে গিয়েছে এবং এক সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। কাজেই মৌলিক মিল থাকা স্বাভাবিক।

আল্লাহতায়ালা বিশেষভাবে আদমকে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞান গরিমা intellect দান করেছেন। এটা তার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি, খলীফারূপে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু তিনিই একমাত্র এবং একাই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন কাজেই ঐ ধরনের কিছু কিছু মিল থাকা অতি স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষের intellect বা বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞান অন্য কোন সৃষ্টির সাথে মিল নেই শারিরীক দিক থেকে মিল থাকলেও।

একই ধরনের প্রশ্ন নোবেল বিজয়ী বিশিষ্ট পদার্থবিদ জন স্টিফেন হকিংস করেছেন। তিনি “Brief history of time” বইতে বারবার করে বলেছেন যে বিশ্বব্রহ্মান্ড, গ্রহ-নক্ষত্র, পৃথিবী ইত্যাদি একটা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে balance করে চলে। এবং তা পদার্থবিদ্যার সব থিওরি মেনে চলে তাহলে স্রষ্টার এখানে ভুমিকা কি? মেনেই যদি চলে তবে প্রকৃতি স্বাভাবিক জিনিস, স্রষ্টার এখানে কাজ কি? তিনি মুসলমান নন হয়তো কখনও আল্লাহর কালাম পড়ার সৌভাগ্য তার হয়নি। কোরআন মাজীদে আল্লাহতায়ালা বারংবার এই balance এর কথা বলেছেন। যেদিন তিনি এই balance নষ্ট করে দিবেন সেদিন পৃথিবী ও গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টির শুরুর পর্যায়ে একাকার হয়ে শূন্য হয়ে আসবে। {সূরা দুখান (আয়াত ১০-১১), সূরা মা’আরিজ (আয়াত ৮-৯), সূরা কিয়ামাহ (আয়াত ৭-৯), সূরা ইনশিক্বাক (আয়াত ১-৫), সূরা যিল্যাল (আয়াত ১-৩), সূরা হুমাযাহ (আয়াত ৪-৯)}।

কাজেই জীববিজ্ঞানী ও পদার্থবিজ্ঞানীরা যত যাই বলুক না কেন কোরআনের বিজ্ঞান সব বিজ্ঞানকে ছাপিয়ে সকল সমস্যার সমাধান ও সকলপ্রকার ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারে।

আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যেও যদি আমরা মেরাজকে (মহাকাশ ভ্রমণ) ব্যাখ্যা দিতে চাই তবে বর্তমান বিজ্ঞানের উন্নতির যুগে ব্যাখ্যা দেওয়া অনেক সহজ। এটা সহজ ছিলনা রাসূলের জামানায়। আজ এই গ্রহ-নক্ষত্রে মানুষ মহাকাশযান নিয়ে ঘুরাফেরা করছে। মহাকাশভ্রমণ এখন আর কঠিন ব্যাপার নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, নবীজি (সাঃ) তখন কিভাবে এটা সম্ভব করেছিলেন। এটা নবীজি (সাঃ) করেননি। এটা আল্লাহতায়ালা করিয়েছিলেন বিশেষ এক যানবাহনের সাহায্যে যার নাম “বোরাক”। বোরাক এসেছে ‘র্বাক্’ শব্দ থেকে। এর অর্থ ‘বিদ্যুৎ’ বা ‘আলো’। আলোরগতি ১,৮৬,০০০ মাইল প্রতি সেকেন্ডে। এর চেয়েও বেশী গতি সম্পন্ন জিনিস মহাস্রষ্টার কাছে থাকতে পারে। তিনি নিজেই অসীম গতিসম্পন্ন ও শক্তিধর। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন যে, আমার জন্য ‘বোরাক’ পাঠানো হল। বোরাক গাধা থেকে বড় ও খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রং এর জন্তু। যতদূর দৃষ্টি যায় এক পদক্ষেপে ততদূর চলে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন আমি এতে আরোহন করলাম এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত পৌছালাম।

আমরা জানি, সময় ১/গতি
গতি ও সময় ব্যাস্তানুপাতিক। অর্থাৎ গতি বৃদ্ধি হলে সময় কমে যাবে আর গতি কমে গেলে সময় বেড়ে যাবে। তাই সময় ব্যাপারটা আপেক্ষিক বা গতির সাথে সম্পর্ক।
পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে বৎসরে একবার ঘুরে আমাদের বৎসর গণনা হয়। নিজ অক্ষে ২৪ ঘন্টায় একবার ঘুরে তাই দিনরাত্রি হয়। যদি এর চেয়ে বেশী জোরে ঘুরত তবে বছরের গণনা ও দিনের গণনার ধরন পাল্টে যেত। তদ্রুপ ধীরে ঘুরলেও অনুরূপ হত। তাই যদি কোন শক্তির গতি অসীম হয় তবে সময় সেখানে শূন্য হবে।
সময় =
ধ্রুবক

গতি
সময় =
সময় =
সময় =
মান
গতি
মান .
অসীম গতি
অর্থাৎ, সময় আপেক্ষিক জিনিস এবং গতির সাথেই তার সম্পর্ক। আমাদের শরীর হতে বিচ্ছুরিত আলো বিশেষ পদার্থে (photography film) আমরা ধারণ করি। এটার নাম আমরা ছবি বলে থাকি। এরকমভাবে আমাদের সকলের দেহ অবয়ব থেকে বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি উর্ধ্বাকাশে বা মহাকাশে (space) প্রতি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা আলোর গতিতে ধাবিতে হচ্ছে। যদি আলোর গতির থেকেও বেশী গতিসম্পন্ন কোন শক্তি থাকতো যা মহাকাশে ধাবিত হয়ে ঐসমস্ত photograph ও ধারন করতে সক্ষম। সেক্ষেত্রে অতীতকে আমরা হাতের মুঠোয় ধরে ফেলতে পারতাম। অতীত বলে কিছু থাকতনা। সবই হয়ে যেত বর্তমান।

এমতাবস্থায়, অতীত বর্তমান বলে আলাদা কিছু থাকে না এবং সময় বা কালের চাকা আরও একটু ঘুরলে ভবিষ্যৎও এর সাথে বিলীন হয়ে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে একটাই কাল থাকত আর তা হচ্ছে বর্তমান-মহাবর্তমান কাল।
আমাদের আল্লাহ এমনই এক অসীম, গতিময় ও মহাশক্তিধর সত্তা সবকিছুই যার কাছে বর্তমান। তিনি সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্র ও মহাবিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করেছেন এবং সবাই তার কথামত চলে এবং তার পাবন্দী করে। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করে না কেবলমাত্র কিছুসংখ্যক নির্বোধ, অহংকারী মানুষ ও জ্বীন শয়তান ছাড়া।
এই মহাস্রষ্টার দীদার লাভের জন্য নবীকরীম (সাঃ) কে এমনই বাহন দেয়া হয়েছিল যে তিনি পৃথিবীতে থেকে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত ঘুরে এসেছিলেন। পৃথিবীর ঘড়িতে সেটা ছিল কয়েক মিনিট বা তার অংশবিশেষ মাত্র।
সূরা মা’অরিজ (আয়াত নং ০৪); “ফেরেশতাগন ও রুহ আল্লাহতায়ালার দিকে উর্ধ্বগামী হয় এমন একদিনে যার পরিমাণ ৫০,০০০ বৎসর”।
সূরা সাজদা (আয়াত ০৫); “তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন, অঃপর তা তাঁর কাছে পৌঁছাবে এমন একদিনে যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান”।
তোমাদের হিসাবে যা ৫০,০০০ বৎসর আমার হিসাবে তা একটা দিন।

আল্লাহর ০১ দিন = আমাদের ৫০,০০০ বৎসর ” ১৪৪০ মিনিট = আমাদের (৫০০০০ঢ৩৬৫ঢ২৪ঢ৬০) মিঃ = ২৬,২৮,০০,০০,০০০ মিঃ আমাদের ২৬,২৮,০০,০০,০০০ মিঃ = আল্লাহর ১৪৪০ মিঃ অতএব, আমাদের ১ মিঃ = .০০০০০০০০৫৪৭ মিঃ অতএব, আমাদের ১ সেকেন্ড = আল্লাহর .০০০০০০০০০০৯ সেকেন্ড =tends to zero (space time)

স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের ক্ষেত্রে হযরত আদম (আঃ) ও নবীকরীম (সাঃ) এর সাদৃশ্যঃ
বস্তুত হযরত আদম (আঃ) ব্যতীত শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর পূর্ব পর্যন্ত কোন নবী-রাসূলগণই প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহর সাক্ষাত লাভ করেননি। প্রত্যেক নবী-রাসূলগণই আল্লাহতায়ালার বার্তাবাহক দ্বারা ওহীপ্রাপ্ত ছিলেন এবং জীবরাইল (আঃ) ফেরেশতার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। মহান আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে মানুষকে তার বিধান মতে সত্যের পথে চলার জন্য তার মনোনীত এই সকল বান্দাদের মাধ্যমে ডাক দিতেন। এই নবী-রাসূলগণ আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে কখনও দেখেননি কিন্তু প্রেরিত ফেরেশতাদের মাধ্যমে নিজের মনোনয়ন পেয়েছেন ও সাথে সাথে তার ওহী বা বার্তা পেয়েছেন। এইভাবে দৃঢ়, শক্ত. মজবুত বিশ্বাস ও দিল নিয়েই মানুষকে তারা আল্লাহর পথে আহ্বান করেছেন। ফলে অবিশ্বাসীদের নিকট থেকে অনেক লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, নির্যাতন সহ্য করেছেন, কখনও কখনও বিতাড়িত হয়েছেন, মৃত্যুবরণও করেছেন তথাপিও সত্য থেকে একচুল পরিমাণ সরে দাঁড়াননি। কারণ, আমার পিছনে যে মহাশক্তি আছে যে সকল ফয়সালার মালিক তাহলে ভয় কিসের? এইরূপ ছিল তাঁদের আত্মপোলব্ধি ও আত্মবিশ্বাস।

হযরত আদম (আঃ) কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি ছিলেন পৃথিবীতে প্রথম মানুষ এবং প্রথম নবী। তার কোন কওম ছিলনা যাকে তিনি আহবান জানাবেন। তিনি এমন একজন নবী যিনি বেহেশত থেকে সরাসরি পৃথিবীতে আগমন করেছেন। তার ভূলের শাস্তি হিসেবে অবশ্য তিনি পরকালের জন্য ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছেন আল্লাহর নিকট থেকে। তিনি সেই নবী যিনি সরাসরি আল্লাহর নিকটে অবস্থান করেছিলেন বেহেশতে থাকা অবস্থায়। তারপর থেকে কোন নবী এরকম আল্লাহর সান্নিধ্য সরাসরি লাভ করতে পারেননি একমাত্র আমাদের মহানবী, শ্রেষ্ঠনবী ও শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ছাড়া।

হযরত মূসা (আঃ) একবার আল্লাহর দর্শনলাভের জন্য নাছোড়বান্দা হলেন এবং বললেন ‘হে আমার প্রভ, তোমার দীদার আমাকে দাও, যেন আমি তোমাকে দেখতে পাই’। আল্লাহ বললেন, ‘তুমি আমাকে কষ্মিনকালেও দেখতে পাবেনা, তবে তুমি পাহাড়ের দিকে দেখতে থাক, সেটি যদি স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে তবেই তুমি আমাকে দেখতে পাবে’। তারপর তার পরওয়ারদিগার পাহাড়ের উপর আপন জ্যোতির বিকিরণ ঘটালেন এবং সেটিকে বিধ্বস্ত করে দিলেন তখন মূসা (আঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়লেন (সূরা আরাফ ; আয়াত ১৪৩)।

হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর ওহীপ্রাপ্ত হয়েছিলেন জিবরাইল (আঃ) এর মাধ্যমে। মানুষকে আল্লাহর নির্দেশমত সত্যের পথে ডেকেছেন। কিন্তু এই শব-ই-মেরাজের রাত্রে সরাসরি সৃষ্টিকর্তার দীদার লাভ করেছেন। আল্লাহ দর্শনের এই সফর তাকে অন্যান্য সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে। তিনি আল্লাহর দ্যূত বা বার্তাবাহক হিসেবে মূল মালিকের দর্শনলাভ করেছেন, এটা অতীব বড় পাওয়া। এখানেই শব-ই-মেরাজের রাত্রির স্বার্থকতা। সাথে সাথে এটা উম্মতে মোহাম্মাদীর জন্য একটা বিশেষ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব। আমার নবীর আল্লাহর সাথে দীদারলাভ যেন আমাদেরও দীদারলাভ। আমার নেতার কোন শক্তিধর কারো সাথে যোগাযোগ থাকলে যেমন আমাদের সাহস, হিম্মত অনেক বেড়ে যায় তদ্রুপ বিশ্ব চরাচরের প্রতিপালকের সাথে আমার নবীর সরাসরি যোগাযোগে আমরা তার উম্মত হিসেবে আমাদের মনপ্রাণ আরও ঈমানে দৃঢ় ও মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠেছে। এজন্য মিলাদ-মাহফিলে একটা শ্লোক শুনা যায়-
নবী না হয়ে দুনিয়ায়
নাহয়ে ফেরেশতা খোদার
হয়েছি উম্মত তোমার
তার তরে শুকুর হাজারবার।

সত্যই তো আমাদের মহানবী ছাড়া অন্য কোন নবীতো আল্লাহর দীদার বা সাক্ষাৎ পাননি, শুধু ওহী পেয়েছেন। কিন্তু আমাদের নবী মেরাজের মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহর সাক্ষাত লাভ করেছেন এবং আমরা তারই অনুসারী। তাহলে আমাদের মর্যাদা কম কিসে? এটা কোন অহংকার নয়। অহংকার অর্থ অন্যকে খাটো জ্ঞান করে নিজেকে বড় মনে করা। কিন্তু এখানে সব নবীই শ্রেষ্ঠ। যেখানে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগীতা এবং সেখানে আমাদের নবী শ্রেষ্ঠতম। এটা আমাদের তৃপ্তি ও আনন্দ। আমরা যেন এই শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হিসেবে শ্রেষ্ঠ উম্মত হতে পারি তারই প্রতিজ্ঞা করাটাই এই শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতির অর্থ।

শব-ই-মেরাজের শিক্ষাঃ
পূর্বেই বলা হয়েছে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীনের কাছে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত বলে কিছু নেই। সবই তার কাছে বর্তমান। তিনি আদি ও অনন্ত। কাজেই বিশেষ বাহনে চড়ে নবী করীম (সাঃ) উর্ধ্বজগতে গমন করেছেন, বিভিন্ন নবীদের সাথে বিভিন্ন আসমানে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে। সবার সাথে সালাম ও কুশল বিনিময় করেছেন। চতুর্থ আসমানে ‘বায়তুল মামুর’ নামক কাবা সদৃশ একটি মসজিদ দেখলেন তারপর সপ্তম আসমানে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’র (বেহেশতের সন্নিকটে একটি শীতল বৃক্ষ যার তলদেশ দিয়ে কয়েকটি নদী প্রবাহিত) কাছে গেলেন।

অতঃপর জিব্রাইল (আঃ) তার সঙ্গ ত্যাগ করলেন। তিনি একাকী ‘রফরফ’ বাহনে আরশে আজিম পর্যন্ত ভ্রমণ করে মহান রাব্বুল আল-আমীনের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তার সৃষ্টি লীলার সব রহস্য অবলোকন করেন। এরপর জান্নাত, জাহান্নাম পরিদর্শন শেষে পূণরায় পৃথিবীতে ফিরে আসেন।

মেরাজের সিদ্ধান্তগুলো মূলতঃ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা (সূরা বনীইসরাইল ; আয়াত ২৩-৩৮)। যেমন আল্লাহর ইবাদত, শরীক না করা, পিতা-মাতার প্রতি ব্যবহার, আত্মীয়দের ও মিসকিনদের হক আদায়, অপচয় না করা, কৃপণতা না করা, ব্যাভিচার, মানবহত্যা, সন্তানহত্যা (যা ঐসময়ে নারী সন্তানদের হত্যা করা হত), এতিমদের প্রাপ্য দান, ওজনে কম না দেওয়া, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, গর্ব-অহংকার পরিত্যাগ, দোযখে বিভিন্ন ধরনের অপরাধির শাস্তিও তাকে দেখানো হয়েছিল। ওসব শাস্তিদানের পর ঐ পাপাচারির মৃত্যু হলে পূণরায় জীবিত করে ঐ শাস্তিদান চলতেই থাকে।

মহান আল্লাহ তায়ালা যেমন একদিকে ক্ষমাশীল, অসীম দাতা ও দয়ালু অন্যদিকে অন্যায়কারী ও পাপাচারীদের ব্যপারে তেমনই কঠোর।

মেরাজ থেকে নবীজি (সাঃ) নিয়ে এলেন উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য পাঁচ ওয়াক্তের ফরয নামায এবং ঘোষণা করলেন ‘নামায মুমীনগণের মেরাজ’। যত দীনদ্বার মুমীন হোকনা কেন নেতাজির (সাঃ) মত সরাসরি মেরাজ তো তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতি ওয়াক্তে আল্লাহর সামনে বিনয় ও একাগ্রতা সহকারে নিবিষ্টচিত্তে আবিষ্টভাবে দুনিয়াকে ভূলে গিয়ে নামায আদায় করতে পারলে তা কিছুটা হলেও ‘খন্ড মেরাজের’ সমতুল্য হবে।

শব-ই-মেরাজের প্রেরণাঃ
শব-ই-মেরাজের রাত অন্যান্য অতিব পবিত্র রাতের মতই একটি। এইরাত গুনাহ মাফ ও মাগফেরাতের রাত। এই রাতের নফল ইবাদত অন্যান্য রাতের ইবাদতের চাইতে অনেকবেশী নেকী ও সওয়াবের। কাজেই সকল মুমীন মুসলমানদের এই রাত্রিতে নফল নামায ও দিনে রোজা রাখা উত্তম। সেই সাথে মনে মনে এই ঐতিহাসিক বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন যে আমার নবী শ্রেষ্ঠ নবী যার সাথে ছিল আল্লাহর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। সেই নবীর উম্মত আমরা। আমাদের সেই মহান আল্লাহ আজও একইভাবে বিরাজমান ও স্বীয় আসনে একইভাবে অবস্থান করছেন ও আমাদেরকে প্রত্যক্ষ করছেন। আমরা তার বান্দাহ। নবীশ্রেষ্ঠ নবীকরীম (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠ উম্মত হিসাবে পৃথিবীতে অবস্থান করছি এটা আমাদের জন্য একটা বিরাট প্রাপ্তি ও হিম্মতের উৎস। আমীন। ####

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More