নওরোজ এক আধ্যাত্মিক ও মানবীয় উৎসব। বিচিত্রময় এ উৎসব শান্তি, মৈত্রী ও সুখ-সমৃদ্ধির আশা বয়ে আনে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জন্য। জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০১০ সালে নওরোজ উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে। ওই সংস্থা নওরোজ উৎসবের প্রথম দিন তথা ২১ শে মার্চকে বিশ্ব নওরোজ উৎসব হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইরানের নওরোজ বিশ্বের প্রাচীন উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রাচীন ইরান বিস্তৃত ছিল মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চল থেকে ভারতবর্ষ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর-আফ্রিকার এক বিশাল অঞ্চলে। তাই এইসব অঞ্চলের অন্যতম প্রধান উৎসব হল এই নওরোজ। অন্য কথায় নওরোজ উৎসবকে আন্তর্জাতিক উৎসব হিসেবেও উল্লেখ করা যায়।
ফার্সি ‘নওরোজ’ শব্দটির অর্থ নতুন দিন তথা বছরের নতুন দিন। এ উৎসবের কোনো কোনো প্রথা সেই সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এখনও প্রচলিত। এইসব প্রথা সর্বত্র ছড়িয়ে দেয় নতুনত্ব ও বসন্তের আমেজ। নওরোজ কেন্দ্রীক একটি প্রাচীন প্রথার নাম হল ‘খনে তেক্কনি’ বা ঘর নাড়া দেয়া। এই পর্বটির উদ্দেশ্য হল, ঘর ও এর আসবাবপত্র পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা। বছরের শেষের দিকে রাস্তাঘাটের মত সর্বসাধারণের ব্যবহৃত স্থানগুলোও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার ধুম পড়ে যায়। বিত্তবানরা ঘরের পুরনো সব আসবাবপত্র, পর্দা, পোশাক ইত্যাদি ফেলে দিয়ে বা বিক্রি করে দিয়ে ঘরবাড়ীকে আবার নতুন করে সাজান।
ইসলামও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। নওরোজ উৎসবের সময় ঘর-দোর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার কাজে পরিবারের সব সক্ষম সদস্য সাধ্য অনুযায়ী অংশ নিয়ে থাকেন। এ ছাড়াও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে তারা পাড়া-পড়শী ও আপনজনদের সহায়তা করেন।
নওরোজ উৎসবের প্রাক্কালে কেনাকাটার ধুম পড়ে যাওয়াও লক্ষণীয়। সাধারণত এ সময় বেশি বেশি কেনা হয় পোশাক, আজিল নামে পরিচিত শুকনো ফল ও বুট-বাদামের মিশ্রণ, তাজা ফল, মিষ্টি ও ঘরবাড়ীর কোনো কোনো সামগ্রী ইত্যাদি। নতুন বছরে সবাই নতুন পোশাক পরতে আগ্রহী। এ ছাড়াও তারা মেহমানকে আপ্যায়নের জন্য সবচেয়ে ভাল খাবার কিনতে চান। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্যও এই সময়টা খুব ভাল কাটে।
ইরানিরা নওরোজের সময় ঘরের মধ্যে ৭টি আইটেম সাজিয়ে রাখে। এই সাতটি আইটেমকে বলা হয় হাফত সিন। ‘হাফতসিন’ অর্থ সাতটি ‘সিন’। ওই সাতটি জিনিষের নামের প্রথম অক্ষর ফার্সি বা আরবী বর্ণমালার ‘সিন’ অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়ায় সেগুলোকে এ নাম দেয়া হয়েছে। এ ৭টি সামগ্রী হল, ‘সাবজে’ বা গম বা ডালের সবুজ চারা, সামানু বা গমের চারা দিয়ে তৈরি করা খাবার, সিব বা আপেল, ‘সেনজেদ’ নামের একটি বিশেষ ফল, ‘সোমাক্ব’ নামক বিশেষ মশলা, সির বা রসুন এবং সের্কে বা সিরকা। এসব সামগ্রী হল নব-জীবন, প্রবৃদ্ধি, ফলবান হওয়া, প্রাচুর্য, সৌন্দর্য, সুস্থতা, ভালবাসা, আনন্দ ও ধৈর্য প্রভৃতির প্রতীক। এ ছাড়াও নওরোজের এ দস্তরখানে ডিম, ফুল, আয়না, পানি, লাল রংয়ের ছোট মাছ ও ধাতব মুদ্রা রাখা হয়। এসবেরই রয়েছে বিশেষ অর্থ। ফুল ও সবুজ কিশলয় আনন্দ ও নব-জীবনের প্রতীক। প্রকৃতিতে নব-জাগরণের বার্তা নিয়ে আসে বসন্ত। চারদিকে ফুলের সমারোহ এটাই মনে করিয়ে দেয় যে কেবল প্রকৃতি নয় মানুষের মনও হওয়া উচিত ফুলের মত সুরভিত ও সুন্দর।
নওরোজ উপলক্ষে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ঈদের আনন্দকে ভাগ করে নেয়ার জন্য অনেক ইরানি বিশেষ ত্রাণ-তহবিলে অর্থ বা নানা জিনিষ-পত্র দান করে থাকেন। এসব অর্থ বা জিনিষ গরীব, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের দান করা হয়।
ইসলামের আবির্ভাবের পর ইরানে নওরোজ উৎসবের রীতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান যুক্ত হয় এ উৎসবের সাথে। মুসলমানরা বসন্ত ঋতুতে গাছপালার পুনরায় সবুজ হওয়াকে পারলৌকিক জীবনের প্রমাণ বলে মনে করেন। বিশেষ দোয়া পাঠের মধ্য দিয়ে ইরানি মুসলমানরা নওরোজ বা নববর্ষ শুরু করেন। এ মুনাজাতে তারা বলেন, “হে অন্তর ও দৃষ্টির পরিবর্তনকারী এবং দিন ও রাতের পরিচালনাকারী এবং অবস্থার পরিবর্তনকারী (মহান আল্লাহ)! আমাদের অবস্থাকে সর্বোত্তম অবস্থায় রূপান্তরিত করুন।” নওরোজের প্রথম সেকেন্ডেই সবাই এ দোয়া পাঠ করেন। এ সময় তাদের সামনে টেবিলে বা দস্তরখানে থাকে পবিত্র কোরআন, তসবিহ এবং “হাফতসিন” নামে খ্যাত সাতটি বিশেষ সামগ্রীসহ আরো কিছু সামগ্রী।
ইরানিরা নওরোজের দিন বাবা-মাসহ নিকট-আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বেশ কয়েকদিন ছুটি থাকে এবং ইরানিরা দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সফর করেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও যান। অনেক ইরানি নওরোজের প্রথম প্রহর বা প্রথম দিনটি পবিত্র কোনো স্থানে কাটাতে পছন্দ করেন। যেমন, অনেকেই পবিত্র মাশহাদ শহরে বিশ্বনবী হযরত মুমহাম্মাদ (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম রেজা (আ.)’র মাজার জিয়ারত করেন। অনেকে এ উপলক্ষে পবিত্র কোম শহরে হযরত ইমাম রেজা (আ.)’র বোন হযরত মাসুমা (সা.)’র মাজারে, কিংবা শিরাজ শহরে অবস্থিত তাঁর ভাই হযরত শাহ চেরাগ (র.)’র মাজারে যান, কেউবা ইরাকে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)’র মাজারে বা আহলে বাইতের অন্য কোনো সদস্যের মাজারে নববর্ষ শুরু করেন। ইমামদের পরিবারের অন্য সদস্যদের মাজারেও এ সময় ভীড় দেখা যায়। তেহরানের আধিবাসীদের অনেকেই ভীড় জমান দক্ষিণ তেহরানে অবস্থিত হযরত শাহ আবদুল আজিম (র.) কিংবা শহরের অন্যান্য অঞ্চলে অবস্থিত কয়েকটি মাজারে।
নওরোজের দিন অনেকেই একে-অপরকে উপহার বা বখশিশ দিয়ে থাকেন। ছোট শিশুরা বড়দের কাছ থেকে বখশিশ পেয়ে খুব খুশি হয়। যে কোনো ঈদ বা উৎসব মানবীয় আনন্দের অপার উৎস। মানুষ আনন্দ-উৎসব ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না। তবে আল্লাহর স্মরণই মানুষকে জোগায় সবচেয়ে বড় প্রশান্তি এবং অপার মানসিক সুখ। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন, যে দিনটিতে মানুষ কোনো পাপ করে না, সে দিনটিই তার জন্য ঈদ বা উৎসবের দিন।
পুরনো দিনের সব মলিনতা, জড়তা, গ্লানি ও হতাশা আমাদের জীবন থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাক এবং সৃষ্টিশীলতা ও নতুনত্বের প্রাণ-প্রবাহে গড়ে উঠুক উন্নত, সফল ও সার্থক মানব-জীবন এ প্রত্যাশা করছি। ###########