শয়তান: কু-কর্মের অলঙ্করণকারী প্রতারক

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন সাইয়্যেদ জাফর রব্বানী এক আলোচনায় বলেছেন, শয়তানের অন্যতম কৌশল হলো মানুষের সামনে সত্য ও মিথ্যাকে পাশাপাশি উপস্থাপন করা। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং ভুলকেই সঠিক মনে করতে থাকে।
সত্য ও মিথ্যার বিভ্রান্তি: হাওযায়ে ইলমিয়া কোমের এই অধ্যাপক ব্যাখ্যা করেন, আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) নাহজুল বালাগা-তে বলেছেন কোনো বিষয়কে ‘সন্দেহজনক’ বলা হয় এ কারণে যে, এর বাহ্যিক রূপ অনেক সময় সত্যের মতো মনে হয়। যদি সত্য পুরোপুরি প্রকাশিত হয়, মানুষ অবশ্যই তার দিকে ঝুঁকবে। আবার মিথ্যা যদি নিখুঁত রূপে প্রকাশিত হয়, তখন মানুষ সহজেই তা চিনতে পারবে এবং সরে আসবে। কিন্তু যখন সত্য ও মিথ্যা একত্রে মিশে মানুষের সামনে আসে, তখনই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। একে বলা হয় শোবাহাত বা সন্দেহপূর্ণ অবস্থা।
শয়তানের প্রতারণা: উস্তাদ রব্বানী বলেন, শোবাহাত আসলে এমন এক মিথ্যা, যাকে সত্যের রূপে সাজিয়ে তোলা হয়। শয়তান এই সুযোগই কাজে লাগায়। মানুষের কু-কর্মকে রঙচঙে করে শোভিত করে উপস্থাপন করা তার অন্যতম কৌশল।
তিনি কোরআনের সূরা কাহফের উদ্ধৃতি দেন “বলুন (হে মুহাম্মদ সা.), আমি কি তোমাদের জানাব সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের কথা? তারা সেই লোক, যারা দুনিয়ার জীবনে সব চেষ্টা-সাধনা নষ্ট করেছে, অথচ তারা মনে করে তারা ভালো কাজ করছে।” [সূরা কাহফ: ১০৩-১০৪]
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা: তিনি সতর্ক করে বলেন, মানুষের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা হলো, যখন সে মনে করে তার কাজ সঠিক ও গ্রহণযোগ্য, অথচ বাস্তবে সে শয়তানের প্রতারণার শিকার। কোরআন মাজিদে বদরের যুদ্ধের ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, শয়তান মুশরিকদের কাজকে তাদের কাছে শোভিত করে তুলেছিল। তারা এমনকি বিশ্বাস করেছিল, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে যুদ্ধ করা তাদের জন্য ভালো কাজ।
আল্লাহ বলেন “শয়তান তাদের আমলকে তাদের কাছে শোভিত করে তুলেছিল এবং বলেছিলÑআজ মানুষের কেউ তোমাদের পরাজিত করতে পারবে না, আমি তোমাদের সহায়।” [সূরা আনফাল: ৪৮]
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে শয়তান পালিয়ে যায় এবং ঘোষণা করেÑ“আমি তোমাদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখছ না। আমি আল্লাহকে ভয় করি, আর আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।”
উস্তাদ রব্বানী বলেন, আল্লাহ না করুন, এমন দিন যেন না আসে যে শয়তানের চোখের অন্তর্দৃষ্টি আমাদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। অথচ তখন শয়তানই বলেছিল “আমি আল্লাহকে ভয় করি।”
ফেরাউনের উদাহরণ: তিনি আরও বলেন, ফেরাউনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। কোরআনে এসেছেÑ“আর ফেরাউন বলল: হে হামান! আমার জন্য একটি উঁচু প্রাসাদ তৈরি করো, হয়তো আমি আসমানের পথগুলোতে পৌঁছতে পারি এবং মূসার উপাস্যকে দেখতে পারি। আমি তো তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি। এভাবেই ফেরাউনের কাছে তার কু-কর্ম শোভিত করা হয়েছিল এবং তাকে সত্যপথ থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। ফেরাউনের চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই ছিল না ধ্বংসের পথে।” [সূরা গাফির: ৩৬-৩৭]
উপসংহার: পরিশেষে, হুজ্জাতুল ইসলাম রব্বানী জোর দিয়ে বলেন, শয়তান সবসময় মানুষকে ফাঁদে ফেলতে চায়। তার কু-কর্মকে সুন্দর সাজিয়ে তুলে ধরে, যাতে মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং মিথ্যাকে সত্য ভেবে গ্রহণ করে। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা, কোরআনের আলোয় সঠিক পথ চিনে নেওয়া এবং শয়তানের প্রতারণা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকা

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More