আহলে বাইত মতাদর্শ কুরআনুল করিমের অনুসরণ করতঃ মনে করে যে, সাহাবিদের মাঝে এমন সব মোমেন ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কুরআনুল করিমে প্রশংসা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ: বাইয়াতে শাজারা’র ক্ষেত্রে বলেন: “মোমেনগণ যখন (হোদায়বিয়ার প্রসিদ্ধ) বৃক্ষতলে আপনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করল তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন; তাদের আন্তরিক বিশ্বস্ততা ও স্বচ্ছতার ব্যাপারে তিনি অবগত ছিলেন; অতঃপর তাদেরকে তিনি দান করলেন পূর্ণ প্রশান্তি এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়।” (সূরা: ফাত্হ, ১৮তম আয়াত।) সুতরাং এই আয়াতে মহান আল্লাহ, যেসব মোমেন ব্যক্তি বাইয়াতে শাজারায় উপস্থিত ছিলেন তাদেরকে স্বীয় সন্তুষ্টির আওতাভুক্ত করেন। আর এই আওতাভুক্তিকরণ, সেখানে উপস্থিত আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও আউস ইবনে খাওলা’র ন্যায় মোনাফিকদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে না। (ওয়াকেদির মাগাজির (পৃ. ৬০৪) ‘বাইয়াতে শাজারাহ্ (বাইয়াতে রিজওয়ান) সংক্রান্ত সংবাদ’ এবং মুকরিজির ইমতায়িল আসমা’, পৃ. ২৯১) অনুরূপভাবে কুরআনুল করিমের অনুসরণ করে আহলে বাইত মতাদর্শ মনে করে যে, সাহাবাদের মাঝে এমন সব মোনাফেক ব্যক্তিও বিদ্যমান ছিল যারা মহিমান্বিত ও বরকতময় আল্লাহর ভর্ৎসনার শিকার হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন: “মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশপাশে আছে তাদের কেউ কেউ মুনাফিক এবং মদিনাবাসীদের মধ্যেও কেউ কেউ, তারা কপটতায় সিদ্ধ। তুমি তাদের মোনাফেকি সম্পর্কে অবগত নও; আমিই তাদের অপবিত্র গোপন রহস্য সম্পর্কে অবগত। আমি তাদেরকে দুইবার শাস্তি দিব (মৃত্যুর পূর্বে পৃথিবীতে এবং মৃত্যুর পর বরজখে) এবং তারা পরে প্রত্যাবর্তিত হবে মহা শাস্তির দিকে।” (সূরা: তওবাহ, ১০১তম আয়াত।)
ঐ মোমেনদের মাঝে এমন সব ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাদের মিথ্যাবাদিতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন। তারা আল্লাহর রসুলের (সা.) স্ত্রীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করেছিলেন। (ইফকের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ঘটনাটি সূরা: নুরের ১১-১৭তম আয়াতে, উম্মুল মোমেনিন আয়েশার প্রতি যে ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা হয়েছিল তা হতে অব্যাহতি দিতে অবতীর্ণ হয়েছে। কিংবা মারিয়া কিবতিয়ার প্রতি যে অপবাদ আরোপ করা হয়েছিল তা হতে অব্যাহতি দিতে ও তাঁর নিষ্পাপতা ঘোষণা করতে অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে ‘উম্মুল মোমেনিন আয়েশার হাদিসসমূহ’ শির্ষক পুস্তকের ২য় খন্ড আলোচনা করেছি) (তাদের এরূপ কথা হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি!) আর এই মোনাফিকদের মধ্যে এমন সব লোক ছিল যাদের সম্পর্কে এই আয়াতে আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন: “এই (দুর্বল ঈমানের) লোকেরা যখন কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা খেলাধুলার সামগ্রী দেখে তখন তার প্রতি ছুটে যায় এবং আপনাকে নামাজের মাঝে একাকি পরিহার করে।” (সূরা: জুমআহ্, ১১তম আয়াত।) আর এ কাজটি এমন এক সময় ঘটেছিল যখন আল্লাহর রসুল (সা.) দ্বন্ডয়মান অবস্থায় জুমআর নামাজের খুতবা দিচ্ছিলেন।
ঐ সাহাবাদের মাঝে এমন সব লোকও ছিল যারা হারশা উপত্যকায়, আল্লাহর রসুল (সা.) তাবুকের যুদ্ধ (মুসনাদে আহমদ, ৫ম খÐ, পৃ. ৩৯০ ও ৪৫৩; সহিহ্ মুসলিম, ৮ম খন্ড, পৃ. ১২২-১২৩, বাবু সিফাতিল মোনাফিকিন; মাজমাউজ্ জাওয়ায়েদ, ১ম খন্ড, পৃ. ১১০ এবং ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ. ১৯৫; ওয়াকেদির মাগাজি, ৩য় খন্ড, পৃ. ১০৪৩; মুকরিজির ইমতাউল আসমা’, পৃ. ৪৭৭; সুয়ুতির তফসিরে র্দুরুল, ৩য় খন্ড, পৃ. ২৫৮-২৫৯, সূরা: তাওবা’র ৭৪তম আয়াতের (হাম্মু বিমা লাম্ ইয়ানালু ..) ব্যাখ্যা) কিংবা বিদায় হজ্ব (শিয়া মাযহাবের হাদিসসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর রসুল (সা.) বিদায় হজ্ব হতে ফিরে আসার সময় এবং জোহ্ফা ভূমিতে ‘গাদির খুমের’ ঘটনা উপলক্ষ্যে, এ ঘটনাটি ঘটেছিল। দেখতে পারেন: বিহারুল আনওয়ার, তেহরানের ইসলামিয়া কিতাবখানা হতে ছাপানো, ১৩৯২ হি., ২৮তম খÐ, পৃ. ৯৭) হতে ফিরে আসার সময় তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল।
আর রসুলের (সা.) সঙ্গীদের সঙ্গ লাভের সম্মান, তাঁর স্ত্রীদের স্ত্রীত্বের সম্মানের চেয়ে বেশি নয়। রসুলের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীদের এই সঙ্গ লাভ হচ্ছে সর্বোন্নত সঙ্গ লাভ। রসুলের স্ত্রীদের মর্যাদা ঘোষণায় মহান আল্লাহ বলেন: “হে নবীর স্ত্রীগণ! যে কাজ স্পষ্টত অশ্লীল, তোমাদের মাঝ হতে কেউ তা করলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে এবং এটি আল্লাহর জন্যে সহজ। তোমাদের মাঝে যে কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের প্রতি অনুগত হবে ও সৎকাজ করবে তাকে আমি পুরস্কার দিব দুইবার এবং তার জন্যে আমি সম্মানজনক রিজ্ক রেখেছি। হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও ..।” (সূরা: আহজাব, ৩০-৩২তম আয়াত।)
রসুলের দুইজন স্ত্রীর সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: “যদি তোমরা দুইজনই অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যেহেতু তোমাদের হৃদয় (রসুলের সন্তুষ্টির বিপরীতে) ঝুঁকে পড়েছে, Ñ আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু যদি তোমরা নবীকে কষ্ট দেয়ার ব্যাপারে পরস্পরে ঐকমত্য হও তবুও (কখনই তোমরা তাঁর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করতে পারবে না। কেননা যে,) আল্লাহ তাঁর সাহায্যকারী ও সংরক্ষক এবং জিব্রাঈল আমিন ও সৎকর্মপরায়ণ মোমিনগণও, উপরন্তু অন্যান্য ফেরেশ্তাও তাঁর সাহায্যকারী।” (সূরা: তাহ্রিম, ৪র্থ আয়াত।) অতঃপর আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ কাফিরদের জন্যে নুহ ও লুতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত উপস্থিত করছেন; তারা ছিল আমার বান্দাদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল; ফলে, নুহ ও লুত (নবুওতের মর্যাদায় ভূষিত হওয়া সত্তে¡ও) তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলা হল, জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সঙ্গে তোমরাও তাতে প্রবশ কর।’ আর আল্লাহ মোমিনদের জন্যে ফিরাউনের স্ত্রীর (আসিয়া) দৃষ্টান্ত পেশ করছেন; যে প্রার্থনা করেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক, তোমার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ কর এবং আমাকে উদ্ধার কর ফিরাউন ও তার দু®কৃতি হতে এবং আমাকে উদ্ধার কর জালিম স¤প্রদায় হতে। আরও তিনি দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন ইমরান তনয়া মরিয়মেরÑ যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ফলে আমি তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার প্রতিপালকের বাণী ও তাঁর কিতাবসমূহ সত্য বলে গ্রহণ করেছিল; সে ছিল অনুগতদের একজন।” (সূরা: তাহ্রিম, ১০Ñ১২তম আয়াত।)
রসুলের (সা.) প্রথিতযশা কতিপয় সাহাবি সম্পর্কে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে যা রসুল (সা.) কিয়ামত দিবসের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন: কিয়ামত দিবসে এমন কতক লোক আনা হবে যারা বাম দিক হতে আটকে পড়বে। তখন আমি সবিনয়ে বলব, ‘প্রভু হে, এরা আমার সাহাবা!’ তখন বলা হবে, ‘আপনি জানেন না যে, এরা আপনার তিরোধানের পর কিরূপ ধ্বংস্বযজ্ঞ ঘটিয়েছে!’ তখন আমি একজন সৎবান্দার ন্যায় বলব: ‘যতদিন আমি তাদের মাঝে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কার্যকলাপের সাক্ষী; কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে তখন তুমিইতো ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত¡াবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী।’ (সূরা: মায়িদাহ, ১১৭তম আয়াত।) আর তখন উত্তর আসবে যে, আপনি এদের হতে পৃথক হওয়ার পর এরা সবাই নিজেদের মুশরিক আত্মীয়দের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল এবং র্শিকে প্রত্যাবর্তন করেছিল। (সহিহ্ বোখারি, তাফসির অধ্যায়, তাফসিরে সূরা মায়িদাহ্, বাব: ‘কুন্তু আলাইহিম শাহিদান্ মা দুম্তু ফিহিম ফালাম্মা তাওয়াফ্ফাইতানি’; আর আম্বিয়া অধ্যায়, বাব: ‘ইত্তাখাজাল্লাহু ইবরাহিমা খালিলা’; তিরমিজি, আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ্, বাবু ‘মা জাআ ফি শা’নিল হাশ্র’; এবং তাফসিরে সুরা ত্বাহা)
আর অপর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: কিয়ামত দিবসে আমার সাহাবিদের মাঝ হতে একদল সাহাবিকে হাউজের পাশে আমার নিকট আনা হবে। আমি তাদেরকে চিনে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের অক্ষিগোলক কেঁপে উঠবে (মানসিক অশান্তির শিকার হবে)। আমি জিজ্ঞাসা করব, ‘এরা আমার সাহাবি ছিল না?’ উত্তর দেয়া হবে, ‘আপনি জানেন না যে, এরা আপনার তিরোধানের পর কি কাজ করেছে!’ (বোখারি, কিতার্বু রিকাক, বাবুন ফিল হাউজি, ৪র্থ খন্ড, পৃ. ৯৫। আরও একই উৎসে দেখতে পারেন: কিতাবুল ফিতান, বাবু ‘মা জাআ ফি কাউলিল্লাহি তাআলা: ওয়াত্তাকু ফিতনাতান্ লা তুসিবান্না ..’, আনফাল, ২৫তম আয়াত। ইবনে মাজাহ্, কিতাবুল মানাসিক, বাবু ‘খুতবাতু ইয়াওমিন্ নাহ্র’, হা. ৫৮৩০। আরও দেখতে পারেন: মুসনাদে আহমদ, ১ম খÐ, পৃ. ৪৫৩; ৩য় খন্ড, পৃ. ২৮ এবং ৫ম খন্ড, পৃ. ৪৮)
আর সহিহ্ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে: কিয়ামত দিবসে আমার কতক সাহাবিকে হাউজের পাশে আমার নিকটে আনা হলে আমি লক্ষ্য করব যে, তাদের অক্ষিগোলক কাঁপছে। আমি সবিনয়ে বলব, ‘হে প্রভু, এরা আমার সাহাবি।’ তখন জোর দিয়ে বলা হবে: ‘আপনি জানেন না যে, এরা আপনার তিরোধানের পর কি ধরনের কাজকর্মে জড়িত হয়েছিল।’ (সহিহ্ মুসলিম, কিতাবুল ফাজায়িল, বাবু ‘ইসবাতু হাউজি নাবীয়্যিনা’, ৪র্থ খন্ড, পৃ. ১৮০০, হা. ৪০)