সূরা তাগাবুনের তাফসীর

আল্লাহ সবকিছুর জ্ঞান রাখেন, এমনকি মানুষের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও
পরবর্তী আয়াতেও একই শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার প্রতি ইশারা করা হয়েছে; অর্থাৎ এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদেরকে এ আয়াতসমূহের প্রতি লক্ষ্য করতে হবে যে, আল্লাহর আনুগত্য ও উপাসনার নিমিত্তে সঠিক পন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে যেসব শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো সবই এ আয়াতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন বর্ণিত হয়েছে,   ‘আকাশম-লী ও ভূম-লে যা কিছু আছে সমস্তই তিনি অবহিত।’ এমনকি ‘এবং তিনি তাও জানেন যা তোমরা গোপন কর।’ অর্থাৎ আল্লাহ আপনার অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত এবং তিনি আপনাদের মনের খবর জানেন। আপনি যা কিছু নিজের মধ্যে গোপন করে রেখেছেন, নিজের মনের মধ্যে লুক্কায়িত কোনো চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং আড়াল করা কোনো অনুভূতি সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। ‘আর তোমরা যা কিছু প্রকাশ কর (তাও তিনি জানেন)।’ এরপর আয়াতে শেষাংশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে,  ‘এবং আল্লাহ বক্ষের রহস্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।’ অর্থাৎ আপনার বুকের ভেতরে, আপনার সত্তার গভীরে যা আছে যা কখনও কখনও মানুষ নিজেও জানে না আল্লাহ তা জানেন। কখনও কখনও মানুষের মধ্যে এমন একটি অনুভূতি থাকে যা মানুষ নিজেই জানে না; কখনও কখনও একজন মানুষ কারো পক্ষে রায় দেয় এবং ধারণা করে যে, সে এই রায়ে সর্বোচ্চ ন্যায্যতা ও নির্ভুলতা পর্যবেক্ষণ করেছে, অথচ মানুষ নিজেই জানে না যে, এই রায়ে এক ধরনের আবেগ হস্তক্ষেপ করেছে। কখনও কখনও একজন মানুষ কাউকে নিন্দা করে, ধারণা করে যে, সে তার নিজস্ব ন্যায্যতা ও যুক্তি অনুসারে শতভাগ সঠিক কাজ করেছে, অথচ ঘৃণা এতে হস্তক্ষেপ করেছে। কখনও কখনও এক্ষত্রে মানুষের নিজস্ব স্বার্থ হস্তক্ষেপ করে, মানুষের আত্মীয়দের স্বার্থ হস্তক্ষেপ করে, মানসিক পূর্ব ধারণা হস্তক্ষেপ করে; বস্তুত এ জাতীয় জিনিসগুলো একজন মানুষের সত্তার গভীরে বিদ্যমান থাকে এবং মানুষ নিজেই এগুলো চিনতে পারে না। অবশ্যই এটা এমন নয় যে, মানুষ সম্পূর্ণরূপে অক্ষম। না, মানুষ যদি তার মন, অনুভূতি ও হৃদয়ের গভীরতা অন্বেষণ করে, তাহলে সে এই সব খুঁজে পাবে। মানুষের মধ্যে এমন কিছু নেই যা মানুষ নিজেই শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে না। মানুষ অবশেষে তার নিজস্ব অনুভূতি এবং চিন্তাভাবনাকে একে অপরের থেকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু এটা অত্যন্ত কঠিন, এমনটি কষ্টকর; কিন্তু আল্লাহ এগুলো সবই জানেন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটে যে, একজন ব্যক্তি কোনো কার্য সম্পন্ন করে ধারণা করে সেটা আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করেছে। কিন্তু যদি সে এক্ষেত্রে তার হৃদয়ের গভীরে যাচাই করে, তাহলে সে দেখতে পাবে যে, এ কাজটি আল্লাহর জন্য ছিল না। কখনও কখনও মানুষ কল্পনা করে যে, সে কোনো ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে একটি কাজ সম্পন্ন করেছে; কিন্তু যদি সে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তাহলে দেখতে পাবে যে, তাতে কোনো ভালো উদ্দেশ্য ছিল না। অনেক কাজের ক্ষেত্রে মানুষ কল্পনা করে যে, এটি নিঃস্বার্থভাবে করেছে, কিন্তু যদি সে গভীরভাবে যাচাই করে তাহলে তার নিকট প্রতীয়মান হবে যে, সেই কাজগুলো নিঃস্বার্থভাবে ছিল না। অবশ্য এগুলোর বিপরীতও রয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভালো উদ্দেশ্যও থাকে, মানুষের সত্তায় ভালো প্রেরণা থাকে, ঐশী আকর্ষণ থাকে যা মানুষ বুঝতেও পারে না। কখনও কখনও মানুষের মধ্যে এমন প্রতিভা থাকে যা সে টের পায় না। মানুষের সত্তায় বিদ্যমান এবং সৃষ্টি ও মানুষের প্রকৃতিতে নিহিত এ বিষয়সমূহ সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট জ্ঞাত। মানুষের সৃষ্টি এবং বিশ্বের সৃষ্টিজগতের প্রভুর সামনে সবই সুস্পষ্ট ও প্রকাশিত।

Related posts

সূরা তাগাবুনের তাফসীর

সূরা তাগাবুনের তাফসীর

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More