দুনিয়া ও পরকালের দুর্ভাগ্য; নেয়ামত অস্বীকারকারীদের শাস্তি
অতীতে এমন কিছু লোক ছিল যারা এমন জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ছিল না; তারা কাফির হয়ে যায়। এর ফলাফল কী হয়েছিল? সে সম্পর্কে আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘তারা তাদের কৃতকর্মের সাজা আস্বাদন করেছিল।’ ঐশী শিক্ষার উপর আমল না করা এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানুষের জন্য যে জীবনধারা নির্ধারণ করেছেন তা গ্রহণ না করার পরিণতি মানুষ নিজেই বহন করে। ইতিহাসে নবী-রাসূলগণ (আ.) কখনও মানুষকে এমন কোনো কাজে বাধ্য করেননি যা তাদের (মানুষের) কোনো উপকারে আসবে না; বরং তাঁদের প্রচেষ্টা ছিল যাতে মানুষ তাদের জীবনকে সংগঠিত করতে পারে, নবীদের (আ.) দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করে মানুষ যাতে সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে। নবীগণ হলেন চিকিৎসকদের মতো যাঁরা মানুষের রোগ পর্যবেক্ষণ করেন ও তা সনাক্ত করেন, ব্যথা ও তার নিরাময় উভয়ই বোঝেন। তাঁরা মানুষকে চিকিৎসা ও রোগ নিরাময়ের জন্য কিছু নির্দেশনা দান করেন, সেগুলো মানুষকে যথাযথভাবে মেনে চলা প্রয়োজন যাতে তার জন্য উপকার ও কল্যাণ বয়ে আনে। যেখানেই মানুষ আমল করেনি কিংবা সক্রিয় হয়নি—ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বহু শতাব্দী ও অসংখ্য প্রজন্ম নবীদের আদেশ পালন করেনি—পরিণতিতে মানবজাতি অজ্ঞতায় নিমজ্জিত হয়েছে; মানুষ অনৈতিকতা ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে; নিপীড়ন ও বৈষম্য কিছু সমাজে মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। পরিণতিতে মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পরও মানবজাতির জন্য এখনও প্রয়োজনীয় শান্তি, প্রশান্তি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির পরিবেশ পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। এ অবস্থা হচ্ছে মানুষের অবিশ্বাসের ফলাফল। যদি মানুষ নবীদের শিক্ষা অনুসরণ করত, নবীরা যা নিষিদ্ধ বলে মনে করতেন তা যদি তারা পাপ বলে মনে করত এবং তার কাছে না যেত, নবীরা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় হিসেবে যা প্রবর্তন করেছিলেন তা যদি তারা অনুশীলন করত, তাহলে আজ জীবনে কোনো নিপীড়ন, কোনো বৈষম্য, কোনো হত্যা, কোনো বঞ্চনা, কোনো দুঃখ থাকত না। কতই না ভালো হতো! পৃথিবীটা একটা স্বর্গে পরিণত হয়ে যেত। নবীগণ (আ.) পৃথিবীকে এমন এক স্বর্গে রূপান্তরিত করতে এসেছিলেন যেখানে মানুষের জন্য কোনো অস্বস্তি, কোনো কষ্ট, কোনো বিশৃঙ্খলা, কোনো বৈষম্য, কোনো নিপীড়ন, কোনো বঞ্চনা থাকবে না এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুর মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না। এমন একটি পৃথিবী যেখানে সকলেই আল্লাহর অপরিসীম নেয়ামত এবং অনুগ্রহ উপভোগ করবে, মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ও মা’রেফাত বৃদ্ধি করবে, পরিপূর্ণতা অর্জন করবে, আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হবে। পাশাপাশি মানবতার দিক থেকে, জ্ঞানের দিক থেকে, নৈতিকতার দিক থেকে, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের ক্ষেত্রে মানুষের সাধ্য অনুযায়ী সাফল্য অর্জন করবে। মূলত এগুলোই ছিল নবীগণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কিন্তু নমরুদ ও ফেরাউনরা সেগুলোতে বাধা দান করেছে, ইতিহাসের সময়ে সময়ে কাফিররা সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করেছে। যারা নবীদের সাথে যুদ্ধ করেছে তারা এটাকে সফল হতে দেয়নি, যারা নবীদের হত্যা করেছে তারা সে লক্ষ্যকে অগ্রসর হতে দেয়নি। সমস্ত নবী-রাসূল (আ.) এ পৃথিবীতে এসেছেন, সংগ্রাম করেছেন এবং চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়েছেন যাতে তাঁদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়ন করতে পারেন এবং যতদূর সম্ভব কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেন। এ কারণেই তো বলা হয়েছে, হে লোকসকল! তোমরা কুরআনকে লক্ষ্য কর! দেখো তোমাদের পূর্বসূরিরা কিভাবে মানব জীবনে জীবনদায়ী, মানব-গঠনকারী এবং জীবনে আলো দানকারী এসব শিক্ষা-দীক্ষাকে অবিশ্বাস করেছিল; আর এর পরিণতি কতই ভয়ানক হয়েছে! ‘তারা তাদের কৃতকর্মের সাজা আস্বাদন করেছিল।’ এর পর কঠোরভাবে ঘোষণা করা হচ্ছে, ‘তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ এই যন্ত্রণাদায়ক আযাব পরকালীন জীবনে নরকে এবং এ দুনিয়ার জীবনের নরকে উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এখানেও তারা একইভাবে আযাবের স্বাদ গ্রহণ করে। ‘যন্ত্রণাদায়ক আযাব’ সর্বত্র বিদ্যমান। হয়তো এ আয়াতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি বলতে পরকালের শাস্তির প্রতি ইশারা করা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবতার ভিত্তিতে এ অবস্থা পৃথিবীর শাস্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। তারাও এই পৃথিবীর শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করেছে; এমনটি নয় কি? আজ আপনারা লক্ষ্য করুন, পৃথিবীতে কী ঘটছে? যেসব জায়গায় নবীদের শিক্ষা-দীক্ষার প্রভাব নেই, যেখানে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির উপস্থিতি নেই এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও দাসত্বের—যেসব বিষয়ের দিকে নবীগণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—কোনো চেতনা নেই, সেখানে আপনারা লক্ষ্য করবেন যে, কত কষ্ট, কত মন্দ, কত বৈষম্য ও নিপীড়ন এবং মানুষের প্রতি কতটা অপমান বিদ্যমান; এসব স্থানের কোথাও নিপীড়ন, কোথাও দারিদ্র্য, অন্য জায়গায় বৈষম্য, আবার কোথাও অত্যাচার ইত্যাদি সবকিছুই রয়েছে।
17
আগের পোস্ট
