মুসলিম উম্মাহকে প্রকৃত ধর্ম তথা সত্যিকারের মোহাম্মদী ইসলামের আলোর বন্যায় আলোকিত করা ছিল যাদের অক্লান্ত সাধনা এবং যারা নিজ জীবনকে ইসলামের জন্য উৎসর্গ করে মানুষের জন্য রেখে গেছেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কল্যাণের অফুরন্ত ফল্গুধারা, আর মানব সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছিল যাদের গৌরবোজ্জ্বল শিক্ষার মূল ভিত্তি ইমাম হাসান আসকারী (আ.) ছিলেন তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর পবিত্র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতানী ট্রাষ্ট-এর উদ্যোগে খুলনায় কাসরে হোসাইনী ইমামবাড়ীতে এক বিশেষ আনন্দ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত ৯ রবিউসসানি, ২১ সেপ্টেম্বর (সোমবার), রাত ৮টায় এ মাহফিলের সূচনা হয় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও দুয়ায়ে ইমাম-এ-যামান (আ.) এর মাধ্যমে।
মাহফিলে প্রধান আলোচনা হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ হুজ্জাতুল ইসলাম জনাব সৈয়দ ইব্রাহিম খলিল রাজাভী। তিনি বলেন, নামাজে ভালোবাসা যেমন দরকার তেমন আহলে মুহাম্মাদ (আ.)-এর প্রতি ভালবাসাও দরকার। হযরত আলী (আ.)-এর জন্মদিবস আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি ১১তম ইমাম (আ.) এর জন্মদিবস আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না কোন মুমিনের ক্ষেত্রে এটাকি হতে পারে। মুমিনদের কাছে হযরত আলী (আ.) ইমাম ঠিক তেমনি হযরত হাসান আসকারী (আ.)ও মুমিনদের ইমাম।
আজ জনগণের কাছে আমার একটি প্রশ্ন রাসুল (সা.)কে মূল্যায়ন করবো তার পিতাকে মূল্যায়ন করবো না, আলী(আ.)কে মুল্যায়ন করবো কিন্তু তার পিতাকে মূল্যায়ন করবো না এটা কোন ধরনের ঈমান এটা কোন ধরনের ভালোবাসা?
আব্বাসীয় শাসকরা মনে করত জনগণের মাঝে নবীজীর আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদা ও অবস্থান তাদের ক্ষমতার জন্য হুমকি। অন্য যে কারণে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)কে তারা হুমকি মনে করতেন তা হলো অনেক হাদীসের বর্ণনা অনুযাযী এ ইমামের সন্তানই হবেন বিশ্বের সেই ত্রাণকর্তা যিনি সব ধরনের জুলুম নির্যাতনের মূল উপড়ে ফেলে তাগুতি শক্তিকে পরাভূত করবেন এবং বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।
বিজ্ঞ আলেমদের অনেকেই এটা মনে করেন যে, জনগণ বা মানব জাতি যদি শেষ ত্রাণকর্তার আবির্ভাবের পরিবেশ সৃষ্টি না করেন তাহলে তার আবির্ভাব বিলম্বিত হতেই থাকবে। তাদের মতে এ জন্যই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যদি তারা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন না করে।”
উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকদের যুগে বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের ভক্ত বা অনুসারীদের জন্য হেজাজ ও ইরাক নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হত না। ইরান তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চল ও রাজধানী থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত হওয়ায় এবং এ অঞ্চলের জনগণের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ধরনের হওয়ায় ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’র নির্দেশ বা পরামর্শে আহলে বাইতের অনেক অনুসারী বা ভক্ত এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। তারা ইমামের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নানা প্রশ্ন বা সমস্যার ব্যাপারে ইমামের দিক-নির্দেশনা নিতেন। তিনি এসব ব্যাপারে ইসলামী জ্ঞানে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও যোগ্য কয়েকজন অনুসারী বা সাহাবীকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। এভাবে শেষ ত্রাণকর্তার অদৃশ্য থাকার দর্শন ও তার বৈশিষ্ট্যগুলোসহ ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও পূর্ববর্তী ইমামদের রেখে যাওয়া শিক্ষাসহ জনগণের মধ্যে টিকিয়ে রাখার এবং সেসবের প্রচার, প্রসার ও ক্রমবিকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন এমন এক যুগে যখন আধুনিক যুগের মত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। এসব শিক্ষা সংরক্ষণের কাজে ইমাম হাসান আসকারী (আ.) ব্যবহার করেছিলেন কালাম ও হাদীস শাস্ত্র।
এই মহতী আয়োজনে মুসলমানদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শিক্ষা ও মানবতার বার্তার প্রতি তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। মাহফিল শেষে দোয়া ও তাবাররুক বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
