আর তাই তো কুরআনের আয়াতে তওরাত সম্পর্কে খ্রিষ্টধর্মের প্রবক্তা হযরত ঈসার (আ.) উক্তি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে- অর্থাৎ ‘তওরাত থেকে যা কিছু আমার পূর্বে ছিল তার সত্যায়নকারী।’ অবশ্য এখানে তওরাত বলতে সে কিতাবকে বুঝান হয়েছে যা সব ধরনের তাহরীফ তথা বিকৃতি থেকে মুক্ত; না ঐ তওরাত যার শিক্ষা ও বিধানাবলির মধ্যে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ঘটেছে। বলা বাহুল্য হযরত ঈসার (আ.) নবুয়্যতকালে তওরাতে কি পরিমাণে তাহরীফ ঘটেছিল সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য আমাদের জানা নেই। কিন্তু যে বিষয়টি সর্বজন বিদিত তা হচ্ছে- হযরত ঈসা (আ.) আসল তওরাতের -তাহরীফমুক্ত কিতাবের- বিধানাবলি থেকে মানুষকে হেদায়েত দান করতেন।
হযরত ঈসা (আ.) আরও বলেন- ‘আর আমি তোমাদেরকে সেই রাসূলের সুসংবাদদাতা।’ অর্থাৎ আমি আমার অতীত আসমানি কিতাব তথা তওরাত ও খ্রিষ্টধর্মকে সত্যায়ন করার পাশাপাশি আগামী দিনে আগত এক রাসূলের সুসংবাদ ও বাশারাত তোমাদেরকে দিচ্ছি। অতঃপর তিনি এ সম্পর্কে আরও বলেন-
‘যিনি আমার পরে আগমন করবেন, যাঁর নাম হবে আহমাদ।’ অর্থাৎ আমার পরে আগত সে রাসূলের নাম হবে ‘আহমাদ’। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ.) স্বীয় নবুয়্যতকালে বহুবার সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল তথা হযরত মুহাম্মাদের (সা.) আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। আমি সূরা হাশরের এক আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করেছি যে, হযরত ঈসার (আ.) এমন বারংবার সুসংবাদ ও এ বিষয়ের উপর এমন গুরুত্বারোপের কারণে ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরা অতীতকাল থেকেই মদীনার আশেপাশে বসতি গড়েছিল। ইয়াহুদি সম্প্রদায়ের বনি কুরাইজেহ, বনি নাযীর ও বনি কাইনাকায়া গোত্র হযরত মুহাম্মাদের (সা.) বে’সাতের বহু বছর পূর্ব থেকেই ইয়াসরিবের (মদীনার) আশেপাশে বসবাস শুরু করে। ইয়াহুদিদের কিছু কাল পরপরই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকেরাও প্রাচীন শামাত অঞ্চল -বর্তমান সিরিয় ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ- হতে এসে নাজরান ও মদীনার অদূরে বসতি গড়ে। তারা সবাই শেষ জামানার রাসূল ও সর্বশেষ নবীর আগমনের প্রতীক্ষায় সেখানে বসবাস শুরু করে। অর্থাৎ তাদেরকে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল যে, সর্বশেষ নবী ও রাসূলের আগমন সেখানে ঘটবে। এমনকি তাঁর শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি কেমন হবে সে বিষয়েও পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছিল; যেমন- তাঁর চেহারা ও অবয়ব কেমন হবে, কথাবার্তার ধরণ কেমন হবে, তিনি কিভাবে আহার করবেন, কিভাবে উঠাবসা করবেন, কিভাবে তিনি তাঁর সাথীদের সাথে চলাফেরা করবেন প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যাবলি হুবহু বর্ণনা করা হয়েছিল। এভাবে হযরত ঈসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে সুসংবাদ ও পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
সুতরাং এখন প্রশ্নের বিষয় হচ্ছে হযরত ঈসার (আ.) সম্প্রদায় তাদের কোন্ ভুলের কারণে কথা ও কাজের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে- কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে,
‘অতঃপর সে (সর্বশেষ রাসূল) যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের নিকট আগমন করেন।’ অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যখন মক্কায় আগমন করেন এবং তাদের -ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টানদের- সম্মুখে স্বীয় স্পষ্ট নিদর্শন ও দলিলাদি -আল্লাহ প্রদত্ত সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি, মোযেজাসমূহ, কুরআনের আয়াতসমূহ এবং ইসলামের ঐশ্বরিক বিধানাবলি- উপস্থাপন করেন; যে সব বিষয় সম্পর্কে তাদেরকে আগেই পূর্বাভাস ও সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। এ কারণে সহজাতভাবেই তাদেরকে সেগুলো গ্রহণ করা উচিত ছিল; কিন্তু তারা তা গ্রহণ করার পরিবর্তে এহেন উক্তি করল- ‘এতো এক স্পষ্ট জাদু।’ অর্থাৎ তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) রেসালতকে প্রত্যাখ্যান করল; যে সম্পর্কে তাদেরকে পূর্বেই সুস্পষ্ট আভাস দেয়া হয়েছিল। অথচ হযরত ঈসা (আ.) যখন তাঁর সম্প্রদায় তথা খ্রিষ্টানদেরকে হযরত মুহাম্মাদের (সা.) রেসালতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, তখন তারা তা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহর (সা.) আগমন ঘটে এবং তিনি প্রকাশ্যে সকলের নিকট ইসলামের দাওয়াত তুলে ধরেন; তখন তারা দেখল এ দাওয়াতে তাদের স্বার্থসমূহ -গোত্রীয় স্বার্থ, পার্থিব স্বার্থ প্রভৃতি- ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ফলে তারা সে দাওয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। এছাড়া তাদের মধ্যে বিদ্যমান একগুঁয়েমি মনোভাব, বিদ্বেষ ও শত্রুতার কারণে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। বছরের পর বছর ধরে খ্রিষ্টানদের -চাই তারা নাজরানের খ্রিষ্টান হোক কিংবা শামাত ও অন্যান্য অঞ্চলের খ্রিষ্টান হোক না কেন- মধ্যে এ ধারা অব্যাহত ছিল। অবশেষে রোম সাম্রাজ্য মুসলিম বাহিনী কর্তৃক বিজয় অর্জনের পর -তাদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের কারণে- তারা ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ শুরু করে। নতুবা আরব ভূ-খণ্ডে রাসূলুল্লাহর (সা.) পার্শ্বে বসবাসের কারণে কিংবা হযরত ঈসার (আ.) সুপারিশের কারণে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নি।