হজরত মোখতার’এর সংক্ষিপ্ত জীবন বিবরণি

by Shihab Iqbal

নাম: মুখতার বিন আবি উবাইদা বিন মাসউদ বিন ওমর বিন উমাইর বিন আউফ বিন ক্বাসী বিন হানবা বিন বাকর বিন হাওয়াযান। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫৮)

মুখতারের গোত্রের নাম সাকিফ যা ছিল সে যুগের প্রসিদ্ধ এবং বিস্তৃত একটি গোত্র যা হাওয়াযান থেকে তায়েফ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। (মোজামে কাবায়েলুল আরাব, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৮) তার কুনিয়া বা উপনাম ছিল আবু ইসহাক (কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭১)

তার উপাধি ছিল কিসান যার অর্থ হচ্ছে চতূর বা বুদ্ধিমান। (কামুস, মোহাম্মাদ বিন ইয়াকুব ফিরুয আবাদী, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৭)

আসবাগ বনি নোবাতে নামক ইমাম আলী (আ.) এর একজন সাহাবী বলেন: ইমাম আলী (আ.) মুখতারকে কাইস উপাধিটি দান করেন। (রেজালে কাসী, প্রষ্ঠা ১২৭)

মুখতারের পিতার নাম আবু উবাইদা সাকাফি তিনি হজরত ওমরের খেলাফতের প্রথমভাগে তায়েফ থেকে মদীনাতে আসেন এবং সেখানেই জীবন যাপন শুরু করেন। (মুরুজুয যাহাব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩১৫)

তাঁর পিতা হজরত ওমরের যুগে ইরানের সাথে যুদ্ধ কালিন সময়ে ছিলেন ইসলামের সেনা বাহিনীর প্রধান। (আল গারাত, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫১৭)

তাঁর মাতার নাম ছিল “দুমে”। তিনি ছিলেন সে যুগের একজন বুদ্ধিমতি নারী যার জ্ঞান, বিচার সহ অন্যান্য বিষয় ছিল বর্ণনা করার মতো। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৩৫০)

মুখতার সাক্বাফি নৈতিকতা, ভদ্রতার শিক্ষা আহলে বাইত (আ.) থেকে অর্জন করেন। (হায়াতিল ইমামিল হুসাইন, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৫৪)

মুখতার সাক্বাফি যুবক অবস্থায় তার বাবা এবং তার চাচার সাথে মিলে যুদ্ধ করার জন্য ইরাকে আসেন। মুখতার ইমাম আলী (আ.) এর সাথে ছিলেন এবং ইমাম (আ.) এর মৃত্যুর পরে কিছুদিন বাসরাতে চলে যান এবং সেখানে কিছুদিন জীবন যাপন করেন। (আল আলাম, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৭০)

মুখতারের বংশধরগণ ছিলেন আহলে বাইত (আ.) এর  অনুসারী বা শিয়া। এক্ষেত্রে ইতিহাসে তাঁর বেশ কিছু পদক্ষেপকে উল্লেখ করা হয়েছে যা দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, তিনি ছিলেন প্রকৃত আহলে বাইত (আ.) এর অনুসারী।

মুসলিম ইবনে আকিলকে সহায়তা:

শেইখ মুফিদ এবং তাবারির বর্ণনামতে মুসলিম ইবনে আকিল যখন কুফাতে আসেন তখন তিনি মুখতারের বাড়িতে অবস্থান করেন। মুখতার তাকে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তাকে সাহায্যে করার প্রতিশ্রুতি দান করেন। (আল ইরশাদ, পৃষ্ঠা ২০৫, তারিখে তাবারী, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৫৫)

বালাজুরি লিখেছেন যে, মুসলিম ইবনে আকিল মুখতারের বাড়িতে অবস্থান করে। কিন্তু যখন ইবনে যিয়াদ কুফাতে আসে তখন তিনি মুসলিমের জীবন রক্ষার্থে তাকে হানী বিন উরওয়া’এর বাড়িতে স্থানান্তর করেন। কেননা হানী বিন উরওয়া ছিল এমন একজন  ব্যাক্তিত্ব যাকে আহলে বাইত (আ.) এর অনুসারীরা যথেষ্ট সম্মান করতো কেননা তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য ব্যাক্তি।

মুখতার হজরত মুসলিমের কুফাতে আগমণের পর জনগণের কাছ থেকে তাঁর বাইয়াত গ্রহণেরে উদ্দেশ্যে কুফার আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় সফর করে। কিন্তু হঠাৎ ইবনে যিয়াদের ছলনায় কুফার সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হলে তিনি আবার কুফাতে ফিরে আসেন। ইবনে যিয়াদ নির্দেশ জারী করে ইমাম হুসাইন (আ.) এর বাইয়াত গ্রহণকারী এবং তাদের সাহায্যেকারীরা যেন আমার বাইয়াত গ্রহণ করে। আর কেউ যদি আমার বাইয়াত গ্রহণ না করে তাহলে তাকে বন্দি করার নির্দেশ জারী করে। ইবনে কাসীর লিখেন যে, যখন মুসলিম এবং হানী বিন উরওয়াকে গ্রেফতার করা হয় তখন মুখতার কুফাতে ছিলেন না বরং তিনি সৈন্য একত্রিত করার জন্য কুফার বাইরে ছিলেন। যখন তিনি মুসলিম এবং হানী বিন উরওয়ার গ্রেফতারের খবর শুনতে পান তখন তিনি সৈন্যদেরকে নিয়ে তড়িৎ গতিতে কুফাতে আসেন এবং যখন তিনি কুফাতে প্রবেশ করেন তখন তিনি ইবনে যিয়াদের সৈন্য বাহিনীর মুখোমুখি হন এবং তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে ইবনে যিয়াদের সৈন্য পক্ষের প্রধান মারা যায়। মুখতার তাঁর সঙ্গীদেরকে বলেন: তোমরা এখান থেকে সরে যাও দেখি অবস্থা কিরূপ হয়।(কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৬৯)

মুসলিম এবং হানী বিন উরওয়ার মৃত্যুর পরে ইবনে যিয়াদ সন্ধান করে মুখতার কে কেননা তাকে আটকাতে পারলেই আর কুফাতে তেমন কোন সমস্যা থাকবে না। (তারিখে তাবারী, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৮১, কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৬)

বন্দি অবস্থায় মুখতার:

হানী বিন জাব্বা ইবনে যিয়াদের প্রতিনিধি আমরু বিন হারিসকে মুখতারের গুপ্ত ঠিকানা দেয়। যখন মুখতার আমরুর মাধ্যে ইবনে যিয়াদের দরবারে উপস্থিত হয় এবং যখন ইবনে যিয়াদ তাকে দেখে তখন বলে: তাহলে তুমিই সে ব্যাক্তি যে মুসলিম ইবনে অকিলকে সাহায্যে করেছিলে? মুখতার বলেন যে, আমি সেই সময়ে কুফা শহরে ছিলাম না। (মাকতালে হুসাইন, পৃষ্ঠা ২৬৮-২৭০)

তখন ইবনে যিয়াদ তাকে কারাগারে বন্দি করার নির্দেশ জারী করে এবং ইমাম হুসাইন (আ.)’এর শাহাদত পর্যন্ত তাকে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। (ইনসাবুল আশরাফ, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৭৬-৩৭৭, কামেল ইবনে আসীর খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১১৬, মাকতালে আবি মেখনাফ, পৃষ্ঠা ২৭১, আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৪৯)

মুখতার যায়েদে বিন কাদামা’কে গোপনে তাঁর বোনের স্বামী আব্দুল্লাহ বিন ওমর বিন খাত্তাব’এর কাছে প্রেরণ করে যেন সে ইয়াযিদের কাছে তার মুক্তির জন্য আবেদন জানায়। যেহেতু বণী উমাইয়ারা আব্দুল্লাহকে সমীহ করতো সেহেতু তার লিখা চিঠির কারণে মোখতারকে মুক্ত করার নির্দেশ জারী করে। ইবনে যিয়াদ বাধ্য হয়ে ইয়াযিদের চিঠির কারণে তাকে মুক্ত করে দেয়। কিন্তু তাকে বলে যে, সে যেন কুফাতে অবস্থান না করে। মুখতার বলে: আমি মক্কায় ওমরা করতে যাচ্ছি এবং এভাবে সে মক্কায় আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর’এর কাছে যায়।

মুখতারের কুফায় প্রত্যাবর্তন:

মক্কায় বেশ কিছুদিন থাকার পরে মুখতার আহলে বাইত (আ.) এর সদস্যদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এক মহৎ উদ্দেশ্যে কুফার দিকে রওনা হয়।(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৩৫৬)

যখন মুখতার কুফার কাছে পৌছায় তখন সে কুফাতে প্রবেশের পূর্বে হাইরা নামক নদীতে গোসল করে এবং নতুন পোষাক এবং পরিপাটি অবস্থায় মসজিদে কুফাতে আসে এবং জনগণকে সুসংবাদ দেয়। (ইনসাবুল আশরাফ, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৭৯)

মুখতার শিয়াদের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিদের সাথে সাক্ষাত করে এবং তাদেরকে বাইয়াত এবং কিয়াম করার জন্য আহবান জানায়। (তারিখে তাবারী, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৭৯, কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭২)

কুফার প্রায় সকলেই মুখতারের কাছে বাইয়াত করে এবং ইমাম হুসাইন (আ.) এর রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। (তারিখে তাবারী, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৮০, কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭২)

মুখতারের কুফায় আগমনের খবর দ্রুত বন্ধু শত্রু সকলের কাছে পৌছে যায়। যখন কুফায় আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের কর্তৃক নির্ধারিত খলিফা আব্দুল্লাহ ইবনে মুতি’এর কাছে মুখতারের আগমণের খবরটি পৌছায় তখন সে আবার মুখতারকে গ্রেফতার করে কারাগারে বন্দি করার নির্দেশ দেয়। তাওয়াবিনরা যখন কিয়াম করে তখনও মুখতার কুফার কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছিল। (কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭৩)

মুখতার কারাগার থেকে তাওয়াবীনের সদস্যদের চিঠি লিখেন এবং তাদের বিদ্রোহের প্রশংসা করেন এবং বলেন যে, তোমরা অটল থাক আমি অতি দ্রুত কারাগার থেকে মুক্ত হব এবং তোমাদের শত্রুদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিব। (তারিখে তাবারী, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৭, কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২১১)

মুখতার আবার মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে তার বোন জামাই আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের কাছে চিঠি লিখে। পুণরায় আব্দুল্লাহ বিন ওমরের চিঠির কারণে মুখতার কয়েক মাসের মধ্যেই মুক্তি পাই। কিন্তু এবার মুক্তির পরে তাকে বিশেষ কিছু শর্ত দেওয়া হয়। মুখতার কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পরে ঠান্ডা মাথায় কিয়ামের পরিকল্পনা করতে থাকে।

মুখতারের কিয়ামের উদ্দেশ্যে:

মুখতার বেশ কিছুদিন মক্কায় অবস্থান করার পরে কুফায় ফিরে আসে এবং শিয়াদের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিত্বদের সাথে সাক্ষাত করে এবং তাদেরকে বলে যে, আমাকে হজরত আলী (আ.) এর সন্তান মোহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া অনুমতি দিয়েছেন যে, আমি যেন আহলে বাইত (আ.) এর অত্যাচারী এবং ইমাম হুসাইন (আ.) এর হত্যাকারীদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করি । এখন তোমরা হচ্ছো সেই প্রথম দল যাদেরকে আমি বাতিলের বিরূদ্ধে কিয়ামের দাওয়াত দিচ্ছি। (তারিখে তাবারী, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৮০, কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭২)

মুখতার বলেন: আমি আহলে বাইত (আ.) এর  নামকে জীবিত করতে এবং ইমাম হুসাইন (আ.) এর রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এসেছি।। (আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ইবনে কাসীর, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৭০)

কিছু লোক মুখতারের কথার সত্যতা জানার জন্য মক্কা এবং মদীনায় মোহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া এবং ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এর কাছে যায় এবং তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করে যে, মুখতার আমাদেরকে আপনাদের নামে জিহাদের জন্য আহ্ববান জানাচ্ছে এক্ষেত্রে আমরা কি করতে পারি? মুহাম্মাদ ইবনে হাফিয়া তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন: এ কাজে তাকে সাহায্যে করা তোমাদের জন্য ওয়াজিব। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৩৬৫)

মদীনা থেকে শিয়াদের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিবর্গরা কুফা এবং ফিরে আসে এবং মুখতারের কিয়ামের আহবানে সাড়া দেয়। (তারিখে তাবারী, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৫, কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২১৫)

শিয়াদের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিবর্গরা ইব্রাহিম বিন মালিকে আশতারের কাছে যায় এবং তাকে ইমাম হুমাইন (আ.) এর রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আহবান জানায় এবং যখন তাকে মোহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়ার সত্যায়িত চিঠিটি দেখানো হয় তখন সে মুখতারকে সাহায্যে করতে রাজি হয়। (ইনসাবুল আশরাফ, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৮৬, তারিখে তাবারী, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৬)

মুখতারের কিয়ামের শ্লোগান ছিল “ইয়া লাসারাতিল হুসাইন”।(তারিখে তাবারী, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩২, কামেল ইবনে আসীর, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২৬)

মুখতার সাক্বাফির বিপ্লবী আন্দোলন সম্পর্কে দুটি মত বর্ণিত হয়েছে: ১৪ রবিউল আওয়াল, ১৬ই রবিউস সানী ৬৬ হিজরীতে তিনি কারবালার ঘাতকদের বিরূদ্ধে কিয়াম ঘোষণা করেন। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ৩৮৬, ওক্বায়েউশ শুহুর, পৃষ্ঠা ৭৪, তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৯৬, ক্বালায়েদুন নুহুর,খন্ড রবিউস সানী, পৃষ্ঠা ২৩২, আমালি শেখ তুসী,পৃষ্ঠা ২৪০)

মুখতারের সহায়তায় এগিয়ে আসে ইরাক ও ইরানের বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ এবং বিপ্লবী মুসলমান। তারা মুখতারের নেতৃত্বে কুফা দখল করেন এবং ইরাক ও ইরানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও তাদের দখলে আসে। এ সময় হিজাজ ও মক্কা ছিল আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের দখলে এবং তার বাহিনীর সঙ্গে উমাইয়াদের যুদ্ধ চলছিল ইসলামী জাহানের কর্তৃত্ব নিয়ে।

তৃতীয় শক্তি মুখতার উমাইয়াদের হামলা প্রতিহত করেন এবং রণ-নিপুণ বীর যোদ্ধা ইব্রাহিম ইবনে মালিক আশতারের সহায়তা নিয়ে কারবালার প্রধান ঘাতকদের হত্যা করতে সক্ষম হন। কুফায় নিযুক্ত ইয়াজিদের কুখ্যাত গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ এবং হাসিন ইবনে নুমাইরসহ কারবালার প্রধান নরপিশাচদেরকে তাদের মহাপাপের শাস্তি হিসেবে হত্যা করা হয়। মুখতারের ন্যায়বিচারবোধ ছিল এতটা শানিত যে, তিনি কারবালার গণহত্যার অন্যতম প্রধান আসামী তথা নিজের ভগ্নীপতি ওমর ইবনে সা’দকেও মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেননি।

ওমর ইবনে সাদ ছিল কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর অবরুদ্ধ পরিবারের বিরুদ্ধে কাপুরুষোচিত যুদ্ধ ও সন্ত্রাসী হামলায় অংশগ্রহণকারী ত্রিশ হাজার ইয়াজিদী সেনার প্রধান কমান্ডার। মহাপাপী শিমার, খুউলি ও হারমালার মত ঘাতকদেরও হত্যা করেন বিপ্লবী নেতা মুখতার এবং তাঁর বাহিনী। মুখতার নিজে ইমাম হুসাইন (আ.)’র ছয় মাসের শিশু আলী আসগর (রা.)-কে হত্যাকারী নরপিশাচ হারমালাকে হত্যা করেন এক বীরত্বপূর্ণ অভিযানে।

কুফায় মুখতারের শাসন টিকে ছিল দেড় বছর। কুফাবাসীদের প্রতারণামূলক চরিত্র ও অসহযোগিতার শিকার হয়ে মহান বীর মুখতারও শাহাদত বরণ করেন। মুসাব ইবনে যুবাইরের বাহিনীর সঙ্গে ভাগ্য-নির্ধারণী এক অতি অসম লড়াইয়ে। হিজাজ থেকে আসা যুবাইরের বাহিনীর সঙ্গে লড়াই না করার জন্য মুখতারের অন্যতম প্রধান সেনাপতির কাপুরুষোচিত সিদ্ধান্ত এবং সিরিয়ার দিকে অভিযান চালানোর পক্ষপাতী ইব্রাহিম ইবনে মালিক আশতারের অনুপস্থিতি- এ দুটি বিষয় কাল হয়ে দাড়ায় মুখতার বাহিনীর জন্য। ফলে মুখতারের হাজার হাজার সেনা নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকে এবং অবশেষে মুখতার ও তাঁর অনুগত মাত্র ১০/১২ জন সেনা যুদ্ধে অংশ নেন হাজার হাজার শত্রু সেনার মোকাবেলায়।

মুখতারের প্রধান সেনাপতি ভেবেছিল হিজাজের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ না করায় যুবাইর হয়তো তাদের প্রাণ ভিক্ষা দেবে। কিন্তু মুসাব ইবনে যুবাইরের নির্দেশে বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণকারী মুখতারের ঐ সকল বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিসহ প্রায় সাত হাজার সেনাদের সবাইকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল। যুবাইরের (আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের ভাই) এ নির্মম আচরণ প্রভাব ফেলেছিল তার বাহিনীর মধ্যেও। উমাইয়াদের নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের সময় যুবাইরের বাহিনীর কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা যুবাইরকে পরিত্যাগ করে। ফলে মুখতারের হত্যাকারী মুসাব ইবনে যুবাইর কেও নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল।

যুবাইর বাহিনী আহত বীর মুখতারকে হত্যা করেছিল কুফার মসজিদের মিম্বরের পাশে যেখানে ইমামতি করতেন ও খুতবা দিতেন আমীরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)। জীবনের অন্তিম সময়ে মুখতার নিজেই শহীদ হওয়ার জন্য এই পবিত্র স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন এবং অবশেষে তিনি মসজিদের সেই মেহরাবে শাহাদত বরণ করেন।

ইমাম বাকির (.)এর স্বীকারোক্তি:

মুখতারে সাক্বাফির পুত্র হাকাম কুরবানির ঈদের দিন ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.)এর সমীপে উপস্থিত হয়। সে নিজের পরিচয় দিলে ইমাম বাকির (আ.) তাকে নিজের কাছে টেনে নেন। তখন সে অভিযোগের সুরে বলে: হে ইমাম (আ.)! লোকজন আমার পিতার সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের কথাবার্তা বলে। তিনি নাকি মিথ্যাবাদি ছিলেন! এক্ষেত্রে আপনি যা বলবেন আমি তা সত্যরূপে স্বিকার করে নিব। ইমাম বাকির (আ.) তাকে বলেন: আমার পিতা ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.) আমাকে বলেছেন যে, মুখতার আমার মায়ের দেন মোহরের অর্থ তাঁকে প্রেরণ করেছিলেন, সে আমাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল, আমাদের শত্রুদের কাছ থেকে সে প্রতিশোধ নেয়, সে আমাদের শত্রুদেরকে হত্যা করে। তারপর ইমাম বাকির (আ.) তিনবার বলেন: “আল্লাহ যেন তোমার পিতার ওপরে রহমত বর্ষণ করুন”

কে ছিলেন হজরত সকিনা?

হজরত সকিনা এবং হজরত রুকাইয়া উক্ত নাম দুটি নিয়ে ইতিহাসে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.)’এর হজরত সকিনা এবং হজরত রুকাইয়া নামের কোন মেয়ে ছিল? যিনি তিন অথবা চার বছর বয়সে কারবালাতে উপস্থিত ছিলেন এবং দামেস্কে শাহাদত বরণ করেন?

ইতিহাসের গ্রন্থ সমূহে উক্ত বিষয় সম্পর্কে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি উক্ত বিষয় নিয়ে প্রথম আলোচনাকারি এমাদ উদ্দিন তাবারিও বিষয়টিকে অস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।

আবার তাবাকাতে কুবরা নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.)’এর উক্ত নামের মেয়েটি প্রাপ্ত বয়স্কা ছিলেন এমনকি তাঁর সন্তানাদিও ছিল। উক্ত বিষয়টি জানার পরে আমরা সকলেই আশ্চর্যিত হয়ে যায় কি তাই না?

যদিও ইমাম হুসাইন (আ.)’এ ছোট কন্যা যাকে আমরা রুকাইয়া, ফাতেমা সুগরা সহ বিভিন্ন নামে চিনি কিন্তু অনেক ঐতিহাসিকগণ তাদের স্বিয় গ্রন্থে তাঁর নামকে উল্লেখ করেনি। আবার কিছু ইতিহাস গ্রন্থে তাঁর জীবনি, কারবালাতে তার উপস্থিতি এমনকি শামে তাঁর হৃদয়বিদারক শাহাদতের ঘটনাও বর্ণনা করা হয়েছে যেমন:

যখন হজরত জয়নাব (সা.আ.) কুফাতে তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)’এর কাটা মাথার দিকে দৃষ্টিপাত করতেন তখন তিনি এভাবে শোকগাঁথা পাঠ করে বলতেন: হে আমার ভাই! তুমি আামদের ছোট ফাতেমার সাথে কথা বল যেন সে মারা না যায়।

ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর জিবনের অন্তিম মূহুর্তে (সিমার তার গলা কাটার সময়) বলেন: হে জয়নাব, সকিনা এবং আমার সন্তানরা! এখন কে তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে? হে রুকাইয়া! উম্মে কুলসুম আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কাছে আমানত স্বরূপ ছেড়ে যাচ্ছি কেননা আমার নির্ধারিত সময় কয়েক মূহুর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

শেইখ মুফিদ (রহ.) লিখেছেন যে, কারবালাতে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর ছোট কন্যা উপস্থিতি ছিল যার মায়ের নাম ছিল ‘রোবাব’।

শেইখ তাবারসি বর্ণনা করেছেন: কারবালাতে আশুরার দিন ইমাম হুসাইন (আ.)’এর কন্যা সকিনার বয়স ছিল ১০ বছর।

এছাড়া বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর আরেকটি কন্যার নাম ছিল সকিনা যিনি কারবালার ঘটনার পূর্বেই বিবাহ যোগ্য ছিলেন।

উপরে উল্লেখিত ইতিহাস এবং রেওয়ায়েত থেকে যে, বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হচ্ছে যে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর  একটি কন্যা ছিল যার নাম ছিল সকিনা এবং তিনি শামে শাহাদত বরণ করেন। আর ইমাম হুসাইন (আ.)’এর আরেক কন্যা যার নাম ছিল সকিনা তিনি তাঁর বাবার শাহাদতের পরেও জিবিত ছিলেন।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং শাহাদতের ঘটনা বর্ণনাকারিগণ ইমাম হুসাইন (আ.)’এর শাহাদতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম হুসাইন (আ.)’এর সকিনা ও ফাতেমা নামের একটি কন্যা ছিল। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৩৫, মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৭৭, আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৭৮, নাসাবে কুরাইশ, পৃষ্ঠা ৫৯, ইনসাবুল আশরাফ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১২৮৮, তাযকেরাতুল খাওয়াস, পৃষ্ঠা ২৪৯)

অনেক ঐতিহাসিকগণ আবার জয়নাব নামটিও উল্লেখ করেছেন। (কাশফুল গুম্মা ফি মারেফাতুল আয়েম্মা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮)

অনেকে আবার তাদের গ্রন্থে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর ছোট কন্যা যে শামে শাহাদত বরণ করে তাঁর কথাও উল্লেখ করেছেন। (নাফসুল মাহুমুম, পৃষ্ঠা ৪১৫- ৪১৬, আল ইকাদ, পৃষ্ঠা ১৭৯, মাআলিউস সিবতাইন, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭০, মুনতাহিউল আমাল, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৮০৭, তারিখে তাবারি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৯)

বিভিন্ন রেওয়ায়েত এবং ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন হজরত জয়নাব (সা.আ.) কুফাতে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর মাথার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বলেন: হে ভাই! আপনি আপনার ছোট ফাতেমার সাথে কথা বলুন তানাহলে সে হয়তো মারাই যাবে। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৫, পৃষ্ঠা ১১৫, ইনাবিউল মোয়াদ্দাত, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২১)

হজরত জয়নাব (সা.আ.)’এর উক্ত কথা দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)’এর ছোট একটি কন্যা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আর এ কারণেই যখন আমরা শিয়া ও সুন্নি ইতিহাসের গ্রন্থ সমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তখন দেখতে পাই যে, কারবালার ঘটনায় ইমাম হুসাইন (আ.)’এর ছোট কন্যা হজরত সকিনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যার মায়ের নাম ছিল রোবাব। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭)

শেইখ তাবারসি উক্ত ঘটনাটি বর্ণনা করার সময় উল্লেখ করেছেন যে, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার সময় সকিনা বিনতে হুসাইন’এর বয়স ছিল ১০ বছর।  (মাকতালে হুসাইন, পৃষ্ঠা ৩৯৭)

যাহাবি তার ‘তারিখে ইসলাম’ নামক গ্রন্থে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর কন্যা হজরত সকিনা’এর কথা উল্লেখ করেছেন। (তারিখে ইসলাম, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩৭১)

তবে ঐতিহাসিকদের মধ্যে হজরত সকিনার বয়স, বিবাহ এবং কারবালাতে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর সকিনা নামের আরো কোন কন্যা সন্তান উপস্থিত ছিল কিনা এ সম্পর্কেও বিভিন্ন মতামত বর্ণিত হয়েছে। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২২)

উপরে উল্লেখিত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, শামে  সকিনা নামের ইমাম হুসাইন (আ.)’এর একটি কন্যা (রুকাইয়া অথবা ফাতেমা ওরফে সকিনা) শাহাদত বরণ করেন। আর যদি ইতিহাসে ইমাম হুসাইন (আ.)’এর শাহাদতের পরে অনেকদিন যাবৎ কোন সকিনা জিবিত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তাহলে তিনি হচ্ছেন অন্য কোন সকিনা যার বিবাহের কথা ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔