“হযরত ফাতেমা যাহরার (আ.) মহিমান্বিত জন্ম এবং বিশ্ব মুসলিম নারী দিবস

by Syed Yesin Mehedi

হযরত মুহাম্মাদের (সা.) নবুয়্যাত ঘোষণার পঞ্চম বর্ষে বিশ জামাদিউস সানী নবী নন্দিনী ফাতেমা যাহরার (আ.) মহিমান্বিত জন্ম দিবস। তাঁর জন্মের মধ্য দিয়ে রাসূলের (সা.) পবিত্রময় জীবনে এক বরকতপূর্ণ দিগন্তের উন্মোচন ঘটে। আমরা যদি প্রচলিত নিয়মানুযায়ী প্রতিটি পূণ্যময় ও ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য বিশেষ কোন দিবস নির্ধারণ করতে চাই, তাহলে নিঃসন্দেহে মুসলিম নারী সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের সর্বোত্তম দিন হচ্ছে হযরত ফাতেমা যাহরার (আ.) জন্ম দিবস। আর তাই তো বিংশ শতাব্দীর অবিসংবাদিত নেতা ও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইমাম খোমেনী (রহ.) এ দিনকে (বিশ জামাদিউস সানী) বিশ্ব মুসলিম নারী দিবস ঘোষণা করেছেন। মানব সমাজে কোন শ্রেণীর (যেমনঃ নারী, শ্রমিক কিম্বা বিশেষ কোন পেশাজিবীর) প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের নিমিত্তে অত্যধিক গুরুত্ববহ দিবসসমূহ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণতঃ উক্ত শ্রেণীর বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পৃক্ত দিনগুলিকেই বেছে নেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, কেন বিশ্ব নারী দিবস উদযাপনের জন্য হযরত ফাতেমা যাহরার (আ.) জন্ম দিবসকে বেছে নেওয়া হবে, যিনি অত্যন্ত স্বল্প দিনই এ ধরণীর বুকে জীবন যাপন করেছেন? নিম্নোক্ত আলোচনায় এ প্রশ্নের যথোচিত উত্তর দান করা হয়েছেঃ

১- বিশ্ব নারী দিবসে মুসলিম নারী সমাজের সম্মুখে সর্বাপেক্ষা পূর্ণাঙ্গ ও অর্থবহ জীবনাদর্শ উপস্থাপন করা বাঞ্ছনীয়। এমন মহীয়সী নারীকে আদর্শরূপে তুলে ধরা জরুরী; যিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে (সুযোগ্য কন্যা, স্ত্রী, মাতা…) অনুকরণীয় হিসেবে স্বীকৃত। আর ফাতেমা যাহরা (আ.) হলেন সে-ই মহীয়সী নারী এবং নারী জাতির জন্য চিরন্তন আদর্শ। যদিও তিনি অত্যন্ত স্বল্প দিন এ পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তাঁর জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত ছিল অসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্যবহ। তিনি শিশুকাল এমনই আধ্যাত্মিকতার সাথে অতিবাহিত করেছেন, যার নজীর অন্য কোন শিশুর মধ্যে পাওয়া যাবে না। তাঁর যৌবনকাল ছিল স্বল্পকালীন; কিন্তু তা ছিল গুরুত্ব, তাৎপর্য এবং শিক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ। সুতরাং তাঁর স্বল্প জীবন বিস্তীর্ণ পরিসরের অধিকারী। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকের জীবনের স্বার্থকতা সময়ের দীর্ঘতায় নয়, বরং জীবনের সার্বিক সফলতা ও গভীরতায়। অস্তিত্ত্বের গভীরতা মানুষের সময়, চিন্তা ও কর্মের ব্যাপকতা দান করে; এমন কি এক ঘন্টার জীবন কয়েক যুগ অপেক্ষা শ্রেয়। আর তাই তো অনেক মহামানবদের এক ঘন্টার জীবন নিষ্ক্রিয় ও অসাড় মানুষদের হাজার বছর অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। সারকথা হচ্ছে, মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অর্থবহ জীবন, না দীর্ঘকালের জীবন। হ্যাঁ, ফাতেমা যাহরা (আ.) নারী জাতির সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর চিন্তা ও চেতনা হচ্ছে রাসূলের (সা.) চিন্তা ও চেতনারই বিকাশ। তিনি ছিলেন নারীদের চেষ্টা-সাধনা, বৈবাহিক জীবন ও মাতৃত্বের ভূমিকায় অত্যুজ্জ্বল নমুনা এবং মানবতার ভূমিকায় সমগ্র মানব জাতির নমুনা স্বরূপ। নিশ্চয়ই তিনি একজন সুযোগ্য কন্যা, সহধর্মিনী, মাতা এবং দায়িত্ব সচেতন মুসলিম নারী। মূলতঃ তিনি যাবতীয় মানবীয় গুণাবলী স্বীয় ব্যক্তিত্বের মাঝে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

২- হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.) মহানবীর (সা.) সাথে রক্তের বন্ধনের কারণে নয়, বরং সুমহান মানবীয় গুণাবলী এবং ফজিলতের কারণে নারী জাতির সম্রাজ্ঞীর আসনে সমাসীন। কাজেই আমরা যদি তাঁর সাথে পরিচিত হই, তাহলে মানুষের প্রতি ভক্তি-ভালবাসা, দয়া-অনুগ্রহ, দায়িত্ববোধ এবং মানবতার দুশমনদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর গুরুত্ব খুব সহজেই প্রকাশ পেয়ে যাবে। কেন ফাতেমা যাহরা (আ.) কারণ তিনি নারীদের প্রতি দৃপ্ত আহ্বান জানিয়েছেনঃ তোমরা শুধু নারী নও, মানুষও বটে। কাজেই মানবীয় বৈশিষ্ট্যে অনুপ্রাণিত হও এবং নিজেদের নারীত্বকে উক্ত বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ কর। শুধু নারীত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে মানবীয় বৈশিষ্ট্যাবলী হতে নিজেদেরকে বঞ্চিত কর না। তোমরা নিজেদের চিন্তা, কর্ম ও বাস্তব জীবনে উপযুক্ত মানব হিসেবে আত্মপ্রকাশ কর; এমন মানব যে স্রষ্টা ও সৃষ্টির সাথে সম্পৃক্ততা বজায় রেখে সম্মুখ গতিতে এগিয়ে চলে।

৩- আমরা বিশ্ব নারী দিবসে ফাতেমা যাহরাকে (আ.) মধ্যমণি হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি এ বিষয়টি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করি যে, ইসলাম নারীদের প্রতি সব ধরনের অবিচার ও অবজ্ঞার ঘোর বিরোধী। দুঃখজনক হলেও সত্য মানবেতিহাসের সিংহভাগই হচ্ছে পুরুষ শাষিত। পুরুষরা আজও নারীদের জীবনযাপনের ক্ষেত্রকে সংকুচিত এবং তাদের চেষ্টা-সাধনা ও অনুসন্ধানের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। পুরুষরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন করছে কিন্তু নারীদের মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে কোন সুযোগ সৃষ্টি করছে না। পরিণতিতে একদিকে সমাজ নারীদের স্নেহ, মমতা ও মেধা হতে বঞ্চিত হচ্ছে আর অপর দিকে ক্রমান্বয়ে তাদের মধ্যে ভক্তি ও ভালবাসা হ্রাস পাচ্ছে। আজ তাদের অপরিসীম স্নেহ ও মমতা কেবল মাতৃক্রোড়ে সীমাবদ্ধ অথচ সমগ্র মানব জাতিকে মমতায় সিক্ত করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। নারীরা এহেন পরিবেশে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা বিকাশের কোন সুযোগ পায় না। বরং তারা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয়ে সমাজে কোনঠাসা হয়ে পড়ে। আর তাই তো পবিত্র ইসলাম মানব জাতির জন্য মুক্তির মহান বার্তা নিয়ে আসে এবং নারী ও পুরুষ উভয়কেই স্ব-দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। পাশাপাশি উভয়ের পারস্পরিক অবস্থান, ভূমিকা এবং সত্তাগত পার্থক্য সম্পর্কে চুলচেরা বিশ্লেষণের সুযোগ দান করে। যাতে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সৃষ্টিতত্ত্ব পূর্ণতা লাভ করতে পারে।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔