হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাত আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর জীবনে এক গভীর শোকাবহ অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রিয়তমা সহধর্মিণীর বিচ্ছেদে তাঁর হৃদয় বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যার বিদায় হযরত আলী (আ.)-এর জন্য ছিল এক অসহনীয় মর্মবেদনার ঘটনা।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-কে দাফন করার সময় হযরত আলী (আ.) মহানবী (সা.)-এর উদ্দেশে যে হৃদয়বিদারক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন, তাতে তাঁর গভীর শোক, ভালোবাসা, ধৈর্য এবং তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহের বেদনাময় চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছিলেন—“হে রাসূলুল্লাহ! আমার পক্ষ থেকে এবং আপনার সেই কন্যার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি সালাম, যিনি আপনার সান্নিধ্যে গমন করেছেন এবং আপনার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।
হে রাসূলুল্লাহ! আপনার অতি প্রিয় কন্যার বিচ্ছেদে আমার ধৈর্যশক্তি হ্রাস পেয়েছে এবং তাঁর শোকে আমার সহ্যক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে আপনার মহাপ্রয়াণ ও আপনাকে হারানোর মতো বিরাট মুসিবতে আমি যে ধৈর্যধারণ করতে পেরেছিলাম, তার মধ্যেই আমার সান্ত্বনা নিহিত রয়েছে।
আমি নিজ হাতে আপনাকে কবরে শায়িত করেছিলাম। আর আমার গ্রীবা ও বক্ষদেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থানকালেই আপনার পবিত্র আত্মা দেহত্যাগ করেছিল। নিশ্চয়ই আমরা মহান আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করব।
আজ আমার কাছে গচ্ছিত আমানত ফিরিয়ে নেওয়া হলো এবং আমাকে যা প্রদান করা হয়েছিল, তা পুনরায় প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো। এখন থেকে আমার দুঃখ ও শোক স্থায়ী হয়ে গেল। আমার রাতগুলো কাটবে নিদ্রাহীনতা ও নিরন্তর জাগরণের মধ্য দিয়ে, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ আমাকে সেই আবাসের জন্য মনোনীত করেন, যেখানে আপনি অবস্থান করছেন।
হে রাসূলুল্লাহ! অচিরেই আপনার কন্যা আপনাকে অবহিত করবেন, আপনার উম্মত তাঁর ওপর কী ধরনের অত্যাচার ও অবিচার করেছে। অতএব, আপনি তাঁর কাছে বিস্তারিতভাবে সবকিছু জিজ্ঞাসা করুন এবং তাঁর কাছ থেকেই প্রকৃত অবস্থা জেনে নিন।
আপনার ইন্তেকালের পর খুব বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার আগেই এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। আপনার পবিত্র স্মৃতি এখনো মানুষের হৃদয়ে অম্লান রয়েছে।
আপনাদের উভয়ের প্রতি আমার সালাম। এ সালাম একজন বিদায় গ্রহণকারীর; তবে তা কোনো বিরক্ত, অসন্তুষ্ট কিংবা সম্পর্কচ্ছেদকারীর বিদায়ী সালাম নয়।
আমি যদি এখান থেকে ফিরে যাই, তবে তা এ কারণে নয় যে, আমি আপনাদের স্মরণে ক্লান্ত বা বিরক্ত হয়ে পড়েছি। আর যদি এখানে অবস্থান করি, তবে তা এ কারণে নয় যে, মহান আল্লাহ তাঁর ধৈর্যশীল বান্দাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার প্রতি আমার আস্থা ও বিশ্বাসে কোনো ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।” (সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা নং ২০২ থেকে নির্বাচিত অংশ।)