হযরত যয়নব (সা.আ.) ও ইমাম সাজ্জাদের (আ.) অনন্য বীরত্বে ইয়াযীদের আতঙ্ক

কারবালার অসম যুদ্ধে অশেষ বীরত্ব ও বিক্রম দেখিয়ে এবং ইয়াযীদের বহু সেনাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে শহীদ হয়েছিলেন হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) সহ ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা ৭২ জন মহামানব। তাঁদের কেউ ছিলেন ইমামের যুবকপুত্র, শিশুপুত্র, সৎভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, চাচাতো ভাই এবং অন্যরা ছিলেন প্রাণ উৎসর্গ করতে আসা নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গী।
ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদতের পর তাঁর বোন হযরত যয়নব (আ.) ইমামের একমাত্র জীবিত ও অসুস্থ পুত্র হযরত যয়নুল আবেদীনের (আ.) জীবন রক্ষা করেন। অবশ্য এ জন্যে তিনি শত্রুদের কাছে দয়া ভিক্ষা করেননি। ভাতিজাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি জল্লাদকে বলেছিলেন, আমার ভাতিজাকে হত্যা করতে হলে আমাকেও হত্যা করতে হবে। এভাবে তিনি একজন নিষ্পাপ ইমামের জীবন রক্ষা করেন। দামেস্কেও এই মহান ইমামকে হত্যার চেষ্টা অলৌকিকভাবে ব্যর্থ হয় বলে বর্ণনা রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে, কারবালায় যয়নুল আবেদীনের শিশু সন্তান ইমাম বাকিরও (আ.) উপস্থিত ছিলেন এবং হত্যাযজ্ঞের পর তিনিও বেঁচে গিয়েছিলেন। নবী বংশের কয়েকজন নারী সদস্যও বেঁচে গিয়েছিলেন কারবালার হত্যাযজ্ঞের পর।
মহাপাপিষ্ঠ ও নরাধম ইয়াযীদের দরবারে আনিত হলে তার বেয়াদবিপূর্ণ নানা কথা ও বিদ্রুপের জবাবে হযরত যয়নব (আ.) এক দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। তেজোদীপ্ত সেই ভাষণের একাংশে তিনি বলেছিলেন: “আমাদের শাসন-কর্তৃত্ব (তোমার হাতে পড়ায়) তুমি মহিমান্বিত আল্লাহর সেই বাণী ভুলে গিয়েছ: “কাফেররা যেন মনে না করে যে, আমরা তাদের যে অবকাশ দান করি তা নিজেদের জন্যে কল্যাণকর। বরং আমরা তো তাদেরকে এ জন্যেই অবকাশ দেই যাতে তাদের পাপগুলো বাড়তে থাকে এবং তাদের জন্যে অপমানজনক শাস্তি অবধারিত।”
তিনি ইয়াযীদকে “হে সেই ব্যক্তির পুত্র যাকে বন্দী করার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছিল” বলেও সম্বোধন করেছিলেন! (কারণ, মুয়াবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান মক্কা বিজয়ের সময় মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়ায় তাকে মুক্তি দেয়া হয়।)
হযরত যয়নব (সা.) তাঁর ঐতিহাসিক সেই ভাষণে পবিত্র নবী বংশের, বিশেষ করে ইমাম হুসাইনের (আ.) মর্যাদা তুলে ধরার পাশাপাশি ইয়াযীদ বাহিনীর জুলুম ও নৃশংসতাও তুলে ধরেছিলেন।
তিনি ইমাম হুসাইনের (আ.) সঙ্গে ইয়াযীদের নানা বেয়াদবি এবং নবী বংশের ওপর তার বাহিনীর নৃশংস জুলুম-নির্যাতন চালানোসহ হত্যাযজ্ঞের জন্যে তাকে খোদায়ী কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে বলেও উল্লেখ করেন। হযরত যয়নব (আ.) এক পর্যায়ে ইয়াযীদের দরবারেই তাকে বলেন, “যদিও ঘটনাচক্রে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু আমি তোমাকে খুবই তুচ্ছ ও নীচ জ্ঞান করি এবং তোমাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করছি ও অনেক বেশি নিন্দা করছি, কিন্তু (আমার ভাইয়ের হত্যার কারণে মুসলমানদের) দৃষ্টিগুলো অশ্রুসজল আর হৃদয়গুলো কাবাবের মত দগ্ধীভূত।”
বিশ্বনবীর (সা.) আহলে বাইতের প্রতি উম্মতের ভালোবাসা ও তাঁদের স্মরণ যে, ইয়াযীদ গোষ্ঠী কখনও বিলুপ্ত করতে পারবে না এবং আহলে বাইতের মর্যাদার ধারে-কাছেও যে, পৌঁছতে পারবে না ইয়াযীদ গোষ্ঠী, তিনি তাও ভবিষ্যদ্বাণী করেন। জালিমদের ওপর যে আল্লাহর লানত বর্ষিত হবে এবং ইহকালে তাদের পতন ও চরম লাঞ্ছনা এবং পরকালেও আরো কঠোর শাস্তি অপেক্ষা করছে, হযরত যয়নব (আ.) তাও উল্লেখ করেন ওই ভাষণে।
তাঁর সেইসব অবিস্মরণীয় ভাষণ ও বক্তব্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচারিত হয়ে দামেস্ক ও কুফাসহ মুসলিম বিশ্বের জনগণের মধ্যে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিল। গোটা আরব উপদ্বীপের চার লাখ মানুষ হুসাইন (আ.) হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে অভ্যুত্থান করে। ফলে কুফায় মুখতারের নেতৃত্বে, নবী বংশের অবমাননাকারী ও ঘাতকরা লাঞ্ছনাপূর্ণ মৃত্যুদন্ডের মাধ্যমে নির্মূল হয়। আর এ জন্যেই নবী-নাতনী হযরত যয়নবকে (আ.) কারবালা বিপ্লবের অন্যতম সফল সংগঠক ও প্রধান পরিচালক বলা যায়। তাঁর বিপ্লবী তৎপরতা ও উপস্থিতি না থাকলে কারবালাতেই এ বিপ্লবের চিরসমাধি রচিত হত এবং বাইরের কেউই এ বিপ্লব ও মহাট্র্যাজেডির খবরও হয়তো জানত না।
গণ-বিদ্রোহের আশঙ্কায় ইবনে যিয়াদের আতঙ্ক: ইবনে যিয়াদ নবীর (সা.) পরিবারের অবমাননার উদ্দেশ্যে কুফা শহরের রাস্তায় রাস্তায় বন্দীদেরকে ঘুরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে উদ্যত হলে আবারও স্বমহিমায় আত্মপ্রকাশ করেন নবী-নাতনী। তাঁর বাগ্মীতাপূর্ণ ও বিবেক জাগানো এবং হৃদয় বিদারক বক্তব্য শুনে কুফার জনগণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। ফলে ইবনে যিয়াদ গণ-বিদ্রোহের আশঙ্কায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সে বন্দীদের কাফেলাকে দ্রুত দামেস্কে পাঠানোর নির্দেশ দেয় এবং এমন সব পথ দিয়ে তাদেরকে নিয়ে যেতে বলে যাতে জনগণ নবী-পরিবারের দুর্দশার কথা জানতে পেরে ইয়াযীদ সরকারের প্রতি গণ-বিদ্রোহ বা গণ-বিক্ষোভ শুরু করার সুযোগ না পায়।
হযরত ইমাম যয়নুল আবেদীনের বীরত্বপূর্ণ ভাষণ: ইবনে যিয়াদ ও ইয়াযীদের দরবারে তেজোদীপ্ত বক্তব্য রেখেছিলেন হযরত যয়নব (আ.)। একই ধরনের বক্তব্য রেখেছিলেন হযরত ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ)। কুফায় ফুফু যয়নব (সা.) ও বোন ফাতিমার ভাষণ শুনে জনগণ যখন মর্মাহত হয়ে কাঁদতে থাকে তখন তাদের সমাবেশে এই ইমামও বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “হে লোক সকল! আমি আলী, হুসাইন ইবনে আলীর (আ.) সন্তান। আমি তাঁর সন্তান যার সব কিছু লুট করা হয়েছে, পরিবারের সবাইকে বন্দী করে এখানে আনা হয়েছে। আমি তাঁর সন্তান, যে ফোরাতের কিনারায় মর্মান্তিক ও নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন। হে লোকেরা! তোমরা কিয়ামতের দিন কিভাবে নবীর (সা.) সামনে দাঁড়াবে যখন তিনি তোমাদের বলবেন, “তোমরা আমার পরিবারবর্গকে এভাবে কতল করেছ আর আমার মর্যাদাও অক্ষুন্ন রাখনি, তাই তোমরা আমার উম্মত নও?”
তাঁর (ইমাম সাজ্জাদ – আ.) এ বক্তব্য শুনে কুফাবাসী চিৎকারধ্বনি দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং একে-অপরকে তিরস্কার করে বলতে থাকে: “আমরা এতই দুর্ভাগা যে, নিজেরা যে ধ্বংস হয়ে গেছি সেটাও জানি না!”
মৃত্যুভয়হীন যুবক ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.): ইবনে যিয়াদ হযরত ইমাম যয়নুলকে (আ.) হত্যার নির্দেশ দিলে ফুফু যয়নব বলেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে আমাকেও হত্যা কর!
ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) বললেন, “আপনি ওর সঙ্গে কথা বলবেন না; বরং আমিই ওর সঙ্গে কথা বলছি।” অতঃপর তিনি ইবনে যিয়াদের দিকে তাকিয়ে বললেন: “ওহে যিয়াদের ছেলে! আমাকে হত্যার ভয় দেখাচ্ছ? তুমি কি জান না শহীদ হওয়া আমাদের প্রথা ও শাহাদতবরণ আমাদের মর্যাদা …?”
ইয়াযীদের দরবারে ইমামের ভাষণ: সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের অলিগলি দিয়ে ইমাম ও তাঁর পরিবারের কয়েকজনকে একই দড়িতে বেঁধে ইয়াযীদের দরবারে আনা হয়। এ সময় ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) বীরত্বের সঙ্গে ইয়াযীদের দিকে তাকিয়ে বলেন: “হে ইয়াযীদ! আল্লাহর রাসুলের (সা.) ব্যাপারে কী চিন্তা করেছ, যদি তিনি এভাবে আমাদেরকে দড়ি বাঁধা অবস্থায় দেখেন?” ইমামের এ কথা শুনে উপস্থিত সবার মধ্যে কান্নার রোল ওঠে।
সিরিয়ায় ইয়াযিদী প্রচারণায় বিভ্রান্ত এক বয়স্ক ব্যক্তি নবী পরিবারের বন্দীদের কাছে এসে বলল: “আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যে, তিনি তোমাদেরকে ধ্বংস করে ফিতনা নিভিয়ে দিয়েছেন।” সে আরো কিছু আজেবাজে কথা বলল। তখন ইমাম (যয়নুল আবেদীন -আ.-) তাকে বললেন: “তুমি কি কুরআন পড়েছ?” সে বলল: “পড়েছি।” ইমাম বললেন: “এ আয়াতটি পড়েছ কি যেখানে এসেছে- বল হে রাসুল! আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না (ইসলাম প্রচারের বিনিময়ে), শুধু এটা চাই যে, তোমরা আমার পরিবারকে ভালোবাসবে? (সূরা: আশ্ শুরা, ২৩তম আয়াত।) “হ্যাঁ, পড়েছি।
রাসুলের আহলে বাইত (নবী-পরিবার) যে, নিষ্পাপ তার প্রমাণ হিসেবে তিনি সূরা আহযাবের ৩৩তম আয়াতও তাকে শোনান।
এভাবে তিনি নবী-পরিবারের সম্মান ও অধিকারের দলিল হিসেবে নাযেল হওয়া আরো কয়েকটি আয়াতের কথা তুলে ধরলে ওই বয়স্ক লোকটি আকাশের দিকে হাত উঁচু করে তিনবার বলেন: “হে আল্লাহ! আমি তওবা করছি, আর তাঁদের হত্যা করাতে আমি অসন্তুষ্ট। আমি এর আগেও কুরআন পড়েছিলাম, কিন্তু এইসব সত্য জানতাম না।”
সিরিয়ার জামে মসজিদে ইমামের (আ.) ভাষণ: মুয়াবিয়ার আমল থেকেই সিরিয়ার মসজিদে নবী-বংশ ও হযরত আলীকে (আ.) গালিগালাজ করা হত। কারবালার ঘটনার পর একদিন এই মসজিদে হযরত আলী (আ.) ও ইমাম হুসাইনকে (আ.) উদ্দেশ্য করে অপমানজনক বক্তব্য দেয় বেতনভোগী খতিব। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.)। তিনি খতিবকে বলেন: “খতিব! তুমি ইয়াযীদকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে দোযখে তোমার নিজের জন্যে স্থান করে নিয়েছ।” অতঃপর তিনি ইয়াযীদের দিকে ফিরে বলেন, “আমাকেও মিম্বরে উঠতে দাও, কিছু কথা বলব যাতে আল্লাহ খুশি হবেন এবং উপস্থিত লোকদেরও সওয়াব হবে।” উপস্থিত লোকদের চাপের মুখে ইয়াযীদ অনিচ্ছা সত্তে ও রাজি হয়। (ইয়াযীদ লোকদের উদ্দেশ্যে বলছিল যে, ইনি এমন এক বংশের লোক যারা ছোটবেলায় মায়ের দুধ পানের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানও অর্জন করতে থাকেন।)
ইমাম (আ.) মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসাসূচক কিছু বলার পর বলেছিলেন: “হে জনতা! আল্লাহ আমাদের ছয়টি গুণ ও সাতটি মর্যাদা দিয়েছেন। জ্ঞান, সহনশীলতা, উদারতা, বাগ্মিতা, সাহস ও বিশ্বাসীদের অন্তরে আমাদের প্রতি ভালোবাসা। আমাদের মর্যাদাগুলো হল রাসুল (সা.), আল্লাহর সিংহ ও সত্যবাদী আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.), বেহেশ্তে দুই পাখার অধিকারী হযরত জাফর তাইয়্যার (রা.), শহীদদের সর্দার হযরত হামযাহ (রা.), রাসুলের (সা.) দুই নাতী হযরত হাসান ও হুসাইন (আ.) আমাদেরই থেকে এবং আমরাও তাঁদেরই থেকে। যারা আমাকে জানে তারা তো জানেই, যারা জানে না তাদেরকে আমার বংশপরিচয় জানাচ্ছি: হে জনতা! আমি মক্কা ও মিনার সন্তান, আমি যমযম ও সাফা’র সন্তান। আমি তাঁর সন্তান যিনি হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) তুলেছিলেন তাঁর কম্বলের প্রান্ত ধরে, আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যিনি কাবা তাওয়াফ করেছেন ও সাঈ করেছেন (সাফা-মারওয়ার মাঝে) তথা হজ্ব করেছেন। আমি এমন এক ব্যক্তির সন্তান যাকে এক রাতেই মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল (রাসুলের মেরাজের প্রতি ইঙ্গিত)। আমি হুসাইনের সন্তান যাকে কারবালায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, আমি আলীর সন্তান যিনি মুর্তাজা (অনুমোদনপ্রাপ্ত), আমি মুহাম্মদের সন্তান যিনি বাছাইকৃত, আমি ফাতিমাতুয্ যাহরার সন্তান, আমি সিদরাতুল মুন্তাহার সন্তান, আমি শাজারাতুল মুবারাকাহ্ বা বরকতময় গাছের সন্তান, হযরত খাদিজার (সা.) সন্তান আমি, আমি এমন একজনের সন্তান যিনি তার নিজের রক্তে ডুবে গেছেন, আমি এমন একজনের সন্তান যার শোকে রাতের আঁধারে জিনেরা বিলাপ করেছিল, আমি এমন একজনের সন্তান যার জন্যে শোক প্রকাশ করেছিল পাখিরা।”
ইমামের খুতবা এ পর্যন্ত পৌঁছলে উদ্বেলিত জনতা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল ও বিলাপ শুরু করল। ফলে ইয়াযীদ আশঙ্কা করল যে, গণ-বিদ্রোহ শুরু হতে পারে। তাই সে মুয়াজ্জিনকে আযান দেয়ার নির্দেশ দিল। ইমাম (আ.) আজানের প্রতিটি বাক্যের জবাবে আল্লাহর প্রশংসাসূচক বাক্য বলছিলেন। যখন মুয়াজ্জিন বলল, “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ;” অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, তখন ইমাম (আ.) মাথা থেকে পাগড়ী নামিয়ে মুয়াজ্জিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি এই মুহাম্মদের নামে অনুরোধ করছি, এক মুহূর্ত নীরব থাক!” এরপর তিনি ইয়াযীদের দিকে তাকিয়ে বললেন: “এই সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ রাসুল কি আমার প্রপিতামহ না তোমার? যদি বল, তোমার তাহলে গোটা পৃথিবী জানে যে, তুমি মিথ্যা বলছ; আর যদি বল, আমার তাহলে কেন তুমি আমার বাবাকে জুলুমের মাধ্যমে হত্যা করেছ, তাঁর মালপত্র লুট করেছ ও তাঁর নারী-স্বজনদের বন্দী করেছ?” একথা বলে ইমাম (আ.) নিজের জামার কলার ছিঁড়ে ফেলে কাঁদলেন। এরপর বললেন, “আল্লাহর কসম! এ পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই যার প্রপিতামহ হলেন রাসুলুল্লাহ (সা.); তাহলে কেন এ লোকগুলো আমার পিতাকে জুলুমের মাধ্যমে হত্যা করেছে এবং আমাদেরকে রোমানদের মত বন্দী করেছে …? অভিশাপ তোমার ওপর যেদিন আমার প্রপিতামহ ও পিতা তোমার ওপর ক্রুদ্ধ হবেন!”
গণ-বিদ্রোহের আশঙ্কায় দিশেহারা ও আতঙ্কিত ইয়াযীদ: অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াযীদ নামায শুরু করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ জনতার অনেকেই মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান। পরিস্থিতির চাপে পড়ে ইয়াযীদ নিজেও ভোল পাল্টে ইমাম হুসাইন (আ.) ও নবী-পরিবারের সদস্যদের হত্যার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে এবং এর দায়ভার ইবনে যিয়াদের ওপর চাপিয়ে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে।
ইয়াযীদকে হত্যার পরিকল্পনা: ইয়াযীদ ইমাম হুসাইনের (আ.) বোন হযরত যয়নবের (আ.) অনুরোধে কারবালার শহীদদের জন্যে শোকানুষ্ঠান পালনের অনুমতি দেয়। সাত দিন ধরে শোক সমাবেশ হয়। বিপুল সংখ্যক সিরীয় নারী শোকানুষ্ঠানে যোগ দেয়। সিরীয় পুরুষদের অনেকেই সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা ঝড়ের গতিতে ইয়াযীদের প্রাসাদে ঢুকে তাকে হত্যা করবে। ইয়াযীদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মারওয়ান এ পরিকল্পনার কথা জেনে ফেলে। সে ইয়াযীদকে পরামর্শ দেয়, হুসাইনের পরিবারকে সিরিয়ায় বেশি দিন রাখা ঠিক হবে না। তাঁদেরকে মদীনায় ফেরত পাঠানো জরুরী। ফলে, ইয়াযীদ নবী-পরিবারকে সফরের রসদপত্র দিয়ে তাঁদেরকে মদীনায় পাঠিয়ে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে কারবালা বিপ্লবের ব্যাপারে ইমাম হুসাইনের (আ.) বোন হযরত যয়নব (আ.) এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ইমামের পুত্র ইমাম যয়নুল আবেদীনের (আ.) বলিষ্ঠ ভাষণ ও সত্য ঘটনা প্রচারের ফলেই জনগণ আসল ঘটনা বুঝতে পারে। ফলে, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই উমাইয়াদের বিরুদ্ধে ইরাকে ও হিজাযে (সৌদী আরব) বিদ্রোহ দেখা দেয়। কুফায় মুখতারের নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার গঠিত হয় এবং এই সরকার ইমাম হুসাইন (আ.) হত্যাকারী ওমর ইবনে সাদ ও শিমারসহ ইয়াযীদ বাহিনীর প্রায় সব ঘাতককে হত্যা করে। অনেক ঘাতক অলৌকিকভাবে কঠোর শাস্তি পেয়েছিল।
৩৪ বছর পর, একই দিনে ইমাম সাজ্জাদের শাহাদত: উল্লেখ্য, কারবালার মহাট্র্যাজেডির ৩৪ বছর পর, ৯৫ হিজরীর এই দিনে (১২ই মর্হরম) ৫৭ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেছিলেন হযরত ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.)। ষষ্ঠ উমাইয়া শাসক ওয়ালীদ ইবনে আব্দিল মালিক বিষপ্রয়োগ করে এই মহান ইমামকে শহীদ করে। ৩৮ হিজরীতে মদীনায় তাঁর জন্ম হয়েছিল। তাঁর মা ছিলেন ইরানী রাজার কন্যা শাহারবানু।
কারবালার ঘটনার পর তিনি যখনই পানি দেখতেন তখনই বাবাসহ কারবালার শহীদদের চরম পিপাসার কথা ভেবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন। কোনো ভেড়া বা দুম্বা জবাই করার দৃশ্য দেখলেও কেঁদে আকুল হতেন। তিনি প্রশ্ন করতেন, এই পশুকে জবাইয়ের আগে পানি পান করানো হয়েছে কিনা? পানি দেয়া হয়েছে একথা শোনার পর তিনি বলতেন, কিন্তু আমার (তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত) বাবাকে পানি না দিয়েই জবাই করেছিল ইয়াযীদ সেনারা। তিনি সব সময় রোযা রাখতেন। ইফতারীর সময় তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতেন: “রাসুলের (সা.) সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত অবস্থায়!”
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) স্বীয় পিতার জন্যে ৩৪ বছর কাঁদেন: তিনি সর্বদাই দিনে রোযা রাখতেন ও রাত জেগে ইবাদত করতেন। রোযা ভাঙ্গার সময় তিনি বাবার ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত অবস্থার কথা উল্লেখ করে এত বেশি কাঁদতেন যে, অশ্রুতে খাবার ভিজে যেত এবং খাবার পানিতেও অশ্রু মিশে যেত। জীবনের শেষ পর্যন্ত এই অবস্থা ছিল তাঁর।
একদিন তাঁর খাদেম তাঁর কান্নারত অবস্থায় তাঁকে বলেন: আপনার দুঃখ ও আহাজারি শেষ হয়নি?
উত্তরে তিনি বলেন: তোমার জন্যে আক্ষেপ! ইয়াকুব (আ.) আল্লাহর একজন নবী ছিলেন। তাঁর ১২ জন সন্তান ছিল। কিন্তু আল্লাহ তাঁর এক পুত্র ইউসুফকে চোখের আড়ালে রাখায় শোকে, দুঃখে ও অতিরিক্ত কান্নায় তিনি প্রায় অন্ধ হয়ে পড়েন, চুল পেকে যায় ও পিঠ বাঁকা হয়ে যায়। সন্তান জীবিত থাকা সত্তে¡ও তাঁর এ অবস্থা হয়েছিল। আর আমি আমার পিতা, ভাই এবং পরিবারের ১৮জন সদস্যকে মাটিতে পড়ে যেতে ও শহীদ হতে দেখেছি; তাই কিভাবে আমার দুঃখ ও অশ্রু থামতে পারে?
গভীর ধার্মিকতা ও আল্লাহর প্রেমে সিজদাপ্রবণ ছিলেন বলে ইমাম যয়নুল আবেদীনকে (আ.) বলা হত ‘সাজ্জাদ’।

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More