ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুসারে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে আল্লাহর রসুল (সা.)স্বীয় জন্মভূমি মক্কা হতে মদিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন এবং এটিকেই হিজরত বলা হয়। তবে তাঁর (সা.) রওয়ানা করার তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। কেউ সফর মাস, কেউ রবিউল আওয়াল মাস প্রভৃতিকে তাঁর সফরের মাস বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এ লেখায় হিজরতের তারিখ নির্ধারণ করা যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য নয় সেহেতু এ বিষয়টিকে এখানেই রেখে দিচ্ছি।
ইসলামের ইতিহাসে হিজরত একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘটনা। হিজরত বলতে আল্লাহর দ্বীন ও ঈমান রক্ষার উদ্দেশ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করাকে বুঝায়। আল্লাহর রসুল (সা.), তাঁর আহলে বাইত (আ.) ও সাহাবায়ে কেরামের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এটি শুধু স্থান পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; বরং এর মাধ্যমে ইসলাম একটি নিরাপদ পরিবেশ লাভ করে, মুসলিম সমাজ সুসংগঠিত হয় এবং ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ পৃথিবীর বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার পথ সুগম হয়। তাই ইসলামের সংরক্ষণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে হিজরতের ভূমিকা অপরিসীম।
অবশ্য, রসুলের (সা.) মদীনা হিজরতের আগে ও পরে এ ধরনের ঘটনা আরও সংঘটিত হয়েছে। যেমন: রসুলের (সা.) সাহাবীদের আবিসিনিয়ায় হিজরত, হযরত ইমাম খোমেইনীর (রহ.) ইরাক, কুয়েত ও ফ্রান্সে হিজরত ইত্যাদি। এসব হিজরতের পেছনে একই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিহিত ছিল।
হিজরতের পটভূমি
মক্কায় ইসলাম প্রচারের সূচনালগ্ন থেকেই আল্লাহর রসুল (সা.), তাঁর আহলে বাইত (আ.) ও সাহাবিদের উপর কাফিরদের নির্যাতন শুরু হয়। মুসলমানদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, তাঁদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হয় এবং ইসলাম গ্রহণের কারণে নানা ধরনের অত্যাচার করা হয়। এতসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা ঈমানের উপর অটল থাকেন।
পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠলে আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানদের মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দেওয়া হয়। একে একে তাঁরা মদিনায় চলে যেতে থাকেন। পরে আল্লাহর রসুল (সা.) হযরত ইমাম আলীকে (আ.) স্বীয় বিছানায় শুইয়ে রেখে এবং হযরত আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা বা হিজরত করেন। এই হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক মহান মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে।
হিজরত ও ঈমান সংরক্ষণ
হিজরতের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ঈমান ও ইসলামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মক্কায় মুসলমানদের স্বাধীনভাবে ইসলামের বিধান পালন ও প্রচার করার সুযোগ ছিল না। হিজরতের মাধ্যমে তারা এমন একটি সমাজে পৌঁছান যেখানে ইসলামের আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এ থেকে বুঝা যায়, একজন মুমিনের কাছে ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি পার্থিব সম্পদ, ঘরবাড়ি ও স্বজনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ ত্যাগ করেও ঈমানকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁদের এই আত্মত্যাগ ইসলামের সংরক্ষণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠে।
মদিনায় ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা
হিজরতের পর মদিনায় আল্লাহর রসুল (সা.) একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করা হয়। মসজিদকে কেন্দ্র করে ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। ইসলামের বিধান বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
মদিনার সমাজে ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহযোগিতা, মানবিক মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম হিসেবে নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে মানুষের সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলামের প্রচার ও সংরক্ষণে হিজরতের ভূমিকা
হিজরতের পূর্বে ইসলাম মূলত মক্কা ও তার আশপাশের অঞ্চলে কঠিন প্রতিকূলতার মধ্যে প্রচারিত হচ্ছিল। মদিনায় এসে ইসলামের জন্য একটি শক্তিশালী ও নিরাপদ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এখান থেকেই আল্লাহর রসুল (সা.) বিভিন্ন গোত্র ও অঞ্চলের মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন।
মদিনার মুসলিম সমাজ সুসংগঠিত হওয়ার ফলে ইসলামের শিক্ষা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে ইসলাম আরব উপদ্বীপের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়। এভাবে হিজরত ইসলামের ব্যাপক বিস্তারের পথ উন্মুক্ত করে।
আধুনিককালে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের’ রূপকার হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.), ইরানে প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত পাহলাভী রাজবংশের তৎকালীন শাসক ‘মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলাভীকে’ দেশের প্রশাসনিক অবকাঠামোতে ‘ইসলামী আইন’ প্রয়োগ করার আহ্বান জানালে শুরু হয় ইমাম খোমেইনীর (রহ.) উপর অমানুষিক অত্যাচার এবং তাঁকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়েও স্বীয় ঈমানী দায়িত্ব-কর্তব্য অব্যাহত রাখেন এবং বহু শহীদের রক্তের বিনিময়ে এক পর্যায়ে ইরানে ‘ইসলামী হুকুমত’ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। আর আজ বিশ্বরাজনীতিসহ মুসলিম দেশগুলোর ভাগ্য পরিবর্তন ও নির্ধারণে ইরানের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কারও নিকট বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এসব সম্ভব হয়েছে একমাত্র তাঁর হিজরতের ফলে।
ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ সংরক্ষণ
হিজরতের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে সাহাবায়ে কেরাম সরাসরি আল্লাহর রসুলের (সা.) নিকট থেকে ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন এবং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারেন। তাঁরা কুরআনের আয়াত মুখস্থ করতেন, রসুলের (সা.) কথা ও কাজ সংরক্ষণ করতেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের নিকট তা পৌঁছে দিতেন।
সাহাবিদের ত্যাগ, সততা ও আমানতদারির মাধ্যমে ইসলামের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌঁছে। কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা সংরক্ষণে তাঁদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। তাই হিজরতকে ইসলামী জ্ঞান ও আদর্শের সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বলা যায়।
হিজরত থেকে আমাদের শিক্ষা
হিজরত শুধু ইতিহাসের একটি ঘটনা নয়; বরং এর মধ্যে মুসলমানদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। প্রথমত, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। দ্বিতীয়ত, বিপদের সময় ঈমানের উপর দৃঢ় থাকতে হয়। তৃতীয়ত, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হলে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার মানসিকতা রাখতে হয়।
বর্তমান যুগে আমাদের জন্য হিজরতের শিক্ষা হলো অন্যায়, পাপ ও অনৈতিকতা থেকে দূরে সরে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ফিরে আসা। অর্থাৎ হিজরতের একটি আধ্যাত্মিক দিকও রয়েছে। নিজের জীবন থেকে গুনাহ ও অসৎ কাজ পরিত্যাগ করে আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলাও হিজরতের শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
উপসংহার
হিজরত ইসলামের ইতিহাসের একটি অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে মুসলমানরা নির্যাতন ও প্রতিকূলতার পরিবেশ থেকে নিরাপদ আশ্রয় লাভ করে এবং ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়। হিজরত ঈমান সংরক্ষণ, ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়ন, মুসলিম সমাজের ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামের প্রচার ও বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আল্লাহর রসুল (সা.), তাঁর আহলে বাইত (আ.) এবং সাহাবায়ে কেরামের হিজরত ও আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্য ও ঈমানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা কখনও বৃথা যায় না। তাই ইসলামের সংরক্ষণ ও মর্যাদা রক্ষায় আমাদেরও কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ, ঈমানকে দৃঢ় রাখা এবং ইসলামী আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। হিজরতের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুক -এটাই প্রত্যাশা।