ইসলামে আত্মশুদ্ধির কর্মপন্থা
ড. এম আব্দুল কুদ্দুস বাদশা
মহান আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন: “তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমতের শিক্ষা দেবে, যদিও তারা এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিপতিত ছিল।” (জুমআহ্: ২) এই আয়াতে কারিমায় রাসুলুল্লাহ্ (সা.) এর প্রধান তিনটি দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যার মধ্যে দ্বিতীয়টি হচ্ছে মানুষদেরকে “পরিশুদ্ধ ও পবিত্র” করা।
মানুষ মাটির তৈরি বটে। কিন্তু পথভ্রষ্ট পাপী মানুষ কখনো কখনো পাথরের চাইতেও কঠিন হয়ে যায়। পাথর তবুও নরম হয়, তার বুক ফেটে প্রবাহিত হয় নির্ঝরিণী। কিন্তু পাপে কলুষিত মানুষ পাথরকেও হার মানায়। এরকম মানুষের সংশোধন ও পরিশুদ্ধি অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “এরপরও তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেল, যেন পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন। অথচ কোনো কোনো পাথর তো এমন যা থেকে নহর প্রবাহিত হয়, আর কিছু এরূপ যে, বিদীর্ণ হওয়ার পর তা হতে পানি নির্গত হয়, আবার কিছু এমন যা আল্লাহর ভয়ে ধ্বসে পড়ে..’ (বাকারা: ৭৪) এই আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, পাথর কঠিন ও শক্ত হওয়া সত্ত্বেও তা থেকে উপকার পাওয়া যায়, তার মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং এক প্রকার চেতনা ও অনুভূতি শক্তি তার মধ্যেও বিদ্যমান থাকে। কিন্তু আয়াতে আল্লাহ্ ইহুদীদেরকে বলছেন, বিগত মুজিযাসমূহ এবং মৃতকে পুনরায় জীবিত করার মতো জলজ্যান্ত ঘটনা দেখার পরও তোমাদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনের উৎসাহ এবং তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার আগ্রহ সৃষ্টি না হয়ে উলটো তোমাদের হৃদয় পাথরের মত কঠিন বরং তার চেয়েও শক্ত হয়ে গেল! আর হৃদয় কঠিন হয়ে যাওয়া ব্যক্তি ও উম্মতের জন্য বড়ই ক্ষতিকর। অন্তর কঠিন হওয়া এই কথারই নিদর্শন যে, সেই অন্তর থেকে প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার যোগ্যতা এবং সত্যকে গ্রহণ করার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেছে। এরপর তার সংশোধনের আশা কম, বরং সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ারই আশঙ্কা বেশী থাকে।
একারণে মহানবী (সা.) এর অন্যতম দায়িত্ব ‘মুসলমানরেক পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করা’। বুঝা যাচ্ছে মু’মিনের আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব কত বেশি। পয়গাম্বর (সা.) সেই কঠিন কাজটি সাধন করার জন্য এসেছেন। তাই তিনি কীভাবে মানুষদের আত্মশুদ্ধির পথ বাৎলে দিয়েছেন তা জানা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। এই প্রবন্ধে আমরা সংক্ষেপে সেই বিষয়টিই আলোচনা করবো।
মানুষের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ তথা নিজেকে নজরদারীর অধীনে রাখার পন্থাটি সম্পূর্ণরূপে “আত্ম-প্রশিক্ষণ” তথা তরবিয়তের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। নিজের উপর নজরদারী বলতে বোঝায় যে, একজন ব্যক্তি স্বীকৃত নিয়ম-কানুনের প্রতি লক্ষ্য রেখে তার সজাগতা ও পূর্ণ সতর্কতার মাধ্যমে চেষ্টা করবে যাতে নৈতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণ তার জীবনের ত্রিসীমায় প্রবেশ না করে এবং তার নৈতিক গুণগুলোকে যেন বিনষ্ট করে না দেয়। আত্মশুদ্ধি ও আত্ম-গঠন হচ্ছে মানুষের নিজের সাথে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, যা ইসলামী টেক্সটগুলিতে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। আমিরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আ.) মালিক আশতারকে লেখা পত্রে লিখেছেন: “আমি এই অঙ্গীকারনামায় তোমাকে যা নির্দেশ দিয়েছি তা অনুসরণ করার ব্যাপারে তুমি নিজের নফ্সের সাথে জিহাদ কর। এই অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে আমি তোমার উপর আমার হুজ্জাত পূর্ণ করলাম, যাতে তোমার নফ্স্ যখন কামনা-বাসনার দিকে দ্রুত ধাবিত হবে, তখন তোমার কোনো অজুহাত না থাকে” (নাহজুল বালাগা, পত্র ৫৩)। এছাড়াও ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি শাহাদাতের সময় তাঁর সন্তানবর্গ ও শিয়াদের উদ্দেশে এই বলে উপদেশ দিয়েছেন: “আল্লাহর কসম, আল্লাহকে ভয় কর, নিজের নফ্সের সাথে জিহাদ করো। কারণ, নফ্সই তোমাদের সবচেয়ে ঘোর শত্র। যেমনটা মহান আল্লাহ বলেছেন: “নিশ্চয়ই “নফ্সে আম্মারা” সর্বদা মন্দের আদেশ দেয়, সেই ব্যক্তি ছাড়া যাকে আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও দয়া করেন।” এবং নিশ্চিতভাবে সমস্ত পাপের গোড়া হলো নফ্সানি কামনা-বাসনার প্রতি সাড়া দেওয়া। (নূরী, মুস্তাদরাকুল ওয়াসায়িল, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৭০)
ইসলামে তরবিয়তের পদ্ধতি
ইসলামের নৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোয় আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের জন্য বিভিন্ন কর্মপন্থা নির্দেশ করা হয়েছে। এখানে সেগুলোর মধ্যে থেকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ৩টি কর্মপন্থার বিবরণ তুলে ধরা হলো:
এক. ইয়াকজা (জাগরণ) ও তাওবা
এই পর্যায়ে মানুষ গাফিলতির ঘুম থেকে জাগ্রত হয় এবং নিজের দিকে দৃষ্টিপাত করে। সাধারণত সে তার আমলনামাকে নৈতিক দোষ-ত্রুটির পঙ্কিলতা দ্বারা কলুষিত দেখতে পায়। যদি এই দোষগুলি অপসারিত না হয়, তবে অন্যায় ও পাপ করার জন্য সে আরও বেশি প্রস্তুতি অর্জন করবে। তাই অতীতের ভুলের জন্য তাওবা করা উচিত। কারণ তাওবা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের পূর্বশর্ত ও ভূমিকা। ইমাম আলী (আ.) বলেছেন: “নিজের নফসের সাথে জিহাদে অবতীর্ণ হও এবং তাওবাকে অগ্রাধিকার দাও যাতে তোমার প্রতিপালকের আনুগত্যের মকামে পৌঁছতে পার”। (আখলাকে ইসলামী: আজারবাইজানি ও দাইলামি, পৃষ্ঠা ২২৬) তাওবা বলতে বোঝায় অনুশোচনা ও অনুতাপের সাথে ভুল পথ ও গর্হিত কাজ থেকে প্রত্যাবর্তন, যা পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধি অর্জনকে সম্ভব করে তোলে। তাই নিজের তরবিয়ত শুরু করার জন্য তাওবা প্রয়োজন যাতে মানবিক মর্যাদার সেই অনুভূতি ফিরে আসে। ইমাম আলী (আ.) বলেন: “তাওবা হৃদয়কে পবিত্র করে এবং পাপকে ধুয়ে ফেলে।” (গুরারুল হিকাম, পৃষ্ঠা ১৯৫) মানুষ যাতে তাওবায় আগ্রহী হয় এজন্য তাকে সেই আয়াতগুলি পাঠ করা উচিত যা মানুষকে তাওবার দিকে আহ্বান করে এবং তার জানা উচিত যে মহান আল্লাহ্র ক্ষমা ও রহমতের পরিধি অত্যন্ত সুবিস্তৃত। তাওবার পর আত্মনিয়ন্ত্রণ শুরু করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া ও নিজের সাথে শর্তারোপ করা আবশ্যক।
দুই. মুশারাতাহ্ (পরষ্পর শর্তারোপ)
মুশারাতাহ হলো এই যে, মানুষ নিজের সঙ্গে এই মর্মে অঙ্গীকার ও চুক্তি করে যে, নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে কোনোভাবেই শৈথিল্য দেখাবে না এবং মহান আল্লাহ্র নির্দেশ লঙ্ঘন করবে না। অনুরূপভাবে সে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় যে, সৎকর্মে সচেষ্ট থাকবে এবং অসৎকর্ম থেকে দূরে থাকবে। এই অঙ্গীকার ও চুক্তি তখনই কার্যকর হয় যখন প্রতিদিন তা নবায়ন করা হয়, যতক্ষণ না তা মানুষের অন্তরে ও আত্মায় নিত্যস্বভাব হিসেবে গেঁথে যায়। মুশারাতাহ্র জন্য সর্বোত্তম সময় হলো ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর, যখন মানুষের হৃদয় অধিকতর পবিত্র ও সত্য গ্রহণে অধিকতর উর্বর থাকে।
হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন: “মুশারাতাহ্ হলো এই যে, দিনের শুরুতে উদাহরণস্বরূপ নিজের সঙ্গে শর্ত করে যে, আজ সে মহান আল্লাহ্র হুকুমের বিরুদ্ধে আচরণ করবে না এবং এই বিষয়ে সে নিজের সিদ্ধান্ত স্থির করে ফেলে। আর এটা স্পষ্ট যে, একদিন বিরুদ্ধাচরণ না করা অত্যন্ত সহজ বিষয় এবং মানুষ সহজেই তা সম্পাদন করতে পারে। তুমি সংকল্প গ্রহণ কর, শর্ত আরোপ করো এবং পরীক্ষা করে দেখো কত সহজ। এমন হতে পারে যে শয়তান ও তার সৈন্যদল ‘মাউন’ তোমার কাছে এই বিষয়টিকে বিশাল করে দেখাবে, কিন্তু এটা হবে সেই অভিশপ্তের ধোঁকাসমূহের একটি। তাকে বাস্তবিকভাবে ও অন্তর থেকে অভিশাপ দাও এবং মিথ্যা কল্পনাসমূহ হৃদয় থেকে বের করে দাও এবং একদিন পরীক্ষা কর, তখন তুমি সত্যতা স্বীকার করবে।” (চেহেল হাদীস: ইমাম খোমেইনী, পৃষ্ঠা ৮)
এই মুশারতাহ চোখ, কান, লজ্জাস্থান, হাত ও পা-এর সঙ্গে হতে পারে। এ প্রসঙ্গে মোল্লা মাহ্দী নারাকী একটি সুন্দর উপমা দিয়েছেন: “জেনে রাখো, আক্ল হচ্ছে আখিরাতের পথে একজন ব্যবসায়ীর মতো, যার পুঁজি হলো আয়ুষ্কাল তথা জীবন। নফ্্সের সহায়তায় সে তা কাজে লাগায়। অতএব নফ্্স, আক্লের ব্যবসায়িক পার্টনারের মতো, যে তার সম্পদে ব্যবসা করে এবং এই ব্যবসার লাভ হলো উত্তম চরিত্র ও সৎকর্ম অর্জন, যা মানুষকে চিরস্থায়ী সুখ ও নেয়ামতের দিকে পরিচালিত করে। ক্ষতি তখনই হয় যখন তার থেকে পাপ ও ভুল-ত্রুটি সংঘটিত হয়, যা পরিণামে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিতে নিপতিত করে… এবং এই ব্যবসার মেয়াদকাল হলো জীবন যতটা দীর্ঘ। যেমনভাবে ব্যবসায়ী প্রথমে তার পার্টনারের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও অঙ্গীকার করে এবং তারপর সব সময় তাকে সতর্ক প্রহরায় রাখে এবং শেষে তার সাথে হিসেব-নিকাশে বসে, যদি বিশ্বাসঘাতকতা, লোকসান ও পুঁজি বিনষ্ট হতে দেখে, তবে তাকে জবাবদিহি ও শাস্তির মুখোমুখি করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে তার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও চাইতে পারে; অনুরূপভাবে নফ্সের সাথে আক্লের অংশীদারিত্বের বেলায়ও এ বিষয়গুলো মেনে চলা বাঞ্ছনীয়। (জামেউস সা-আদাত: মোল্লা মাহ্দী নারাকী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৯৩)
তিন. মোরাকাবা (সতর্ক প্রহরা)
‘মোরাকাবা’ কথাটি আরবি ‘রাকাবা’ হতে এসেছে। এর অর্থ গর্দান। এইজন্য আরবিতে ‘রাকিব’ তাকেই বলা হয় যে গর্দান টান টান করে যাতে আশপাশের পরিস্থিতি নজরে রাখতে পারে। সূরা হুদ এর ৯৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে: ‘আমিও তোমাদের সাথে ‘রাকিব’ তথা প্রহরায় রইলাম।’ অর্থাৎ এমন প্রহরী যার কাছ থেকে কিছুই গোপন থাকে না। নীতি শাস্ত্রবিদগণের মতে, মোরাকাবা হলো মুশারাতাহ্র পর মানুষের সর্ব অবস্থা ও পরিস্থিতিতে নিজেকে সতর্ক প্রহরায় রাখা এবং খেয়াল রাখা। এটা এক প্রকার ধ্যান।
একজন মোরাকাবারত ব্যক্তি সারাক্ষণ নিজের প্রতি পর্যবেক্ষণ ও সতর্ক দৃষ্টি বজায় রাখবে। অর্থাৎ নফ্সের নাসিকা টেনে ধরে রাখা। সুলুক তথা আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণকারী ব্যক্তির সাথে অন্যদের পার্থক্য এই মোরাকাবা’র প্রশ্নেই স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা, অন্যেরা কেবল পাপের সামনে স্বীয় নফ্সের প্রতি সতর্ক থাকে। কিন্তু একজন আধ্যাত্মিক সাধক সর্বক্ষণ নিজ নফ্সের প্রতি সতর্ক থাকে। ঠিক সেই দরদী মায়ের ন্যায়, যে কেবল বিপদের সময়েই তার শিশুর প্রতি খেয়াল রাখে না, বরং প্রতিটি মুহূর্তেই সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক থাকে যা তার শিশুর ক্ষতি করতে পারে।
লোহায় মরিচা ধরে। কিন্তু রেত দিলে তা আবার শাণিত ও চকচকে হয়ে ওঠে, দ্যুতি ছড়ায়। মানুষের দেহ মনের ঠিক একই অবস্থা। তাযকিয়া তথা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সে পাপ ও পঙ্কিলতার কলুষতা থেকে নিজেকে বিশুদ্ধ করতে পারে। রিপুর দাসত্ব, হিংসা, ক্রোধ, অহমিকা, আত্মম্ভিরতা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, চোঘলখুরী, শঠতা, গালমন্দ, অপবাদ, ঠাট্টা -বিদ্রূপ ইত্যাদি মন্দ অভ্যাসগুলো অন্তরকে কালিমালিপ্ত করে দেয়। এই আবর্জনাগুলো সাফ করে অন্তরকে অলঙ্কারে সজ্জিত করাই আত্মশুদ্ধির লক্ষ্য। বিনয়, সততা, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ, ক্ষমা ও সহনশীলতা হচ্ছে সেই মূল্যবান আভরণ, যা মানুষকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে। অতএব মু’মিনের জীবনে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব খুবই স্পষ্ট, ইসলাম তাকে এই কর্মপন্থা প্রদান করেছে। আর এ কারণেই পয়গাম্বরগণের বে’সাতের একটি অন্যতম লক্ষ্য নৈতিকতার বিস্তার ঘটানো এবং ধাপে ধাপে আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের কর্মপন্থা বাৎলে দেওয়া।
সামরিক শক্তি অর্জনে নবীজির অনুপ্রেরণা
ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
ইসলামের মূল লক্ষ্য শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা। তবে শান্তি ও ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য কখনো কখনো শক্তি ও প্রতিরোধক্ষমতার প্রয়োজন হয়। তাই অনেক সময় দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব পরিহার করে আত্মরক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নির্যাতিত মানুষের সুরক্ষার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই শক্তি শুধু অস্ত্রশস্ত্র বা সামরিক বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কৌশলগত দক্ষতা ও নৈতিক নেতৃত্বও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামের আলোকে মুসলিম উম্মাহর সামরিক শক্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো।
আত্মরক্ষা ও শত্রুর আগ্রাসন প্রতিরোধ:
ইসলাম মুসলমানদের আত্মরক্ষা ও শত্রুর আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি অর্জন এবং প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহ, অস্ত্রশস্ত্র ও যানবাহনের ব্যবস্থা, শরীরচর্চা এবং সামরিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে নির্দিষ্ট কোনো অস্ত্রের নাম উল্লেখ না করে শক্তি অর্জনের কথা বলা হয়েছে, যা যুগ ও সময়ভেদে পরিবর্তিত সামরিক সক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করে। অতীতে তীর-তলোয়ার ও বর্শা ছিল যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র; পরে বন্দুক ও কামানের যুগ এসেছে আর বর্তমান যুগে রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা প্রচলিত।
সুতরাং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৌশল আয়ত্ত করা ইসলামি নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্রভান্ডারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, শিক্ষা, গোয়েন্দা দক্ষতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও এর অপরিহার্য অংশ। এ কারণেই মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামগ্রিক শক্তি অর্জন অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য প্রস্তুত রাখ শক্তি ও অশ্ববাহিনী, তা দিয়ে তোমরা ভীত-সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শক্রকে, তোমাদের শক্রকে এবং এরা ছাড়া অন্যদের যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদের জানেন। আর আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদের দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ (সুরা আল-আনফাল: ৬০)
নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষা:
ইসলামে সামরিক শক্তি অর্জনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো— অত্যাচারিত ও নিপীড়িত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা। যদি দুর্বলদের রক্ষা করা না হয়, তাহলে পৃথিবীতে শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করবে এবং সমাজে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদের যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তারা অত্যাচারিত। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম। তাদের তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে, তারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।’ আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রিষ্টান সংসার-বিরাগীদের উপাসনা স্থান, গির্জা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদগুলো; যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে (তাঁর ধর্মকে) সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই মহাশক্তিমান, চরম পরাক্রমশালী।’ (সুরা আল-হজ: ৩৯-৪০)
এই আয়াত প্রমাণ করে, সামরিক শক্তি শুধু মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়; বরং মানবসমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা:
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে মুসলিম এবং অমুসলিমদের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করেন। এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকদের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। ইসলাম শান্তিপ্রিয় অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেয়। তবে যখন কোনো শক্তি ইসলাম, মুসলমান বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের সঙ্গে মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-মুমতাহিনা: ৮)
সামরিক শক্তি অর্জনে নবীজির অনুপ্রেরণা:
নবী (সা.) মুসলমানদের যুদ্ধোপকরণ প্রস্তুত করা, তীরন্দাজি শেখা, ঘোড়সওয়ারি অনুশীলন করা এবং সামরিক দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি এসব কাজকে শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, বরং ইবাদত ও সওয়াবের কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহমান ইবনু আবু হোসাইন (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা একটি তীরের উসিলায় তিনজন লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তীর নির্মাতা যে নির্মাণকালে কল্যাণের আশা করেছে, (জিহাদে) এই তীর নিক্ষেপকারী এবং তা নিক্ষেপে সাহায্যকারী।’ তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা তীরন্দাজি করো ও ঘোড়দৌড় শিক্ষা করো। তবে তোমাদের ঘোড়দৌড় শেখার তুলনায় তীরন্দাজি শিক্ষা করা আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়। মুসলিম ব্যক্তির সব ক্রীড়া-কৌতুকই বৃথা। তবে তীর নিক্ষেপ, ঘোড়ার প্রশিক্ষণ এবং নিজ স্ত্রীর সঙ্গে ক্রীড়া-কৌতুক বৃথা নয়। (কারণ) এগুলো হলো উপকারী ও বিধিসম্মত। (তিরমিজি: ১৬৩৭)
বোঝা যায়, মুসলিম সমাজকে সর্বদা দক্ষ, সক্ষম ও প্রস্তুত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে সামরিক শক্তি অর্জন কোনো আগ্রাসী মনোভাবের প্রতীক নয়; বরং আত্মরক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষার একটি অপরিহার্য উপায়। মুসলিম উম্মাহর জন্য সামরিক শক্তি অর্জনের পাশাপাশি জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, চরিত্রগঠন ও নৈতিক নেতৃত্বে সমৃদ্ধ হওয়াও সমানভাবে জরুরি। তখনই একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। (লেখক: অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, আমার দেশ পত্রিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।)
ইমাম খোমেনী (রহ.) বৈষয়িক অগ্রগতির পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতা রক্ষার ওপর জোর দিতেন
ইমাম খোমেনী (রহ.) মনে করতেন সুস্থ মত-বিনিময় ও নানা ধরনের চিন্তার পারস্পরিক অনুধাবনই হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতি প্রসারের সঠিক পন্থা। কোনো একটি ধারণা ছড়িয়ে দেয়ার সবচেয়ে ভালো ভিত্তি হল চিন্তাশীলদের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক সংলাপ, যুদ্ধ, বিতর্ক বা হৈ-চৈ করা নয়।
বিশ্ব দর্শন দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতির দর্শন সংক্রান্ত এক সেমিনারে ইমাম খোমেইনীর এই দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন সাইয়্যেদ মোহসেন শারিফি নামক একজন গবেষক।
তিনি বলেছেন, ইমাম খোমেনীর মতে সংস্কৃতি হচ্ছে সমাজের মাথা ও চিন্তাশীলদের মগজ এবং সংস্কৃতি হচ্ছে সব সুখ ও দুর্ভাগ্যের উৎস। সংস্কৃতি সমাজের নির্মাতা, সমৃদ্ধির মূল ও দুর্ভাগ্যের গোড়া।
ইমাম খোমেনীর মতে সংস্কৃতিরও রয়েছে নানা ধরণ। যেমন, ইসলামী সংস্কৃতি, উপনিবেশবাদী সংস্কৃতি, নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি, রাজকীয় সংস্কৃতি, স্বাধীনতার সংস্কৃতি ইত্যাদি। ইসলামী ও পশ্চিমা সংস্কৃতি উভয়ই বৈশ্বিক মিশনের দাবিদার, কিন্তু ইমাম খোমেইনীর মতে অবিকৃত ইসলামী সংস্কৃতি পশ্চিমা সংস্কৃতির চেয়ে উন্নত। পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতি নানা রোগের কারণে ভেঙ্গে যাচ্ছে ও বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি মনে করতেন।
শারিফি আরও বলেছেন, মুসলিম চিন্তাবিদদের কেউ কেউ বলছেন প্রগতির একমাত্র পথ পশ্চিমা সংস্কৃতি, তাদের আরেক দল মনে করেন, পশ্চিমা সংস্কৃতিকে পুরোপুরি পরিহার করা উচিত ও এ সংস্কৃতির কোনো সাফল্য নেই, আর ইসলামী ও পশ্চিমা সংস্কৃতির মধ্যে বন্ধন বা সম্পর্ক ইসলামী সভ্যতাকে বিচ্যুত ও দুষিত করবে। অন্য এক দল মনে করেন সভ্যতা ও সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক যদি যৌক্তিক হয় ও সমালোচনা-ভিত্তিক তাহলে তা বয়ে আনবে উন্নতি ও প্রগতি। ইমাম খোমেনী এই তৃতীয় ধারার চিন্তার ভিত্তিতেই কাজ করতেন ও কথা বলতেন।
তিনি আরও বলেছেন, ইমাম খোমেনী মনে করতেন পশ্চিমা সংস্কৃতির কিছু দুর্বলতা হল উপনিবেশবাদ ও পশ্চিমা-বিকারবাদ। আর এর ভালো দিক তথা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে ভিন্নভাবে নেয়া উচিত। বৈষয়িকতা ও বস্তুতান্ত্রিক উন্নতির পাশাপাশি নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতারও বিকাশ ঘটানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি একটি তৃতীয় বা মধ্যবর্তী চিন্তার অনুসরণ করতেন।
ইমাম খোমেনী (রহ.) মনে করতেন সুস্থ মত-বিনিময় ও নানা ধরনের চিন্তার পারস্পরিক অনুধাবনই হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতি প্রসারের সঠিক পন্থা। কোনো একটি ধারণা ছড়িয়ে দেয়ার সবচেয়ে ভালো ভিত্তি হল চিন্তাশীলদের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক সংলাপ, যুদ্ধ, বিতর্ক বা হৈ-চৈ করা নয়। আর এই ছিল ইমাম খোমেনীর সংলাপের সংস্কৃতি।
শারিফি আরও বলেছেন, ইমাম খোমেনী (রহ.) পশ্চিমা সংস্কৃতির নেতিবাচক দিক মোকাবেলার জন্য ও পশ্চিমা আধিপত্যবাদ মোকাবেলার জন্য ইসলামের দিকে ফিরে আসার ওপর গুরুত্ব দিতেন। এভাবে ইমাম পশ্চিমা সংস্কৃতির সঙ্গে সংঘাতের বিষয়টিকে বিবেচনা করতেন যে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও চিন্তাধারা সমসাময়িক যুগে কথিত মানবতাবাদ, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ ও ভোগবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
হায়া ও ঈমান: ডিজিটাল যুগে শালীনতার সংকট ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
আলী নওয়াজ খান
ভূমিকা
মানুষের সৌন্দর্য কেবল তার মুখের অবয়বে নয়, পোশাকের চাকচিক্যে নয়, কিংবা মানুষের চোখে তার জনপ্রিয়তার পরিমাপেও নয়। মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তার অন্তরের পবিত্রতায়, আচরণের কোমলতায়, কথার শালীনতায়, দৃষ্টির সংযমে এবং নিজের মর্যাদা সম্পর্কে তার গভীর সচেতনতায়।
ইসলামী নৈতিক দর্শনে এই অন্তর্গত সৌন্দর্যের এক অনন্য নাম—‘হায়া’ (الحياء)।
হায়া কেবল লজ্জা নয়; হায়া হলো অন্তরের সেই সূক্ষ্ম প্রহরী, যে মানুষকে অন্যায়ের দিকে পা বাড়ানোর আগে থামিয়ে দেয়। যে কণ্ঠ পাপের আহ্বানে বলে—“না!” যে বিবেক অশ্লীলতার সামনে মাথা নত করতে দেয় না। যে আত্মসচেতনতা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় —“মানুষ আমাকে না দেখলেও আমার রব আমাকে দেখছেন।”
এ কারণেই আহলে বাইত (আ.)-এর বাণীতে হায়া ও ঈমানকে একে অপরের সঙ্গে এমন নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ বলা হয়েছে, যেন তারা একই বৃন্তে ফোটা দুটি ফুল, একই প্রদীপের দুটি শিখা।
ইমামদের বাণীতে হায়ার সঙ্গে ঈমানের সম্পর্ক এত গভীর যে, হায়াকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য নৈতিক প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইমাম বাকের (আ.) অথবা ইমাম সাদিক (আ.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:
الْحَيَاءُ وَالْإِيمَانُ مَقْرُونَانِ فِي قَرَنٍ فَإِذَا ذَهَبَ أَحَدُهُمَا تَبِعَهُ صَاحِبُهُ
“হায়া ও ঈমান একই বন্ধনে আবদ্ধ। অতএব, এ দুটির একটি যখন চলে যায়, অপরটিও তার অনুসরণ করে চলে যায়।” আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৬।
এখানে ্রقَرَنগ্ধ এমন এক বন্ধন বা রজ্জুর অর্থ বহন করে, যার মাধ্যমে দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে।
অর্থাৎ হায়া ও ঈমানের সম্পর্ক কোনো বাহ্যিক সম্পর্ক নয়; এটি মানুষের আত্মিক ও নৈতিক অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত এক সম্পর্ক।
যেখানে ঈমানের আলো জ্বলে, সেখানে হায়ার কোমল ছায়া থাকার কথা। আর যখন অন্তর থেকে হায়ার আলো নিভে যেতে থাকে, তখন ঈমানের দীপ্তিও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে পড়ে।
১. হায়া কি কেবল লজ্জা?
হায়া মানে নিজেকে ছোট মনে করা নয়। হায়া মানে সত্য কথা বলতে ভয় পাওয়া নয়। হায়া মানে জ্ঞান অর্জনের পথে সংকুচিত হয়ে যাওয়া নয়। ইসলামী দৃষ্টিতে হায়া হলো এমন এক মহান নৈতিক শক্তি, যা মানুষকে অন্যায়ের সামনে নিজেকে সংযত রাখতে শেখায়।
হায়া হলো—
– অন্যায় করতে অন্তরের সংকোচ;
– অশ্লীলতা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ;
– আল্লাহর সামনে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে গভীর সচেতনতা;
– নিজের দেহ ও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা;
– অন্যের সম্মান ও ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা;
– ভাষা ও আচরণে শালীনতা;
– এবং পাপকে বিনোদনের বস্তুতে পরিণত না করা।
আল-কাফি-এর একই অধ্যায়ে আরও বর্ণিত হয়েছে:
الْحَيَاءُ مِنَ الْإِيمَانِ وَالْإِيمَانُ فِي الْجَنَّةِ
“হায়া ঈমানের অন্তর্ভুক্ত এবং ঈমান জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।”
আরও বর্ণিত হয়েছে:
لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا حَيَاءَ لَهُ
“যার হায়া নেই, তার ঈমান নেই।”
এই বাণীগুলো যেন আমাদের আত্মার দরজায় কড়া নেড়ে বলে—
ঈমান শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; ঈমানের একটি সৌন্দর্য হলো চরিত্র। আর চরিত্রের একটি উজ্জ্বল অলংকার হলো হায়া।
২. কুরআনের দৃষ্টিতে শালীনতা
পবিত্র কুরআন শালীনতাকে কেবল পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। কুরআন মানুষের দৃষ্টি, চিন্তা, আচরণ, যৌন পবিত্রতা এবং সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুকে শালীনতার বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا۟ مِنْ أَبْصَـٰرِهِمْ وَيَحْفَظُوا۟ فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرٌۢ بِمَا يَصْنَعُونَ
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।” —সূরা আন-নূর, ২৪:৩০।
এর পরবর্তী আয়াতে মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করা এবং নিজেদের সৌন্দর্য যথেচ্ছভাবে প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি গভীর বিষয় আমাদের হৃদয়ে ধারণ করা প্রয়োজন—
কুরআন অশ্লীলতার দরজা বন্ধ করা শুরু করেছে দৃষ্টি থেকে। কারণ অনেক পাপ হাত দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় চোখ দিয়ে।
অনেক পতন পা দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় দৃষ্টির একটি অসতর্ক মুহূর্ত থেকে।
চোখ যা দেখে, মন তা ধারণ করে। মন যা ধারণ করে, কল্পনা তাকে লালন করে। আর কল্পনা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন আচরণ তার অনুসরণ করতে শুরু করে।
৩. অশ্লীলতার প্রসারকে কুরআন কীভাবে দেখে?
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক—এটা পছন্দ করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।” —সূরা আন-নূর, ২৪:১৯।
এই আয়াত আমাদের সামনে অশ্লীলতার একটি গভীর সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে।
অশ্লীলতা যখন কেবল ব্যক্তিগত গোপন পাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তার প্রভাব এক রকম। কিন্তু যখন অশ্লীলতা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, যখন তা বিনোদন হয়ে ওঠে, যখন তা প্রদর্শনযোগ্য ও প্রশংসনীয় বিষয় হিসেবে মানুষের সামনে হাজির হয়—তখন এর প্রভাব ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও স্পর্শ করে।
একটি সমাজে কোনো বিষয়কে বারবার প্রদর্শন করা হলে, বারবার প্রচার করা হলে, বারবার উপভোগের বস্তু বানানো হলে—একসময় মানুষের নৈতিক অনুভূতিও তার প্রতি অসাড় হয়ে যেতে পারে।
যে বিষয় দেখে একদিন মানুষ চোখ নামিয়ে নিত, একদিন হয়তো সেটিই দেখে মানুষ হাসতে শুরু করবে।
আর সেই দিনটিই নৈতিক বিপদের দিন।
৪. ডিজিটাল যুগে হায়ার নতুন পরীক্ষা
একসময় অশ্লীল কোনো দৃশ্য দেখতে হলে মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হতো।
কিন্তু আজ?
একটি ছোট্ট স্মার্টফোনের পর্দাই যেন এক বিশাল পৃথিবীর দরজা।
, Facebook, Instagram, TikTok, YouTube চোখের সামনে হাজির হচ্ছে অসংখ্য ছবি, ভিডিও, রিলস, মিম ও মন্তব্য।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বিবেচনা করা দরকার—
প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা প্রতিটি কনটেন্ট নির্মাতা অশ্লীলতা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে কাজ করে—এমন সাধারণীকরণ সঠিক নয়।
কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দৃষ্টি আকর্ষণ, শেয়ার, মন্তব্য, অনুসরণকারী ও ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতি এমন কনটেন্টকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে, যা মানুষের কৌতূহল, হাসি, চমক কিংবা যৌন উত্তেজনাকে ব্যবহার করে।
ফলে ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। যা একদিন লজ্জার বিষয় ছিল—তা হয়ে যায় “মজা”। যা একদিন গোপন রাখার বিষয় ছিল—তা হয়ে যায় “কনটেন্ট”।
যা একদিন নৈতিক আপত্তির কারণ ছিল—তা হয়ে যায় “ভাইরাল বিনোদন”।
এখানেই হায়ার সামনে নতুন পরীক্ষা।
৫. “শুধু মজা করার জন্য”—এই যুক্তির বিপদ
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন দৃশ্য, অঙ্গভঙ্গি কিংবা সংলাপের সঙ্গে একটি বাক্য প্রায়ই শোনা যায়—
“আরে, এটা তো শুধু মজা!”
কিন্তু ইসলামী নৈতিকতার প্রশ্ন হলো—
কোনো বিষয়কে হাসির মোড়কে পরিবেশন করলেই কি তা নৈতিকভাবে নির্দোষ হয়ে যায়? অবশ্যই নয়।
কারণ হাসি মানুষের প্রতিরোধকে অনেক সময় কোমল করে দেয়।
যে বিষয়কে সরাসরি বলা হলে মানুষ প্রত্যাখ্যান করতে পারে, সেটিই যখন অভিনয়, রসিকতা, মিম, রিলস কিংবা বিনোদনের আবরণে সামনে আসে, তখন তার প্রতি মানুষের নৈতিক প্রতিরোধ অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ যে অশ্লীল দৃশ্য দেখে আমরা হাসছি, আগামীকাল হয়তো সেই দৃশ্য আর অশ্লীল বলেই মনে হবে না।
এভাবেই সীমারেখা একটু একটু করে সরে যায়। আজ যা নিষিদ্ধ মনে হয়, কাল তা স্বাভাবিক হয়। আজ যা দেখে লজ্জা লাগে, কাল তা দেখে হাসি পায়।
আর পরশু হয়তো মানুষ প্রশ্নই করবে না—
“এতে লজ্জার কী আছে?”
এটাই হায়ার ক্ষয়।
তাই প্রশ্নটি শুধু— “আমি কি পাপ করছি?”
এতটুকু নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত— “আমি কি এমন কোনো বিষয়কে বিনোদন হিসেবে প্রচার করছি, যা অন্য মানুষের হায়াকে দুর্বল করে দিতে পারে?”
৬. হাসি নিজে নিষিদ্ধ নয়
এখানে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্যটি স্মরণ করা জরুরি।
ইসলাম মানুষকে হাসতে নিষেধ করেনি।
নবীজী (সা.) এবং আহলে বাইত (আ.)-এর জীবনে আনন্দ, হাস্যরস ও প্রফুল্লতার দৃষ্টান্ত রয়েছে।
সুতরাং সমস্যা হাসিতে নয়। সমস্যা হলো—আমরা কী নিয়ে হাসছি।
যদি হাসির জন্য—
– অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি,
– যৌন ইঙ্গিত,
– নারী বা পুরুষের দেহকে প্রদর্শনের বস্তু বানানো,
– অন্যকে অপমান করা,
– মিথ্যা বলা,
– অশালীন ভাষা ব্যবহার,
– পাপকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন,
– কিংবা শিশু-কিশোরদের সামনে অনৈতিক আচরণকে স্বাভাবিক করে তোলা
ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটিকে নিছক নির্দোষ বিনোদন হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না।
হাসি যদি হৃদয়কে নির্মল করে—তা আনন্দ।
আর হাসি যদি লজ্জাবোধকে হত্যা করে—তা নৈতিক বিপদের দরজা।
৭. আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষায় হায়া ও জ্ঞান
ইসলামে হায়া মানুষকে অজ্ঞ করে না। হায়া মানুষকে সত্য জানতে বাধা দেয় না। বরং আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষায় হায়া জ্ঞান ও বিবেকের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
উসুল আল-কাফি-তে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে বর্ণিত হয়েছে:
الْحَيَاءُ حَيَاءَانِ: حَيَاءُ عَقْلٍ وَحَيَاءُ حُمقٍ، فَحَيَاءُ الْعَقْلِ هُوَ الْعِلْمُ وَحَيَاءُ الْحُمقِ هُوَ الْجَهْلُ
অর্থাৎ—
“হায়া দুই ধরনের—বুদ্ধিবৃত্তিক হায়া এবং নির্বুদ্ধিতার হায়া। বুদ্ধিবৃত্তিক হায়া হলো জ্ঞান, আর নির্বুদ্ধিতার হায়া হলো অজ্ঞতা।”
অতএব ইসলামী হায়া মানে প্রশ্ন করতে লজ্জা পাওয়া নয়।
সত্য জানতে লজ্জা পাওয়া নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাওয়া নয়।
বরং— হায়া হলো পাপের সামনে আত্মসংযম; সত্যের সামনে ভীরুতা নয়।
৮. “শত্রু হায়া ধ্বংস করতে চায়”—বিষয়টি কীভাবে বুঝতে হবে?
“শত্রু সমাজ থেকে পরিকল্পিত ছকে হায়া ধ্বংস করতে চায়”—এই বাক্যটি একটি সতর্কতামূলক বক্তব্য ।
তাই আপনারা দেখতে পাবেন—
যখন কোনো সাংস্কৃতিক বা বাণিজ্যিক পরিবেশে যদি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ক্রমাগত উত্তেজক, অশালীন ও সীমালঙ্ঘনকারী কনটেন্টকে পুরস্কৃত করা হয়, তাহলে তা সামাজিকভাবে হায়ার সীমারেখাকে দুর্বল করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তাই মুসলিম সমাজের প্রতিরোধ হতে হবে—
অজ্ঞতার মাধ্যমে নয়, জ্ঞানের মাধ্যমে।
ঘৃণা পোষণের মাধ্যমে ও নৈতিকতার মাধ্যমে।
প্রযুক্তি বর্জনের মাধ্যমে নয়, প্রযুক্তির সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে।
ভয় দেখিয়ে নয়, চরিত্র গঠন করে।
৯. একটি “লাইক” কি নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ?
ডিজিটাল যুগ আমাদের সামনে একটি নতুন নৈতিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে।
আগে কোনো অশালীন বিষয় দেখা ছিল অনেক সময় ব্যক্তিগত ব্যাপার।
কিন্তু আজ?
একটি Like, একটি Share, একটি Comment, একটি Follow কোনো কনটেন্টকে আরও বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
তাই একজন মুমিনের নিজের কাছে প্রশ্ন করা উচিত—
আমি যে ভিডিওটি দেখছি, সেটি কি শুধু আমার চোখে এসে থামছে, নাকি আমার একটি শেয়ার সেটিকে আরও বহু চোখের সামনে নিয়ে যাচ্ছে?
যদি কোনো কনটেন্টে অশ্লীলতা থাকে, তাহলে শুধু “আমি তো দেখলাম” —এখানেই বিষয়টি শেষ নয়।
কারণ আমি যখন সেটি শেয়ার করি, তখন হয়তো অজান্তেই আমি তার প্রচারের অংশ হয়ে যাই।
এখানেই হায়া একটি ব্যক্তিগত গুণের সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক দায়িত্বে পরিণত হয়।
১০. শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
শিশুর হৃদয় হলো কোমল মাটির মতো। তার ওপর যে দৃশ্যের বীজ বোনা হয়, তার চরিত্রে একদিন তারই অঙ্কুর দেখা দিতে পারে।
শিশু যদি প্রতিদিন দেখে—
“অশ্লীলতা = হাসি”
“দেহ প্রদর্শন = জনপ্রিয়তা”
“অশালীন কথা = ভাইরাল হওয়া”
“নির্লজ্জতা = সাহস”
তাহলে তার মূল্যবোধের কাঠামো ধীরে ধীরে বদলে যেতে পারে।
তাই সন্তানকে শুধু বলা যথেষ্ট নয়—
“এগুলো দেখবে না।”
অভিভাবকদের নিজেদের জীবনেও ডিজিটাল শালীনতার উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে।
কারণ শিশু শুধু আমাদের উপদেশ শোনে না।
-সে আমাদের দেখে।
-আমাদের কথা শোনে।
-আমাদের অভ্যাস অনুকরণ করে।
-এমনকি আমরা মোবাইলের পর্দায় কী দেখি—সেটিও তার নৈতিক শিক্ষার নীরব অংশ হয়ে যায়।
১১. একজন মুমিনের জন্য ডিজিটাল হায়ার কয়েকটি নীতি
১. দেখার আগে এক মুহূর্ত থামুন
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন— “এটি দেখা কি আমার ঈমান ও চরিত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি দুর্বল করবে?”
২. শেয়ার করার আগে ভাবুন
“আমি কি এমন কিছু অন্যের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি, যা আল্লাহ পছন্দ করেন না?”
৩. হাসার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন
“এই হাসির মূল্য কি আমার লজ্জাবোধ?”
৪. অনুসরণ করার আগে বিবেচনা করুন
“আমি যাকে ঋড়ষষড়ি করছি, সে আমার চরিত্রের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?”
৫. সন্তানকে ডিভাইস দেওয়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন
“আমি কি শুধু তার হাতে প্রযুক্তি তুলে দিয়েছি, নাকি প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিক শিক্ষাটিও দিয়েছি?”
উপসংহার
ইমামদের এই ছোট্ট বাণীর মধ্যে যেন এক বিশাল নৈতিক জগতের দরজা খুলে যায়—
الحياء والإيمان مقرونان في قرن
“হায়া ও ঈমান একই বন্ধনে আবদ্ধ।”
কত অল্প শব্দ!
কিন্তু কত গভীর শিক্ষা!
যেন একটি ছোট্ট প্রদীপের আলোয় মানুষের পুরো চরিত্রের পথ দেখা যায়।
ঈমান যদি হৃদয়ের আলো হয়, তবে হায়া সেই আলোর চারপাশের প্রহরী।
ঈমান যদি হৃদয়ের প্রাণ হয়, তবে হায়া তার সৌন্দর্য।
আজকের ডিজিটাল যুগে হায়ার পরীক্ষা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও সূক্ষ্ম, আরও জটিল।
কারণ অশ্লীলতা এখন কোনো নির্দিষ্ট গলির অন্ধকারে লুকিয়ে নেই।
তা কখনো ছবির আকারে আসে।
কখনো ভিডিও হয়ে আসে।
কখনো মিম হয়ে আসে।
কখনো রিলস হয়ে আসে।
কখনো “মজা” নাম নিয়ে আসে।
কখনো আবার লক্ষ লক্ষ মানুষের হাসির মাঝখানে এসে দাঁড়ায়।
তাই আমাদের সংগ্রাম প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়।
আমাদের সংগ্রাম প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে।
আমাদের লক্ষ্য হাসি বন্ধ করা নয়।
আমাদের লক্ষ্য হাসিকে পবিত্র করা।
আমাদের লক্ষ্য সৌন্দর্যকে অস্বীকার করা নয়।
আমাদের লক্ষ্য সৌন্দর্যকে মর্যাদার আবরণে রক্ষা করা।
আমাদের লক্ষ্য তরুণদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা নয়।
আমাদের লক্ষ্য তাদের আনন্দকে অশ্লীলতার ওপর নির্ভরশীল হতে না দেওয়া।
এবং সর্বোপরি— যে সমাজে পাপ দেখে মানুষ লজ্জিত হয়, সে সমাজে ঈমানের আলো এখনো জীবিত।
কিন্তু—
যে সমাজে পাপকে দেখে মানুষ শুধু হাসে,
যে সমাজে অশ্লীলতা বিনোদনে পরিণত হয়,
যে সমাজে নির্লজ্জতাকে সাহস বলা হয়,
আর হায়াকে পুরোনো চিন্তা বলে উপহাস করা হয়—
সেখানে থেমে দাঁড়ানোর, নিজের দিকে ফিরে তাকানোর এবং আত্মসমালোচনা করার সময় এসে গেছে।
আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—
হায়াকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি সামাজিক রীতি রক্ষা করা নয়; বরং ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রহরীকে রক্ষা করা।
তাই আজকের মুমিনের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় শুধু— “আমি কতজনকে বিনোদন দিয়েছি?”
বরং আরও গভীর প্রশ্ন হওয়া উচিত— “আমার কারণে কতজনের হায়া রক্ষা পেয়েছে?”
কারণ ডিজিটাল দুনিয়ায় একটি খরশব, একটি ঝযধৎব, একটি ঠরফবড়, কিংবা একটি হাসির আড়ালেও একজন মানুষের নৈতিক জগৎ গড়ে উঠতে পারে—আবার ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে।
আর সেই কারণেই আজ আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে একটি প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হওয়া দরকার—
“আমি কি শুধু দর্শক, নাকি আমার প্রতিটি ক্লিকের মধ্যেও আমার ঈমানের সাক্ষ্য রয়েছে?”
আমাদের জনগণ আত্মসমর্পণ করবে না’
সৌদি শাসকগোষ্ঠী সুন্নি মাজহাবের প্রতিনিধিত্ব করে না: আল-হুথি
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর নেতা সাইয়্যেদ আবদুল মালিক আল-হুথি নিপীড়ন ও দ্বিচারিতার জন্য আমেরিকা, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের নিন্দা করেছেন। তিনি সৌদি শাসকদের বিরুদ্ধে ইসলামি স্লোগান ব্যবহারের অভিযোগ এনে বলেছেন, একই সময়ে তারা বাস্তবে মুসলমানদের হত্যা করছে।
২০১৬ সালে সৌদি যুদ্ধবিমান দিয়ে সানার ‘গ্র্যান্ড হল’-এ হামলার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে আজ দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, সৌদি আগ্রাসনকে যারা সমর্থন করে—তা কোনো সরকার হোক, গোষ্ঠী হোক কিংবা সংগঠন—তারা নিজেদের পাপ, অপরাধ ও অন্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলছে। এর দুনিয়া ও আখিরাতে পরিণতি রয়েছে।
তিনি বলেন, উম্মাহর বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। আনুগত্য ও শত্রুতার প্রশ্নে অনেক সিদ্ধান্ত এখন ইসলামি নীতি, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরে গেছে।
‘সৌদি শাসকগোষ্ঠী জায়নবাদী পথ অনুসরণ করছে’
সাইয়্যেদ আবদুল মালিক আল-হুথি বলেছেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ বা সুন্নি মাজহাবের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং তারা জায়নবাদী পথ অনুসরণ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, সৌদি আরব ইসলামি স্লোগান ব্যবহার করলেও বাস্তবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড ও আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।
আল-হুথি বলেন, ‘যে ব্যক্তি সৌদি আগ্রাসীদের সঙ্গে মিলে শিশু ও নারী হত্যা এবং ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, সে নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এবং নিজের দেশেরও ক্ষতি করে। শিশু ও নারীদের হত্যাকারীর পাশে দাঁড়ানো এবং তার সঙ্গে অংশ নেওয়া সবচেয়ে বড় কলঙ্কগুলোর একটি।’
আনসারুল্লাহর শীর্ষ নেতা বলেন, বর্তমান আরব ও ইসলামি বিশ্বে সৌদি শাসকগোষ্ঠী কঠোর আগ্রাসনের অন্যতম প্রধান উদাহরণ। তার প্রশ্ন, ‘সৌদি আরব কখন আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অবস্থানও নিয়েছে?’
আল-হুথি অভিযোগ করেন, সৌদি হামলায় ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ, শিশু, নারী, শিক্ষার্থী, মসজিদ ও বাজারও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তিনি বলেন, সৌদি শত্রুরা নতুন করে হামলা জোরদার করার পর আবারও শিক্ষার্থী, শিশু ও নারীদের লক্ষ্যবস্তু করার একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
তিনি বিশেষভাবে দাহইয়ানে শিশুদের বহনকারী একটি বাসে হামলার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বাসে থাকা ব্যক্তিদের সৌদি পক্ষ ‘সামরিক বিশেষজ্ঞ’ বলে দাবি করেছিল। পরে জানা যায়, তারা ছিল অল্পবয়সী শিক্ষার্থী।
আল-হুথি বলেন, সৌদি হামলার অনেক ঘটনা রয়েছে, যার মধ্যে সানার আল-রুয়াইশান পরিবারের জানাজার অনুষ্ঠানে হামলাও রয়েছে। তার দাবি, জানাজার হলে জড়ো হওয়া বিপুল মানুষের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল এবং যত বেশি সম্ভব মানুষকে হত্যা করাই ছিল হামলাকারীদের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের হামলায় জানাজা ও বিয়ের অনুষ্ঠানও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। হাজ্জাহ প্রদেশে আলী আদলির পরিবারের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ওই হামলায় একটি পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
‘আমেরিকা ও ব্রিটেনের ওপর নির্ভর করে সৌদি আরব’
আনসারুল্লাহ নেতা বলেন, সৌদি আরব হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ব্রিটেনের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, আমেরিকার অংশগ্রহণে সৌদি শাসকগোষ্ঠী ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সৌদি আগ্রাসনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ইয়েমেনের জনগণের মনোবল ভেঙে তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। তবে তার ভাষায়, এটি ‘একটি মরীচিকা’।
আল-হুথি বলেন, আগ্রাসন শুরুর সময়ের তুলনায় ইয়েমেনের জনগণের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন আরও শক্তিশালী ও কার্যকর এবং নিজেদের অধিকার ও ন্যায্যতার বিষয়ে তাদের বিশ্বাসও আরও দৃঢ় হয়েছে।
কাতারকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান
বক্তব্যে কাতারের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন আল-হুথি। তিনি কাতারকে সৌদি আরবের সঙ্গে তার অতীত অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ২০১৫ সালে কাতার ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনে সামরিকভাবেও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু পরে সৌদি আরব কাতারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং দেশটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রচারণা চালিয়ে তাকে অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, সৌদি আরব কাতারের ওপর সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালায়। উপসাগরীয় দেশগুলো এবং আমেরিকাকে কাতারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগও তোলা হয়। এমনকি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও কাতারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে যারা ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আগ্রাসনকে সমর্থন করছে, তাদের নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
আল-হুথি অভিযোগ করেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী বাহরাইনের আল খলিফা পরিবারের মতো কাতারেও সরকার পরিবর্তনের আশা করছে। কাতারের প্রতি ‘ভ্রাতৃসুলভ’ পরামর্শ দিয়ে আল-হুথি তাদের হিসাব-নিকাশ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
‘আমাদের জনগণ অপমান ও দাসত্ব মেনে নেবে না’
আব্দুল মালিক আল-হুথি বলেন, ইয়েমেনের জনগণ কোনো সাময়িক বা আকস্মিক সত্তা নয়; তারা একটি ঐতিহ্যবাহী জনগোষ্ঠী, যাদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক মর্যাদার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তারা অপমান ও দাসত্ব মেনে নেবে না।
তিনি বলেন, পবিত্র স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় ইয়েমেনের জনগণ সামনের সারিতে থাকার জন্য প্রস্তুত।
আল-হুথির ভাষায়, ‘আমাদের জনগণ আত্মসমর্পণ করবে না।’ তিনি দাবি করেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী ইয়েমেনের জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না এবং বর্তমানে তারা আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ওমর আল-বশিরের উদাহরণ
নিজের অবস্থান পরিবর্তনের পর ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে অন্যায় অবস্থান নেওয়ার জন্য সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের উদাহরণ তুলে ধরেন আল-হুথি। তিনি বলেন, ইয়েমেন ও সুদানের জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আল-বশির স্বার্থের কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে যোগ দেন এবং ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আগ্রাসনে অংশ নেন। তিনি সুদানের সেনাবাহিনী এবং জানজাভিদ বাহিনীকে ইয়েমেনে পাঠান। আল-হুথির দাবি, তারা কোনো অধিকার ছাড়াই ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ অপরাধ করেছে।
তিনি প্রশ্ন করেন, এর ফল কী হয়েছিল?
আল-হুথি বলেন, অর্থনৈতিক লাভের আশা শেষ পর্যন্ত মরীচিকায় পরিণত হয়, আর এর বিপরীতে আসে ‘ঐশী শাস্তি’।
তিনি বলেন, সুদানে যা ঘটছে তা তাদের জন্য দুঃখজনক। তবে আল-বশিরের হিসাব-নিকাশ ব্যর্থ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সবাই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
‘ফিলিস্তিনের নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানো উচিত’
আবদুল মালিক আল-হুথি বলেন, ইসলামি অঙ্গনে ভূমিকা রাখতে চায়—এমন প্রতিটি দেশ, সরকার, সেনাবাহিনী ও সংগঠনের উচিত নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ানো। কারণ ফিলিস্তিনের বিষয়টি স্পষ্ট এবং এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই।
আল-হুথি বলেন, ‘ফিলিস্তিনি জনগণ নিপীড়িত। তাদের দাবি ন্যায়সংগত এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো ও তাদের সমর্থন করা উম্মাহর দায়িত্ব।’
তিনি প্রশ্ন করেন, সৌদি আরবের কীসের অভাব—অর্থ, নাকি সামরিক সক্ষমতা? তার মতে, সৌদি আরবের বিপুল অর্থ ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে এবং তারা আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইসরায়েলের অংশীদার। তাই সৌদি আরবের কারও সহায়তার প্রয়োজন নেই। বরং যারা তাদের পাশে দাঁড়াবে, তারাই পাপ ও আগ্রাসনের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলবে।
আল-হুথি বলেন, কিছু পক্ষ ইসলামি নীতি ও আল্লাহর নির্দেশনা থেকে দূরে সরে গিয়ে অর্থের প্রলোভনে পরিচালিত হচ্ছে। অর্থ পাওয়ার জন্য নিপীড়কদের সঙ্গে যোগ দেওয়া এবং নিপীড়িতদের ওপর আগ্রাসনে অংশ নেওয়া একটি শয়তানি প্ররোচনা। এটি ধর্ম ও দুনিয়া—দুই ক্ষেত্রেই স্বার্থের বিনিময়ে নীতি বিক্রি করার মতো।
বাব আল-মান্দাব নিয়ে নতুন অভিযোগ
বক্তব্যের শেষদিকে আল-হুথি অভিযোগ করেন, সৌদি শাসকগোষ্ঠী লাহিজ প্রদেশের উপকণ্ঠ থেকে বাব আল-মান্দাবের দিকে হামলা চালানোর জন্য একটি নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। একই সঙ্গে তারা একটি ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি, যেখানে কিছু গণমাধ্যমও জড়িয়ে পড়েছে।#পার্সটুডে
একটি বিশেষ আবেদন
পাক্ষিক ফজর-এর সম্মানিত পাঠক ও গ্রাহকদের প্রতি
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
১৯৯৭ থেকে ২০২৬—প্রায় তিন দশকের পথচলা।
অসংখ্য প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও পাক্ষিক ফজর খুলনা থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। এই দীর্ঘ পথচলায় ফজরের লক্ষ্য কখনোই অর্থ উপার্জন ছিল না। দ্বীনি জ্ঞান, ইসলামী মূল্যবোধ ও সত্যের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ববোধই ছিল আমাদের পথচলার মূল প্রেরণা।
কিন্তু আজ ফজরের পথচলায় নতুন এক কঠিন বাস্তবতা এসে দাঁড়িয়েছে।
১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ডাক বিভাগের ডাকমাশুল অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে যেখানে প্রতি কপি ফজর মাত্র ১ টাকা ডাকমাশুলে পাঠানো সম্ভব হতো, বর্তমানে সেখানে প্রতি কপির জন্য ৭ টাকা ডাকমাশুল দিতে হচ্ছে।
ফলে বাধ্য হয়ে বার্ষিক গ্রাহক চাঁদা ২৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
এ কারণে সম্মানিত গ্রাহকদের প্রতি আমাদের বিশেষ অনুরোধ—
যাঁরা ২০২৬ সালের গ্রাহক চাঁদা ইতোমধ্যে ২৫০ টাকা পরিশোধ করেছেন, তাঁদের অনুগ্রহ করে আরও ১৫০ টাকা সহযোগিতা করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।
আর যাঁরা এখনো ২০২৬ সালের গ্রাহক চাঁদা পরিশোধ করেননি, তাঁদের নিকট অনুরোধ—বর্ধিত ডাকমাশুলের কারণে পত্রিকা নিয়মিত ডাকযোগে পাঠানোর জন্য অনুগ্রহ করে ৪০০ টাকা গ্রাহক চাঁদা প্রদান করুন।
প্রিয় পাঠক,
ফজর শুধু একটি পত্রিকা নয়—এটি তিন দশকের একটি দ্বীনি আমানত।
আপনাদের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও দোয়ার ওপর নির্ভর করেই এর পথচলা এত দীর্ঘ হয়েছে।
আমরা অর্থের হিসাব না করে এতদিন যে দায়িত্ব পালন করে এসেছি, আজ সেই দায়িত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেই আপনাদের সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন।
আপনাদের সামান্য সহযোগিতাই ফজরের এই দীর্ঘ পথচলাকে অব্যাহত রাখতে পারে।
আশা করি, আমাদের এই অনিবার্য সীমাবদ্ধতাকে আপনারা সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং দ্বীনি জ্ঞান ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারের এই প্রয়াসকে অব্যাহত রাখতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।
আল্লাহ তায়ালা আপনাদের সহযোগিতা কবুল করুন এবং উত্তম প্রতিদান দান করুন।
প্রকাশক
পাক্ষিক ফজর
১২, আলতাপোল লেন, খুলনা
সুরা কাহফ: ঢাল ও আলোকবর্তিকা
আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য বিভিন্নভাবে বিশেষ নেয়ামত ও ফজিলত দান করেছেন। কখনো বিশেষ কোনো দিনকে, কখনো কোনো সময়কে, কখনো কোনো আমলকে এবং কখনো কোরআনের কোনো সুরা বা আয়াতকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। বিশেষ সুরাগুলোর একটি হচ্ছে সুরা কাহ্ফ।
আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত বিশেষ দিনগুলোর একটি জুমার দিন। সেই জুমার দিনে মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে ফজিলতপূর্ণ অনেক আমল। এগুলোর মধ্যে একটি আমল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে জুমার দিনে ‘সুরা কাহ্ফ’ তিলাওয়াত করা। সুরা কাহ্ফ পবিত্র কোরআনের ১৮ নম্বর সুরা। এর শুরু হয়েছে ১৫তম পারায় এবং এতে আয়াত রয়েছে ১১০টি।
জুমার দিনে ‘সুরা কাহ্ফ’ তিলাওয়াতের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহ্ফ পড়বে, তার (ঈমানের) নূর এই জুমা থেকে আগামী জুমা পর্যন্ত চমকাতে থাকবে।’ (মিশকাত)। সুরা কাহ্ফের আরো একটি বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আমরা পবিত্র হাদিস থেকে জানতে পারি। বারাআ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি সুরা কাহ্ফ তিলাওয়াত করছিলেন। তার ঘোড়াটি দুটি রশি দিয়ে তার পাশে বাঁধা ছিল। তখন এক টুকরো মেঘ এসে তার উপর ছায়া দান করল। মেঘখণ্ড ক্রমেই নিচের দিকে নেমে আসতে লাগল। আর তার ঘোড়াটি ভয়ে লাফালাফি শুরু করে দিল। সকালবেলা যখন লোকটি নবী (সা.)-এর কাছে ওই ঘটনার কথা ব্যক্ত করেন, তখন তিনি বললেন, এ ছিল আস-সাকিনা (প্রশান্তি/ফেরেশতা), যা কোরআন তিলাওয়াতের কারণে নাজিল হয়েছিল।’ (বুখারি)
শুধু তা-ই নয়, সুরা কাহ্ফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ফজিলত রয়েছে, সেটা হচ্ছে দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তির মাধ্যম। দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার জন্য সুরা কাহ্ফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করার নির্দেশ হাদিসে এসেছে। অন্য একটি বর্ণনায় শেষ ১০ আয়াতের কথাও রয়েছে। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সুরা আল-কাহ্ফের প্রথম ১০টি আয়াত মুখস্থ করবে তাকে দাজ্জালের অনিষ্ট হতে নিরাপদ রাখা হবে।’ (মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় শেষ ১০ আয়াতের কথা রয়েছে।
দাজ্জালের ফিতনা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। শেষ যুগে বহু মানুষ দাজ্জালের ফিতনায় বিভ্রান্ত ও পরীক্ষিত হবে। দাজ্জালের ফিতনা কতটা ভয়ংকর হবে, তা কিছুটা আলোকপাত করা যাক। দাজ্জালের ফিতনাগুলোর অন্যতম একটি ভয়ংকর ফিতনা হবে, তার সঙ্গে এমন কিছু থাকবে, যা বাহ্যিকভাবে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো মনে হবে। কিন্তু বাহ্যিকভাবে যেটা জান্নাত দেখা যাবে, প্রকৃতপক্ষে সেটা হবে জাহান্নাম। যেটা দেখতে জাহান্নাম মনে হবে, সেটাই হবে জান্নাত। হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) দাজ্জাল সম্পর্কে বলেছেন, ‘দাজ্জালের আবির্ভাবকালে তার সঙ্গে পানি এবং আগুন থাকবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যা আগুন মনে হবে, প্রকৃতপক্ষে তা হবে ঠান্ডা পানি। আর যা পানি মনে হবে, সেটি হবে মূলত দাউ দাউ করা আগুন। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই সময়ের মুখোমুখি হবে, সে যেন দাজ্জালের আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে; কারণ সেটি হবে সুমিষ্ট ও শীতল পানি।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
আমাদের সর্বদা যাবতীয় ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে হবে এবং দাজ্জাল থেকে দূরে থাকতে হবে। তাছাড়া দাজ্জালের আবির্ভাবের আগেও পৃথিবীতে নানা ধরনের ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। তাই নিজেদের সর্বদা হিফাজত করতে হবে। আর তার অন্যতম উপায় হচ্ছে সুরা কাহ্ফের তিলাওয়াত এবং প্রথম ও শেষ ১০ আয়াত মুখস্থ করা। দাজ্জালের আবির্ভাবের সময় মুসলিমদের জন্য মক্কা-মদিনায় অবস্থান করা নিরাপদ হবে। কারণ দাজ্জালের ফিতনার সময় মক্কা ও মদিনা বিশেষভাবে নিরাপদ থাকবে। দাজ্জাল এ দুই নগরীতে প্রবেশ করতে পারবে না। নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দাজ্জাল বের হওয়ার কথা শুনবে, সে যেন তার কাছে না যায়। আল্লাহর শপথ! এমন একজন লোক দাজ্জালের কাছে যাবে, যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। অতঃপর সে দাজ্জালের সঙ্গে প্রেরিত সন্দেহময় জিনিসগুলো ও তার কাজকর্ম দেখে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমানহারা হয়ে তার অনুসারী হয়ে যাবে।’ (আবু দাউদ)
দাজ্জালের ফিতনাগুলোর আরেকটি হচ্ছে, তার কপালে আরবি অক্ষরে কাফের লেখা থাকবে। কিন্তু অমুসলিম ও মোনাফেকরা তা পড়তে পারবে না, যদিও তারা শিক্ষিত হবে। আর ঈমানদাররা তা পড়তে পারবেন তারা নিরক্ষর হলেও। তাই এই ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য আমাদের ঈমানের যত্ন নেওয়া উচিত। সুরা কাহ্ফের তিলাওয়াত নিয়মিত করলে আমাদের ঈমান সেই ফিতনা মোকাবিলা করতেও প্রস্তুত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
দাজ্জালের আরো একটি ভয়ংকর ফিতনা হবে, দাজ্জাল মৃতকে জীবিত এবং জীবিতকে মৃত্যু দেওয়ার মতো ক্ষমতা পাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে। তার এই ক্ষমতায় অসংখ্য মুসলিম দ্বিধায় পড়ে ঈমানহারা হয়ে যাবে। দাজ্জাল তার কর্মকাণ্ডে শয়তানের সহযোগিতা নেবে। শয়তান কেবল মিথ্যা, গোমরাহি এবং কুফরি কাজেই সাহায্য করে থাকে। এ সম্পর্কে হাদিসের কিতাবে বর্ণিত আছে, নবী (সা.) বলেন, ‘দাজ্জাল মানুষের কাছে গিয়ে বলবে, আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেখাই, তাহলে কি তুমি আমাকে প্রভু হিসেবে মানবে? সে বলবে, অবশ্যই মানব। এ সুযোগে শয়তান তার পিতা-মাতার আকৃতি ধরে সন্তানকে বলবে, হে সন্তান! তুমি তার অনুসরণ করো। সে তোমার প্রতিপালক।’ (ইবন মাজাহ)
এমন কঠিন অবস্থায় কীভাবে মুসলিমদের ঈমান রক্ষা করা সম্ভব? যখন একজন সাধারণ মুসলিম চোখের সামনে জান্নাত-জাহান্নাম দেখতে পাবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবে। সে বুঝতেও পারবে না, সেটা যে ধোঁকা, সেটাই জাহান্নাম। যখন তার মৃত পিতা-মাতা জীবিত হয়ে দাজ্জালকে প্রতিপালক মানতে বলবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে বিশ্বাস করে নেবে। কারণ তখন অধিকাংশ মুসলিমের ঈমান হবে দুর্বল। সেই কঠিন মুহূর্তেও একজন মুসলিম নিজের ঈমানের হিফাজত করবেন এই সুরার মাধ্যমে। তাছাড়া এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত এই সুরা তিলাওয়াতকারীর জন্য নূর হয়ে থাকবে।
হৃদয়ের আলো তাহাজ্জুদ
তাহাজ্জুদ শব্দটি গভীর রাতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখে। রাত গভীর হলেই তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত হয়। হৃদয়ের আবেগ ঢেলে প্রেমপেয়ালা পরিপূর্ণ করার সময় হলো তাহাজ্জুদ। সেজদায় রবের কাছে গিয়ে প্রেমালাপের উত্তম তরিকা তাহাজ্জুদ। মনের ভাষাগুলো চোখ দিয়ে বের করে হাতে ও মুখে শান্তি মাখানোর নাম-ই তাহাজ্জুদ।
তাহাজ্জুদের ওয়াক্তে রব বান্দার খুব কাছাকাছি চলে আসেন। বান্দারও সুযোগ থাকে রবকে কাছে পেয়ে সব হাজত তুলে ধরার। দুনিয়াবাসী এ সময় ঘুমের কোলে পরম আরামে থাকে। আরশ থেকে নামা রবের বিশেষ রহমত পেতে বান্দার আরাম বিসর্জন দেওয়া জরুরি। ইবাদত যত ত্যাগ ও মেহনতময় হবে, তত লাভজনক হবে এর ফল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ (মুসলিম: ১১৬৩)
গোনাহ মাফ, নৈকট্যলাভ ও মন ভালো রেখে মন্দ থেকে দূরে থাকার অন্যতম পথ হলো রাতের নামাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজ আদায় করা উচিত। কারণ, রাতে ইবাদত করা তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের রীতি। এটি তোমাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের পথ, গোনাহ মাফের উপায় এবং অপরাধ-অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার মাধ্যম।’ (সহিহ ইবনে খুজাইমা: ১১৩৫)
পৃথিবীর প্রাসাদ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর মাটিও ইসরাফিল (আ.)-এর ফুঁতকারের অপেক্ষায়। আকাশ-মাটি সব ধ্বংস হবে। দুনিয়ার প্রাসাদ তো দুনিয়ার চোখে নামমাত্র সুন্দর, কিন্তু রাতজাগা ইবাদতকারীদের জন্য রয়েছে, অবর্ণনীয় সুন্দরের জান্নাতি চিরস্থায়ী প্রাসাদ। হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতের মধ্যে প্রাসাদগুলো এমন হবে যে, এর ভেতর থেকে বাইরের সবকিছু দেখা যাবে এবং এর বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছু দেখা যাবে।’ এক বেদুইন দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! এসব কাদের জন্য? তিনি বললেন, ‘যারা মানুষের সঙ্গে নরম কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়, সিয়াম পালন করে এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় করে ।’ (তিরমিজি: ২৫২৭)
আমরা মানুষ। আল্লাহর বান্দা। তিনি জানেন আমরা অপরাধ করতে পারি! তাই তো, তিনিই ক্ষমার অপার সুযোগ রেখে তাহাজ্জুদের সময় নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে আমাদের ডাকতে থাকেন। সাহাবি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে আমাদের পরওয়ারদিগার আমাদের নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন—কেউ আছে কি! যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কেউ আছে কি! যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দিয়ে দেব। কেউ আছে কি! যে আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।’ (বুখারি: ৬৩২১)
প্রকৃত মুমিনরা শেষ রাতে আল্লাহর সান্নিধ্যের টানে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। তাহাজ্জুদকে সেতু বানিয়ে সেজদার বাহনে চড়ে চলে যায় মহান রবের দরবারে। আল্লাহর দরবারের চেয়ে উত্তম গন্তব্য মুমিনের আর কী হতে পারে! রব আমাদের সবাইকে কবুল করুন।
হিংসা: অন্তরের কঠিন রোগ যা আমল নষ্ট করে
একটি ইসলামী সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভ্রাতৃত্ববোধ। আর হিংসা ভ্রাতৃত্ববোধকে ধ্বংস করে। মহানবীর পবিত্র জীবনাদর্শের অন্যতম সৌন্দর্য হলো হিংসা না করা। তিনি তাঁর প্রিয় সাহাবি এবং দীর্ঘদিনের খাদেম হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-কে বলেন, “হে বৎস! তুমি যদি সকাল ও সন্ধ্যা এমনভাবে পার করতে পারো যে, তোমার অন্তরে কারো প্রতি কোনো হিংসা, বিদ্বেষ বা অকল্যাণ কামনা নেই—তবে তুমি তা-ই করো।” এরপর তিনি যোগ করেন: “হে বৎস! আর এটাই হলো আমার সুন্নাত বা আদর্শ। আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে জীবিত করল (ভালোবাসল), সে মূলত আমাকেই ভালোবাসল। আর যে আমাকে ভালোবাসল, সে জান্নাতে আমার সাথেই থাকবে।” (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭৮)
আল্লাহর রসূল শত্রুর সাথেও হিংসা করতেন না। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তাঁর ঘোর শত্রুদেরও বিনাশর্তে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। যারা তাঁকে মক্কা থেকে তাড়িয়েছিল, তাঁদের প্রতি কোনো প্রতিশোধ বা হিংসা নেননি। তায়েফে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হওয়ার পরও তিনি তাঁদের ধ্বংস কামনা না করে হেদায়েতের দোয়া করেছিলেন।
মহানবীর মহান সাহাবাগণ আল্লাহর রসূলকে এবং তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শকে তাঁদের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। মদীনার আওস ও খাজরাস গোত্র বংশানুক্রমে শত্রুতা ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্যে এসে তারা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। মক্কা থেকে যেসব মুসলিম কাফেরদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মদীনায় হিজরত করে তাদেরকেও তারা ভাই বলে বুকে আগলে নেন এবং নিজেদের ঘর-বসতিতে আশ্রয় দেন।
এক হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) তাঁর এক সাহাবিকে জীবিতাবস্থায় “জান্নাতি” বলে ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে জানা যায়, সেই সাহাবির বিশেষ আমল ছিল—তিনি প্রতিদিন ঘুমানোর আগে তাঁর অন্তরে কোনো মুসলিমের প্রতি হিংসা বা ক্ষোভ রাখতেন না এবং সবাইকে ক্ষমা করে দিতেন।
বস্তুত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত বা আদর্শ কেবল বাহ্যিক পোশাক-পরিচ্ছদ বা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্তরের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং মানুষের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষহীন মন রাখা তাঁর অন্যতম প্রধান সুন্নাত। কোনো মানুষের ক্ষতি বা অকল্যাণ চিন্তা না করে দিন পার করতে পারলে হাশরের ময়দানে আল্লাহর দরবারে হিসাব-নিকাশ অনেক সহজ হয়ে যায়। অন্তরে ক্ষোভ বা অহংকার না রেখে সবাইকে ক্ষমা করে ঘুমাতে যাওয়া মানুষকে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে জান্নাতে থাকার সৌভাগ্য এনে দেয়।
হিংসা একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি। আল্লাহর রসূল শুধু নিজে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকেননি, বরং পুরো মানবজাতিকে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
আল্লাহর রসূল সাহাবাদের হিংসা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতেন, ‘তোমরা একে অন্যের সঙ্গে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করবে না। পরস্পর শত্রুতা করবে না। পারস্পরিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করবে না।’ তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৪২৪)
খাঁটি ঈমান নিয়ে জান্নাতে যেতে হলে অন্তরকে হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত রাখা আবশ্যক। তওবা না করে যদি কেউ অন্তরে স্থায়ীভাবে হিংসা পোষণ করে মারা যায়, তবে তার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আগুন যেভাবে শুকনো কাঠ বা ঘাস পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, তেমনি হিংসাও মানুষের নেক আমলগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। তিনি আরও বলতেন- মুমিন একে অপরের ভাই। অন্যের নেয়ামত দেখে কষ্ট পাওয়া বা তা নষ্ট কামনা করা প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। তিনি বলতেন, অন্তরে হিংসা রেখে জান্নাতের পবিত্র পরিবেশে প্রবেশ করা যায় না, কারণ জান্নাতিদের অন্তর থেকে সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ চিরতরে দূর করে দেওয়া হবে।
হিংসুক ব্যক্তি মূলত আল্লাহর বণ্টন করা তাকদির বা ফয়সালার ওপর অসন্তুষ্ট হয়। তারা অন্যের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বা রিজিক দেখে হিংসা করে। এটা আসলে বোকামি। কারণ রিজিকের মালিক আল্লাহ। আল্লাহ অফুরন্ত রিজিকের মালিক। সুতরাং অন্যের প্রতি হিংসা না করে আল্লাহর কাছে রিজিক প্রার্থনা করাই শ্রেয়।
কোনো ব্যক্তির মাঝে হিংসার প্রবৃত্তি দেখা দিলে তাকে অবিলম্বে তওবা করতে হবে এবং নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
অন্তরকে হিংসা ও বিদ্বেষের মতো মারাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং ইসলামি স্কলারদের নির্দেশনা অনুযায়ী, মনকে হিংসামুক্ত রাখার প্রধান উপায়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. আল্লাহর তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থাকা মনোভাব: হিংসা মূলত জন্ম নেয় যখন কেউ অন্যের ভালো কিছু দেখে ঈর্ষা করে। সমাধান: মনে প্রাণে বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ যাকে যতটুকু দিয়েছেন তা তাঁরই ফয়সালা। আল্লাহর বণ্টনের ওপর সন্তুষ্ট থাকলে (যাকে ইসলামে ‘রেজা বিল কাজা’ বলা হয়) মন থেকে হিংসা দূর হয়ে যায়।
২. অন্যের জন্য দোয়া করা আমল: কারো প্রতি হিংসা তৈরি হলে, উল্টো তাঁর নেয়ামত বৃদ্ধি এবং কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে গোপনে দোয়া করুন। ফলাফল: হাদিস অনুযায়ী, আপনি যখন অন্যের জন্য দোয়া করবেন, ফেরেশতারা আপনার জন্যও একই দোয়া করবেন। এতে শয়তান পরাজিত হয় এবং অন্তরের হিংসা ভালোবাসায় রূপ নেয়।
৩. সালামের ব্যাপক প্রচলন করা রাসূলের (সা.) শিক্ষা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে? তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের ব্যাপক প্রচলন করো।” (সহিহ মুসলিম)। সালাম মানুষের অহংকার ও হিংসা ধুয়ে দেয়।
৪. উপহার আদান-প্রদান করা পদ্ধতি: যার প্রতি মনের ভেতর হিংসা বা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তাকে ছোটখাটো কোনো উপহার দিন। উপকারিতা: হাদিসে এসেছে, “তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, এতে তোমাদের মধ্যকার পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে এবং হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে।” (আল-আদাবুল মুফরাদ)।
৫. নিজের চেয়ে কম সৌভাগ্যবানদের দিকে তাকানো দৃষ্টিভঙ্গি: পার্থিব ধন-সম্পদ ও ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে সবসময় নিজের চেয়ে নিচের স্তরের মানুষের দিকে তাকানো উচিত। লাভ: এতে নিজের প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা (শুকরিয়া) প্রকাশ পায় এবং অন্যের ওপর হিংসা করার মানসিকতা তৈরি হয় না।
৬. নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার প্রার্থনা করা: অন্তরের পবিত্রতার জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে দোয়া করা। কোরআনে বর্ণিত এই দোয়াটি নিয়মিত পড়া যেতে পারে: “হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্বে যারা ঈমান এনেছে তাদের ক্ষমা করুন। আর ঈমানদারদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না।” (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০)
এই অভ্যাসগুলো নিয়মিত চর্চা করলে মানুষের অন্তর হিংসার অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
নর ও নারী সৃষ্টির রহস্য
পুরুষরা মহান আল্লাহর জালালি নাম তথা শক্তিমত্তা, শান-শওকত ও পরাক্রমের ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর নামগুলোর প্রতিফলন পছন্দ করে নিজেদের মধ্যে। অন্যদিকে নারীরা মহান আল্লাহর জামালি নাম তথা দয়া, প্রেম ও করুণার মত প্রশান্ত-সৌন্দর্য-জ্ঞাপক নামগুলোর প্রতিফলন পছন্দ করে নিজেদের মধ্যে।-এ কথাগুলো বলেছেন ইরানের বিশিষ্ট আলেম ও দার্শনিক মরহুম আয়াতুল্লাহ মুহাম্মাদ তাকি মেজবাহ ইয়াজদি।
মানুষ খোদায়ি নাম ও গুণগুলোর প্রকাশ :
তাঁর মতে মানুষ খোদায়ি নাম ও গুণগুলোর প্রকাশ। মানুষ মহান আল্লাহর নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় নিদর্শন। অন্য কথায় আধ্যাত্মিক রহস্যবাদীদের ভাষায় মানুষ হচ্ছে খোদায়ি নাম ও গুণগুলোর প্রকাশ।
পরিপূর্ণ মানব হচ্ছে সেইসব মানুষ যার মধ্যে খোদায়ি সব নাম ও গুণের প্রকাশ ঘটে যেমনটি ঘটেছে মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের মধ্যে। মহান আল্লাহর নামগুলো (আসমাউল হুসনা) ও গুণগুলোর রঙে রঙিন হতে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পুরুষরা যেমন মহান আল্লাহর উচ্চতর বা সর্বোচ্চ নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম নারীরাও সেই পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম যেমনটি আমরা দেখি নবী-নন্দিনী হযরত ফাতিমার (সা.আ) উচ্চ মর্যাদার ক্ষেত্রে।
নর ও নারীর ক্ষেত্রে খোদায়ি গুণাবলীর প্রকাশের ভিন্ন রূপ :
আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা (সা. আ.) ছিলেন মহানবীর (সা.) পবিত্র বা নিষ্পাপ আহলে বাইতের সদস্য যার ইঙ্গিত রয়েছে পবিত্র কুরআনে। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের দিক থেকে তাঁরা ছিলেন প্রায় একই পর্যায়ের। কিন্তু নারী ও পুরুষ হিসেবে তাঁদের মধ্যে খোদায়ি নামগুলোর প্রকাশে ভিন্নতা রয়েছে।
হযরত আলী (আ.) ছিলেন মহানবীর (সা.) স্থলাভিষিক্ত ও প্রতিনিধি এবং পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত মহানবীর (সা.) আহলে বাইতের এমন একজন সদস্য যিনি বীরত্ব, সাহসিকতা, ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়তার জন্য খ্যাতিমান। অন্যদিকে হযরত ফাতিমা জাহরা (সা. আ.)ও ছিলেন মহানবীর (আ.) সেই আহলে বাইতেরই এমন এক সদস্য যার দয়া ও অন্যদের কল্যাণ বা সাহায্যের জন্য উদারতা, ইবাদাত এবং এ ধরনের আরও মহতী গুণের জন্য খ্যাতিমান।
এভাবে আমরা দেখছি দু’জন পূর্ণাঙ্গ বা পরিপূর্ণ মানব যাদের রয়েছে বিশেষ ধরনের উচ্চতর খোদায়ি গুণাবলী।
আল্লাহর গুণগুলো দুই ধরনের: জালালি বা মহামহিম কিছু গুণ যেমন শক্তিমত্তা, শান-শওকত, গৌরব ও পরাক্রম ইত্যাদি এবং জামালি বা সৌন্দর্যবোধক কিছু গুণ যেমন, সৌন্দর্য, আলো, দয়া ও করুণা ইত্যাদি।
নারী ও পুরুষ হচ্ছে মহান আল্লাহর এই দুই ধরনের খোদায়ি গুণের প্রকাশ :
তাই মানুষ যদি পূর্ণতার পথে সঠিকভাবে এগিয়ে যায় তাহলে তারা মহান আল্লাহর নামগুলোর প্রতিফলক হতে পারে। পুরুষরা মহান আল্লাহর জালালি নাম তথা শক্তিমত্তা, শান-শওকত ও পরাক্রমের ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর নামগুলোর প্রতিফলন পছন্দ করে নিজেদের মধ্যে। অন্যদিকে নারীরা মহান আল্লাহর জামালি নাম তথা দয়া, প্রেম ও করুণার মত প্রশান্ত-সৌন্দর্যজ্ঞাপক নামগুলোর প্রতিফলন পছন্দ করে নিজেদের মধ্যে।
আর এসবই নারী ও পুরুষ সৃষ্টির নেপথ্যে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর বিচক্ষণ পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত যা সৃষ্টি জগতকে ঘিরে রেখেছে যাতে তারা মহান আল্লাহর দুই ভিন্ন ধরনের গুণগুলোর প্রকাশ বা প্রতিফলন ঘটায় এবং জীবন সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা পায়।
জান্নাতে যাওয়ার পথ যেভাবে সুগম করে সদকা
কোরআন, হাদিসে গোপন ও প্রকাশ্যে দান সদকা করার কথা বলা হয়েছে। দান-সদকা বিপদাপদ থেকে মুক্ত করে। এর সওয়াব মানুষ পরকালেও পেয়ে থাকে। মানুষ যখন মারা যায়, তখন তিনটি আমল ছাড়া তার সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সেই তিনটি জিনিস হলো, প্রবাহমান দান বা সাদকায়ে জারিয়া, তার রেখে যাওয়া জনকল্যাণমূলক জ্ঞান এবং এমন সুসন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।
মহানবী (সা.) সদকার নানা বরকত ও সুবিধার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সদকা বিপদ-আপদ প্রতিরোধ করে, গুনাহ মুছে ফেলে, আল্লাহর অসন্তোষ থেকে রক্ষা করে, জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং আয়ু বরকতময় করে।
মহানবী (সা.) আল্লাহর নামে কসম খেয়ে আরও বলেছেন, সদকা কখনোই সম্পদ কমায় না। বরং তা সম্পদ বৃদ্ধি করে এবং তাতে বরকত আনে।
বেশি বেশি দান-সদকা করতে এবং সদকা করার ক্ষেত্রে বিলম্ব না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে পবিত্র কোরআনে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগেই আমি যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে দান করো। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে যদি আরও অল্প কিছুদিন সময় দেওয়া হতো, তবে আমি দান করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। (সুরা আল-মুনাফিকুন: ১০)
মহানবী (সা.) হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর একটি গল্প বর্ণনা করেছেন, যেখানে সাদকার প্রভাব ফুটিয়ে তুলতে একটি সুন্দর রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। নবী ইয়াহইয়া (আ.) একবার বনি ইসরাইলকে সম্বোধন করে বলেছিলেন: আল্লাহ আমাকে তোমাদের সদকা করার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেছেন। কারণ যে ব্যক্তি সদকা দেয় তার উদাহরণ সেই ব্যক্তির মতো, যাকে শত্রুরা বন্দি করেছে; তারা তার হাত ঘাড়ে বেঁধে মৃত্যুদণ্ডের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। তখন সে তার কাছে থাকা সবকিছু দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে সে মুক্তি পায়। (তিরমিজি)
এখান থেকে শিক্ষা হলো, সদকা হলো এমন এক মাধ্যম যার মাধ্যমে আমরা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পেতে পারি। সদকা আমাদের জীবনের সেই শিকলগুলো কেটে ফেলার উপায় যা আমাদের জীবনকে সংকুচিত করে এবং প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনে বাধা দেয়।
সৌভাগ্যবশত, পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভের জন্য আমাদের দান করার ক্ষেত্রের কোনো অভাব নেই। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ দরিদ্র মানুষ প্রতিদিন আমাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী। তবে দান করার ক্ষেত্রে বাস্তব উপযোগীদের খুঁজে বের করতে হবে এবং দেখতে হবে আসলে কারা দান ও সদকা গ্রহণের উপযোগী।
সুতরাং, সদকা শুধু অর্থের বিনিময়ে নয়, হাসিমুখ, সৎ পরামর্শ বা পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাও সদকার অংশ। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত সদকার অভ্যাস গড়ে তোলাই জান্নাতের পথকে সুগম করার অন্যতম সেরা উপায়।
আল্লাহর কাছে কীভাবে দোয়া করবেন
মল্লিক শিহাব ইকবাল
আল্লাহর কাছে কীভাবে দোয়া বা প্রার্থনা করতে হয়—সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আগে, তাঁর ইবাদত কীভাবে করতে হবে, সেই বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা করা প্রয়োজন।
মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করার পর তাঁর একত্ব ও প্রভুত্বের স্বীকৃতি নেন এবং আমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেন যে, তিনিই আমাদের একমাত্র স্রষ্টা। এই সাক্ষ্য নেওয়ার পর তিনি আমাদের আদিপিতা হযরত আদম (আ.)-এর বংশধারায় ফিরিয়ে দেন। এরপর থেকে মানুষের জন্মপ্রক্রিয়া অনুযায়ী একে একে প্রত্যেককে তার পূর্বপুরুষের বংশে রাখা হয় এবং তাঁর নির্ধারিত উপযুক্ত সময়ে আমাদের এই দুনিয়াতে পাঠানো হয়। আর আমাদের এই দুনিয়ায় পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য একটাই কেবলমাত্র তাঁর ইবাদত বা দাসত্ব করা।
আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখাতে বিভিন্ন যুগে নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন। তাঁদের মূল দায়িত্ব ছিল একমাত্র তাঁরই ইবাদত করতে শেখানো এবং অন্য সব উপাস্য থেকে দূরে রাখা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে, সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনব্যবস্থা ইসলাম এবং পবিত্র আল-কুরআনকে। এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো, আমরা কীভাবে তাঁর সঠিক ইবাদত করতে পারব এবং এই লক্ষ্য অর্জনের সর্বোত্তম উপায়গুলো কী কী সে বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা ও সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন সৃষ্টির সেরা ব্যক্তিত্ব রাসূল, আমাদের নেতা মুহাম্মদ (সা.)। একবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল ‘ইবাদত’ বা উপাসনা কী? তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “দোয়াই হলো ইবাদত।” এরপর তিনি কুরআনের এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেছিলেন: “আর তোমাদের পালনকর্তা বলেন: ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব; নিশ্চয়ই যারা আমার ইবাদত করতে অহংকার করে, তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে’” (সুরা আল-মুমিন: ৬০)।
পবিত্র কুরআনে যেমনটি বলা হয়েছে, ‘দোয়া’ বা প্রার্থনা হলো ইবাদত বা উপাসনার সর্বোচ্চ শিখর -এই বিষয়টি এবং দোয়ার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যে আমরা কুরআনের কয়েকটি আয়াত উপস্থাপন করতে চাই:
“বলুন: তোমাদের দু‘আ (প্রার্থনা) না থাকলে আমার রব তোমাদের কোনো পরোয়া করতেন না।” (সুরা আল ফুরকান: ৭৭)
“আর তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, নিজে সৎকর্ম করে এবং বলে: আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত”? (সুরা হা-মীম সেজদাহ: ৩৩)
“তারা যাদেরকে ডাকে, তারা নিজের্ইা তো তাদের রবের কাছে নৈকট্যের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে তাঁর নিকটতর? আর তারা তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর আযাবকে ভয় করে। নিশ্চয় তোমার রবের আযাব ভীতিকর।” (সুরা বনী ইসরাঈল: ৫৭)
“আর তুমি নিজকে ধৈর্যশীল রাখ তাদের সাথে, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, এবং দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তোমার দু’চোখ যেন তাদের থেকে ঘুরে না যায়। আর ওই ব্যাক্তির আনুগত্য করো না, যার অন্তরকে আমি আমার যিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে এবং যার কর্ম বিনষ্ট হয়েছে।”(সুরা আল কাহাফ: ২৮)
“তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।” (সুরা আস সেজদা: ১৬)
“অতঃপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া। আর তার জন্য তার স্ত্রীকে উপযোগী করেছিলাম। তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।” (সুরা আল আম্বিয়া: ৯০)
“এ কারণে তুমি আহ্বান কর এবং দৃঢ় থাক যেমন তুমি আদিষ্ট হয়েছ। আর তুমি তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না এবং বল, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন আমি তাতে ঈমান এনেছি এবং তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ আমাদের রব এবং তোমাদের রব। আমাদের কর্ম আমাদের এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের; আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন বিবাদ-বিসম্বাদ নেই; আল্লাহ আমাদেরকে একত্র করবেন এবং প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে।” (সুরা আশ্্ শূরা: ১৫)
“আর আমি তোমাদের ও আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদাত তোমরা কর তাদের পরিত্যাগ করছি এবং আমি আমার রবের ইবাদাত করছি। আশা করি আমার রবের ইবাদত করে আমি ব্যর্থ হব না।” (সুরা মারইয়াম: ৪৮)
“তিনিই চিরঞ্জীব; তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। সুতরাং, তাঁর প্রতি আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকেই ডাকো।” (সুরা আল মুমিন: ৬৫)
“সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বৃদ্ধ বয়সে আমাকে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দোআ শ্রবণকারী।”(সুরা ইব্রাহীম: ৩৯)
“আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে।” (সুরা আল বাকারা: ১৮৬)
সৃষ্টির জন্য দোয়ার গুরুত্বের ওপর জোর প্রদানকারী এবং সৃষ্টিকর্তার নিকট দোয়ার মর্যাদা স্পষ্টকারী যেসব আয়াত পবিত্র কুরআনে রয়েছে, এগুলো তার কয়েকটি নমুনা মাত্র।
আল্লাহর মহানতম নাম সম্বলিত একটি দোয়া:
ইমাম আল-হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবূ তালিব (আ.) থেকে নিম্নোক্ত ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে:
আমরা যখন কাবা শরীফের চারপাশে তাওয়াফ করছিলাম, তখন কাউকে কবিতার এই পংক্তিগুলো আবৃত্তি করতে শুনলাম:
হে আর্তের ডাকে সাড়াদানকারী এবং গভীর অন্ধকারেও যারা প্রার্থনা করে তাদের আহবানে সাড়া দাতা; হে সকল পরীক্ষা, বেদনা ও বিপদ-আপদ দূরকারী! আপনার পবিত্র গৃহের চারপাশে সমবেত হয়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা আপনার অতিথিরা; তাঁরা বিনীত প্রার্থনা নিবেদন করছেন—আর আল্লাহ তো সর্বদা জাগ্রত ও সর্ববিষয়ে অবহিত। হে প্রভু, আমি আপনার কাছে আমার কৃত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি; আপনার অনুগ্রহেই আপনার সৃষ্টি আপনাকে পরম দয়ালু হিসেবে চেনে—তাই আপনার পবিত্র সত্তার জ্যোতির উসিলায় আমি আপনার কাছে মিনতি করছি! যদি কোনো পাপী আপনার ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভ না-ই করে, তবে সীমালঙ্ঘনকারীদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের আর কে আছে?
ইমাম আরও বলেন, “আমার পিতা আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) বললেন, ‘হে হুসাইন! তুমি কি শুনছ না কেউ একজন তার পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তার রবের কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে? যাও এবং তাকে এখানে নিয়ে এসো।’ আমি দ্রুত তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। আমি দেখলাম তিনি এক সুদর্শন ব্যক্তি; তাঁর শরীরে কোনো শারীরিক ত্রুটি ছিল না এবং পরিধেয় বস্ত্রও ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন; এমনকি তাঁর শরীর থেকে সুবাসও ভেসে আসছিল। তবে আমি লক্ষ্য করলাম যে, তাঁর শরীরের ডান পাশটি অবশ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। আমি তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে ‘আমীরুল মুমিনীন’-এর (বিশ্বাসীদের নেতার) সামনে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিলাম। তিনি এলেন এবং আমীরুল মুমিনীন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কে এবং আপনার ঘটনাটি কী?’ লোকটি বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! এমন একজন ব্যক্তির অবস্থা কী হবে, যে ব্যক্তি যা করার জন্য আদিষ্ট হয়েছিল তা পালন করেনি, বরং এমন কাজ বেছে নিয়েছে যা শাস্তির যোগ্য?'”
ইমাম তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?” লোকটি উত্তর দিল, “লাহিকের পুত্র মুনযিল।” তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কাহিনী কী?” সে বলল, “যৌবনকালে আরবদের মধ্যে আমোদ-প্রমোদ ও পাপাচারের জন্য আমি বেশ পরিচিত ছিলাম; তখন আমি যেন এক গভীর অসচেতনতার ঘোরে আচ্ছন্ন ছিলাম। এখন যদি আমি তওবা করি, তবে তা কবুল হবে না; আর যদি নিজেকে শুধরানোর চেষ্টা করি, তবে তাও আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তাই রজব ও শাবানের মতো পবিত্র মাসগুলোতেও আমি আমার পাপাচার অব্যাহত রাখি। আমার বাবা আমার প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন।”
তিনি আমাকে আমার অজ্ঞতার পরিণাম এবং সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য অপেক্ষমান ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে বৎস! আল্লাহ যখন তাঁর ক্রোধ প্রকাশ করেন, তখন তিনি তাঁর পরাক্রমও প্রদর্শন করেন; তাই যারা জাহান্নামের আগুনে দণ্ডিত হবে, তাদের পথে তুমি পা বাড়িয়ো না। কারণ, কতবার না মানুষ তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে—এমনকি পবিত্র ফেরেশতাগণ, পবিত্র মাসসমূহ, রাত ও দিনগুলোও তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে!’ অথচ তিনি যখনই আমাকে উপদেশ ও ভর্ৎসনা করতে থাকতেন, আমি তখনই তাঁকে প্রহার করতে থাকতাম।
একদিন, আমার আচরণের কারণে তিনি যখন অত্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি রোজা রাখব এবং তা ভাঙব না; আমি নামাজ আদায় করব এবং ঘুমাব না…’ তিনি এক সপ্তাহ ধরে রোজা রাখলেন, এরপর একটি কৃশ উটে চড়ে হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন এবং বললেন, ‘আমি আল্লাহর ঘরে যাব এবং তোমার বিরুদ্ধে আমার পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাব।’ তিনি ‘হাজ্জে আকবার’-এর (প্রধান হজ বা আরাফার) দিন মক্কায় পৌঁছলেন, কাবা শরীফের গিলাফ আঁকড়ে ধরলেন এবং আমার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করলেন:
হে সেই সত্তা—যাঁর সান্নিধ্যে দূর-দূরান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা ছুটে আসে; কেউ আসে পায়ে হেঁটে, আবার কেউ বা বাহনে চড়ে—সেই মহিমান্বিত ও পালনকর্তার অনুগ্রহ লাভের আশায়, যাঁর দৃষ্টির আড়ালে কিছুই লুকানো যায় না। এই ‘মুনাজিল’ (অশুভ শক্তি বা আপদ) যেন থামতেই চায় না—যদিও আমি তাকে বারবার ধিক্কার জানাই; তাই এর উপযুক্ত শাস্তি বিধান করুন—কারণ আপনার বিচারাদেশ অমান্য করার সাধ্য কারো নেই। তার ওপর আঘাত হানুন এবং তার এক পাশ অবশ করে দিন; আপনি অনাদি ও অনন্ত—কারো জন্মদাতা বা জাতক নন, বরং আপনি চিরপবিত্র ও মহিমান্বিত!
“আমি সেই সত্তার শপথ করে বলছি যিনি আকাশকে উচ্চে স্থাপন করেছেন এবং পানি থেকে ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করেছেন—তিনি তাঁর কথা শেষ করতে না করতেই আমার শরীরের ডান পাশ সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গেল; আর আমি পবিত্র গৃহের আঙিনায় পড়ে থাকা এক টুকরো কাঠের মতো হয়ে রইলাম। লোকজন আসা-যাওয়ার পথে আমার সম্পর্কে বলত, ‘ইনি সেই ব্যক্তি যাঁর পিতার প্রার্থনার জবাব আল্লাহ দিয়েছেন।'”
ইমাম আলী (আ.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাবা কী করেছিলেন?” তিনি বললেন, “হে মুমিনদের নেতা! আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম যেন তিনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন—ঠিক যেভাবে তিনি অতীতে আমার বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিলেন—যেহেতু এখন তিনি আমার সাথে সন্ধি করেছেন এবং আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আমি তাঁকে একটি মাদী উটের পিঠে বসালাম এবং আমরা দ্রুত চলতে চলতে ‘আরাক’ উপত্যকায় পৌঁছলাম; এমন সময় হঠাৎ একটি পাখি গাছ থেকে উড়ে এসে উটটিকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল।”
“পথিমধ্যে আমার বাবা পড়ে গিয়ে মারা যান।” আলী (আ.) বললেন, “আমি কি তোমাকে এমন কিছু দোয়া শেখাব না যা আমি আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে শিখেছি এবং তিনি বলেছিলেন যে, কেউ যদি তা পাঠ করে তবে মহান আল্লাহ অবশ্যই তার বিপদ বা কষ্ট দূর করে দেন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, দয়া করে আমাকে শেখান!” ইমাম হুসাইন (আ.) উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁকে সেই দোয়াটি শেখালেন। তিনি তা পাঠ করলেন এবং তাঁর অসুস্থতা সেরে গেল; তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন। আমি সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কী করেছিলেন?”
তিনি বললেন, ‘সবাই শান্ত হয়ে গেলে আমি তা পাঠ করলাম; এরপর দ্বিতীয়বার এবং তারপর তৃতীয়বার তা পুনরাবৃত্তি করলাম। তখন আমি কাউকে বলতে শুনলাম: “আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট; কারণ তুমি তাঁকে তাঁর সেই মহান নামের (ইসমে আজম) মাধ্যমে আহ্বান করেছ—যে নামের উসিলায় কেউ প্রার্থনা করলে তিনি সাড়া দেন এবং কিছু চাইলে তিনি তা পূরণ করেন!” এরপর আমি ঘুমালাম এবং স্বপ্নে আল্লাহর রাসূলকে (সা.) দেখলাম। তিনি আমাকে বললেন, “আলী—আমার চাচাতো ভাই—সত্যই তোমাকে ঠিক কথা বলেছে; এতে সত্যিই আল্লাহর সেই মহান গুণবাচক নামটি রয়েছে, যার উসিলায় কেউ প্রার্থনা করলে তিনি সাড়া দেন এবং কিছু চাইলে তা পূরণ করেন।” এরপর আমি তাঁকে দ্বিতীয়বার স্বপ্নে দেখলাম এবং বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কণ্ঠে সেই দোয়াটি শুনতে আমার খুব ভালো লাগে!” তিনি বললেন,’
হে প্রভু! আমি আপনার নিকট মিনতি জানাই—হে অদৃশ্য সবকিছুর জ্ঞাতা! হে সেই সত্তা, যাঁর শক্তিতে আকাশমণ্ডল স্থাপিত ও পৃথিবী প্রসারিত হয়েছে এবং যাঁর মহিমার জ্যোতিতে সূর্য ও চন্দ্র আলোকিত ও উদ্ভাসিত হয়! হে সেই সত্তা, যিনি প্রতিটি বিশ্বাসী ও পবিত্র আত্মার সান্নিধ্যে আসেন! হে সেই সত্তা, যিনি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও পুণ্যবানদের ভীতি দূর করেন!
হে তিনি, যিনি তাঁর সৃষ্টির সকল প্রয়োজন পূরণ করেন; যিনি ইউসুফকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন; যাঁর কাছে পৌঁছানোর জন্য কোনো দ্বাররক্ষী নেই, যাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হওয়ার মতো কোনো সহায়তাকারী নেই, কিংবা যাঁর কাছে উৎকোচ দেওয়ার মতো কোনো উজির নেই; যাঁর ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই যে তাঁকে ডাকা হবে; এবং যিনি দান করার ফলে কেবল তাঁর দানশীলতা ও উদারতাই বৃদ্ধি পায়…—নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহাম্মদ ও তাঁর বংশধরের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন! তাই হে প্রভু, আমি আপনার কাছে আমার কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি প্রার্থনা করছি; কারণ আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।
“অতঃপর আমি জেগে উঠলাম এবং সুস্থ হয়ে গেলাম।” আলী (আ.) বললেন, “এই দোয়াটি আঁকড়ে ধরো, কারণ এটি জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর মধ্যে একটি।”
সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে পুলিশের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা হোসেইনি খামেনেয়ী জাতীয় পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিভিন্ন পর্যায়ে ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, বার্তায় আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে শত্রুপক্ষের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি এ বাহিনীর সদস্যদের নিরলস প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করেন। এ ছাড়া বাহিনীটির সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং তথ্য বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) পরিকল্পিত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।
তাঁর পূর্ণাঙ্গ বার্তাটি নিচে তুলে ধরা হলো।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
নিরাপত্তা মহান আল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। প্রিয় ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে—বড় শহর থেকে শুরু করে গ্রাম ও মহল্লার ক্ষুদ্রতম জনবসতি পর্যন্ত, বৈরী আবহাওয়া ও বিচিত্র ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে দুর্গম সীমান্ত পাহারা দেওয়া থেকে শুরু করে পাহাড়, সাগর, সমতল, বনাঞ্চল এবং দেশের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলো পর্যন্ত—নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৃতিত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী সদস্যদের বীরত্ব ও সাহসিকতার। তাঁরা ইরানের নিরাপত্তার অন্যতম মজবুত স্তম্ভ।
এই নিরাপত্তা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামাজিক ও নৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনসাধারণের স্বস্তি নিশ্চিত করে। এ ধরনের মূল্যবান সেবা আল্লাহর পথে জিহাদ হওয়ার পাশাপাশি জনগণের শক্তিশালী সমর্থনও লাভ করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেতৃত্ব ও সদর দপ্তর থেকে শুরু করে থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি পর্যন্ত সর্বস্তরে এ বাহিনীর অবদান বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় এ ভূমিকার প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
অপরাধী মার্কিন-ইসরায়েলি শত্রুশিবির পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে আঘাত হানার জন্য যে বিশেষ গুরুত্ব ও তৎপরতা দেখিয়েছে, তা এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।
কিন্তু সমাজের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ভিত্তিগুলোর ওপর চালানো শত্রুপক্ষের এই ন্যক্কারজনক ও বিদ্বেষপূর্ণ আঘাত—যার ঐতিহাসিক নজির নেই— সাহসী সদস্যদের দায়িত্ব পালনে সামান্যতম শিথিলতাও আনতে পারেনি। এমনকি রাস্তায় কিংবা যানবাহনে অবস্থান করেও তাঁরা তাঁদের নিজস্ব কর্মস্থল ও ঘাঁটিতে পালন করা দায়িত্ব ও কর্তব্য একইভাবে সম্পন্ন করেছেন।
এ কারণেই নির্যাতিত হয়েও শক্তিশালী ইরানি জাতি দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার জন্য তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
অন্যদিকে, সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সমাজের ভেতর থেকেই উঠে এসেছেন। জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টিকারী আচরণের মাধ্যমে তাঁরা এই মূল্যবান প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলতে পারেন।
অনেক সময় নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের পরিশ্রম ও আত্মত্যাগকে কিছু মানুষ স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে ধরে নিতে পারেন। কিন্তু তাঁদের এই অবমূল্যায়িত অবস্থান ও অখ্যাতিই মহান আল্লাহর দরবারে তাঁদের প্রতিদান আরও বাড়িয়ে দেয়।
নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর জনবল, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা—সব দিক থেকেই সার্বিক শক্তিশালীকরণ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং তথ্য বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিকল্পিত ব্যবহার ফারাজার দায়িত্ব পালনের মান উন্নত করা ও কার্যক্রম সহজতর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পুলিশের মর্যাদাবান শহীদদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদা ও তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করছি। এ বাহিনীর সব পরিবার, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেনাসদস্য ও সাহসী সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বিশেষ করে ফারাজার সাহসী, অক্লান্ত ও বিচক্ষণ কমান্ডার এবং তাঁর প্রচেষ্টার প্রশংসা করছি।
আমাদের নেতা—আল্লাহ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন—এর দোয়ার বরকতে আশা করি, ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা, শক্তি ও মর্যাদা আরও সমুন্নত করার ক্ষেত্রে তাঁরা আগের চেয়েও বেশি সফল হবেন।
সাইয়্যেদ মুজতবা হোসেইনি খামেনেয়ী
‘শারায়েউল ইসলাম’ প্রণেতা আল্লামা মুহাক্কিক হিল্লির (রহ.) জীবন ও কর্ম: একটি পর্যালোচনা
ড. এম. এ. কাইউম
সারসংক্ষেপ
ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ফিকাহ্শাস্ত্রের বিকাশ, বিন্যাস ও পদ্ধতিগত উপস্থাপনার ক্ষেত্রে আল্লামা আবুল কাসিম নাজমুদ্দিন জাফর ইবনে হাসান আল হিল্লি (রহ.) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ‘মুহাক্কিক হিল্লি’ নামে অধিক পরিচিত। তাঁর রচিত “শারায়েউল ইসলাম ফি মাসায়িলিল হালালে ওয়াল হারাম” ইমামিয়া শিয়া ফিকহের অন্যতম প্রভাবশালী গ্রন্থ। এ গ্রন্থে ইসলামের ব্যবহারিক বিধিবিধানকে সুসংবদ্ধ ও সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফিকহের পাশাপাশি উসুলুল ফিকহ, আকাইদ, যুক্তিবিদ্যা ও অন্যান্য জ্ঞানশাখায়ও তাঁর অবদান রয়েছে। এ প্রবন্ধে তাঁর জীবন, শিক্ষাজীবন, শিক্ষক-শিষ্য, রচনাবলি, ফিকহি চিন্তাধারা এবং মুসলিম জ্ঞান-ঐতিহ্যে তাঁর প্রভাব আলোচনা করা হয়েছে।
মূল শব্দ: মুহাক্কিক হিল্লি, শারায়েউল ইসলাম, ইমামিয়া ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, হিল্লা, ইসলামি আইনশাস্ত্র।
ভূমিকা
ইসলামি সভ্যতার বৌদ্ধিক ইতিহাসে ফিকহশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান কাজ হলো ধর্মীয় নির্দেশনা ও ব্যবহারিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যাকে সুসংবদ্ধ বিধিব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যে মুহাক্কিক হিল্লি (রহ.) উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর বিশেষত্ব শুধু বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ রচনা নয়; বরং জটিল ফিকহি বিষয়কে সুস্পষ্ট অধ্যায়, সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং ধারাবাহিক শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে উপস্থাপন করা।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “শারায়েউল ইসলাম” দীর্ঘকাল ধরে ইমামিয়া শিয়া ফিকহের শিক্ষাদান, গবেষণা ও আইনগত মতামত বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গ্রন্থখানার উপর পরবর্তী যুগে অসংখ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে লেখকের পাণ্ডিত্য, বিষয়বিন্যাসের দক্ষতা এবং ফিকহি ঐতিহ্যে তাঁর প্রভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো ঐতিহাসিক ও গ্রন্থভিত্তিক তথ্যের আলোকে মুহাক্কিক হিল্লির জীবন ও কর্মের পরিচয় তুলে ধরা এবং তাঁর প্রধান রচনা “শারায়েউল ইসলামের” বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব মূল্যায়ন করা।
জন্ম, পরিচয় ও ঐতিহাসিক পটভূমি
মুহাক্কিক হিল্লির পূর্ণ নাম: আবুল কাসিম নাজমুদ্দিন জাফর ইবনে হাসান ইবনে আবি যাকারিয়া ইয়াহইয়া আল হিল্লি। তিনি ৬০২ হিজরি মোতাবেক ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে ইরাকের হিল্লা নগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৭৬ হিজরি মোতাবেক ১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবনকাল ছিল এমন এক সময় যখন ইরাক ও পারস্য অঞ্চলে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা এবং ফিকহের বিভিন্ন শাখায় উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধিক কার্যক্রম চলছিল।
হিল্লা নগরটি মধ্যযুগে ইমামিয়া শিয়া জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সেখানে ফকিহ, মুহাদ্দিস, ধর্মতাত্ত্বিক ও অন্যান্য জ্ঞানশাখার পণ্ডিতগণ শিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। এই পরিবেশ মুহাক্কিক হিল্লির জ্ঞানচর্চা ও বৌদ্ধিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
‘মুহাক্কিক’ উপাধিটি তাঁর গভীর অনুসন্ধানী মনোভাব, গবেষণামূলক বিচারক্ষমতা এবং ফিকহি আলোচনায় সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে ‘হিল্লি’ উপাধিটি তাঁর জন্মস্থান হিল্লার সঙ্গে সম্পর্ক নির্দেশ করে। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র আল্লামা হাসান ইবনে ইউসুফ আল হিল্লিও পরবর্তী সময়ে একজন বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক ও ফকিহ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন
মুহাক্কিক হিল্লির প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয় পারিবারিক পরিবেশে। তাঁর পিতা ‘হাসান ইবনে ইয়াহইয়া’ ছিলেন একজন আলেম। প্রথমদিকে তিনি সাহিত্য ও কবিতার প্রতি আগ্রহী ছিলেন বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে তিনি ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং ফিকহ, উসুলে ফিকহ, কালাম ও যুক্তিবিদ্যার মত শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে জাফর ইবনে নুমা আল্ হিল্লি, ফাখখার ইবনে মা‘দ আল মুসাভি এবং মুহাম্মদ ইবনে জাহম আল্ হিল্লির নাম উল্লেখযোগ্য। এসব আলেমের নিকট থেকে তিনি ধর্মীয় জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনার পদ্ধতি শেখেন। পূর্ববর্তী ফকিহদের রচনা অধ্যয়ন, প্রচলিত মতামতের বিশ্লেষণ এবং যুক্তিনির্ভর পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁর নিজস্ব ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি পরিপক্ক হয়।
তাঁর জ্ঞানচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন মতামতকে যাচাই করে গ্রহণ করা। তিনি কেবল পূর্ববর্তী আলেমদের বক্তব্য সংকলন করেননি; বরং দলিল, যুক্তি এবং ফিকহি নীতির আলোকে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছেন। এ কারণেই তাঁর রচনাগুলো পরবর্তী যুগের ফকিহদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।
শিক্ষকতা, শিষ্যগঠন ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ
মুহাক্কিক হিল্লি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় হিল্লায় অবস্থান করে শিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন বলে ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর পাঠচক্রে বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম ও জ্ঞানানুরাগীরা অংশগ্রহণ করতেন। ফলে হিল্লা নগরের বৌদ্ধিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে ভ্রাতুষ্পুত্র আল্লামা হাসান ইবনে ইউসুফ আল্ হিল্লি বিশেষভাবে স্মরণীয়। আল্লামা হিল্লি পরবর্তী সময়ে ফিকহ, কালাম, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে অসামান্য অবদান রাখেন। চাচা ও ভ্রাতুষ্পুত্রের এই বিদ্যাচর্চার সম্পর্ক ইমামিয়া শিয়া জ্ঞান-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
মুহাক্কিক হিল্লির শিক্ষাদান ছিল তাঁর রচনাকর্মেরই সম্প্রসারণ। গ্রন্থে যে বিষয়গুলো তিনি সংক্ষিপ্ত ও সুসংবদ্ধভাবে উপস্থাপন করেছেন, পাঠদানের মাধ্যমে সেগুলোর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে এই জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে এবং ফিকহি আলোচনার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়।
৫. শারায়েউল ইসলাম: পরিচয় ও বিষয়বস্তু
মুহাক্কিক হিল্লির সর্বাধিক পরিচিত গ্রন্থের পূর্ণ নাম “শারায়েউল ইসলাম ফি মাসায়িলিল হালালে ওয়াল হারাম”। নামটির অর্থ হলো হালাল ও হারাম সংক্রান্ত বিধিবিধানের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধানসমূহ। গ্রন্থখানা ইমামিয়া শিয়া ফিকহের একটি সুবিন্যস্ত আইনগ্রন্থ যেখানে ধর্মীয় কর্তব্য, ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং সম্পদ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধান আলোচিত হয়েছে।
গ্রন্থখানার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সুসংগঠিত বিষয়বিন্যাস। এতে ফিকহি বিধানগুলোকে প্রধানত চারটি বৃহৎ শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়েছে:
১. ইবাদত: নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ও অন্যান্য ধর্মীয় কর্তব্যসংক্রান্ত বিধান।
২. উকুদ বা চুক্তি: বিবাহ, ক্রয়-বিক্রয় এবং বিভিন্ন চুক্তিভিত্তিক লেনদেনের বিধান।
৩. ঈকাআত বা একতরফা আইনগত কার্যক্রম: তালাক ও এ ধরনের অন্যান্য আইনগত কার্যক্রমের বিধান।
৪. আহকাম বা অন্যান্য বিধান: উত্তরাধিকার, বিচারব্যবস্থা, দণ্ডবিধি এবং বিভিন্ন ব্যবহারিক আইনগত বিষয়।
এই শ্রেণিবিন্যাসের ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আলোচনা করা সম্ভব হয়েছে। গ্রন্থখানার ভাষা তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত এবং বক্তব্য সুসংহত। ফলে এটি শিক্ষার্থী, গবেষক ও ফকিহদের জন্য একটি কার্যকর পাঠ্য ও রেফারেন্সগ্রন্থে পরিণত হয়েছে।
শারায়েউল ইসলামের বৈশিষ্ট্য ও ফিকহি গুরুত্ব
শারায়েউল ইসলামের গুরুত্ব প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে উপলব্ধি করা যায়। প্রথমত, গ্রন্থখানা ফিকহি বিষয়বস্তুকে সুসংবদ্ধভাবে বিন্যস্ত করেছে। দ্বিতীয়ত, এর সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা জটিল বিধানগুলো অধ্যয়ন ও স্মরণে সহায়তা করে। তৃতীয়ত, এর উপর পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিস্তৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হওয়ায় গ্রন্থখানা একটি দীর্ঘস্থায়ী গবেষণা-ঐতিহ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সংক্ষিপ্ততা মানেই বিষয়ের সরলীকরণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে মূল গ্রন্থে একটি বিধান সংক্ষেপে উপস্থাপিত হলেও তার দলিল, শর্ত, ব্যতিক্রম ও প্রয়োগ নিয়ে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারদের বিস্তারিত আলোচনা করতে হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য গ্রন্থখানাকে শুধু প্রাথমিক পাঠ্য হিসেবে নয়, বরং উচ্চতর ফিকহি গবেষণার ভিত্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পরবর্তী যুগে রচিত “জাওয়াহিরুল কালাম” এবং “মাসালিকুল আফহাম” গ্রন্থদ্বয় শারায়েউল ইসলামের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের ধারায় বিশেষভাবে পরিচিত। এসব রচনা দেখায় যে, মুহাক্কিক হিল্লির সংক্ষিপ্ত বক্তব্য পরবর্তী ফকিহদের কাছে দীর্ঘ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
তবে গ্রন্থখানার বিধানগুলোকে সব মুসলিম মাযহাবের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। এটি মূলত ইমামিয়া শিয়া ফিকহের ঐতিহ্যের অন্তর্গত। এর মূল্যায়নে তাই সংশ্লিষ্ট মাযহাবের উৎস, পরিভাষা ও পদ্ধতিগত কাঠামো বিবেচনা করা জরুরি।
অন্যান্য রচনা ও জ্ঞানক্ষেত্রে অবদান
মুহাক্কিক হিল্লির পাণ্ডিত্য শুধু শারায়েউল ইসলামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর অন্যান্য রচনাও ফিকহ ও ধর্মীয় চিন্তার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
ক. আল্ মুখতাসারুন্নাফি‘: এটি তাঁর ফিকহবিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। শারায়েউল ইসলামের তুলনায় সংক্ষিপ্ত বিন্যাসে ফিকহি বিষয়গুলো উপস্থাপন করায় এটি অধ্যয়ন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বিশেষ উপযোগী হয়ে উঠে।
খ. আল্ মু‘তাবারু ফি শরহিল মুখতাসার: এই গ্রন্থে ফিকহি বিষয়ের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ স্থান পেয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁর যুক্তিনির্ভর পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন মতামতের মূল্যায়ন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
গ. মা‘আরিজুল উসুল: এটি উসুলুল ফিকহ বা ইসলামী আইনতত্ত্বের উপর রচিত একখানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এতে ফিকহি বিধান নির্ণয়ের পদ্ধতি ও তাত্ত্বিক ভিত্তি আলোচিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, ইমামিয়া উসুলশাস্ত্রের বিকাশে এই গ্রন্থের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
ঘ. নাহজুল উসুল: উসুলুল ফিকহ বিষয়ক এই রচনার নামও তাঁর গ্রন্থতালিকায় পাওয়া যায়। তবে এর প্রাপ্যতা ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
ঙ. আল্ মাসলাকু ফি উসুলিদ্দিন: এটি আকাঈদ ও ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তাসংক্রান্ত রচনা হিসেবে পরিচিত।
চ. নুকাতুন্ নিহায়া: পূর্ববর্তী ফিকহি গ্রন্থের আলোচনা ও পর্যালোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত এই রচনা তাঁর বিশ্লেষণী মনোভাবের পরিচয় বহন করে।
এ ছাড়া যুক্তিবিদ্যা ও বিভিন্ন বিশেষায়িত ফিকহি প্রশ্ন নিয়ে তাঁর আরও কিছু রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব গ্রন্থ থেকে বোঝা যায়, তিনি একই সঙ্গে ব্যবহারিক আইনশাস্ত্র, আইনতত্ত্ব এবং ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তার বিকাশে ভূমিকা রেখেছিলেন।
ইজতিহাদ ও উসুলুল ফিকহে তাঁর অবদান
মুহাক্কিক হিল্লির বৌদ্ধিক অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উসুলুল ফিকহের পদ্ধতিগত বিকাশ। উসুলুল ফিকহ বলতে কুরআন, সুন্নাহ এবং স্বীকৃত অন্যান্য দলিলের আলোকে শরয়ী বিধান নির্ণয়ের নীতিমালা ও পদ্ধতিকে বোঝায়। ফিকহের বিধানসমূহ যথাযথভাবে বুঝতে হলে এসব নীতির জ্ঞান অপরিহার্য।
তাঁর “মা‘আরিজুল উসুল” গ্রন্থে আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আধুনিক গবেষণায় গ্রন্থখানাকে ইমামিয়া শিয়া উসুলশাস্ত্রের প্রাথমিক প্রভাবশালী সংক্ষিপ্ত রচনাগুলোর অন্যতম হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এতে ইজতিহাদের ভূমিকা সীমিত হলেও সুস্পষ্টভাবে বিবেচিত হয়েছে। এর ফলে ফিকহি বিধান নির্ণয়ে যুক্তি, দলিলের বিশ্লেষণ এবং পদ্ধতিগত বিচারবিবেচনার গুরুত্ব প্রকাশ পায়।
তাঁর এই অবদানকে শুধু একটি গ্রন্থের রচনায় সীমাবদ্ধ করে দেখা উচিত নয়। বরং ফিকহি বিধান সংকলন এবং বিধান নির্ণয়ের তাত্ত্বিক পদ্ধতি -এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপন তাঁর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এভাবে তিনি পরবর্তী ফকিহদের জন্য গবেষণা ও ব্যাখ্যার একটি সুসংবদ্ধ ভিত্তি নির্মাণে সহায়তা করেন।
বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার ও প্রভাব
মুহাক্কিক হিল্লির মৃত্যুর পরও তাঁর রচনাবলি ইমামিয়া শিয়া ফিকহের পাঠদান ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখে। বিশেষ করে শারায়েউল ইসলামের উপর বহু ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, তাঁর রচনার বিষয়বস্তু, বিন্যাস ও পরিভাষা দীর্ঘকাল ধরে ফিকহি আলোচনাকে প্রভাবিত করেছে।
তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র আল্লামা হিল্লির মত পরবর্তী পণ্ডিতদের মাধ্যমে হিল্লার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত হয়। এ ছাড়া তাঁর রচনাবলি বিভিন্ন অঞ্চলের আলেমদের কাছে পৌঁছে যায় এবং ফিকহি মতামতের তুলনামূলক বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হতে থাকে। তাঁর অবদানের মূল্যায়নে তাই ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
গবেষণাগত মূল্যায়ন
মুহাক্কিক হিল্লির জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, তিনি এমন একটি জ্ঞানকেন্দ্রে কাজ করেছেন যেখানে ফিকহ, কালাম ও যুক্তিবিদ্যার চর্চা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁর গ্রন্থসমূহে বিষয়বস্তুর সংক্ষিপ্ততা এবং কাঠামোগত শৃঙ্খলা লক্ষ করা যায়। তৃতীয়ত, তাঁর রচনার উপর পরবর্তী যুগে বিস্তৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হওয়া তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
তবে তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রচলিত সব বিবরণকে সমানভাবে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা সমীচীন নয়। জন্ম-মৃত্যুর সাল, গ্রন্থের নাম এবং প্রধান শিক্ষক-শিষ্যদের পরিচয়ের মত তথ্য জীবনীমূলক ও গবেষণামূলক সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হলেও কিছু জনপ্রিয় বর্ণনায় অতিরঞ্জন থাকতে পারে। একইভাবে তাঁর অনুসারী বা শিষ্যের সংখ্যা সম্পর্কে প্রচলিত দাবিগুলো নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক সূত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
একটি গবেষণামূলক মূল্যায়নে তাঁর অবদানকে সংশ্লিষ্ট মাযহাবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা উচিত। এতে একদিকে তাঁর ফিকহি চিন্তার স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হবে, অন্যদিকে বৃহত্তর ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে তাঁর অবস্থানও যথাযথভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
উপসংহার
মুহাক্কিক হিল্লি (রহ.) ছিলেন মধ্যযুগীয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার একজন প্রভাবশালী ফকিহ, আইনতাত্ত্বিক ও লেখক। তাঁর “শারায়েউল ইসলাম” ইমামিয়া শিয়া ফিকহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে অধ্যয়ন ও গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। গ্রন্থটির সুসংবদ্ধ বিন্যাস, সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা এবং পরবর্তী ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহের ধারাবাহিকতা তাঁর পাণ্ডিত্য ও পদ্ধতিগত দক্ষতার পরিচয় বহন করে।
এ ছাড়া বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে তিনি ফিকহ ও উসুলে ফিকহের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, জ্ঞানচর্চায় শুধু তথ্য সংকলন নয়; বরং যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ, সুসংবদ্ধ উপস্থাপনা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কার্যকর বৌদ্ধিক কাঠামো নির্মাণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং, মুহাক্কিক হিল্লির জীবন ও কর্ম অধ্যয়ন করলে মধ্যযুগীয় ইমামিয়া শিয়া ফিকহের বিকাশ, হিল্লা নগরের জ্ঞানচর্চা এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রের পদ্ধতিগত ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করা যায়। তাঁর রচনাবলি আজও ঐতিহাসিক ও ফিকহি গবেষণার মূল্যবান উপাদান।
সম্পাদকীয়
বিপন্ন মানবতা ও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বাস্তবতা
সমসাময়িক বিশ্ব এক গভীর নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। চারপাশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি নির্মম সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক বিশ্বে মানুষের জীবন যতোটা সহজ হয়েছে, মানুষের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা ও মানবতা ততোটাই যেন ফিকে হয়ে এসেছে। যুদ্ধ, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং ক্ষমতার অন্ধ লড়াই আজ বিশ্বজুড়ে মানবতার মৌলিক ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা সংঘাতগুলো কেবল রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সীমানার গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই; এগুলো সরাসরি আঘাত হানছে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর। ক্ষমতার পালাবদল বা আধিপত্য বিস্তারের এই নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতায় বলি হচ্ছে নারী, শিশু ও নিরপরাধ সাধারণ মানুষ। কোথাও যুদ্ধবিগ্রহের লেলিহান শিখা ঘরবাড়ি কেড়ে নিচ্ছে, আবার কোথাও জাতিগত ও ধর্মীয় দ্বন্দ্বে ঝরছে রক্ত। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, অথচ তাদের সুরক্ষায় বিশ্বনেতাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের চেয়ে কথার লড়াইয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে দেখা যায়।
মানবতার এই চরম বিপর্যয়ের সময়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের বিবেকের অবস্থান কোথায়? বিশ্বমোড়লরা শান্তির বুলি আওড়ালেও অস্ত্র বাণিজ্যের রমরমা ব্যবসা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত বন্ধে তারা প্রায়শই ব্যর্থ বা উদাসীন। এই দ্বিমুখী নীতি মানবসভ্যতার জন্য এক লজ্জাজনক অধ্যায়।
তবে সম্পূর্ণ অন্ধকারেই যে আশার প্রদীপ নিভে গেছে, এমন নয়। প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশ্বের নানা প্রান্তে সাধারণ মানুষ মানবতার টানে একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সাধারণ তরুণ সমাজ এবং মানবিক কর্মীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, মানবতা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
এই সংকট উত্তরণে কেবল শোক প্রকাশ বা নিন্দা জ্ঞাপন যথেষ্ট নয়। বিশ্ববাসীকে আত্মোপলব্ধি করতে হবে যে, কোনো জাতি বা রাষ্ট্র একা বাঁচতে পারে না। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল একটি শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব। ক্ষমতার লিপ্সা ত্যাগ করে বিশ্বনেতাদের মানবকল্যাণে ঐক্যবদ্ধ হওয়া আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, বর্তমানের এই নৈতিক অবক্ষয় একদিন সমগ্র মানবসভ্যতাকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
