হাদিসের আলোকে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব

by Syed Yesin Mehedi

জ্ঞানার্জন সম্পর্কে রসূলুল্লাহও (সা.) বিশেষভাবে তাগিদ করেছেন। তিনি বলেছেন :
১. ‘আল্লাহ যখন তার কোন বান্দার কল্যাণ করতে ইচ্ছা পোষণ, তাকে তিনি ধর্মিয় বিষয়ে পান্ডিত্য দান করেন।’ -আল কফি, ১ম খণ্ড, পৃ-৩২।
২. ‘সোনা রূপার খনির মতো মানুষও (বিভিন্ন প্রকারের) খনি। তাদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উত্তম (গুণ বৈশিষ্ট্যধারী) হয়ে থাকে, দীনের সঠিক বুঝ-জ্ঞান লাভ করতে পারলে ইসলাম গ্রহণের পরও তারাই উত্তম মানুষ হয়ে থাকে।’ -সহীহ মুসলিম : ।
৩. ‘জ্ঞান বিজ্ঞানের কথা জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীদের হারানো ধন। সুতরাং যেখানেই তা পাওয়া যাবে, প্রাপকই তার অধিকারী। -তিরমিযি।
৪.‘ইসলামের একজন সঠিক জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি শয়তানের জন্যে হাজারো (অজ্ঞ) ইবাদতগুজারের চাইতে ভয়ংকর।’ -তিরমিযি।
৫. ‘জ্ঞানান্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের একটি অবশ্য কর্তব্য ।’ – আল কফি, ১ম খণ্ড, পৃ-৩৮।
৬. ‘দীনের জ্ঞানী ব্যক্তি কতইনা উত্তম মানুষ। তার কাছে লোকেরা এলে তিনি তাদের উপকৃত করেন, আর না এলে তিনি কারো মুখাপেক্ষী হন না।’ -রিযযীন, মিশকাত।
৭. ‘জ্ঞানের আধিক্য (নফল) ইবাদতের আধিক্যের চাইতে উত্তম।” -বায়হাকি : .।
৮. ‘সর্বোত্তম মানুষ হলো তারা, জ্ঞানীদের মধ্যে যারা উত্তম।’ -দারমি।
৯. ইমাম বাকের (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : জ্ঞানের যাকাত হল অন্যকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়া।
জ্ঞানী ব্যক্তির মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন :
১. ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের কোনো পথ অবলম্বন করে, তাতে আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দেন। যখন কিছু লোক আল্লাহর কোনো ঘরে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব (কোরআনে) পড়ে এবং নিজেদের মাঝে তার মর্ম আলোচনা করে, তখন তাদের উপর নেমে আসে প্রশান্তি, ঢেকে নেয় তাদেরকে আল্লাহর রহমত, পরিবেষ্টিত করে তাদেরকে ফেরেশতাকুল। তাছাড়া আল্লাহ তাঁর কাছের ফেরেশতাদের নিকট তাদের কথা আলোচন করেন। যার আমল (কর্ম) তাকে পিছিয়ে দেয়, তার বংশ তাকে এগিয়ে দিতে পারে না।’ -সহীহ মুসলিম।
২. ‘ফেরেশতারা জ্ঞানান্বেষণকারীদের জন্যে নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেয় (অর্থাৎ তাদের সহযোগিতা করে ও উৎসাহিত করে)’। -মুসনাদে আহমদ।
৩. ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানান্বেষণে আত্মনিয়োগ করে, এ কাজের ফলে তার অতীতের দোষত্রুটি মুছে যায়।’ -তিরমিযি, দারমি।
৪. ‘তোমাদের মাঝে সবচেয়ে ভালো মানুষ সে, যে নিজে কোরআনে শিখে এবং অন্যদের শিখায়।’ -বুখারি : ।
৫. ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানান্বেষণ করে তা অর্জন করেছে, তার জন্যে দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে। আর যদি তা লাভ করতে নাও পেরে থাকে তবু তার জন্যে একগুণ প্রতিদান রয়েছে।’ -দারমি।
৬. ‘রাতের কিছু অংশ জ্ঞান চর্চা করা, সারা রাত (ইবাদতে) জাগ্রত থাকার চাইতে উত্তম।’ -দারমি।
৭. ‘জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসীরা, এমনকি পানির নিচের মাছ। অজ্ঞ ইবাদতগুজারের তুলনায় জ্ঞানী ব্যক্তি ঠিক সেরকম মর্যাদাবান, যেমন পূর্ণিমা রাতের চাঁদ পৃথিবীবাসীর কাছে তারকারাজির উপর দীপ্তিমান। আর জ্ঞানীরা নবীদের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী।’ -আহমদ, তিরমিযি, আবু দাউদ।

জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে  এ পর্যায়ে এ সম্পর্কেই কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা বলব।

১.“একবার এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে উপস্থিত হয়ে জানতে চাইল, হে আল্লাহর রাসূল! যদি কোনো ব্যক্তির জানাযার একই সময়ে কোনো ইলমী জলসা অর্থাৎ জ্ঞানার্জনের বৈঠক থাকে তাহলে আমি কোনটিতে অংশ নিতে পারি? রাসূলেখোদা বললেন, জানাযায় অংশগ্রহণ ও দাফন-কাফন করার জন্যে অন্য লোক থাকলে তুমি ইলমী জলসায় উপস্থিত হও। নিশ্চয়ই জ্ঞান চর্চার অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া হাজারটা জানাযায় অংশগ্রহণ থেকে, হাজারটা অসুস্থ লোকের খোঁজ নেয়া থেকে, হাজার রাত ইবাদত করা থেকে, হাজার দিন রোযা পালন থেকে, হাজার দেরহাম সদকা দেয়া থেকে, হাজার বার নফল হজ্জ করা থেকে এবং হাজারটা নফল জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে উত্তম। এরপর রাসূল (সা.) বললেন, “ইলম দ্বারাই আল্লাহর আনুগত্য হয়, ইলমের দ্বারাই আল্লাহর ইবাদত সম্পন্ন হয়। জ্ঞানের মধ্যে দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গল নিহিত যেমনিভাবে মুর্খতার সাথে দুনিয়া ও পরকালের অনিষ্টতা নিহিত রয়েছে।”

২. একবার রাসূলেখোদা মসজিদে নববীতে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন দু’দল লোক গোল হয়ে বসে কোনো কাজে ব্যস্ত আছে। একদল আল্লাহর যিকির-আযকার ও ইবাদত-বন্দেগী করছে আরেকদল জ্ঞানচর্চার কাজে মশগুল। রাসূলুল্লাহ (সা.) দু’দলকে দেখেই খুশী হলেন এবং তাঁর সাথের লোকদেরকে বললেন, “এ দু’দল লোকই ভালো কাজে ব্যস্ত আছে এবং এরা সবাই উত্তম ও পূণ্যবান। কিন্তু আমাকে পাঠানো হয়েছে লোকজনকে শিক্ষা দিয়ে জ্ঞানী করে গড়ে তোলার জন্য।”
এ কথা বলেই তিনি সেই দলের দিকে এগিয়ে গেলেন যারা শিক্ষা দান ও গ্রহণের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনিও তাদের সঙ্গে বসলেন এবং শিক্ষাদানের কাজে লেগে গেলেন।
রাসূলে খোদা (সা.) মুর্খতাকে অপছন্দ করতেন বলেই আজীবন তিনি জ্ঞান বিতরণ করেছেন এবং সবখানে শিক্ষার আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন।
৩.  দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ই রমজান শুক্রবার অনুষ্ঠিত বদরের যুদ্ধে । ৭০ জন কাফেরকে বন্দী করে মদীনায় আনা হয়। এই বন্দীদের মুক্তিপণ হিসাবে অর্থ বা অন্য কোন সম্পদ নির্ধারণ না করে  আমাদের প্রিয় নবী ঘোষণা দেন যে, বন্দীদের মধ্যে যারা শিক্ষিত, তারা প্রত্যেকে ১০জন করে নিরক্ষরকে শিক্ষা দান করতে পারলে বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পাবে।
জ্ঞানই সবকিছুর ভিত্তিমূল । জ্ঞানের আলোকেই মানুষ ন্যায়-অন্যায় ও ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। জ্ঞান তথা শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই রচিত হয় জাতিসত্তা। কোন জাতির সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হ’ল শিক্ষা। জাতীয় আশা-আকাঙ্খা পূরণ, জাতীয় আদর্শের ভিত্তিতে চরিত্র গঠন, জীবনের সকল ক্ষেত্রে ও বিভাগে নেতৃত্বদানের উপযোগী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা কেবলমাত্র উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রধান উপকরণও শিক্ষা ।
কোন জাতিকে একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হ’লে সেই জাতির লোকদেরকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে । যখন তারা সেই আদর্শ অনুযায়ী তৈরি হবে তখনই একটি সফল সামাজিক বিপ্লব সাধন সম্ভব। সকলকে এই সত্যটি উপলদ্ধি করতে হবে । শিক্ষক মহোদয়, ছাত্র ছাত্রী দিগকে তাহাদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে অন্যথায় জাতির কোন আশা থাকবেনা ।  দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ জ্ঞান চর্চা ছেড়ে দিয়ে মুর্খতাকে গ্রহণ করে মুসলমানরা কুরআনের নির্দেশ থেকে যেমন দুরে সরে গেছে তেমনি নিজেদের অবস্থানকেও দুর্বল করে ফেলেছে। তাই নিজেদের হারানো গৌরব ফিরে পেতে হলে সবাইকে জ্ঞান চর্চায় এগিয়ে আসতে হবে।
মহানবী (ছাঃ) মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে জাহেলিয়াতের গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন জাতিকে একটি বিশ্ববিজয়ী জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হন।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔