ইমামগণের সুস্পষ্ট ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা

by Syed Yesin Mehedi

কিছু বিশ্বাসীর মনে একটি প্রশ্ন গভীর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে: কেন আল-হুসাইন তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করেছিলেন, অথচ তাঁর উত্তরসূরিরা তা থেকে বিরত ছিলেন—বিশেষ করে যখন সকল ইমামই একটি অভিন্ন ও সুসংগত আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন? কারণ, আল-হুসাইন যদি মুষ্টিমেয় অনুসারী নিয়েও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তাঁর বেদখল হওয়া অধিকার দাবি করে থাকেন, তবে ইমাম আল-সাদিক—যাঁর অনুসারীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল—কেন তেমন কোনো পদক্ষেপ নেননি?
এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার জন্য অন্যান্য ইমামদের পরিস্থিতির তুলনায় আল-হুসাইনের পরিস্থিতির বিষয়ে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, যাতে আমরা আজকের দিনে আমাদের করণীয় সম্পর্কে সচেতন হতে পারি।
স্বাভাবিকভাবেই এটি সর্বজনবিদিত যে, মহানবী (সা.) তাঁর প্রচারকার্য শান্তিপূর্ণ ও গোপনে শুরু করেছিলেন এবং তা দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। এই সময়কালে তিনি অনুসারীদের এমন একটি দল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন, যারা নতুন এই বার্তায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত এবং ‘জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছুকেই বর্জন করেছিল।
পরিশেষে মহানবী (সা.) অনুভব করলেন যে, এই দলটি জাহেলিয়াতের শক্তির মোকাবিলায় সক্ষম; তাই তিনি সশস্ত্র জিহাদের ডাক দিলেন এবং এক কঠিন সামরিক সংগ্রামের পর মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সফল হলেন। মহানবী (সা.)-এর হাতে সূচিত এই নতুন সমাজ গঠনের দুরূহ দায়িত্বটি পূর্ণাঙ্গভাবে ইমাম আলী(আ.)’র ওপর ন্যস্ত করা হলো, যাতে তিনি জাহেলিয়াতের বিশ্বাস ও প্রথাগুলোর মূলোৎপাটন করার যে প্রক্রিয়া নবীজি শুরু করেছিলেন তা সম্পন্ন করতে পারেন এবং এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন যার পারস্পরিক সম্পর্কগুলো আল্লাহর বিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।
তবে মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পরপরই ইমাম আলী (আ.) ক্ষমতায় আসেননি; বরং তাঁকে ক্ষমতা লাভ থেকে বিরত রাখা হয়েছিল এবং তাঁর অনুগত সমর্থকের সংখ্যাও ছিল নগণ্য। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, ইসলাম গ্রহণকারীদের অনেকেই কেবল বাহ্যিকভাবেই ইসলামকে মেনে নিয়েছিল—তাদের অন্তরে ছিল না প্রকৃত বিশ্বাস—এবং তারা ইসলামের প্রতি লোক দেখানো বিশ্বাসের আড়ালে ‘জাহেলিয়াত’ বা প্রাক-ইসলামি যুগের রীতিনীতিই অনুসরণ করত। এই পরিস্থিতি পবিত্র কুরআনের সেই আয়াতের ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করেছিল যেখানে বলা হয়েছে, “তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন কিংবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে?” (সূরা আল-ইমরান: ১৪৪)
অর্থাৎ, তোমরা কি তোমাদের পুরনো বিশ্বাসে ফিরে যাবে? ইমাম আলী (আ.) উপলব্ধি করলেন যে, নিজের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য এখনই সশস্ত্র অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়; তাই তিনি বিদ্রোহ না করে বরং আজীবন এমন একদল নিষ্ঠাবান বিশ্বাসী গোষ্ঠী গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকলেন—যারা নতুন ধর্মের মূল লক্ষ্যগুলোর প্রতি সচেতন, ইমামতের বিষয়ে আলীর দাবির বৈধতায় বিশ্বাসী এবং নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনে মহানবীর সুন্নাহর যথাযথ অনুসারী। অবশেষে উসমান (রা.)-এর মৃত্যুর পর যখন তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন, তখন তিনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিষয়ে নীরবতা পালনের নীতি গ্রহণ করেননি; বরং তিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে তাদের অন্তর ও কর্মকে পরিশুদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি সেইসব মুসলিমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন যারা ইসলামের প্রসারের সুযোগকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল অথবা বৃহত্তর সমাজের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে নিজেদের খেয়াল-খুশি ও স্বার্থ অনুযায়ী ইসলামি বিধানের ব্যাখ্যা করত।
জাহেলিয়াতের শক্তির বিরুদ্ধে এবং এমন কিছু মুসলিমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আল-হাসান তাঁর পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন—যাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে পরিশুদ্ধ হয়নি এবং যারা সিরিয়া অঞ্চলে ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্তারের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করছিল। এ কারণেই তিনি লড়াই চালিয়ে যান এবং তাঁর অনুসারীদের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন; কিন্তু তাঁর কিছু অনুসারী তাঁর নির্দেশ অমান্য করে। এমনকি আল-মাদায়িনে একজন তাঁকে হত্যার চেষ্টাও চালায়, যার ফলে আল-হাসানের পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে—আর এই ঘটনাটিই পরবর্তীতে তাঁর যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
একদিকে আল-হাসানের অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তি ও তাঁর সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়া এবং অন্যদিকে প্রতিপক্ষের ঐক্য ও সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের অনড় মনোভাব—এই পরিস্থিতি আল-হাসানকে মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেছিল। এই সন্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল যে, মুয়াবিয়া আল-হাসানের অনুসারীদের জীবন বা সম্পদের কোনো ক্ষতি করবেন না কিংবা মসজিদে ‘আহলে বাইত’ বা নবী-পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে গালিগালাজ বা নিন্দা করবেন না; এছাড়া মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর আল-হুসাইন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন।
ইমাম আল-হুসাইন এই চুক্তির শর্তাবলী মেনে চলার বিষয়ে অবিচল ছিলেন; অথচ মুয়াবিয়ার বিশ বছরের শাসনামলে প্রতিপক্ষ ধারাবাহিকভাবে চুক্তির শর্তগুলো একের পর এক লঙ্ঘন করে। নিজের শাসনামলের শেষ দিকে মুয়াবিয়া ইয়াজিদকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন এবং এর মাধ্যমে আল-হাসানের কাছে করা সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন—যেখানে বলা হয়েছিল যে, তার (মুয়াবিয়ার) পর আল-হুসাইনই উত্তরাধিকারী হবেন।
আল-হুসাইন মুয়াবিয়ার শাসনামলে তার কার্যকলাপের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য তাঁর অনুসারীদের প্রস্তুত করেছিলেন। ইরাক থেকে প্রাপ্ত খবরের ভিত্তিতে আল-হুসাইন মনে করেছিলেন যে, একদিকে জনগণ বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে; অন্যদিকে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, সামগ্রিকভাবে মুসলিম সমাজ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং তাদের পুনরুজ্জীবিত করার মতো কারো প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই তিনি কুফার দিকে অগ্রসর হন। যদিও কুফাবাসীরা—যারা আগে তাঁকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—পরবর্তীতে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল এবং ক্ষমতাসীনদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল, তবুও আল-হুসাইন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অত্যন্ত স্বল্প সংখ্যক অনুসারী নিয়ে তিনি লড়াই অব্যাহত রাখেন, যা শেষ পর্যন্ত কারবালার প্রান্তরে তাঁদের সকলের শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।
এ থেকে স্পষ্ট যে, লড়াই করার বিষয়ে আল-হুসাইনের সিদ্ধান্তটি কোনোভাবেই কোনো নতুন প্রথা বা উদ্ভাবন ছিল না; বরং যখনই সম্ভব হয়েছে ‘জাহিলিয়্যাত’-এর শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভাই, পিতা ও দাদার অনুসৃত নীতিরই ধারাবাহিকতা ছিল এটি। আল-হুসাইনের হত্যাকাণ্ডের ফলে আল-সাজ্জাদ এবং অন্যান্য ইমামরা ক্ষমতা দখলকারী কর্তৃপক্ষের প্রতি এক ধরণের নীরব বা নিষ্ক্রিয় নীতি (য়ঁরবঃরংঃ ঢ়ড়ষরপু) অবলম্বনের পথ বেছে নেন; কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে:
১. (প্রথমত) সংখ্যায় অনেক হওয়া সত্ত্বেও, আল-হুসাইনের অনুসারীদের মধ্যে এমন পর্যাপ্ত আনুগত্য ছিল না যার ফলে তারা ইমামের নির্দেশ অনুযায়ী আল্লাহর পথে নিজেদের ও নিজেদের সম্পদ উৎসর্গ করতে পারতেন;
২. (এবং দ্বিতীয়ত) মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই জানতো না যে, মহানবী (সা.)-এর মনোনীত ব্যক্তি হিসাবে আল হুসাইনই ছিলেন বৈধ ইমাম ও ইসলামি উম্মাহর নেতা; ঠিক যেমন তারা জানতেন না যে, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ছিল অবৈধ।
এ কারণেই আমরা দেখি যে, উমাইয়া কর্তৃপক্ষের বিষয়ে আল-সাজ্জাদ নীরবতার নীতি অবলম্বন করেছিলেন; তবে এই নীরবতা তাদের শাসনকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো লক্ষণ ছিল না, বরং এর কারণ ছিল তাঁর অনুসারীদের স্বল্প সংখ্যা। একইভাবে, সমাজ থেকে তাঁর এই বিচ্ছিন্নতা কোনোভাবেই বাস্তবতা থেকে পলায়ন ছিল না; বরং এটি ছিল সেই দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ—যেসব অপকর্মের ফলে আল-হুসাইনকে হত্যা করা হয়েছিল, কাবা শরীফ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং মহানবীর শহরকে (মদিনা) আক্রমণের শিকার ও তিন দিনব্যাপী লুটতরাজের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
ইমামতের সময়কালে আল-সাজ্জাদ তাঁর অনুসারীদের আত্মশুদ্ধি এবং তাদের কথা ও কাজে খোদাভীতি জাগ্রত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি ব্যক্তিগত পর্যায়ে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেন এবং এমন সব স্বার্থপরতা থেকে মানুষকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন, যা আল-হুসাইনের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আল-সাজ্জাদের লক্ষ্য ছিল এমন একদল নিষ্ঠাবান মুসলিমকে একত্রিত করা—যারা ইসলামের মূল উদ্দেশ্য ও বিধানসমূহ মেনে চলতেন, কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে আহ্বান জানাতেন এবং সর্বক্ষেত্রে ইমামের অনুসরণ করতেন। এছাড়া, আল-সাজ্জাদ তাঁর অনুসারীদের এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে অনুধাবন করার ওপর জোর দিতেন যে, তলোয়ারের মাধ্যমে পরিচালিত কোনো যুদ্ধ তখনই ‘জিহাদ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে, যখন সেই যুদ্ধের আহ্বানকারী কেবল কথার পরিবর্তে নিজের কাজের মাধ্যমেই মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার মতো প্রয়োজনীয় গুণাবলির অধিকারী হন।
বর্ণিত আছে যে, তিনি কুরআনের এই আয়াতটি উল্লেখ করেছিলেন: “তারা হলো তারা, যারা আল্লাহর দিকে তওবা করে ফিরে আসে, যারা তাঁর ইবাদত করে, তাঁর প্রশংসা করে, তাঁর সেবায় পৃথিবীতে বিচরণ করে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে রুকু ও সিজদা করে, সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎকাজে বাধা দেয় এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা রক্ষা করে—আর যারা ঈমান এনেছে তাদের সুসংবাদ দিন।” (সূরা আত-তাওবাহ: ১১২)। এরপর তিনি বলেছিলেন, “যখন আমরা এমন লোকদের পাই যাদের মধ্যে এই গুণাবলী বিদ্যমান, তখন তাদের সাথে জিহাদ করা হজের চেয়েও উত্তম।” (কাফি, ৫/২২)।
ইমাম আল-বাকির তাঁর পিতার নীতি অনুসরণ করে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা থেকে বিরত থাকেন এবং তাঁর ভাই যায়েদকেও উমাইয়াদের অবৈধ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ না করার পরামর্শ দেন; কারণ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মতো যথেষ্ট রাজনৈতিক সচেতনতা তখন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। তাই আল-বাকির নবীর সুন্নাহ বা হাদিসের মাধ্যমে, সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। তিনি তাঁর কিছু অনুসারীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন প্রতি বছর হজের সময় মানুষকে আল-হোসাইনের সংগ্রাম ও শাহাদাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়—যার লক্ষ্য ছিল সম্প্রদায়ের মানুষের মনে অনুভূতি জাগিয়ে তোলা এবং তাঁদের হৃদয় ও আবেগকে এমনভাবে উদ্বেলিত করা, যাতে তাঁরা ন্যায়সংগত ও মহৎ উদ্দেশ্যে পরিচালিত বিপ্লবের আদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন।
কারণ, হজের সময়টি ছিল বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলমানদের এক মিলনক্ষেত্র; এ সময় আল-হুসাইনের সংগ্রাম ও শাহাদাতের বার্তা প্রচার এবং মহানবী (সা.)-এর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা নিয়ে অসন্তোষ ও সন্দেহের জন্ম দেয়, যা তাদের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে একটি আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
যদিও ইমাম আল-সাজ্জাদ ও ইমাম আল-বাকিরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাঁদের প্রতি বিপুল সংখ্যক অনুসারীকে আকৃষ্ট করেছিল, তবুও ইমাম আল-বাকির তাদেরকে সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করেননি; কারণ তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় আনুগত্য ও সাংগঠনিক সংহতির অভাব ছিল। আল-কুলাইনি বর্ণনা করেন যে, একদা আব্দুল্লাহ বিন আতা ইমাম আল-বাকিরকে বলেছিলেন, “ইরাকে আপনার অনুসারীদের সংখ্যা তো বিশাল। আল্লাহর কসম, আপনার সম্প্রদায়ের মধ্যে আপনার মতো আর কেউ নেই। তাহলে আপনি কেন সশস্ত্র বিদ্রোহ করছেন না?” জবাবে তিনি বলেছিলেন, “হে আব্দুল্লাহ বিন আতা, আপনি তো সাধারণ মানুষের কথায় কান দিতে শুরু করেছেন।” একইভাবে এ কথাও বর্ণিত আছে যে, ইমাম আল-সাদিক নিজেও তাঁর বিপুল সংখ্যক অনুসারীকে বিদ্রোহের পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ হিসেবে গণ্য করেননি। বরং তিনি তাঁদের ঈমান, খোদাভীতি, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং ইমামের প্রতি আনুগত্য ও বাধ্যতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
ইমাম আল-বাকির ও আল-সাদিকের দৃঢ় নীতিসমূহ কোনো অপরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল না, বরং তা ছিল তিক্ত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গৃহীত। অনেক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, ইমামদের পরিকল্পনায় ৭০ হিজরিতে একটি বিদ্রোহের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু আল-হুসাইনের শাহাদাত সেই পরিকল্পনাকে বিলম্বিত করে দেয়। এছাড়া ১৪০ হিজরিতে আরেকটি বিদ্রোহ সংঘটনের পরিকল্পনারও প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু ইমামের অনুসারীদের মধ্যে সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিপ্লবের তারিখ গোপন রাখার অক্ষমতার কারণে তাঁদের পরিকল্পনা শত্রুদের কাছে ফাঁস হয়ে যায়; ফলে পরবর্তী ইমামগণ তাঁদের অনুসারীদের পরবর্তী কোনো সম্ভাব্য বিদ্রোহের বিষয়ে আর অবহিত করেননি।
এই পর্যালোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইমামদের প্রকৃতপক্ষে একটি সুনির্দিষ্ট ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপদ্ধতি ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম আলী (আ.) যখন অল্প সংখ্যক অনুসারীর অধিকারী ছিলেন তখন সমসাময়িক শাসকদের সাথে সন্ধি করেছিলেন; কিন্তু অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে অস্ত্র ধারণ করেন। একইভাবে, আল-হাসান যখন নিজে ও তাঁর দল শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন তখন যুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু দুর্বলতার মুহূর্তে সন্ধি স্থাপন করেছিলেন। আল-হুসাইনও অনুরূপ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং কুফাবাসীদের আনুগত্যের ওপর ভরসা করে আল্লাহর পথে বিদ্রোহ করেছিলেন; অথচ অন্য ইমামরা ততক্ষণ পর্যন্ত এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন, যতক্ষণ না তাঁরা অনুগত অনুসারীদের এমন একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী গড়ে তুলতে পেরেছিলেন—যারা মুসলিম সম্প্রদায়ের চিন্তাধারাকে আল্লাহর বিধানের অনুকূলে পরিবর্তিত করতে সক্ষম ছিল।
বর্তমান সময়ে বিশ্বাসীদের প্রধান কাজ হলো নিজেদের ‘জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগের যেকোনো আচরণ থেকে মুক্ত করা। মহান আল্লাহর নির্দেশাবলি অনুসরণের মাধ্যমেই তা অর্জন করা সম্ভব—যে নির্দেশাবলি নবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের (পরিবারবর্গের) আচার-আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনধারার মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বর্তমান ইমামের প্রতি আনুগত্যের দাবিদার প্রত্যেক বিশ্বাসীর উচিত—নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজের মতো আবশ্যিক বিধান ও নিয়মাবলি পালনের মাধ্যমে এবং আহলে বাইতের বৈধ ও যোগ্য আলেমদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন, তাঁদের নির্দেশনা অনুসরণ ও মানুষকে সৎকাজের আহ্বান ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে ইমামের প্রতি নিজেদের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা প্রমাণ করা।
একইভাবে, তাদের এমন সব কাজ করা উচিত যা সমাজের পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে এবং সমাজকে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও নিরাপদ ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়—যেমন: পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি আনুগত্য, প্রতিবেশীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, চুক্তি ও সমঝোতা পালনে বিশ্বস্ততা এবং নিজ পেশা, মানুষের সাথে আচরণ ও নিজ দেশের প্রতি নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততা বজায় রাখা।
যিনি আহলে বাইত এবং যুগের ইমামের প্রতি অনুগত, তিনি এমন ব্যক্তি যিনি মন্দ কাজ—যেমন শিরক, পিতামাতার অবাধ্যতা, নারীদের ব্যভিচারিণী অপবাদ দেওয়া, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা, মিথ্যা বলা, চুরি, মদ্যপান এবং ঈশ্বর থেকে দূরে সরিয়ে নেয় এমন যেকোনো কাজ—থেকে বিরত থাকেন। বিশ্বাসীরা যদি আবশ্যিক কার্যাবলি পালন করেন, নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকেন এবং নিষ্ঠার সাথে ঈশ্বরের আনুগত্য করেন, তবে তা জটিলতা ও দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ গঠনে সহায়তা করবে; এমন এক সমাজ যেখানে বিশ্বাসীরা যুগের ইমামের নির্দেশাবলির প্রতি আন্তরিকভাবে অনুগত থাকতে পারবেন।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔