আত্মসংশোধন ও সমাজ সংশোধনের কর্মপন্থা

আত্মসংশোধন ও সমাজ সংশোধনের কর্মপন্থা
আল্লামা সাইয়েদ মুজতাবা মুসাভী লারী
হতাশা সম্পর্কে জীবনের আলো ও অন্ধকার বৈশিষ্ট্যসূচক লক্ষণসমূহ
দুঃখ ও সুখে গড়া মানুষের এ জীবন। এ দুই অবস্থার যে কোনো একটি অবস্থার মধ্যে মানুষের পার্থিব জীবনের একটি অংশ নিবিষ্ট থাকে। প্রতিটি মানুষকে তার অভিজ্ঞতার নিজস্ব অংশের সম্মুখীন হতে হয়। এভাবে সে তার জীবনের সমস্যাবলি হতে উদ্ভূত সুখ ও দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে। এ তিক্ত বাস্তবতার কারণেই মানুষের জীবন সুখ-দুঃখের মধ্যে উঠানামা করে। আমরা মানুষ হিসেবে মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণকারী এ শাশ্বত বিধানসমূহকে পরিবর্তন করে আমাদের ইচ্ছামাফিক করতে পারি না। তথাপি জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করার পর, এ বিশাল বিশ্বে আমাদের জীবনের প্রকৃত সত্যকে স্লানকারী কুৎসিত সত্তাসমূহকে পরিত্যাগ করতে পারি এবং আমাদের স্পষ্ট ধারণাকে আমাদের অস্তিত্বের সুন্দর লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে পারি।
বিস্ময়সৃষ্টিকারী সৃষ্টিসমূহও সূ² নির্ভুল জ্ঞানে পরিপূর্ণ এ বিশ্ব আমাদেরকে বলে দেয় যে, প্রতিটি সৃষ্টির একটা উদ্দেশ্য রয়েছে যার জন্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অপরপক্ষে, আমরা বিশ্বের মধ্যকার উজ্জ্বল দিকসমূহকে বাদ দিয়ে বা ভুলে গিয়ে এর বিষাদময় দিকের প্রতি আমাদের দৃষ্টিকে নিবদ্ধ করতে পারি। শেষপর্যন্ত এটা প্রতিটি মানুষের উপর নির্ভর করে যে, সে তার চিন্তার গতিকে কোন্ দিকে পরিচালিত করার সিদ্ধান্ত নিবে। সুতরাং, সে তার জীবনকে যেভাবে দেখতে চায় তদনুযায়ী সে তার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তি বাছাই করবে।
আমাদের জন্যে ক্ষতিকারক উপাদানগুলো পরিহার করে আমাদের জীবনের জন্যে যা সঠিক ও যথাযথ তা বাছাই করে নেওয়ার উপযোগী করে আমাদের চিন্তা ও বিচারক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে যাতে আমরা আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা হারিয়ে না ফেলি। এটা করতে ব্যর্থ হলে আমরা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারি অথবা ধ্বংসাত্মক দুর্ভাগ্যের শিকারেও পরিণত হতে পারি। আমাদের অনেকেই মনে করেন, আমাদের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ যদি অন্য রকম হত তাহলে হয়তো আমরা সুখী হতাম। বস্তুতপক্ষে, এসব লোকের সমস্যা তাদের জীবনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং ব্যাপারটা পদ্ধতিগত যা দিয়ে এসবের মুকাবিলা করা হচ্ছে। আমরা ইচ্ছা করলে ঘটনাসমূহের প্রভাব পরিবর্তন করতে পারি, অথবা এর কোনো কোনোটার ফলাফলকে আমাদের প্রয়োজনীয় খাতে পরিবর্তিত করতে পারি।
এক প্রখ্যাত চিন্তাবিদ লিখেন: আমাদের কল্পনা সর্বদা ঘৃণা ও অসন্তোষের ক্ষেত্রে বিচরণ করে থাকে, তাই আমরা সব সময় চীৎকার করি ও অভিযোগ করি। কারণ, আমাদের নৈতিক চেতনার মধ্যে চিৎকারের কারণ নিহিত রয়েছে। আমাদেরকে এমনভাবে তৈরী করা হয়েছে যে, আমাদের মনের ঝোঁক বা গতি সর্বদা এমন সব জিনিসের প্রতি নিবদ্ধ যা আমাদের রূহ বা আত্মার জন্যে মোটেও উপযুক্ত নয়। প্রতিদিন আমাদের মনে নতুন নতুন জিনিস লাভের আশা-আকাঙ্খা দেখা দেয় অথবা সম্ভবত আমরা সঠিকভাবে জানি না আমরা কি চাই। এরপরও অন্যরা যখন সুখী হয় তখন আমরা তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হই এবং দুঃখ পেতে থাকি। আমরা দুর্ব্যবহারকারী ছেলে-মেয়েদের মত যারা নতুন নতুন অজুহাত বের করে আর কাঁদতে থাকে। তাদের কান্না দেখে আমাদের অন্তরে দুঃখ হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাদেরকে প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝাতে সক্ষম না হই এবং তাদের এই অলীক কল্পনা ও অবান্তর চাহিদা পরিহার করাতে না পারি ততক্ষণ পর্যন্ত আমরাও শান্তি পাই না। এসব ছেলে-মেয়ে, তাদের অসংখ্য আশা-আকাঙ্খার কারণে অন্য আর কিছুই দেখতে পায় না। সুতরাং তাদের দুঃখ-দুর্দশা চলতেই থাকে। এটা আমাদের দায়িত্ব যে, আমরা যেন জীবনের ভালো দিকসমূহ সম্পর্কে তাদের চোখ খুলে দেই। আমাদেরকে তাদের অবশ্যই একথা বুঝাতে হবে যে, একমাত্র সেইসব লোকই ফুল ও গোলাপের চাষ করতে সক্ষম যারা চোখ খুলে জীবনের বাগান দেখেছে। অন্ধ ব্যক্তিরা একমাত্র কাঁটা ছাড়া আর কিছুই পাবে না। আমরা যদি বিষণœতা ও হতাশার সীমানা অতিক্রম করতে সক্ষম হই এবং প্রকৃত ঘটনাসমূহকে পরীক্ষা করতে পারি, তাহলে এখনকার মত আতঙ্ক সৃষ্টিকারী একটি সময়েও আমরা দেখতে পাবো যে, আমাদের জীবনের বাগিচার সর্বত্র ফুল ও গোলাপের দৃশ্য সমেত সর্বত্র প্রস্থানের পথসমূহ বিরাজমান রয়েছে যা সব সময় দর্শনার্থীদের দৃষ্টিকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করতে থাকবে।
মানুষের সুখ-শান্তির উপর তার চিন্তার গভীর প্রভাব রয়েছে। বস্তুতপক্ষে মানুষের সুখের একমাত্র ফলপ্রসূ উপাদান হচ্ছে তার চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা। একজন হতাশাগ্রস্ত লোকের দৃষ্টিতে একটা অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা অসহনীয় ও ধ্বংসাত্মক, কিন্তু একজন আশাবাদী লোকের দৃষ্টিতে যিনি সবকিছুকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকেন, তিনি কখনও এ ধরনের ঘটনায় ভেঙ্গে পড়বেন না, প্রতিরোধের মনোভাবও হারাবেন না। আশাবাদীরা কখনও বিনয়, সংযম ও ধৈর্যের সীমা লংঘন করে না। কাল্পনিক দুঃখে পরিবেষ্টিত হওয়ার চিন্তা যাদের মন-মগজকে সদা আচ্ছন্ন করে রাখে তাদের জীবন হয় অসুখী, দুঃখজনক ও বিষাদময়। অত্যধিক প্রতিক্রিয়াশীলতার কারণে তারা তাদের অনেক শক্তি ও যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে এবং দুনিয়ার সৌভাগ্য ও ভালো জিনিসসমূহ সম্পর্কে এক কঠিন অজ্ঞতার মধ্যে নিজেদেরকে নিমজ্জিত করে রাখে।
এক বিজ্ঞ ব্যক্তির মতে: “এ পৃথিবীতে যে যেভাবে চলতে চায় পৃথিবীও তার সঙ্গে তদ্রুপ ব্যবহার করে থাকে। এভাবে তুমি যদি পৃথিবীর প্রতি হাস, পৃথিবীও তোমার সঙ্গে হাসতে থাকবে। আর তুমি যদি বিষণ্ন দৃষ্টিতে দেখ তাহলে পৃথিবীও তোমার কাছে বিষণ্ন মনে হবে। তুমি যদি পৃথিবীকে নিয়ে চিন্তা করতে থাক তাহলে এটা তোমাকে চিন্তাশীলদের মধ্যে পরিগণিত করবে। আর তুমি যদি দয়ালু ও সত্যবাদী হও তাহলে তুমি তোমার চতুর্দিকে এমন সব লোক দ্বারা পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে যারা তোমাকে ভালোবাসবে এবং তাদের অন্তরের সব ভালোবাসা ও সম্মানকে তোমার জন্যে উজাড় করে দেবে।”
দুঃখ-যন্ত্রণার বাহ্যিক তিক্ত দৃশ্য সত্তে¡ও এটা মানুষের মন ও আত্মার জন্যে অত্যন্ত সুফলদায়ক। দুঃখ-কষ্টের কালিমার মধ্যে মানুষের আত্মিক শক্তিসমূহ অধিকতর সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। অবিরত ত্যাগ ও আপোষহীন সংগ্রামের মধ্য হতে মানবীয় শক্তি ও জ্ঞানের বিকাশ হতে হতে মানুষকে তার পরিপূর্ণতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দেয়।###

Related posts

তাত্ত্বিক ভিত্তিসমূহ

ইসলামি শিষ্টাচার: ছোটদের স্নেহ ও বড়দের প্রতি সম্মান

ইমাম রেযা’র (আ.) জ্ঞানপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More