মুয়াবিয়া ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই সমগ্র মুসলিম জাহানে এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আদেশ জারি করে মসজিদের মিম্বার, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি, জুমার নামাযের খুতবাসমূহে প্রকাশ্যে আলী ইবনে আবি তালিবের (আ.) প্রতি গালিগালাজ ও অভিশাপ বর্ষণের নিময় চালু করা হয়। তখন খুতবার শুরুতে আল্লাহর হামদ্ ও রাসূলের (সা.) প্রতি দুরুদ পাঠের পর ইমাম আলীর (আ.) প্রতি (ইসলামের শত্রু হিসেবে) লানত পাঠ করা হত। এ অবস্থা বনি উমাইয়ার শাসক উমর বিন আব্দুল আজিজের শাসনকাল পর্যন্ত বহাল ছিল।
যখন বলা হয় আহলে বাইতের (আ.) এবং আলী ইবনে আবি তালিবের (আ.) দুশমনদের প্রতি অভিসম্পাত জ্ঞাপন, ঘৃণা প্রকাশ এবং তাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা হচ্ছে শিয়া মুসলমানদের ঈমানের পরিচয় কিংবা যখন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয় যে, আহলে বাইতের (আ.) দুশমনদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ স্বয়ং আহলে বাইতের (আ.) বেলায়েতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশেরই অংশবিশেষ; তখন এ দু’টি বিষয় পরস্পর থেকে ভিন্ন কিছু নয়। এখানে দু’টি বিষয় সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন; তম্মধ্যে একটি হচ্ছে- আহলে বাইতের (আ.) দুশমন কারা? অপরটি লানত, অভিশাপ ও ঘৃণা প্রকাশ বলতে কি বুঝায়?
বিভিন্ন রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে সুন্নী মুসলমানরা আহলে বাইতের (আ.) দুশমন নয়। অধিকাংশ মুসলমানরাই সুন্নী মাযহাবের অনুসারী; তারা বিভিন্ন ফেরকা ও মতাদর্শে বিভক্ত। আকিদাগত ও ফিকাহগত দিক থেকে তাদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু তদুপরি সুন্নী মাযহাবের কোন ফেরকা ও মতাদর্শের লোকেরা আহলে বাইতের (আ.) প্রতি শত্রুতা পোষণ করে না। কোন সুন্নী মুসলিম আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.), খাতুনে জান্নাত ফাতিমা যাহরা (আ.), ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রতি অবমাননা বরদাশত করে না; এমনকি এহেন কাজকে তারা হারাম মনে করে। আমি অনেক সুন্নী মাযহাবের অনুসারীকে দেখেছি যখন তাদের সম্মুখে আহলে বাইতের (আ.) কথা বলা হয়, তখন তারা আবেগাপ্লুত হয়ে যায়, এমনকি কেউ কেউ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে।
আহলে বাইতের (আ.) দুশমন হচ্ছে নাসেবী গোষ্ঠী; যারা আহলে বাইতের (আ.) প্রতি অবমাননাকে বৈধ মনে করে। এ ধারা বনি উমাইয়াদের থেকে শুরু এবং আজ অবধি তা বহাল রয়েছে। শাসনযন্ত্রে শাসন কর্তৃত্ব ও আইনগত অধিকারের ক্ষেত্রে পবিত্র আহলে বাইতের (আ.) প্রতি অবিচার মূলত সমস্ত মুসলিম উম্মাহর প্রতি অবিচার, সর্বস্তরের মানুষের প্রতি অবিচার এবং সর্বোপরি সমগ্র মানবতার প্রতি অবিচার।
বক্রচিন্তার কিছু লোক, চাই কথিত আলেম হোক কিংবা মূর্খ; তারা বিশাল মুসলিম জাহানের নগণ্যসংখ্যক একটি গোষ্ঠী যারা (আলেম সদৃশ) আহলে বাইতের (আ.) প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। এ বিপথগামী গোষ্ঠীর প্রেতাত্মারা আজও আহলে বাইতের (আ.) প্রতি শত্রুতা পোষণ করে। তারা কাফির; হয়তো তারা দৃশ্যত পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে কিন্তু রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ী তারা মুসলিম নয়। অনুরূপভাবে শিয়া মাযহাবের মধ্যেও মুষ্টিমেয় কিছু লোক রয়েছে, যারা হচ্ছে গোঁড়া মানসিকতাপূর্ণ, গোলাত বা আকিদার ক্ষেত্রে সীমালংঘন ও বিচ্যুতির শিকার; তারাও ধর্মচ্যুত। এমনকি তারা যদি প্রতিদিন আহলে বাইতের (আ.) যিয়ারতেও শরিক হয়। গোলাত শিয়া হচ্ছে তারা, যারা মাসুম ইমামগণকে (আ.) তাঁদের অবস্থান থেকে অতিমাত্রায় তুলে ধরে; আল্লাহর বৈশিষ্ট্যাবলিকে তাঁদের সাথে সম্পৃক্ত করে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে তারা ইমামগণকে (আ.) মহান আল্লাহর শরিক মনে করে (নাউজুবিল্লাহ)। রেওয়ায়েতের ভাষা অনুযায়ী দু’টি গোষ্ঠী কাফির ও মুরতাদ; তম্মধ্যে একটি গোষ্ঠী হচ্ছে গোলাত শিয়া যারা আহলে বাইতকে (আ.) আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে এবং অপর গোষ্ঠী হচ্ছে নাসেবী যারা আহলে বাইতের (আ.) প্রতি অবমাননা ও বিদ্বেষ পোষণ করে। উভয় গোষ্ঠীই বিচ্যুত, বিভ্রান্ত, কাফির ও মুশরিক; কাজেই তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও মোকাবেলা করা উচিত। এ দু’টি গোষ্ঠীই নগণ্য, মুরতাদ, বিচ্যুত ও বিপথগামী; একটি নিজেদেরকে শিয়া বলে দাবি করে এবং অপরটি সুন্নী নাম ব্যবহার করে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ মুসলিম চাই যে মাযহাবেরই হোক না কেন আহলে বাইতের (আ.) প্রতি শত্রুতা পোষণ করে না। সুতরাং এ দু’টি বিভ্রান্ত গোষ্ঠীর সাথে বিরোধিতা মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য এবং মুসলিম মাযহাবসমূহের মধ্যে অভিন্ন ও যৌথ বিষয়াদির ক্ষেত্রে মতৈক্য, সম্প্রীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। আহলে বাইতের (আ.) শত্রুদের প্রতি লানত বর্ষণ না গালিগালাজ এবং গোলাত শিয়াদের প্রতিও লানত বর্ষণ পুরোপুরি বৈধ বরং মুস্তাহাব। এমনকি তাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ ও তাদের বিরুদ্ধে কাতারবদ্ধ হওয়া ইবাদত তথা আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় কাজ হিসেবে গণ্য। এ দু’টি গোষ্ঠী যে ইসলামের কথা বলে তা কোন অবস্থায় কোরআন স্বীকৃত ইসলাম নয়; বরং বিকৃত ও বিপদজনক।
নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহর (সা.) পবিত্র আহলে বাইতের (আ.) প্রতি ভক্তি ও ভালবাসা পোষণ ঈমানের পূর্ণতার শর্ত; যদি শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের যে কেউ তাদের প্রতি ভক্তি ও ভালবাসা পোষণ না করে তবে তার ঈমান ও আকিদাতে ত্রুটি আছে। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, যদি কারও মধ্যে আহলে বাইতের (আ.) মা’রেফাত না থাকে কিংবা যদি কেউ তাদের প্রতি ভক্তি ও ভালাবাসা পোষণ না করে; তবে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। যদি এটাই মানদÐ হয়ে থাকে, তবে এমনও শিয়া রয়েছে যাদের অন্তরে আহলে বাইতের (আ.) প্রকৃত মা’রেফাত ও ভালবাসার অভাব রয়েছে। তাদের মধ্যে বাহ্যিক ও লোক দেখানো ভালাবাসার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু সে ভক্তি ও ভালাবাসা তাদের অন্তরের গভীরে মোটেও প্রবেশ করে নি। আর এর প্রমাণ হচ্ছে আহলে বাইত (আ.) যেসব মন্দকর্ম সম্পর্কে বলেছেন সেগুলো থেকে তোমরা বিরত থাকো। কিন্তু সেগুলোর অনেক কিছুই কতিপয় শিয়া আঞ্জাম দেয়।
293
আগের পোস্ট
