আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে ইমাম মাহদী (আঃ)র পবিত্র জন্ম

শিয়া এবং আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে মাহদাভিয়াতের বিষয়ে কোন মতপার্থক্য নেই। শিয়া-সুন্নি যে সকল বিষয়ে একমত এবং তাঁদের গ্রন্থে মিল আছে সেগুলির কিছু উল্লেখ্য বিষয় হলঃ
১। মাহদাভিয়াতের মূল বিষয়।
২। মাহদাভিয়াতের বিষয়ে আকিদা রাখা ওয়াজিব।
৩। ইমাম মেহদী (আঃ)’র দাওয়াত এবং ইমামের হাতে সমগ্র পৃথিবীর বিজয় হবে।
৪। হযরত ঈসা (আঃ) আকাশ থেকে পবিত্র কুদস তথা জেরুজালেমে অবস্থিত মুসলমানদের প্রথম কিবলার মসজিদে অবতরণ করবেন এবং তিনি ইমাম মেহদীর পেছনে বায়তুল মুকাদ্দাসে নামায আদায় করবেন।
৫। ইমাম মেহদী (আঃ)’র নাম ও উপাধি।
৬। পশ্চিম থেকে সূর্য উদয় হওয়া।
৭। ইমাম মেহদী (আঃ) আহলেবাইতের একজন সদস্য এবং হযরত ফাতিমার সন্তান।
৮। হাদিস ও রেওায়াতে ইমাম মেহদী (আঃ)’র সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী।
৯। ইমাম মেহদী (আঃ)’র যুগে বরকতের প্রাচুর্য।
১০। কাবা শরিফের রুকন এবং মাকামের মাঝে ইমাম মেহদী (আঃ)’র হাতে বাইয়াত।
১১। ইমাম মেহদী (আঃ)’র বিশ্বব্যাপী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ন্যায়বিচার।
১২। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র নামে ইমাম মেহদী (আঃ)’র নামকরণ।
১৩। ইমাম মেহদী (আঃ)’র আবির্ভাবের কিছু লক্ষণের উপর একমত।
শিয়া-সুন্নি মতপার্থক্য যে বিষয়ে সেটি হল ইমাম মেহদী (আঃ)’র পবিত্র জন্ম। শিয়া মুসলমানদের আকিদা যে ১৫ ই শাবান সবচেয়ে মহিমান্বিত রাতগুলোর অন্যতম। এ ছাড়াও এই দিন মানবজাতির শেষ ত্রাণকর্তা হযরত ইমাম মেহদী (আঃ)’র পবিত্র জন্মদিন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র পবিত্র আহলে বাইতের ১১ তম সদস্য হযরত ইমাম হাসান আসকারী (আঃ)’র পুত্র হিসেবে তাঁর জন্ম হয়েছিল ২৫৫ হিজরিতে ইরাকের (বর্তমান রাজধানী বাগদাদের উত্তরে) পবিত্র সামেরাহ শহরে। তাঁর মায়ের নাম ছিল নার্গিস। এবং তিনি আল্লাহর আদেশে এক পর্যায়ে অদৃশ্য হয়ে যান। তাঁর অদৃশ্য থাকার সময়ও দুই ভাগে বিভক্ত। স্বল্পকালীন সময়ের জন্য অদৃশ্য হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে অদৃশ্য থাকা। দীর্ঘ মেয়াদে অদৃশ্য থাকার পর উপযুক্ত সময়ে তিনি আবার আবির্ভূত হবেন এবং সব ধরনের জুলুম ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন।
কিন্তু সুন্নি ওলামাদের ভিতরেও ইমাম মেহদী (আঃ)’র পবিত্র জন্ম নিয়ে মতপার্থক্য আছে। যে সকল প্রসিদ্ধ সুন্নি সূত্রগুলোতে ইমাম মেহদী (আঃ)’র পবিত্র জন্মদিনের বিষয় শিয়াদের সঙ্গে একমত ও ইমামের জন্মের বিষয় বর্ণনা আছে যে তিনি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র পবিত্র আহলে বাইতের ১১ তম সদস্য, হযরত ইমাম হাসান আসকারী (আঃ)’র পুত্র এবং তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৫ ই শাবান ২৫৫ হিজরিতে ইরাকের (বর্তমান রাজধানী বাগদাদের উত্তরে) পবিত্র সামেরাহ শহরে। সুন্নি ওলামাদের ভিতরে যে সকল ওলামা নিজের পুস্তকে ইমাম হাসান আসকারী (আঃ)’র পুত্রের জন্মকে গ্রহণ করেছেন, কিংবা ইমাম মেহদী (আঃ)’র পবিত্র জন্মের বিষয়ে যে সকল সুন্নি ওলামাগণ ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করেছেন তাঁদের সংখ্যা হল ৬৬ জন। (আল মেহদী আল মোউদ আল মুন্তাযার ইন্দা ওলামাএ আহলে সিন্নাহ ওয়া শিয়া, নাজমুদ্দিন আস্কারী, ১ খন্ড, ১৮২-২২৬ পৃ) কেউ লিখেছেন ৬৮ সুন্নি ওলামাদের নাম। (মুন্তাখাবুল আসার, সাফি গুলপাইগানী, খন্ড ২, ৩৬৯-৩৯৩ পৃ) আবার ১২৮ সুন্নি ওলামাদের পুস্তকের নাম (দেফা আনিল কাফি, সামির হাশিম আমিদি, খন্ড ২, ৫৬৯-৫৯২ পৃ) এবং ১৩৫ সুন্নি ওলামাদের নামও আছে। (দার ইন্তেযারে কাঁকনুস, মেহদী আলিযাদেহ, ১৮৮-১৯৮ পৃ)
যে সকল প্রসিদ্ধ সুন্নি সূত্রগুলোতে ইমাম মেহদী (আঃ)’র পবিত্র জন্মদিনের বিষয় শিয়াদের সঙ্গে একমত ও ইমামের জন্মের বিষয় বর্ণনা আছে সেই সূত্রগুলি এখানে তুলে ধরা হচ্ছেঃ
১- ইবনে আসির জাযরী (৬৩০ হিজরি) লিখেছেনঃ ২৬০ হিজরিতে হাসান ইবনে আলি (মোহাম্মাদের পিতা) যাকে শিয়ারা মুন্তাযার বলেন ইন্তেকাল করেছেন। (আল কামিল ফী তারিখ, ইবনে আসির, বাইরুত, দারে সাদির, প্রকাশ ১৩৮৫ হিজ, ৬ খন্ড, ৩২০ পৃ)
২- মোহাম্মাদ বিন তালহা শাফেয়ী (৬৫২ হিজরি) লিখেছেনঃ আবুল কাসিম মোহাম্মাদ বিন হাসান তিনিই মেহদী ও হুজ্জাত এবং হকের (সত্যিকারের ইমাম) প্রতিনিধি। (মাতালেব আল সাউল, ইবনে তালহা শাফেয়ী, বাইরুত, আল্বালাঘ, ১ প্রকাশ ১৪১৯ হিজ, ২ খন্ড, ১৫২ পৃ)
৩- সিবত ইবনে জোযি (৬৫৪ হিজরি) লিখেছেনঃ মোহাম্মাদ ইবনে হাসানই হলেন মেহদী, যিনি সালেহের প্রতিনিধি, হুজ্জাত ও সাহেবুজ্জামান ও কায়েম মুন্তাযার এবং তিনিই হলেন শেষ ইমাম। (তাযকিরাতুল খাওয়াস, সিবত ইবনে জোযি, ৩২৫-৩২৬ পৃ)
৪- গাঁজি শাফেয়ী লিখেছেনঃ যেরূপ হযরত ঈসা, হযরত খিযর এবং হযরত ইলইয়াস শত শত বছর ধরে জীবিত আছেন, তেমনি ইমাম মেহদী ও জীবিত থাকতে পারেন। (আল বায়ান ফী আখবারএ সাহেবুযযামান, গাঁজি শাফেয়ী, ৯৭ পৃ)
৫- ইবনে খালকান (৬৮১ হিজরি) লিখেছেনঃ শিয়াদের বিশ্বাস আবুল কাসিম মোহাম্মাদ বিন হাসান আসকারী হলেন ১১ তম ইমাম যিনি হুজ্জাত নামে প্রসিদ্ধ। তাঁর জন্ম হয় ২৫৫ হিজরির ১৫ ই শাবানে। (ওফইয়াতুল আইয়ান, ইবনে খালকান, বাইরুত, দারুল ফিকর, ১ প্রকাশ ১৯৭১ খৃ, ৪ খন্ড, ১৭৬ পৃ)
৬- আলি ইবনে মোহাম্মাদ বিন সাব্বাগ মালেকি (৮৫৫ হিজরি) ইমাম মেহদীর জীবিত থাকার বিষয় বহু প্রমাণ বর্ণনা করেছেন। (আল ফুসুলুল মুফিম্মাহ, ইবনে সাব্বাগ মালেকি, ১ পৃ ১৪২২ হিজরি, ২৮১ পৃ)
৭- শামসুদ্দিন যাহাবি (৭৪৮ হিজরি) বহু স্থানে মোহাম্মাদ বিন হাসান আসকারির বিষয় লিখেছেনঃ “হাসান বিন আলি আল-জাওয়াদ শিয়াদের বারো ইমামদের একজন, যাহার ইস্মত (পবিত্রতা)এর উপরে শিয়ারা বিশ্বাস রাখেন। তিনি (ইমাম আসকারি) মুন্তাযির এর বাবা। (আল এবার ফী খাবার মিন গাবার, সামসুদ্দিন যাহাবি, বাইরুত, দারুল কিতাব আল ইলমিয়া, ১ প্রকাশ ১৪০৫ হিজরি, ১ খন্ড, ৩৭৩পৃ)
শামসুদ্দিন যাহাবি অন্য এক পুস্তকে লিখেছেনঃ “আবু মোহাম্মাদ (ইমাম আসকারি) শিয়াদের ইমাম। তাঁর পুত্র মোহাম্মাদ বিন হাসান ২৫৮ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। (তারিখুল ইসলাম ওয়া ওফইয়াতুল মাশাহির ওয়াল আলাম, সামসুদ্দিন যাহাবি, বাইরুত, দারুল কিতাব আল-আরাবি, ২ প্রকাশ ১৪১৩ হিজন্দ, ১৯ খন্ড, ১১৩ পৃ)
যাহাবি অন্য পুস্তকে আরও লিখেছেনঃ “মুন্তাযির শরীফ যিনি আবুল কাসিম, মোহাম্মাদ বিন হাসান আসকারিই। (পূর্ব; সিয়ার ইলামুন নবলা, কাহিরাহ, দারুল হাদিস, ১৪২৭ হিজরি, ১৩ খন্ড, ১১৯ পৃ) হাসান বিন আলি বিন জাওয়াদ শিয়া ইস্না আশারিদের ইমাম দুনিয়া থেকে চলে যান, এবং তিনি শিয়াদের মুন্তাযির (মেহদী)এর বাবা ছিলেন। (পূর্ব; দোওালুল ইসলাম, বাইরুত, মানশুরাত আল আলামি, ১৪০৫ হিজরি, ১৪৫ পৃ)
৮- আবদুল ওয়াহাব শা’রানী (৯৭৩ হিজরি) লিখেছেনঃ তিনি (ইমাম মেহদী) ইমাম হাসান আসকারির এক পুত্র এবং ২৫৫ হিজরির শাবান মাসের মাঝে জন্ম গ্রহণ করেন এবং হযরত ঈসা (আঃ)এর আগমন পর্যন্ত জীবিত থাকবেন। (আল ইওাকিত ওয়াল জাওাহির, শা’রানী, ২য় খন্ড, ৫৬২ পৃ)
৯- ইবনে হাজার হিতামি (৯৭৪ হিজরি) লিখেছেনঃ আবুল কাসিম, মোহাম্মাদ আল হুজ্জাত তাঁর পিতার ইন্তেকালের সময় পাঁচ বছরের ছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাআ’লা তাঁকে হিকমত দান করেছেন; এবং কায়েম ও মুন্তাযির নাম দেওয়া হয়েছে। (আল সাওায়েক আল মুহাররেকা, হিতামি, ২য় খন্ড, ৬০১ পৃ)
১০- সাইইয়াদ মোমিন শাবলাঞ্জি (১২৯০ হিজরি) লিখেছেনঃ এই অধ্যয় মোহাম্মাদ বিন হাসান এর বিষয় লেখা হয়েছে। তাঁর মাতা কানিজ ছিলেন এবং তাঁর উপাধি ছিল আবুল কাসেম। (নুরআল আবসার ফী মানাকেবে আলে বাইতুন নাবী আল মুখতার, ১ প্রকাশ ১৩০৮ হিজরি, ১৬৮ পৃ)
১১- সুলেমান বিন ইবরাহিম আল-কুনদুযি (১২৯৪ হিজরি) লিখেছেনঃ কায়েম (আঃ)এর জন্ম ২৫৫ হিজরির ১৫ই শাবানের রাত্রে সামেরাহ শহরে হয়েছিল। (এনাবিউল মাওাদ্দাত, সুলেমান হানাফি কুনদুযি, ২য় খন্ড, ৫৪৩ পৃ)
১২- খাইরুদ্দিন জারকুলি (১৩৯৬ হিজরি) এই বিষয়ে লিখেছেনঃ মোহাম্মাদ বিন হাসান আসকারি শিয়াদের শেষ ইমাম এবং তাঁদের মাঝে মেহদী এবং সাহিবুজ্জামান নামে পরিচিত, যিনি সামেরাহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর পিতার ইন্তেকালের সময় প্রায় পাঁচ বছরের ছিলেন। (আল এলাম, খাইরুদ্দিন যারকুলি, ৬ খন্ড, ৮০ পৃ)
১৩- মুহিউদ্দিন বিন আরাবি, যিনি তাঁর পুস্তক ‘ফাতুহাতে মাক্কিয়া’র ৬য় খন্ডে, ৫১ পৃষ্ঠায় বিস্তারিত লিখেছেনঃ “মোহাম্মাদ বিন হাসান আল-আসকারি হলেন ইমাম মেহদীএ মোউদ যার আবির্ভাবের বিষয় নবী (সঃ আঃ) ওয়াদা দিয়েছেন”। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, ‘ফাতুহাতে মাক্কিয়া’র নূতন প্রকাশগুলিতে কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।
যে সকল সুন্নি ওলামা ইমাম মেহদীর জন্মকে গ্রহণ করেছেন এবং বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন তাঁদের ভিতরে উল্লেখ্যঃ সা’রানী, সাবান (ইস’আফুর রাগেবিন ফী সিরাতুল মুসতাফা ওয়া ফাযায়েলে আহলেবাইতেহিল তাহেরিন, কাহেরাহ, দারে শাক্রুন, ৮ম প্রকাশ ১৩৮৪ হিজরি, ১৪১-১৪২ পৃ) এবং হাসান হামযাভী (মাশারেকুল আনোয়ার ফী ফাওযে আহলিল এতেবার, কাহেরাহ, মাক্তাবাহ আযহারিয়া, প্রকাশ ১৪২৭ হিজরি, ১১২ পৃ) এই বিষয়টি তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন।
সুন্নি প্রসিদ্ধ আলিম আলি বিন মোহাম্মাদ বিন আহমাদ মালেকি যিনি ইবনে সাবাগ নামে পরিচিত, ইমাম মেহদীর জন্মকে বিশ্বাস করেন এবং শিয়াদের মতই চিন্তা রাখেন।
যাইহোক, ইবনে আরাবী, শারানী এবং অন্যান্য ব্যক্তির মত কতিপয় সুন্নি আলেমও বিশ্বাস করেন যে, ইমাম মুহম্মদ ইবনে হাসান আল-আসকারীই হলেন হযরত মাহদী (আঃ)। তারা তাঁর নাম ও নসব (বংশ পরিচিতি) স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন এবং তাঁকে তারা জীবিত ও গায়েব বলে বিশ্বাস করেন।
ইমাম বাকির (আ.) থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে: “যখন আমাদের কায়েম আবির্ভূত হবে ও বিপ্লব করবে তখন পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলে যে ব্যক্তিকেই প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করবে তখন তাকে বলবে: তোমার হাতের তালুতেই তোমার কর্মসূচী ও প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা আছে। যখনই তোমার ক্ষেত্রে কোন ব্যাপার ঘটবে যা তুমি বুঝনি এবং যার হিকমতও তোমার জানা নেই তখন তুমি তোমার হাতের তালুর দিকে তাকাবে এবং সেখানে যে নির্দেশনা বিদ্যমান আছে তদনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।” (নুমানী প্রণীত গাইবাত, পৃ. ৩১৯) মোহাম্মাদ জয়নুল আবেদিন, কাঠমান্ডু, নেপাল

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More