অনুবাদ: মোঃ হোসাইন কাদীর গাজী
নাহজুল বালাগাহ বইয়ের বিরাট একটি অংশ জুড়ে (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) নৈতিকতা, তাকওয়া এবং উপদেশ বিষয়ক আলোচনা করা হয়েছে।
সেখানে ইমাম আলী (আঃ) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ খুতবা রয়েছে। যাতে শুধুমাত্র মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই খুতবাটি ইমাম আলী (আঃ) তার সাহাবী হাম্মামের অনুরোধে বলেছিলেন। এজন্য এটিকে “খুতবায়ে হাম্মাম”ও বলা হয়।
মাওলায়ে মুত্তাকিয়ান ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) এর হাম্মাম নামে একজন মুত্তাকি সাহাবী ছিলেন। একদিন তিনি ইমামকে বললেন, “হে ইমাম, আপনি মুত্তাকিদের সম্পর্কে কিছু বলুন যাতে আমি তাদেরকে কল্পনায় দেখতে পাই। ইমাম প্রথমে বলতে দিতে চাইলেন না। অতঃপর বললেন- হে হাম্মাম, আল্লাহকে ভয় করো কেননা, আল্লাহ সর্বদা তাদের সাথেই আছেন, যারা মুত্তাকি ও সৎকর্মশীল।
হাম্মাম এতে সন্তুষ্ট হলেন না এবং ইমাম আলী (আঃ) কে তার কসম দিলেন। এরপর ইমাম (আঃ) আল্লাহর প্রশংসা করে এবং মুহাম্মদ ও আলে মুহাম্মদের প্রতি দরুদ প্রেরণ করে খুতবা শুরু করলেন।
খুতবাটি নিম্নরূপ: “মহান আল্লাহ্ রব্বুল আলামিন সকল অস্তিত্বকে সৃষ্টি করার পর তাদের আনুগত্য পাবা থেকে অমূখাপেক্ষী ছিলেন কেননা, তাদের সৎকর্ম তাদের নিজেদেরই উপকারে আসে, আল্লাহর নয়। আবার তাদের অসৎকর্ম তাদের নিজেদেরই ক্ষতি করে, আল্লাহর নয়। আল্লাহ তাদেরকে সমস্ত উপকরণ দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মুত্তাকিদের কথা কিছুটা ভিন্ন। কেননা তারা নম্রভাবে হাঁটে, আল্লাহ যেগুলো হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকে, তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে, কানকে অনর্থক কথা শোনা থেকে বিরত রাখে, নিজেদেরকে জ্ঞানের দিকে ধাবিত করে। তারা শত দুঃখ-কষ্ট, বালা, মুসিবতের মধ্যে থেকেও এমনভাবে চলে যেন দেখে মনে হয় স্বস্তি ও শান্তির মধ্যে জীবনযাপন করছে।
তারা সওয়াবের আশায় এবং পাপের ভয়ে দুনিয়ায় থাকতে চাইতো না যদি মৃত্যু অবধারিত না থাকতো। তারা বেহেশতকে এমনভাবে দেখে যা নিয়ামত ও শান্তি দ্বারা পরিপূর্ণ আর তারা দোযখকে এমনভাবে দেখে যা আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত।
মুত্তাকিদের অন্তর উদ্বিগ্ন থাকে তবে তাদের দ্বারা কারো কোনো ক্ষতি হয় না। তাদের শরীর হালকা (চিকন), চাওয়া (চাহিদা) কম, অন্তর পাক ও পবিত্র। তারা দুনিয়াতে কিছুদিনের জন্য কষ্ট সহ্য করে অনন্তকাল আরামে থাকার কথা চিন্তা করে।
পাপিরা কিছুক্ষণ অন্যায় কাজ করে সুখভোগ করে অনন্তকাল জাহান্নামের আযাব ভোগ করবে।
অন্যদিকে মুত্তাকিরা কিছুদিন কষ্ট সহ্য করে অনন্তকাল জান্নাতে আরামভোগ করবে।
তারা সারারাত জেগে পারা পারা আকারে, ধীরে ধীরে, বুঝে বুঝে কোরআন পড়ে। এটা পড়ার সময় তারা অনেক কষ্ট করে তবে এর মধ্যেই তারা দুঃখ নিবারনের ওষুধ খোঁজ করে। কোরআন পড়তে পড়তে যখন তারা সুসংবাদ দেওয়ার আয়াতে পৌঁছায় তখন তারা এতই আনন্দিত হয় ও আগ্রহ প্রকাশ করে যেন তারা তা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। এটা দেখার জন্য তাদের মন উতলা হয়ে ওঠে। আর যখন তারা আযাবের আয়াতে পৌঁছায় তখন তারা তা মনোযোগ সহকারে উপলব্ধি করে এবং মনে হয় যেন তারা জাহান্নামীদের আর্তনাদ নিজ কানে শুনতে পাচ্ছে। তখন তারা নতজানু হয়ে যায় এবং সিজদাতে লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
আর তারা দিনের বেলায় আলেম, মুত্তাকি ও ধৈর্যশীল হয়ে থাকে। কোনো সুঁই (সূচ) কে ধারালো করার জন্য যেমন ঘষতে হয় তেমনভাবে তারা নিজেদের ছোট ছোট গুনাহগুলো মাফ চেয়ে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে যায়।
যখন মুত্তাকিদের সাথে দেখা হয় মনে হয় তারা অসুস্থ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা অসুস্থ নয় বরং তারা সৎকর্মে এতোটা ব্যস্ত যে অন্য কাজ করার সময়ই পায় না।
তারা অনেক ভালোকাজ করেও মনে করে তেমন বেশি কিছু করতে পারিনি। তারা সর্বদা নিজেকে ছোট মনে করে ও দোষী সাব্যস্ত করে। কেননা তারা নিজে জানে যে তারা কি করেছে আর আল্লাহ্ তার থেকে বেশি জানেন।
তারা বলে, হে আল্লাহ অন্যরা যা বলে সে বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, তারা আমাকে যতোটা ভালো মনে করে আমাকে তার থেকেও ভালো কাজ করার তৌফিক দান করুন আর তারা যে সমস্ত গুনাহের কথা জানেনা সেগুলো ক্ষমা করুন।
মুত্তাকিরা দ্বীন ইসলামের কাজে সবসময় অগ্রগামী থাকে। তারা দূরদর্শী, নম্র, ভদ্র, জ্ঞান পিপাসু এবং দৃঢ় বিশ্বাসী। তারা তাদের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ইবাদাতের সময় বিনয়ী থাকে।
তারা গরীব অবস্থাতেও নিজেকে ধনী মনে করে এবং বিপদে থাকে ধৈর্যশীল। তারা সর্বদা হালাল ও হেদায়েতকে হাসিমুখে খোঁজ করে।
তারা লোভ করে না এবং ভালো কাজ করার সময় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে ।
তারা আল্লাহর প্রশংসা করতে করতে দিনকে রাতে পরিণত করে আর যিকর করতে করতে রাতকে দিনে পরিণত করে।
তারা সারারাত আল্লাহর ভয়ে অতিবাহিত করে এবং সকালে শান্তি অনুভব করে। তাদের ভয়ের কারণ হলো এই যে, কোনো গাফিলতি করে ফেলেছে কিনা। আর তাদের আনন্দের কারণ হলো এই যে, আল্লাহর রহমত তাদের উপর নাযিল হয়েছে।
যদি তাদের নাফস কোনো খারাপ জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয় তাহলে তারা তার প্রতি অনিহা প্রকাশ করে এবং চেষ্টা করে তাদের নাফসের চাহিদা পূরণ না করতে।
তাদের অন্তরের প্রশান্তি তার মধ্যেই যেটা স্থায়ী আর তারা তা থেকে দুরত্ব অবলম্বন করে যেটা অস্থায়ী।
তাদের মধ্যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দুইটাই আছে। তাদের কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকে। তাদের চাহিদাও অত্যন্ত কম, অন্যায়ও অত্যন্ত কম।
তাদের অন্তর বিনয়ী এবং অল্পে তুষ্ট। তাদের খাওয়াও কম তাই কষ্টও কম। তাদের বস্তুগত কোনো চাহিদা নেই।
তারা তাদের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং তাদের দ্বারা কারো কোনো ক্ষতি হয় না।
তারা জালেমকে ক্ষমা করে দেয় আর বঞ্চিতকে দান করে। তারা সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। তারা কখনোই মন্দভাষায় গালিগালাজ করে না এবং সর্বদা মিষ্টি ভাষায় কথা বলে।
তাদের মধ্যে কোনো খারাপ জিনিস খুঁজে পাওয়া দুষ্কর কেননা সৎকর্ম তাদের মধ্যে বিকশিত। তারা সর্বদা কল্যাণের পথে থাকে এবং অকল্যাণের পথ থেকে দূরে থাকে।
যে সকল কষ্ট অন্যদের জর্জরিত করে, সে কষ্ট তাদের উপর কোনো প্রভাব ফেলে না। কেননা তারা কষ্টে ধৈর্যহারা হয় না।
তারা যখন ভালো থাকে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করে এবং কখনো শত্রুর উপরেও জুলুম করে না।
কেউ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষি দেওয়ার পূর্বেই তারা তাদের স্বীয় ভূল স্বীকার করে।
তারা কখনো আমানতের খিয়ানত করে না। তাদেরকে কিছু মনে রাখতে বললে তারা তা ভুলে যায় না। তারা অন্যদেরকে কখনো খারাপ নামে ডাকে না, প্রতিবেশিকে কষ্ট দেয় না এবং মুসিবতের সময় অন্যকে দোষারোপ করে না।
তারা কখনো বাতিলকে গ্রহণ করেনা এবং হক থেকে বিচ্যুত হয় না। তারা প্রয়োজন ব্যতিত কথা বলে না, অট্রহাসি হাসে না এবং নিজের তাকওয়া রক্ষার জন্য কিছু মানুষ থেকে দূরে থাকে। এই দূরত্বটা অহংকারের জন্য নয় আর নিকটে আসাটাও কৌতুক বা চক্রান্ত নয়।”
খুতবাটি শোনার পর হাম্মাম বেহুশ হয়ে গেলো এবং মারা গেলো।
ইমাম আলী (আঃ) বললেন:- “আমি আশংকা করছিলাম সে এগুলো শোনার পর বেঁচে থাকতে পারবেনা, যারা এই ধরণের উপদেশ পাওয়ার যোগ্য তাদের উপর এমনই প্রভাব বিস্তার করে।”
একজন বলে উঠলো:- কেন আপনার উপর প্রভাব বিস্তার করলো না?
ইমাম বললেন:- “মৃত্যুর জন্য কারণ ও সময় উভয়ের দরকার হয়, হাম্মামের জন্য এটাই মৃত্যুর সময় ও মৃত্যুর কারণ ছিল। তোমরা এই ধরণের কথা বলো না, কেননা এসব শয়তানের কথা যা তোমার দ্বারা বলানো হয়েছে।” (সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদিত)
তথ্যসূত্রঃ অশনাঈ বা মুতুনে হাদীস ওয়া নাহজুল বালাগাহ, মাহদী মোহরিযী####
