ইমাম জাফর সাদিকও শিয়াদের অন্য সকল ইমামদের ন্যায় ইমামতের দাওয়াত দিয়েছেন। এই ঐতিহাসিক সত্যটি প্রমাণ করার জন্য সবচেয়ে চূড়ান্ত প্রমাণ হল অসংখ্য বর্ণনা যা ইমাম জাফর সাদিকের বাণী থেকে ইমামতের দাবীকে স্পষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে উদ্ধৃত করে।
আমি বিষয়টি ব্যাখ্যা করব। ইমাম এই বিষয়টির প্রচার ও প্রসার করার সময় সংগ্রামের এমন একটি পর্যায়ে রয়েছেন যেখানে তাকে অবশ্যই সেই সময়ের শাসকদের সরাসরি এবং স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং জনগণের সামনে নিজেকে ইমামত ও বেলায়াতের প্রকৃত হকদার হিসেবে দাবি করতে হবে। আর এটা তখনই কেবল করা সম্ভব হবে যখন এর পূর্বের সকল বিষয়ের তাবলিগ বা প্রচার সম্পন্ন হবে। সবার মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হবে। সর্বত্র ও সবার মধ্যে প্রস্তুতি পরিলক্ষিত হবে। বেশির ভাগের মধ্যে ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠত হবে। ন্যায়পরায়ণ শাসনব্যবস্থা যে কতটা জরুরী সেটা সকলেই উপলব্ধি করবে। আর তখনই কেবল একজন নেতা চূড়ান্ত সংগ্রামের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এগুলো ছাড়াই কাউকে সমাজের ইমাম বা নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা তড়িঘড়ি এবং অহেতুক কাজ হবে।
আরও যে বিষয়টিকে বেশী করে গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে ইমাম কখনো কখনো শুধুমাত্র নিজের ইমামতকে প্রমাণ করেই ক্ষান্ত হন না। বরং তিনি নিজের নামের পাশাপাশি তাঁর পূর্বের ও পরের ইমামদের নাম এবং পরিচয় তুলে ধরেন। প্রকৃতপক্ষে, ইমামতের ধারা যে অবিচ্ছেদ্য সেটাই প্রমাণ করেন। এর মাধ্যমে ইমাম একদিকে যেমন প্রমাণ করেন যে, এর আগেও যেসকল অবৈধ খলিফারা ছিল তারাও সকলেই জালিম ও তাগুত ছিল। এখনও যারা রয়েছে তারাও জালিম ও তাগুত। আর শিয়াদের বর্তমান ও পূর্বের জিহাদ একই সূত্রে গাঁথা রয়েছে এবং অব্যাহত থাকবে। এভাবে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) নিজের ইমামতকে পূর্বের ইমামদের ইমামতের সাথে সংযুক্ত করে এটাকে ভিত্তিহীন হওয়া থেকে বের করে নিজের সিলসিলাকে মহানবীর সঠিক সিলসিলার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। নিম্নে আমরা ইমামের দাওয়াতের কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরব:
এ প্রসঙ্গে আমার দেখা সবচেয়ে মজার রেওয়াতেটি হল আমরু বিন আবিল মাকদাম হতে বর্ণিত হাদিস। যেখানে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। ৯ই জিলহজ্ব আরাফাত দিন। সেদিনের বিশেষ আমল পালন করার জন্য গোটা মুসলিম বিশ্ব থেকে প্রচুর পরিমাণে প্রতিনিধি উপস্থিত রয়েছেন। এই পরিবেশে একটি সঠিক কথা সবার দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে ফেলতে পারে। ইমাম নিজে সেখানে উপস্থিত হয়ে বাণী বা বার্তা দিচ্ছেন। তিনি জনতার মাঝে উপস্থিত হয়ে উচ্চস্বরে তিনবার তাঁর কথাকে পুনরাবৃত্তি করছেন।
﴿ ایها الناس ان رسول الله کان الامام ثم کان علی ابن ابی طالب ثم الحسن ثم الحسین ثم علی ابن الحسین ثم محمد ابن علی و ثم جعفر ابن محمد. ﴾
হে জনগণ! মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন ইমাম তথা নেতা। তারপর আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন ইমাম। তারপর ইমাম হাসান এবং ইমাম হুসাইন ইমাম ছিলেন। তারপর ছিলেন ইমাম সাজ্জাদ, ইমাম বাকের এবং এখন আমিই হচ্ছি সঠিক ও সত্য ইমাম। ( বিহারুল আনওয়ার ৪৭তম খন্ড, পৃ: ৫৮)
অন্য একটি হাদিস আবিস সাবাহ কিনানি থেকে বর্ণিত হয়েছে, সেখানে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) নিজেকে এবং অন্যান্য ইমামদেরকে এভাবে পরিচয় করিয়েছেন:
আমরা হলাম তারা যাদের আনুগত্যকে মহান আল্লাহ সকল মানুষের জন্য ফরজ করেছেন। এছাড়া আনফাল (তথা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদ ছাড়া অন্য যে কোনো সম্পদ) এবং সাফুল মালও (মুসলমানদের থেকে গসব করা সম্পদ উদ্ধার হওয়া) আমাদের কাছেই দিতে হবে। কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী এসব সম্পদ মহান আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং রাসুলের স্থলাভিষিক্তের জন্য তথা অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য নির্দিষ্ট যাতে এসব সম্পদকে মুসলিম জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। তাই আনফাল হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুল মালের অন্যতম প্রধান উৎস। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এ হাদিসে নিজেকে আনফাল এবং সাফুল মালের হকদার হিসেবে পরিচয় করাচ্ছেন। আর এভাবে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছেন যে, বর্তমান সময়ের ইসলামী শাসক তিনি, সবকিছু তাঁর হাতেই থাকবে এবং তিনিই এগুলোর সঠিক ব্যবহার করবেন। অন্য হাদিসে ইমাম এক এক করে সব ইমামদের নাম উচ্চারণ করেন এবং তাদের আনুগত্য যে ওয়াজিব সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেন এবং নিজের নামের সময় চুপ করে থাকেন। শ্রোতা সহজেই বুঝতে পারেন যে, ইমাম বাকিরের পর ইমাম হচ্ছেন ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা তাঁর হাতেই থাকা উচিত। এভাবে ইমাম যে সে যুগের নেতা সেটা তুলে ধরেন এবং তিনি যে হযরত আলীর উত্তরসূরী সেটাও প্রমাণ করে দেন। আল কাফি গ্রন্থের হুজ্জাত কিতাবে এবং বিহারুল আনওয়ারের ৪৭তম খন্ডে+ ইমামগণ যে তাদের ইমামতের তাবলিগ করেছেন এবং মুসলমানদের নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার যে একমাত্র তাদের সে বিষয়টি সরাসরি এবং ইশারা ইঙ্গিতে বারংবার বর্ণিত হয়েছে।
গোটা মুসলিম বিশ্বে ইমামতের ব্যাপক তাবলিগের বিষয়ে আরও স্পষ্ট দলিল রয়েছে। আর এ দলিল এতটাই শক্তিশালী যে, যদি এর স্বপক্ষে কোন হাদিসও না থাকত তারপরও তা বুঝতে কারও বিন্দুমাত্র কোন সমস্যা হত না। যারা ইমামগণের লিখিত জীবনী অধ্যয়ন করে তাদের মনে এ প্রশ্ন জাগ্রত হতেই পারে যে, ইমামগণ উমাইয়াদের যুগে নিজেদের সত্যতা প্রচারের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, না কি করেন নি? আর যদি না-ই করে থাকবেন তাহলে আমরা যে দেখতে পাই, ইমামগণের সাথে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র তাদের প্রতিনিধিদের গভীর সম্পর্ক ছিল এবং তারা খুমসের অর্থ ইমামের কাছে পৌঁছে দিতেন এবং শরীয়তের মাসআলা-মাসায়েল জেনে নিতেন। মদীনা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে যত খুমসের সম্পদ আসত, বিভিন্ন এলাকা থেকে যত প্রশ্ন আসত তা কিভাবে সম্ভব হত? এছাড়াও আলে আলী তথা আহলে বাইতের প্রতি গোটা বিশ্বের মুসলমানদের যে ভালবাসা তা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? খোরাসান, সিসতান, বসরা, ইয়েমেন, কুফা মিশরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে যে অধিক পরিমাণে ইমামের ছাত্র ছিল যারা ছিলেন মুহাদ্দিস ও রাভি তারা কিভাবে গড়ে উঠল? কোন শক্তিশালী ও পবিত্র হাত এদেরকে গড়ে তুলেছিল? এটা বলা কি সম্ভব যে, তা কাকতালীয় এবং আকস্মিকভাবে হয়ে গিয়েছিল?
উমাইয়াদের পক্ষ থেকে কোন ব্যতিক্রম ছাড়াই গোটা মুসলিম বিশ্বে শিয়া মাজহাবের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো হত। এমনকি আলীর নামকে অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে সকল মিম্বর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে নামাজের খোতবায় লানত করা হত। এমতাবস্থায় একটি শক্তিশালী সংগঠণ না থাকলে কিভাবে সম্ভব হত যে, গোটা মুসলিম বিশ্বে আহলে বাইতের ভক্ত তৈরি হবে এবং তারা দূর দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে হিজাজ তথা মদীনায় এসে ইমামের সাথে সাক্ষাত করত এবং ইমামের কাছ থেকে ধর্মীয়, রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করত। আবার বিভিন্ন সময়ে তারা অত্যাচারী উমাইয়াদের বিরুদ্ধে কিয়াম তথা সংগ্রাম করার জন্য ইমামের কাছে অনুমতি চাইত। তারা যদি ইমামদের থেকে শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই গ্রহণ করতেন তাহলে জিহাদ তথা সংগ্রামের জন্য অনুমতি চাইবেন কেন?
প্রশ্ন আসতে পারে, যদি সত্যিই এমন কোন শক্তিশালী সংগঠন থাকত তাহলে কেন তার কোন নাম আমরা শুনতে পাই না এবং সরাসরি সে সম্পর্কে কোন ঘটনাও আমাদের জানা নেই? উত্তরে বলতে হয় যা আমরা আগেও বলেছি, এর মূল কারণ হচ্ছে সতর্কতা এবং তাকিয়্যাহ অবলম্বন করা যাতে শত্রæরা এ বিষয় সম্পর্কে না জানতে পারে এবং ইমাম পর্যন্ত তারা না পৌঁছাতে পারে। সুতরাং শিয়াদের জিহাদ সফল না হওয়া এবং তাদের ক্ষমতায় না আসার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। যদি আব্বাসীরাও ক্ষমতায় না পৌঁছাত এবং তাদের চেষ্টা সফল না হত তাহলে তাদেরও এমন অনেক গোপন কথা, পদক্ষেপ এবং নানা ধরণের তিক্ত ঘটনার কষ্ট তাদের মনের মধ্যেই থেকে যেত, কেউ সে সম্পর্কে কিছু জানতেও পারত না এবং কোন ইতিহাসেও তা লিখিত হত না। (পিশওয়ায়ে সাদেক)
তাকিয়্যাহর কথা এলে প্রশ্ন আসে আমরা কেবল তখনই তাকিয়্যাহ করব যখন কোন জালিম শাসক ক্ষমতায় থাকবে এবং আমরা তার ভয়ে কিছু না বলতে পেরে গোপনে কাজ করব। না তখনও ভয়ের কারণে তাকিয়্যাহ করতে হয় নি। বরং التّقيّة ُ تُرس ُ المُؤمِن তাকিয়্যাহ হচ্ছে মুমিনের ঢাল। ঢাল কখন কাজে লাগাতে হয়? ঢাল যুদ্ধের ময়দানে কাজে লাগে যখন মানুষ সংগ্রামে লিপ্ত থাকে তখন ঢাল ব্যবহার করে। সুতরাং তাকিয়্যাহ সংগ্রামের সময় কাজে লাগে, কেননা তা হল ঢালস্বরূপ।
তখনও তাকিয়্যাহর অর্থ এটাই ছিল। যখন তাকিয়্যাহ করতাম তার অর্থ হচ্ছে শত্রæর গায়ে তলোয়ারের আঘাত করছি। কিন্তু সে না তরবারি দেখতে পাচ্ছে, না হাত উঁচু করা দেখতে পাচ্ছে, না তরবারি দিয়ে আঘাত করা দেখতে পাচ্ছে। বরং শুধুমাত্র ব্যথাটা ভালভাবেই অনুভব করছে। আর এটার নাম হচ্ছে তাকিয়্যাহ। তখনও যারা তাকিয়্যাহ করত এভাবেই করত। তাঁরা গোপনে, শত্রæর চোখের আড়ালে, গোপন স্থান থেকে, বহু চিন্তা-ভাবনা ও সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করতেন। যেমন: খুব সতর্কতার সাথে লিফলেট বিতরণ করতেন, আর যখন তা মানুষের হাতে পৌঁছাত তখন শত্রুর মান-সম্মান ধুলোর সাথে মিশে যেত। এ কাজ তলোয়ারের আঘাতের মতই শক্তিশালী ছিল, যখন সে আঘাত তাদের কোমরে গিয়ে লাগত তাদের কোমর ভেঙ্গে যেত। সুতরাং তাকিয়্যাহ করতাম এর অর্থ হচ্ছে আমরা কি করছি তা শত্রু বুঝতে পারত না। কাজেই তাকিয়্যাহ ছিল ঢাল আর তাকিয়্যাহ যিনি করতেন তিনি সেই ঢালের পিছনে লুকিয়ে থাকতেন। তাকিয়্যাহর অর্থ হচ্ছে এটা, আর এখনও এ অর্থকেই বোঝায়।
332
আগের পোস্ট
