ইমাম রেযা (আ.)কে স্থলাভিষিক্ত করার ক্ষেত্রে মামুনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাই যে, আব্বাসিয় খেলাফতের লোকজন “আর রেযা মিন আলে মোহাম্মাদ” উক্ত শ্লোগানের মাধ্যমে ইরানিদের ভালবাসা এবং আলাভিয়ানদের মন জয় করতে চেয়েছিল। কিন্তু যখন তারা ক্ষমতায় আসে তখন তারা আলাভি মুসলমানদের উপরে অত্যাচার করা শুরু করে দেয় যেমন নাফসে যাকিয়া, হুসাইন বিন আলি, ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.), ইমাম মূসা কাযিম (আ.)কে শহিদ করে। আর এগুলো ছিল আব্বাসিয় খেলাফতের অন্যতম কালো অধ্যায়। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৯৭, তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮১, আল কাফি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৮৪, মুরুজুয যাহাব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৩৬, মাকাতেলুত তালেবিন, পৃষ্ঠা ৩০০, তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭৬)
কিন্তু তারপরেও আব্বাসিয় খেলাফতের ক্ষমতা মানুষের অন্তর থেকে আহলে বাইতের পবিত্র ইমাম (আ.)’দের প্রতি ভালবাসাকে মুছে দিতে পারেনি। বরং তাদের উক্ত ষড়যন্ত্রের বিপরীতে তাঁদের প্রতি মানুষের ভালবাসা আরো বৃদ্ধি পায়। বরং উক্ত ভালাবাসা শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং তা খলিফার পরিবার এবং তাদের দরবারের লোকজনের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছিল যেমন: খলিফা হারুনর রশিদের স্ত্রী জুবাইদা, খলিফা মনসুরের নাতি এবং আব্বাসিয় খেলাফতের অতি সম্মানিত নারী ইমাম রেযা (আ.)’এর ইমামতকে মেনে নিয়েছিল। যখন হারুনর রশিদ তার স্ত্রীর উক্ত খবরটি জানতে পারে তখন সে তাকে তালাক্ব দেয়ার কসম খায়। (আমালি সাদুক্ব)
রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন আব্বাসিয় খেলাফতের লোকজন ইমাম মূসা কাযিম (আ.)’এর শাহাদতের খবর প্রচার করে তখন মনসুর দাওয়ানেকি’র পুত্র সুলাইমান তার সন্তান এবং দাসদেরকে নির্দেশ দেয় যেন খেলাফতের উক্ত কাজে তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং সে নিজেও খালি পায়ে ইমাম (আ.)’এর জানাযায় অংশগ্রহণ করে। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৮, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৮, পৃষ্ঠা ২২৫)
যখন মনসুর দাওয়ানেকি’র পুত্র সুলাইমান হারুনর রশিদকে পত্র লিখে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চায় তখন হারুনর রশিদ তার চিঠির উত্তরে লিখে জানায় যে, আত্মিয়তার দরদ দখোচ্ছো। আমি শপথ করে বলছি যে, ইমাম (আ.)কে হত্যার কাজটি সিন্দি বিন সাহাক আমার নির্দেশে করেনি। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৮, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৮, পৃষ্ঠা ২২৫)
সে আরো বলে যে, ইমাম মূসা ইবনে জাফর (আ.)’এর শাহাদতের মূল কারণ হচ্ছে আলাভি মুসলমানরা। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩৭- ২৪৩, মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩২৬)
এখন মূসা কাযিম (আ.)’এর সন্তান ইমাম রেযা (আ.) নিজেকে মুসলমানদের ইমাম বলে পরিচয় দিয়ে বেড়াচ্ছে। যেহেতু খলিফা হারুন ইমাম মূসা কাযিম (আ.)’এর শাহাদতের কারণে ভয় পেয়েছিল। সেহেতু সে ইয়াহিয়া বিন খালেদ বারমাকি’কে বলে যে, আমরা ইমাম রেযা (আ.)’এর বাবার সাথে যা করেছি তাতে হয়তো তাঁর শিক্ষা হয়নি। আমার মন চায় তরবারি দ্বারা সকল আলাভি মুসলমানদেরকে হত্যা করে ফেলি। (উয়ুনে আখবারে ইমাম রেযা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২২৬, কাশফুল গুম্মা, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৫)
ইমাম রেযা (আ.) আব্বাসিয় খলিফাদের উক্ত মানসিক অবস্থার সার্বিক সুবিধাকে কাজে লাগান এবং প্রকাশ্যেভাবে নিজের ইমামতকে প্রকাশ করেন। কেননা তখন আমিন এবং মামুন উভয়েই খেলাফত অর্জনের জন্য একে অপরের রক্তের পিপাসু হয়ে পড়ে এবং অবশেষে ১৯৮ হিজরি মহরম মাস শেষ হওয়ার ৫ দিন পূর্বে মামুন আমিনকে হত্যা করে খেলাফতকে নিজের দখলে নিয়ে নেয়। (আত তাম্বিয়া ওয়াল ইশরাফ, পৃষ্ঠা ৩২৩)
মামুন খেলাফতের মূল কেন্দ্রকে বাগদাদ থেকে মার্ভে স্থানান্তরিত করে। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৫, তাবারি, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ৫৭৪- ৫৭৫)
কিন্তু উক্ত সময়ে বিভিন্ন স্থানের মুসলমানরা আব্বাসিয় খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধও সংঘটিত হয় যার ফলে হাজার হাজার মুসলমানরা মারা যায়। আর এর ফলে আহলে বাইত (আ.)’এর অনুসারিরা বিভিন্ন স্থানে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে তোলে নিম্নে কিছু স্থানের নাম উল্লেখ করা হলো:
১- বাসরা: আবুল সারায়া যাইদ বিন মূসা বিন জাফর বাসরাতে আব্বাসিয় খেলাফতের বিরুদ্ধে বিপ্লব করে এবং সেখান থেকে আব্বাসিয় সমর্থকদের বের করে দেয় এবং তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। আর এ কারণেই তাকে যাইদুন নার উপাধি দান করা হয়। (আল ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৮৬)
২- ইয়েমেন: ইব্রাহিম বিন মূসা বিন জাফর (আ.)’এর নেতৃত্বে ২০০ হিজরিতে বিপ্লব সংঘটিত হয়। তিনিও ইয়েমেন থেকে আববাসিয় সমর্থকদেরকে বিতাড়িত করেন। (আল কামেল ফিত তারিখ, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩১০, ৩১১)
৩- মক্কা: হুসাইন বিন হাসান আফতাস আলাভি ২০০ হিজরিতে মক্কায় বিপ্লব করেন এবং তা হেজাজ এমনকি সম্পূর্ণ ইয়েমেনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মামুন উক্ত বিপ্লবি কর্মকান্ডকে বন্ধ করার জন্য ঈসা বিন যাইদ জালুদিকে প্রেরণ করে যেন সে মিথ্যা অঙ্গিকার দানের মাধ্যেমে হুসাইন বিন হাসান আফতাস আলাভিকে মামুনের বাইয়াত করতে বাধ্য করে। (তাবারি, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ১২৬- ১২৭)
যখন মামুন দেখলো যে, আব্বাসিয় খেলাফতের বিরুদ্ধে বিপ্লবকারীদের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে রাসুল (সা.)’এর বংশধরের লোকজন। তখন সে ইমাম মূসা কাযিম (আ.)’এর পরে বিভিন্ন বিপ্লবকে দমন এবং ইমাম রেযা (আ.)’কে নিজের নখদর্পনে রাখার জন্যে ষড়যন্ত্রের একটি নীল নকশার পরিকল্পনা করে। আর এ কারণেই খলিফা মামুন ইমাম রেযা (আ.)কে মদিনা থেকে মার্ভে জোরপূর্বক ডেকে নিয়ে আসে। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৬৫, আল কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৫৫)
ইমাম রেযা (আ.)কে পরবর্তী খলিফা পদটি দান করার পিছনে মামুনের বিশেষ কিছু উদ্দেশ্য ছিল। সে মুসলমানদের কাছে প্রমাণ করতে চাচ্ছিলো যে, ইমাম (আ.)গণ ও খেলাফতের মসনদে বসার ইচ্ছা পোষণ করে কেননা সাধারণ জনগণ জানতো না যে, মামুন ইমাম রেযা (আ.) কে জোরপূর্বক মার্ভে নিয়ে এসেছে এবং তাঁকে জোরপূর্বক পরবর্তী খলিফা হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। যেহেতু ইমাম রেযা (আ.) মামুনের অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিল সেহেতু তিনি শর্ত রাখেন যে, তিনি খেলাফতের কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন না। (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৯, পৃষ্ঠা ১২৯- ১৩০)####