ইমাম হোসাইন (আ.) আন্দোলন করার জন্য কুফাকে বেছে নেয়ার কারণ

by Shihab Iqbal

ইসলামের ইতিহাসের পর্যালোচনায় শিয়া,সুন্নি প্রাচ্যবিদ নির্বিশেষে প্রত্যেক গবেষক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন যে, কেন ইমাম হোসাইন (.) আন্দোলন করার জন্য কুফাকে বেছে নিলেন? সবাই নিজ নিজ জ্ঞানের পরিধি অনুযায়ী প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যে বিষয়গুলো প্রশ্নটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তা হলো

. ইমাম হোসাইন (.) রাজনৈতিক সামরিক অভ্যুত্থানে বাহ্যিকভাবে পরাজয়ের শিকার হন এবং তাঁর পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলো কুফাকে বিপ্লবের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেয়া

. সময়ের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিরা,যেমন তাঁর চাচাত ভাই ভগ্নিপতি আবদুল্লাহ বিন জাফর(ইবনে ছাম কুফী, আল ফুতুহ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৬৭),আবদুল্লাহ বিন আব্বাস(আল ফুতুহ, পৃ. ৬৬),আবদুল্লাহ বিন মুতি(আলবিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৬২),মিসওয়ার বিন মাখরামা(আলবিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৬২) এবং মুহাম্মাদ হানাফিয়া(বিহারুল আনওয়ার, ৪৪তম খণ্ড, পৃ. ৩৬৪) ইমাম হোসাইন (.)-কে ইরাক কুফায় যেতে নিষেধ করেছিলেন। আর তাঁদের কেউ কেউ কুফাবাসীদের অতীত বিশ্বাসঘাতকতা প্রতারণার কথা তুলে ধরেছিলেন যা তারা ইমাম আলী (.) এবং ইমাম হাসান (.)-এর সাথে করেছিল

কিন্তু ইমাম হোসাইন (.) তাঁদের নিষেধ সত্ত্বেওযদিও এগুলো পরবর্তীকালে বাহ্যিকভাবে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছিলনিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং কুফার দিকে রওয়ানা দেন। আর এখানেই কতিপয় ঐতিহাসিক বিশেষ করে ইবনে খালদুন সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন যে,ইমাম হোসাইন (.) ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেননি।(মুকাদ্দামে ইবনে খালদুন, পৃ. ২১১)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসসহ কতিপয় ব্যক্তিত্বের কথা থেকে বোঝা যায় যে,ইমাম হোসাইন (.)-এর সামনে কুফা ছাড়াও অন্যান্য জায়গা,যেমন ইয়েমেনের পথ খোলা ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস,ইমাম হোসাইন (.)-কে বলেন : ‘যদি নিতান্তই মক্কা থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করেন তাহলে ইয়েমেনের দিকে যান। কারণ,সেখানে সুরক্ষিত উপত্যকা দুর্গ আছে,আর তা বিস্তৃত এক এলাকা। অতএব,সেখানে থেকে আপনি আপনার আহ্বায়ক প্রচারকদেরকে বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে পারবেন।’(ইবনে আসির, আলকামিল ফিত্ তারীখ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৪৫)

কিন্তু কেন ইমাম হোসাইন (.) পথগুলা বেছে নিলেন না?

প্রশ্নের জবাবে শিয়া আলেমরা ছাড়া অন্য ব্যক্তিবর্গ,যেমন সুন্নি আলেম প্রাচ্যবিদগণ সাধারণ দৃষ্টিতে ইমাম হোসাইন (.)-এর আন্দোলনকে বিশ্লেষণ করেছেন। আর তাঁরা ক্ষেত্রে শিয়াদের আকীদাবিশ্বাস বিশেষ করে ইমামদের গায়েবের জ্ঞান থাকা এবং ভুলত্রুটি থেকে মুক্ত থাকার বিষয় দুটিকে দৃষ্টিতে রাখেননি; বরং তাঁরা বিপ্লবের সামরিক ফলাফলের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলেছেন যে,ইমাম হোসাইন (.) তাঁর সিদ্ধান্তে ভুলের শিকার হয়েছেন

কিন্তু শিয়ারা নিজেদের আকীদাবিশ্বাসের ভিত্তিতে ইমামের পদক্ষেপকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং এক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত পেশ করেছেন। তাঁদের মতামতগুলো সাধারণত দুটি মৌলিক মতের মধ্যে সীমাবদ্ধ যা নিম্নরূপ :

এক. শাহাদাতের দৃষ্টিভঙ্গি

মতটি নিম্নোক্ত মৌলনীতিগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত :

. শিয়াদের প্রত্যেক ইমাম ইমামতের দায়িত্ব লাভের সময় উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত একটি বই খোলেন এবং তার মধ্যে লিখিত নির্দেশনা থেকে স্বীয় ঐশী দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত হন। আর তাতে বর্ণিত নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা কাজ করেন।(উসূলে কাফী, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৮৩৬)

. ইমাম হোসাইন (.) যখন নিজের কর্মসূচির পাতা খোলেন তার মধ্যে নিজের দায়িত্ব এভাবে লক্ষ্য করেন– ‘যুদ্ধ কর,হত্যা কর এবং জেনে রেখ যে,নিহত হবে। একদল লোক নিয়ে শাহাদাতের জন্য নিজের এলাকা ত্যাগ করে চলে যাও এবং জেনে রেখ যে,তারা তোমার সাথেই শাহাদাত বরণ করবে।’(উসূলে কাফী, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৮৩৬)

অতএব,প্রথম থেকেই আল্লাহর ইচ্ছা ছিল যে,ইমাম হোসাইন (.) শাহাদাত বরণ করুন। আর ইমাম হোসাইন (.)-এর আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ ছিল না। ইমাম হোসাইন (.) যখন ইরাক অভিমুখে রওয়ানা দিয়েছিলেন তখন একবার স্বপ্নে মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে তিনি শাহাদাতের বিষয় সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। যখন মুহাম্মাদ হানাফিয়া কুফা যাওয়ার কারণ সম্পর্কে ইমাম হোসাইন (.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তখন তিনি জবাবে বলেছিলেন : “মহানবী (সা.) স্বপ্নে আমার কাছে আসেন এবং আমাকে বলেন : ‘হে হোসাইন! বের হও,কারণ,আল্লাহ তাআলা তোমাকে শহীদ অবস্থায় দেখতে চান। ”(লুহুফ, পৃ. ৮৪)

উপরিউক্ত মতামতের প্রেক্ষিতে বলা যায় যে,( মতবাদের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং এর প্রতি বিশ্বাসীদের সম্পর্কে জানার জন্য পড়ুন : মুহাম্মাদ সিহহাতী সারদরুদী লিখিতশাহীদে ফাতেহ দার অঈনেয়ে আনদীশে’,পৃ. ২০৫২৩১) কুফার দিকে ইমাম হোসাইন (.)-এর যাত্রা আসলে শাহাদাত লাভের উদ্দেশ্যে ছিল। আর ইমাম হোসাইন (.) ভালোভাবেই তাঁর এরূপ নিয়তির কথা জানতেন। অতএব,এটি ছিল ইমাম হোসাইন (.)-এর বিশেষ দায়িত্ব যে ক্ষেত্রে তিনি কোনক্রমেই অন্য কোন ব্যক্তি,এমনকি পূর্ববর্তী দুই ইমামের অনুসরণ করতে পারেন না

অতএব, ব্যাপারে কোন প্রশ্নের অবকাশ থাকতে পারে না। আর বড় বড় ব্যক্তিত্বের মতকে উপেক্ষা করে ইমাম হোসাইন (.)-এর কুফা যাওয়ার বিষয়টিও সমাধান হয়ে যায়। কারণ,শিয়াদের দৃষ্টিতে,ইমাম হোসাইন (.) কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতা প্রতারণা সম্পর্কে অন্যদের থেকে ভালো জানতেন। তিনি এটাও জানতেন যে,পরিশেষে কুফাবাসী তাঁকে পরিত্যাগ করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং তাঁকে শহীদ করবে। বিষয়টি জানা সত্ত্বেও তিনি কুফার উদ্দেশে রওয়ানা হন যাতে স্বীয় শাহাদাতের স্থানে পৌঁছেন এবং শহীদ হন

কিন্তু প্রশ্ন হলো শাহাদাতের উদ্দেশ্য কী ছিল?

এক. নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ বলেন : শাহাদাতের উদ্দেশ্য ছিল সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধের দায়িত্ব পালন। আর তাঁর রক্তের মাধ্যমে ইসলামের চারাগাছে পানি সিঞ্চন করা দায়িত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় ছিল। পরিশেষে রক্ত ইসলামের পুনরুজ্জীবন এবং ইয়াযীদ বনি উমাইয়ার মুখোশ উন্মোচনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলশ্রুতিতে ৭০ বছর পর উমাইয়া শাসনের কবর রচিত হয়

আবার কেউ কেউ,যাঁরা সাধারণত আবেগপ্রবণ এবং যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী নন তাঁরা কোনরূপ দলিল উপস্থাপন ছাড়াই শাহাদাতের উদ্দেশ্যকে ইমাম হোসাইন (.)-এর অনুসারীদের গুনাহের কাফ্ফারা এবং শিয়াদের জন্য ইমামের শাফাআত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ঠিক যে রকম হযরত ঈসা (.) সম্পর্কে খ্রিস্টানরা মনে করে।(শাহীদে ফাতেহ, পৃ. ২৩৯)

শাহাদাতের উপরিউক্ত দৃষ্টিভঙ্গিটি যে সকল বর্ণনার ভিত্তিতে বলা হয়েছে সেগুলোর সনদের সমস্যা (বর্ণনাকারীদের দুর্বলতা) ছাড়াও আরও কতগুলো সমস্যা রয়েছে যা নিম্নে তুলে ধরা হলো

. ইমাম হোসাইন (.)-এর বিশেষ কোন দায়িত্ব থাকার বিষয়টি তাঁর এবং অন্য ইমামদের সকলের জন্য আদর্শ হওয়ার মৌলনীতিকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। অথচ ইমামদের অনুসরণীয় আদর্শ হওয়া এবং শিয়াদের জন্য তাঁদের আনুগত্যের আবশ্যকতা যুগ যুগ ধরে শিয়াদের নিকট একটি সুনিশ্চিত বিষয় হিসেবে চলে এসেছে

. দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ইমাম হোসাইন (.)-এর বক্তব্যের সুস্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। কারণ,তিনি বলেছেন : ‘আমি তোমাদের আদর্শ।’(তারীখে তাবারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৪০৩)

. যদিও ইমাম হোসাইন (.)-এর শাহাদাত সম্পর্কে পূর্ববতী নবিগণ,মহানবী (সা.),ইমাম আলী (.) ইমাম হাসান (.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং ইমাম হোসাইন (.)-এর কতগুলো বক্তব্য থেকেও স্পষ্টভাবে জানা যায় যে,তিনি নিজের শাহাদাত সম্পর্কে অবগত ছিলেন,কিন্তু তাঁর কোন বক্তব্য থেকেই এটা বোঝা যায় না যে,ইমামের আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল শাহাদাত বরণ করা। তাই আন্দোলনের উদ্দেশ্যকে ইমাম হোসাইন (.)-এর সামগ্রিক বক্তব্য থেকে উদ্ঘাটন করতে হবে। ইমাম হোসাইন (.) স্বীয় ভ্রাতা মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়ার কাছে লিখিত অসিয়তনামায় সুস্পষ্টভাবে আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন

‘…আমি আমার নানার উম্মতের মধ্যে সংস্কার সাধনের উদ্দেশ্যে বের হয়েছি। আমি চাই সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতে। আর আমার নানা মুহাম্মাদ (সা.) এবং আমার পিতা আলী বিন আবী তালিব (.) যে পথে চলেছেন,আমিও সেই পথে চলতে চাই।’(বিহারুল আনওয়ার, ৪৪তম খণ্ড, পৃ.৩২৯; ইবনে সাম, আলফুতুহ, ৫ম খণ্ড,পৃ. ২১।)

ইমাম হোসাইন (.)-এর এই অসিয়তনামায় তিনটি উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো হলো : সংস্কার সাধন,সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধ এবং মহানবী (সা.) ইমাম আলী (.)-এর সুন্নাতের অনুসরণ। ইমাম তাঁর অসিয়তনামায় শাহাদাত সম্পর্কে কিছুই বলেননি

দুই. ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিভঙ্গি

কতিপয় লেখকের মতে(শাহীদে ফাতেহ, পৃ. ১৬৯), দৃষ্টিভঙ্গি প্রথমবার শিয়াদের মধ্যে বিশেষ করে সাইয়্যেদ মুরতাজা আলামুল হুদার (৩৫৫৪৩৬ হি.) লেখনীর মধ্যে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি ইমাম হোসাইন (.)-এর কুফা রওয়ানা দেয়া সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে বলেন : ‘…আমাদের মাওলা আবু আবদুল্লাহ (.) কেবল তখনই খেলাফত লাভের জন্য কুফার দিকে যান যখন তিনি কুফাবাসীদের পক্ষ থেকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পান এবং বিজয় সুনিশ্চিত দেখেন। …’(শাহীদে ফাতেহ, পৃ. ১৭০, উদ্ধৃতি তানজিহুল আমবিয়া, পৃ. ১৭৫) সাইয়্যেদ মুরতাজার পর কোন শিয়া আলেম এরকম দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেননি;বরং অধিকাংশ আলেম,যেমন শেখ তূসী (.),সাইয়্যেদ বিন তাউস (.) আল্লামা মাজলিসি (.) কোন কোন সময় দৃষ্টিভঙ্গির চরম বিরোধিতা করেছেন। (বিরোধিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড় : শাহীদে ফাতেহ, পৃ. ১৮৪১৯০ এবং ২০৫২৩১)

সমসাময়িক কালে কতিপয় লেখক পুনরায় দৃষ্টিভঙ্গি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন,যাতে আহলে সুন্নাত এবং প্রাচ্যবিদদের সন্দেহসংশয় নিরসনের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি উপযুক্ত জবাব দিতে পারেন। চিন্তাশীল মহলের ওপর দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব থাকার কারণে আলেমসমাজ এবং পণ্ডিত ব্যক্তিগণ চরমভাবে এর বিরোধিতা করেছেন। এমনকি শহীদ মোতাহ্হারী এবং ডক্টর শরিয়তীর মতো পণ্ডিত ব্যক্তিগণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেননি।(বিরোধিতা এবং পাল্টা জবাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন : রাসূল জাফারিয়ান লিখিতইরানের ধর্মীয় রাজনৈতিক দল উপদলসমূহ’, পৃ. ২০৮২১৪) কারণ, দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো,এতে ইমামের (.) ইলমে গায়েবের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয়নি

কিন্তু মতের সার কথাটি হলো ইমাম হোসাইন (.)-এর আন্দোলন ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল; আর কাজ ইয়াযীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং উমাইয়া গোষ্ঠীর মুখোশ উন্মোচন করা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে সম্ভব ছিল না। ইমাম খোমেইনী (.) সহ আরো অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি তা সমর্থন করেছেন। ইমাম খোমেইনী (.) বিভিন্ন সময় বিষয়ের প্রতি ইশারা করেছেন এবং বলেছেন : ‘ইমাম হোসাইন (.)-এর আন্দোলনের উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে একটি ছিল ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করা। যেমন:

. //১৩৫০ ফারসি (১৯৫২ খ্রি.) তারীখে নাজাফ শহরে ইমাম খোমেইনী (.) তাঁর বক্তৃতায় বলেন : ‘ইমাম হোসাইন (.) কুফাবাসীদের থেকে বাইআত নেয়ার জন্য মুসলিম বিন আকীলকে পাঠান,যাতে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন এবং ইয়াযীদের অবৈধ সরকারকে উৎখাত করতে পারেন।’(সাহিফায়ে নূর, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭৪)

. ‘ইমাম হোসাইন (.) যখন মক্কায় আসেন এবং হজের মওসুমে মক্কা থেকে বের হন তখন সেটা ছিল একটা বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ। ইমামের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ইসলামী রাজনৈতিক। ইমাম হোসাইন (.)-এর এসব ইসলামী রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোই উমাইয়া শাসনের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদি তিনি এসব পদক্ষেপ না নিতেন তাহলে ইসলামই ধ্বংস হয়ে যেত।’(সাহিফায়ে নূর,১ম খণ্ড, পৃ. ১৩০)

. ‘ইমাম হোসাইন (.) খেলাফত লাভের জন্য এসেছিলেন। তাঁর আন্দোলনে নামার আসল উদ্দেশ্য ছিল এটাই। আর এটা ছিল তাঁর গৌরব

যারা মনে করে তিনি খেলাফত লাভের জন্য আসেননি তাদের ধারণা ভুল;বরং ইমাম এসেছিলেন খেলাফত লাভের জন্য। তিনি চেয়েছিলেন খেলাফত যেন ইমাম হোসাইন (.) এবং তাঁর অনুসারীদের মতো ব্যক্তিদের হাতে থাকে।’(সাহিফায়ে নূর, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯০)

দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে কতগুলো দলিল নিচে উল্লেখ করা হলো

. সবচেয়ে বড় দলিল হলো,ইমাম হোসাইন (.)-এর সেই বক্তব্য যা তিনি মদীনা থেকে বের হওয়ার সময় প্রদান করেছিলেন। আর এতে তিনি স্বীয় আন্দোলনের লক্ষ্য হিসেবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছিলেন : সংস্কার সাধন,সৎকাজের আদেশ অসৎকাজের নিষেধ এবং মহানবী (সা.) হযরত আলী (.)-এর সুন্নাতের অনুসরণ।(বিহারুল আনওয়ার, ৪৪তম খণ্ড, পৃ. ৩২৯) আর এটা সুস্পষ্ট যে,সংস্কার সাধন ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সম্ভব নয়। এছাড়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে সৎকাজের আদেশ অসৎকাজের নিষেধ কেবল এমন ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্ভব,যে সরকারের শাসক হবেন ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ এবং যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মহানবী (সা.) ইমাম আলী (.)-এর সুন্নাতের অনুসরণের কথা,যার মাধ্যমে ইমাম এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের শাসন পরিচালনার পদ্ধতির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আর নিজের উদ্দেশ্য হিসেবে মহান ব্যক্তিদের সুন্নাতের অনুসরণের কথা বলার অর্থ হলো তিনি তাঁদের ন্যায় ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করতে চান

. কুফাবাসীরা তাদের চিঠিতে লিখেছিল,আমাদের যোদ্ধা সৈন্যরা প্রস্তুত,কিন্তু তাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো কোন ইমাম নেই।(এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, কুফাবাসীরা যদিও ইয়াযীদকে খলিফা হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি ইমাম হোসাইনকে কুফায় এস নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু তারা ইমাম হোসাইনকে কখনই খেলাফতের প্রকৃত হকদার হিসাবে মনে করে তা করে নি। বরং তাদের প্রায় সকলেই বনি উমাইয়ার শাসনে অতীষ্ঠ হয়ে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে ইমাম হোসেনেরযার সমাজে রাসূলের নাতি হিসাবে জনপ্রিয়তা প্রসিদ্ধি রয়েছেসহযোগিতা চেয়েছে।) তাদের চিঠির ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে,তারা ইয়াযীদের সরকারকে অবৈধ মনে করে। তাই তারা ইমাম হোসাইন (.)-এর কাছে চেয়েছিল যে,তিনি যেন কুফায় এসে ইমাম হিসেবে শাসনভার গ্রহণ করেন। ইমাম কুফাবাসীদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের নিমিত্তে আন্দোলন শুরু করেন। উদাহরণস্বরূপ : কুফা থেকে আগত একটি চিঠিতেযেটি কুফার বড় বড় ব্যক্তিত্ব,যেমন সুলায়মান বিন সুরাদ খুজায়ী,মুসাইয়্যেব বিন নাজাবাহ্ হাবীব বিন মাজাহের লিখেছিলেনবর্ণিত হয়েছে : ‘আমাদের কোন ইমাম নেই। অতএব,আমাদের কাছে আসুন। আশা করা যায় যে,আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে আমাদেরকে সত্যের ওপর একত্র করবেন।’(ওয়াকাআতুত তাফ, আবু মিখনাফ, পৃ. ৯২)

. কুফাবাসীদের দাওয়াতের প্রথম জবাবে ইমাম হোসাইন (.) মুসলিম বিন আকীলকে কুফায় পাঠান। আর এটা ছিল ইমামত এবং ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার নিদর্শন। মুসলিম বিন আকীলকে কুফায় পাঠানোর সময় ইমাম কুফাবাসীদেরকে সম্বোধন করে একটি চিঠি লিখেন– ‘তোমরা যা বলেছ তা বুঝতে পেরেছি,তোমাদের চিঠির সারমর্ম হলো তোমাদের কোন ইমাম নেই।’(ওয়াকাআতুত তাফ, আবু মিখনাফ, পৃ. ৯১)

চিঠি দ্বারা ইমাম নিজের কুফা যাওয়াটাকে শর্তসাপেক্ষ করে তোলেন। আর সে শর্ত হলোমুসলিমের দ্বারা কুফাবাসীর দাবির সত্যতা প্রত্যয়ন।(ওয়াকাআতুত তাফ, আবু মিখনাফ, পৃ. ৯১)

. ইমাম হোসাইন (.) স্বীয় চিঠিতে কতগুলো শর্ত উল্লেখ করেছিলেন। আর সেগুলো যে কেবল ইমাম হোসাইন (.)-এর ওপরই প্রযোজ্য হয় তা সুস্পষ্ট। শর্তগুলো উপরিউক্ত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রমাণ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ইমাম (.) তাঁর চিঠিতে ইমামতের ধারায় রাষ্ট্রপরিচালনার দিকগুলো নিয়েই বেশি আলোচনা করেছেন। আর শরীয়তের আহকাম বর্ণনা সংক্রান্ত কোন আলোচনা তিনি করেননি। যদিও পরবর্তীকালে কেউ কেউ ইমামতকে আহকাম (শরীয়তের বিধিবিধান) বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেনযা একটি আংশিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

সম্পর্কে ইমাম হোসাইন (.) স্বীয় চিঠিতে বলেন : ‘আমার আত্মার শপথ! শুধু ব্যক্তিই ইমাম হতে পারেন যিনি পবিত্র কুরআনের পূর্ণ জ্ঞান রাখেন,ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী,সত্যের ওপর আমলকারী এবং নিজের সমস্ত চেষ্টাপ্রচেষ্টাকে আল্লাহর পথে কাজে লাগান (আল্লাহর জন্য নিজেকে একনিষ্ঠভাবে নিবেদিত রাখেন)’(ওয়াকাআতুত তাফ, আবু মিখনাফ, পৃ. ৯১)

. মুসলিমের কর্মকাণ্ডগুলো ছিল কুফায় ইমাম হোসাইন (.)-এর পক্ষ থেকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট আলামত। তাঁর কর্মকাণ্ডগুলো ছিল নিম্নরূপ:

. ইমাম হোসাইন (.)-কে সাহায্য করার জন্য দেয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আমল করার জন্য কুফাবাসীদের থেকে বাইআত গ্রহণ।(তারীখে ইয়াকুবী,২য় খণ্ড, পৃ. ২১৫ ২১৬)

. বাইআতকারীদের তালিকা তৈরি করা। বলা হয়েছে যে,বাইআতকারীদের সংখ্যা ১২ হাজার থেকে ১৮ হাজারের মধ্যে ছিল।(মুরুজুয যাহাব,৩য় খণ্ড,পৃ. ৬৪।)

. বনি উমাইয়ার অনুসারীরা ইয়াযীদকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল যে,দিন দিন মুসলিমের অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। থেকে বলা যায়,তারা বুঝতে পেরেছিল যে,মুসলিমের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে কুফা তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। নিচের বাক্য থেকে তা পরিষ্কার বোঝা যায়– ‘যদি কুফার প্রয়োজন থাকে,তাহলে কঠোর শাসক সেখানে নিয়োগ কর,যে তোমার নির্দেশ পালন করবে এবং তোমার দুশমনের সাথে তোমার মতো আচরণ করবে।’(ওয়াকাআতুত তাফ, পৃ. ১০১)

. দাবির পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলোইমাম হোসাইন (.)-এর কাছে প্রেরিত মুসলিমের প্রতিবেদন। মুসলিম ইমাম হোসাইন (.)-কে সাহায্য করার জন্য কুফাবাসীদের আগ্রহ এবং পদক্ষেপকে সমর্থন করে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন যা কুফা অভিমুখে ইমামের রওয়ানা হওয়ার কারণ হয়।(ওয়াকাআতুত তাফ,পৃ. ১১২) ইমাম (.) মাঝপথে কুফাবাসীদের উদ্দেশে চিঠি লেখেন এবং তা কায়েস বিন মুসাহ্হার সায়দাভীর মাধ্যমে কুফায় প্রেরণ করেন। ইমাম সেই চিঠিতে মুসলিমের পত্রের ভিত্তিতে ৮ই যিলহজকে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার তারীখ হিসেবে ঘোষণা করেন। আর তিনি কুফা শহরে পৌঁছা পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে বলেন। ইমাম স্বীয় চিঠিতে বলেন : ‘মুসলিমের পত্র আমার কাছে পৌঁছেছে যা তোমাদের সঠিক সিদ্ধান্তের পরিচায়ক। আর তোমরা যে আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত এবং দুশমনদের থেকে আমাদের অধিকার আদায় করার জন্য তৈরি তা আমি বুঝতে পারলাম মহান আল্লাহর কাছে চাই,তিনি যেন আমাদের কাজকে সুন্দর করে দেন এবং তোমাদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করেন। চিঠি প্রেরণের পরই মঙ্গলবার ৮ই যিলহজতারবিয়ার দিনমক্কা থেকে তোমাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। তোমাদের কাছে আমার দূত পৌঁছা মাত্রই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রস্তুত হয়ে যাও এবং সত্যের পথে অটল থাক। আমিও খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের কাছে চলে আসছি।’(আলইরশাদ,পৃ. ৪১৮)

কয়েকটি সমস্যা

উপরিউক্ত দাবির ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সমস্যা রয়েছে,যা নিম্নে তুলে ধরা হলো

. দৃষ্টিভঙ্গির শিয়াদের কালামশাস্ত্রের মৌলিক ভিত্তির সাথে বৈপরীত্য রয়েছে। কারণ,কালামশাস্ত্রের মতে,ইমামদের অদৃশ্যের জ্ঞান আছে

. দৃষ্টিভঙ্গি ইমামের ভুল কাজ করার প্রতি ইশারা করে যা ইমামের নিষ্পাপ হওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বলা যেতে পারে যে, সমস্যার কারণেই শিয়া সমাজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে

সমস্যার উত্তর দিতে গেলে আমাদেরকে শিয়াদের কালামশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে হবে যেখানে ইমামের অদৃশ্যের জ্ঞান নিষ্পাপ হওয়া এবং ঐগুলো প্রমাণ করার দলিল এবং ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সেগুলোর গরমিল পরিলিক্ষিত হলে তা দূর করার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের কাজ যেহেতু ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা সেহেতু কালামশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করা থেকে বিরত থাকব। তবে,এটুকু বলতে চাই যে,কালামশাস্ত্রের ভিত্তিতেও দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক প্রমাণ করা সম্ভব। যেমন ইমাম খোমেইনী (.)-এর মতো বড় ব্যক্তিত্বের মতও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করা একটি দ্বীনি দায়িত্ব। আর তা অবশ্যই পরিকল্পনা,চূড়ান্ত দলিল উপস্থাপন (যাতে কারো কোন অজুহাত দেখানোর অবকাশ না থাকে),বিচক্ষণতা এবং অন্যদের সহযোগিতা নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু ফলাফল আল্লাহর কাছে এবং সেটার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এমনকি ফলাফল জানা থাকলেও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে কোন বাধা নেই। কেননা,যে ব্যক্তি সত্যের পথে অগ্রসর হয় তার পরাজয় সাময়িক,আর কালক্রমে চূড়ান্ত বিজয় অবশ্যই সত্যপন্থীদের হয়ে থাকে

তদুপরি সমস্যা থেকে যায় যে,ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইমাম হোসাইন (.)-এর আন্দোলন যে পরাজয়ের শিকার হয় তা প্রমাণ করে যে,কুফাবাসীদের সম্পর্কে ইমামের ধারণা সঠিক ছিল না; বরং সময়ের অন্যান্য ব্যক্তিত্ব,যেমন ইবনে আব্বাসের ধারণাই ছিল সঠিক

ঐতিহাসিক পর্যালোচনা বাস্তবভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা যায়

ইমাম হোসাইন (.)-এর আন্দোলনের যৌক্তিকতা

যদি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব একটি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে যথেষ্ট পর্যালোচনা বিভিন্ন অবস্থার দিকে লক্ষ্য রাখার পর কোন একটা ফলাফলে পৌঁছে এবং সেই ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়,আর এর মাঝে সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনা সংঘটিত হয়ে তার সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে বাধার সৃষ্টি করে,তাহলে সে ব্যক্তিকে কোনক্রমেই দোষী সাব্যস্ত করা যায় না

আমরা বিশ্বাস করি, সময় ইমাম হোসাইন (.) কুফার অবস্থা খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি মুয়াবিয়ার খেলাফতকালে কুফাবাসীদেরকে কোন জবাব দেননি এবং সুস্পষ্টভাবে তাদের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন(দিনওয়ারী, আলআখবারুত্ তোওয়াল, পৃ. ২০৩),এমনকি স্বীয় ভ্রাতা মুহাম্মাদ হানাফিয়াকে তাদের আহ্বানে সাড়া দিতে নিষেধ করেছিলেন।(ইবনে কাসীর, আলবিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৬৩)

আর সময়ও কুফাবাসীদের চিঠি পৌঁছামাত্রই তাদের প্রতি বিশ্বাস করেননি;বরং তাদের দাবির যথার্থতা সত্যতা জানার জন্য স্বীয় চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকীলকে সেখানে পাঠান। মুসলিম সেখানে এক মাসেরও বেশি সময় অবস্থান করেন এবং খুব নিকট থেকে এলাকার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হন,আর সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে,ইমাম হোসাইন (.)-এর আগমনের জন্য কুফার অবস্থা অনুকূলে। মুসলিম স্বীয় চিঠিতে কুফার অনুকূল অবস্থার কথা ইমামকে জানান। সময় ইমাম হোসাইন (.) কুফার দিকে রওয়ানা হন। অবশ্য ইমাম যে হজের মওসুমে তাড়াতাড়ি করে মক্কা থেকে বের হয়েছিলেন তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তাঁর জীবননাশের আশঙ্কা

এর মাঝে যে অপ্রত্যাশিত ঘটনা সংঘটিত হয় তা হলো,কুফার গভর্নরের পদ থেকে নোমান বিন বশীরের অপসারণ এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে তাঁর স্থলাভিষিক্তকরণ যা কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পক্ষে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব ছিল না। বরং বাহ্যিক অবস্থা পুরোপুরি এর বিপরীত ছিল। কারণ,ইয়াযীদ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপারে এরকম বলা হয়েছে যে,ইয়াযীদ তার ওপর খুব রাগান্বিত ছিল।(তারীখে তাবারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৬,৩৫৭; আলকামিল ফিত্ তারীখ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৩৫) এজন্য তাকে বসরার গভর্নরের পদ থেকে অপসারণের চিন্তায় ছিল।( ইবনে মাসকাভেই, তাজারিবুল উমাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪২; আলবিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৫২) এমনকি কোন কোন গ্রন্থে এসেছে,ইয়াযীদ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের সবচেয়ে বড় দুশমন ছিল।(সিবতে ইবনে জাওযী, তাজকিরাতুল খাওয়াস, পৃ. ১৩৮)

বাধা থাকা সত্ত্বেও যদি মুসলিম এবং তাঁর সাথিরা ইবনে যিয়াদের মতো ভীতি প্রদর্শন,হুমকি,চাপ প্রয়োগ,লোভ দেখানো ইত্যাদি অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাইআতকারীদেরকে সংগঠিত রাখতেন এবং অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক,সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন উপাদান নিয়ামক কাজে লাগাতেন,যেমনটা ইবনে যিয়াদ করেছিল,তাহলে কুফায় তাঁদের বিজয়ের সমূহ সম্ভাবনা ছিল

এমনকি মুসলিম যদি শারীক বিন আত্তার আম্মারা বিন আবদুস সলূলের প্রস্তাব অনুযায়ী সুবর্ণ সুযোগটাকে কাজে লাগাতেন এবং হানীর গৃহে ইবনে যিয়াদকে হত্যা করতেন(আলকামিল ফিত্ তারীখ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৩৭) তাহলে খুব ভালোভাবে কুফার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন

এখানে আমরা বলতে পারি,কুফার জনগণ সম্পর্কে ইমাম হোসাইন (.) অন্য ব্যক্তিবর্গ,যেমন ইবনে আব্বাসের থেকে বেশি ভালো করে জানতেন। কারণ,প্রথমত,ইবনে আব্বাসের ধারণা ইমাম আলী (.) ইমাম হাসান (.)-এর যুগকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ইমাম হোসাইন (.)-এর ধারণা বর্তমান যুগকেন্দ্রিক ছিল

দ্বিতীয়ত,কুফাবাসীদের সম্পর্কে ইমাম হোসাইন (.)-এর ধারণা শিয়াদের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ,যেমন সুলাইমান বিন সুরাদ হাবীব বিন মাজাহেরের চিঠি ছাড়াও স্বীয় প্রতিনিধি মুসলিমের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল; কিন্তু ইবনে আব্বাস অন্যান্য ব্যক্তির হাতে এরকম কোন মাধ্যমই ছিল না যাতে কুফার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন

উল্লেখ্য যে,কুফার বর্তমান অবস্থা বিশ বছর আগের অবস্থার সাথে পুরোপুরি ভিন্ন ছিল এবং ইমাম হোসাইনের সাথে আন্দোলন করার জন্য কুফাবাসীদের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল আর তাদের পশ্চাদপসরণ বিশ্বাসঘাতকতার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। কারণ :

এক. কুফা ইসলামী জাহানের কেন্দ্র হওয়ার দিক থেকে সিরিয়ার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি। ফলে কেন্দ্র কুফা থেকে সিরিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছিল। যেহেতু উমাইয়া শাসকরা সব সময় কুফাকে অনুন্নত করে রাখার চেষ্টা করত,সেহেতু কুফাবাসীরা তাদের অতীত গৌরব,নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ফিরিয়ে পাওয়ার প্রচেষ্টায় রত ছিল

দুই. সময় কুফাবাসী বিশেষ করে শিয়াদের ওপর উমাইয়া শাসকদের যুলুমঅত্যাচার তাদেরকে শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছিল

তিন. ইয়াযীদের ব্যাপারে কুফাবাসীদের ধারণা এবং ইমাম হোসাইন (.)-এর সাথে তার তুলনা তাদেরকে ইয়াযীদের শাসন গ্রহণ না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছিল

এখন অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে,বিশেষ কতগুলো কারণ যেমন: ইয়াযীদের অদক্ষতা মুয়াবিয়ার মতো ধর্মীয়,রাজনৈতিক এবং সামাজিক ব্যক্তিত্ব না থাকার কারণে কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা,অপরদিকে কুফার প্রাদেশিক গভর্নরের দুর্বলতার করণে ইমাম হোসাইনের বিজয়ের সমূহ সম্ভাবনা ছিল এবং কুফায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সিরিয়ার কেন্দ্রীয় শাসনের সাথে মোকাবিলা করাও তাঁর পক্ষে সহজ ছিল

অতএব,বলা যায় যে,ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী,ইমাম হোসাইন (.)-এর প্রভাব,কুফার অবস্থা,কুফাবাসীর মনোভাব এবং সিরিয়ার কেন্দ্রীয় শাসনের অবস্থা অনুসারে কুফাকে বেছে নেয়ার ব্যাপারে ইমাম হোসাইন (.)-এর সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সঠিক ছিল। আর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যদি না ঘটত তাহলে নিশ্চিতভাবে ইমাম হোসাইন (.) বাহ্যিক বিজয়ও লাভ করতেন

[‘ইরশাদগ্রন্থে আছে] ইমাম হোসেইন (.) তার সাথীদের রাতের বেলা জড়ো করলেন, ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (.) বলেন যে, আমি তাদের কছে গেলাম শোনার জন্য তারা কী বলেন এবং সে সময় আমি অসুস্থ ছিলাম। আমি শুনলাম ইমাম তার সাথীদের বলছেন,

আমি আল্লাহর প্রশংসা করি সর্বোত্তম প্রশংসার মাধ্যমে এবং তাঁর প্রশংসা করি সমৃদ্ধির সময়ে এবং দুঃখ দুর্দশার মাঝেও। হে আল্লাহ, আমি আপনার প্রশংসা করি জন্য যে, আপনি আমাদের পরিবারে নবুয়াত দান করতে পছন্দ করেছেন। আপনি আমাদের কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং ধর্মে আমাদেরকে বিজ্ঞজন করেছেন এবং আমাদেরকে দান করেছেন শ্রবণ শক্তি দূরদৃষ্টি এবং আলোকিত অন্তর। তাই আমাদেরকে আপনার কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আম্মা বাআদ, আমি তোমাদের চেয়ে বিশস্ত এবং ধার্মিক কোন সাথীকে পাই নি, না আমি আমার পরিবারের চাইতে বেশী বিবেচক, স্নেহশীল, সহযোগিতাকারী সদয় কোন পরিবারকে দেখেছি। তাই আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে তোমাদেরকে উত্তমভাবে পুরস্কৃত করুন এবং আমি মনে করি শত্রুরা একদিনও অপেক্ষা করবে না এবং আমি তোমাদের সবাইকে অনুমতি দিচ্ছি স্বাধীনভাবে চলে যাওয়ার জন্য এবং আমি তা তোমাদের জন্য বৈধ করছি। আমি তোমাদের উপর থেকে আনুগত্য শপথের দায়ভার তুলে নিচ্ছি (যা তোমরা আমার হাতে হাত দিয়ে শপথ করেছিলে) রাতের অন্ধকার তোমাদের ঢেকে দিয়েছে, তাই নিজেদের মুক্ত করো ঘূর্ণিপাক থেকে অন্ধকারের ঢেউয়ের ভেতরে। আর তোমাদের প্রত্যেকে আমার পরিবারের একজনের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ো গ্রাম শহরগুলোতে, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের মুক্তি দান করেন। কারণ লোকগুলো শুধু আমাকে চায় এবং আমার গায়ে হাত দেয়ার পরে তারা আর কারো পেছনে ধাওয়া করবে না।

কথা শুনে তার ভাইয়েরা, সন্তানরা, ভাতিজারা এবং আব্দুল্লাহ বিন জাফরের সন্তানরা বললেন, “আামরা তা কখনোই করবো না আপনার পরে বেঁচে থাকার জন্য। আল্লাহ যেন কখনো তা না করেন।হযরত আব্বাস বিন আলী (.) সর্বপ্রথম ঘোষণা দিলেন এবং অন্যরা তাকে অনুসরণ করলেন

ইমাম তখন আক্বীল বিন আবি তালিবের সন্তানদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, “মুসলিমের আত্মত্যাগ তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়েছে, তাই আমি তোমাদের অনমতি দিচ্ছি চলে যাওয়ার জন্য।তারা বললেন, “সুবহানাল্লাহ, লোকেরা কী বলবে? তারা বলবে আমরা আমাদের প্রধানকে, অভিভাবককে এবং চাচাতো ভাইকে, যে শ্রেষ্ঠ চাচাতো ভাই, পরিত্যাগ করেছি এবং আমরা তার সাথে থেকে তীর ছুড়িনি, বর্শা দিয়ে আঘাত করি নি এবং তার সাথে থেকে তরবারি চালাই নি এবং তখন আমরা ( অভিযোগের মুখে) বুঝতে পারবো না কী করবো; আল্লাহর শপথ, আমরা তা কখনোই করবো না। প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের জীবন, সম্পদ পরিবার আপনার জন্য কোরবানী করবো। আমরা আপনার পাশে থেকে যুদ্ধ করবো এবং আপনার পাশে থেকে পরিণতিতে পৌঁছে যাবো। আপনার পরে জীবন কুৎসিত হয়ে যাক (যদি বেঁচে থাকি)

এরপর মুসলিম বিন আওসাজা উঠলেন এবং বললেন, “আমরা আপনাকে কি পরিত্যাগ করবো? তারপর যখন আল্লাহর সামনে যাবো তখন তার সামনে আপনার অধিকার পূরণের বিষয়ে আমরা কী উত্তর দিবো? না, আল্লাহর শপথ, আমি আমার বাঁকা তরবারি শত্রুদের হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়ে দিবো এবং আমি তাদেরকে আমার তরবারি দিয়ে আঘাত করতেই থাকবো যতক্ষণ না এর শুধু হাতলটা আমার হাতে থাকে। আর যদি তাদের সাথে যুদ্ধ করার মতো আমার হাতে কোন অস্ত্র আর না থাকে তাহলে আমি তাদেরকে পাথর দিয়ে আক্রমণ করবো। আল্লাহর শপথ, আমরা আপনার হাত থেকে আমাদের হাত তুলে নিবো না যতক্ষণ না আল্লাহর কাছে প্রমাণিত হয় যে আমরা আপনার বিষয়ে নবীর সম্পর্ককে সম্মান দিয়েছি। আল্লাহ শপথ, যদি এমনও হয় যে, আমি জানতে পারি যে আমাকে হত্যা করা হবে এবং এরপর আমাকে আবার জাগ্রত করা হবে এবং এরপর হত্যা করা হবে এবং পুড়িয়ে ফেলা হবে এবং আমার ছাই চারদিকে ছড়িয়ে দেয় হবে এবং তা যদি সত্তর বারও ঘটে, তারপরও আমি আপনাকে পরিত্যাগ করবো না যতক্ষণ না আপনার আনুগত্যে আমি নিহত হই। তাহলে কিভাবে আমি তা পরিত্যাগ করবো যখন জানি যে মৃত্যু শুধু একবার আসবে যার পরে এক বিরাট রহমত আমার জন্য অপেক্ষা করছে?”

এরপর যুহাইর বিন ক্বাইন উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “আল্লাহর শপথ, আমি খুবই ভালোবাসবো যদি আমাকে হত্যা করা হয় এবং এরপর জীবিত করা হয় এবং এরপর আবারও হত্যা করা হয় এবং তা এক হাজারবার ঘটে এবং এভাবে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ যেন আপনাকে আপনার পরিবারকে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করেন।

এরপর অন্যান্য সব সাথীরা তা পুনরাবৃত্তি করেন, [তাবারির বর্ণনামতে] তারা বললেন, “আল্লাহর শপথ, আমরা আপনাকে পরিত্যাগ করবো না, বরং আমাদের জীবন আপনার জীবনের জন্য কোরবানী হবে। আমরা আপনাকে রক্ষা করবো আমাদের ঘাড়, চেহারা হাত দিয়ে। এরপর আমরা সবাই মৃত্যুবরণ করবো দায়িত্ব পালন শেষে।

নিচের যুদ্ধ সম্পর্কিত কবিতাটি তাদের আলোচনাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে,

হে আমার অভিভাবক, যদি আমার শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসন আরশ পর্যন্ত পৌঁছায় তবুও আমি আপনার চাকর হয়ে এবং আপনার দরজায় ভিক্ষুক হয়ে থাকবো এবং যদি আমি আমার হৃদয় এর ভালোবাসাকে আপনার কাছ থেকে তুলে নিই তাহলে কাকে আমি ভালোবাসবো এবং আমার হৃদয়কে কোথায় নিয়ে যাবো?”

আল্লাহ তাদেরকে ইমাম হোসেইন (.) এর বিষয়ে উদারভাবে দান করুন। এরপর ইমাম হোসেইন (.) তার তাঁবুতে ফিরে গেলেন

আল্লাহ সেই যুবকদের পুরস্কৃত করুন যারা ধৈর্যের সাথে সহ্য করেছেন, তারা ছিলেন পৃথিবীর যে কোন জায়গায় অতুলনীয়। তারা ছিলেন উত্তম চরিত্রের প্রতিচ্ছবি এবং বাটির পানি মিশ্রিত দুধ নয় যা পরে পেশাবে পরিণত হয়।

সাইয়েদ ইবনে তাউস বর্ণনা করেছেন যে, মুহাম্মাদ বিন বাশার হাযরামীকে বলা হলো যে, “তোমার ছেলেকেরেইশহরের সীমান্তে গ্রেফতার করা হয়েছে।তিনি উত্তর দিলেন, “আমি তাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলাম। আমার জীবনের শপথ, তার গ্রেফতার হওয়ার পর আমি বেঁচে থাকতে চাই না।ইমাম হোসেইন (.) তার কথাগুলো শুনতে পেলেন এবং বললেন, “তোমার আল্লাহ তোমার উপর রহমত করুন, আমি তোমার কাছ থেকে বাইয়াত তুলে নিলাম, তুমি যেতে পারো এবং তোমার ছেলেকে মুক্ত করার চেষ্টা করো।

তিনি বললেন, “আমি যদি আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হই আমি হিংস্র পশুদের শিকার হয়ে যাবো।এতে ইমাম বললেন, “তাহলে ইয়েমেনী পোষাকগুলো দিয়ে তোমার অন্য ছেলেকে পাঠাও, যেন সে তাকে এগুলোর বিনিময়ে মুক্ত করতে পারে।

তিনি মুহাম্মাদ বিন বাশারকে পাঁচটি পোষাক দিলেন যার মূল্য এক হাজার স্বর্ণের দিনার

হোসেইন বিন হামদান হাযীনি তার বর্ণনা ধারা বজায় রেখে আবু হামযা সূমালি থেকে বর্ণনা করেন এবং সাইয়েদ বাহরানি বর্ণনার ক্রমধারা উল্লেখ না করেই তার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন যে: আমি ইমাম আলী আল যায়নুল আবেদীনকে বলতে শুনেছি, শাহাদাতের আগের রাতে আমার বাবা তার পরিবার এবং সাথীদের জড়ো করলেন এবং বললেন, “হে আমার পরিবারের সদস্যরা এবং আমার শিয়ারা (অনুসারীরা), রাতকে ভেবে দেখো যা তোমাদের কাছে বহনকারী উট হয়ে এসেছে এবং নিজেদেরকে রক্ষা করো, কারণ লোকেরা আমাকে ছাড়া কাউকে চায় না। আমাকে হত্যা করার পর তারা তোমারদেরকে তাড়া করবে না। আল্লাহ তোমাদের উপর রহমত করুন। নিজেদেরকে রক্ষা করো। নিশ্চয়ই আমি আনুগত্য শপথের দায়ভার তুলে নিলাম যা তোমরা আমার হাতে করেছো। কথা শুনে তার ভাইয়েরা, আত্মীয়স্বজন সাথীরা একত্রে বলে উঠলো, “আল্লাহর শপথ হে আমাদের অভিভাবক, হে আবা আবদিল্লাহ আমরা আপনার সাথে কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করবো না, তাতে লোকেরা বলতে পারে যে আমরা আমাদের ইমামকে, প্রধানকে এবং অভিভাবককে পরিত্যাগ করেছি এবং তাকে শহীদ করা হয়েছে। তখন আমরা আমাদের আল্লাহর মাঝে ওজর খুঁজবো। আমরা আপনাকে কখনোই পরিত্যাগ করবো না যতক্ষণ না আমরা আপনার জন্য কোরবান হই।ইমাম বললেন, “নিশ্চয়ই আগামীকাল আমাকে হত্যা করা হবে এবং তোমাদের সবাইকে আমার সাথে হত্যা করা হবে এবং তোমাদের কাউকে রেহাই দেয়া হবে না।তারা বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন আপনাকে সাহায্য করার জন্য এবং আমাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন আপনার সাথে শহীদ হওয়ার জন্য। তাহলে কি আমরা পছন্দ করবো না যে আমরা আপনার সাথে উচ্চ মাক্বামে (বেহেশতে) থাকবো, হে রাসূলুল্লাহর সন্তান?” ইমাম বললেন, “আল্লাহ তোমাদের উদারভাবে পুরস্কৃত করুন।এরপর তিনি তাদের জন্য দোআ করলেন। যখন সকাল হল, তাদের সবাইকে শহীদ করে ফেলা হল

তখন ক্বাসিম বিন হাসান (.) জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কি শহীদদের তালিকায় আছি?” তা শুনে ইমাম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন এবং বললেন, “হে আমার প্রিয় সন্তান, তুমি মৃত্যুকে তোমার কাছে কিভাবে দেখো?”

ক্বাসিম বললেন, “মধুর চেয়ে মিষ্টি।

ইমাম বললেন, “নিশ্চয়ই, আল্লাহর শপথ, তোমার চাচা তোমার জন্য কোরবান হোক, তুমি তাদের একজন যাদেরকে শহীদ করা হবে আমার সাথে কঠিন অবস্থার শিকার হওয়ার পর এবং আমার (শিশু) সন্তান আব্দুল্লাহকেও (আলী আসগার) শহীদ করা হবে।

কথা শুনে ক্বাসিম বললেন, “হে চাচাজান, তাহলে কি শত্রুরা মহিলাদের কাছে পৌঁছে যাবে দুধের শিশু আব্দুল্লাহকে (আলী আসগারকে) হত্যা করতে?”

ইমাম বললেন, “আব্দুল্লাহকে হত্যা করা হবে তখন, যখন আমি প্রচণ্ড পিপাসার্ত হয়ে ফিরে আসবো তাঁবুতে এবং পানি অথবা মধু চাইতে, কিন্তু কিছুই পাওয়া যাবে না। তখন আমি অনুরোধ করবো আমার সন্তানকে আমার কাছে আনার জন্য যেন আমি তার ঠোঁটে চুমু দিতে পারি (এবং এর মাধ্যমে স্বস্তিপাই) সন্তানকে আনা হবে এবং আমার হাতে দেয়া হবে এবং একজন (শত্রুদের মাঝ থেকে) জঘন্য ব্যক্তি একটি তীর ছুঁড়বে তার গলায় এবং বাচ্চাটি চিৎকার করে উঠবে। তখন তার রক্ত আমার দুহাতে ভরে যাবে এবং আমি আমার হাত দুটো আকাশের দিকে তুলে বলবো: হে আল্লাহ, আমি সহ্য করছি এবং হিসাব নিকাশ আপনার কাছে ছেড়ে দিচ্ছি। তখন শত্রুদের বর্শা আমার দিকে দ্রুত ছুঁড়ে দেয়া হবে এবং তাঁবুর পেছনে খোড়া গর্তের ভিতর আগুন গর্জন করতে থাকবে। এরপর আমি তাদেরকে আক্রমণ করবো। সে সময়টি হবে আমার জীবনের সবচেয়ে তিক্ত সময়। এরপর আল্লাহ যা চান তাই ঘটবে।

কথা বলে ইমাম কাঁদতে লাগলেন এবং আমরাও অশ্রু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সন্তানের তাঁবু থেকে কান্নার সুর উঠলো

আবু হামযা সুমালি থেকে কুতুবুদ্দীন রাওয়ানদি বর্ণনা করেন যে, ইমাম আলী আল যায়নুল আবেদীন (.) বলেছেন যে: আমি আমার বাবার (ইমাম হোসেইনের) সাথে ছিলাম তার শাহাদাতের আগের রাতে। তখন তিনি তার সাথীদের সম্বোধন করে বললেন: “ রাতকে তোমাদের জন্য বর্ম মনে করো কারণ লোকগুলো আমাকে চায় এবং আমাকে হত্যা করার পর তারা তোমাদের দিকে ফিরবে না, এখন তোমাদেরকে ক্ষমা করা হচ্ছে এবং (এখনও) তোমরা সক্ষম।

তারা বললো, “আল্লাহর শপথ, তা কখনোই ঘটবে না।ইমাম বললেন, “আগামীকাল তোমাদের সবাইকে হত্যা করা হবে এবং কাউকে রেহাই দেয়া হবে না।তারা বললো, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন আপনার সাথে শহীদ হওয়ার জন্য।তখন ইমাম তাদের জন্য দোআ করলেন এবং তাদের মাথা তুলতে বললেন। তারা তাই করলেন এবং বেহেশতে তাদের মর্যাদা দেখতে পেলেন এবং ইমাম তাদের প্রত্যেককে সেখানে তাদের স্থান দেখালেন। এর ফলে প্রত্যেকে তাদের চেহারা বুক তরবারির দিকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন বেহেশতের সেই মর্যাদায় প্রবেশ করার জন্য

শেইখ সাদুক্বেরআমালিতে ইমাম জাফর সাদিক্ব (.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন যে: সাথীদের সাথে ইমামের আলোচনার পর তিনি আদেশ দিলেন তার সেনাদলের চারদিকে একটি গর্ত খোঁড়ার জন্য। গর্ত খোঁড়া হলো এবং তা জ্বালানী কাঠ দিয়ে পূর্ণ করা হলো। এরপর ইমাম তার ছেলে আলী আকবার (.) কে পানি আনতে যেতে বললেন ত্রিশ জন ঘোড়সওয়ার বিশ জন পদাতিক সৈন্যসহ। তারা বেশ ভীতির ভিতর ছিলেন এবং ইমাম নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করতে লাগলেন,

হে সময়, বন্ধু হিসেবে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত, প্রভাত হওয়ার সময় সূর্যাস্তের সময়, কত সাথী অথবা সন্ধানকারী লাশে পরিণত হবে, সময় এর পরিবর্তে অন্য কাউকে নিয়ে সন্তুষ্ট হবে না, বিষয়টি ফায়সালার ভার থাকবে সর্বশক্তিমানের কাছে এবং প্রত্যেক জীবিত প্রাণীকে আমার পথে ভ্রমণ করতে হবে।

এরপর তিনি তার সাথীদের আদেশ করলেন, “পানি পান করো, যা পৃথিবীতে তোমাদের শেষ রিয্ক্ব এবং অযু করো এবং গোসল করে নাও। তোমাদের জামা কাপড়গুলো ধুয়ে নাও, কারণ সেগুলো হবে তোমাদের কাফন।

[‘ইরশাদগ্রন্থে আছে] ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (.) বলেছেন যে, আমার বাবার শাহাদাতের আগের রাতে আমি জেগে ছিলাম এবং আমার ফুপু হযরত যায়নাব (.) আমার শুশ্রূষা করছিলেন। আমার বাবা তার তাঁবুতে একা ছিলেন এবং আবু যার গিফারীর দাস জন তার সাথে ছিলো এবং সে উনার তরবারি প্রস্তুত করছিলো মেরামত করছিলো। আমার বাবা কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন, “(হে) সময়, বন্ধু হিসেবে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত প্রভাত হওয়ার সময় এবং সূর্যাস্তের সময়, কত সাথী অথবা সন্ধানকারীই না লাশে পরিণত হবে, সময় এর বদলে অন্য কাউকে নিয়ে সন্তুষ্ট হবে না, বিষয়টির ফায়সালার ভার থাকবে সর্বশক্তিমানের কাছে এবং প্রত্যেক জীবিত প্রাণীকে আমার পথে ভ্রমণ করতে হবে।

তিনি তা দুবার অথবা তিন বার বললেন এবং বুঝতে পারলাম তিনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন এবং আমি শোকার্ত হলাম কিন্তু নীরবে তা সহ্য করলাম এবং বুঝলাম যে আমাদের উপর দুরযোগ নেমে এসেছে। আমার ফুপু যায়নাব (.) তা শুনতে পেয়েছিলেন। অনুভূতি এবং দুশ্চিন্তা নারীদের বৈশিষ্ট্য, তাই তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। তিনি নিজের পোষাক ছিড়ে মাথার চাদর ছাড়া আমার বাবার দিকে দৌড়ে গেলেন এবং বললেন: আক্ষেপ মর্মান্তিক ঘটনার জন্য, আমার যেন মৃত্যু হয়ে যায়। আজ আমার মা ফাতিমা (.), আমার বাবা আলী (.) এবং আমার ভাই হাসান (.) আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। হে তাদের উত্তরাধিকারী, যারা বিদায় নিয়েছে, হে জীবিতদের আশা

ইমাম তার বোনের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, “হে প্রিয় বোন, শয়তান যেন তোমার সহনশীলতা কেড়ে না নেয়।তার চোখ অশ্রুতে পূর্ণ হয়ে গেলো এবং এরপর তিনি বললেন, “যদি মরুভূমির পাখিকে রাতে মুক্তি দেয়া হয় তাহলে সে শান্তিতে ঘুমাবে।

তখন তিনি (যায়নাব) বললেন, “আক্ষেপ, তাহলে কি আপনি নৃশংসভাবে এবং অসহায়ভাবে নিহত হবেন? তা আমার হৃদয়কে আহত করছে এবং তা আমার জীবনের উপর অত্যন্ত কঠিন।

এরপর তিনি (যায়নাব) তার চেহারায় আঘাত করতে শুরু করলেন, জামার কলার ছিঁড়ে ফেললেন এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। তখন ইমাম উঠে দাঁড়ালেন এবং তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে দিয়ে এবং বললেন, “হে প্রিয় বোন, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো এবং একমাত্র আল্লাহর কাছে সান্তনা চাও এবং জেনো যে পৃথিবীর ওপরে যারা আছে তারা সবাই মৃত্যুবরণ করবে এবং আকাশের বাসিন্দারাও ধ্বংস হয়ে যাবে শুধু আল্লাহর সূরত (সত্তা) ছাড়া। আল্লাহ যিনি তার ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আবার তাদেরকে জীবিত করবেন এবং তারা সবাই তার কাছে ফেরত যাবে। আর আল্লাহ অদ্বিতীয়। আমার নানা আমার চাইতে উত্তম ছিলেন। আমার বাবা আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন এবং আমার মা আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। প্রত্যেক মুসলমানের ওপরে বাধ্যতামূলক যে সে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উদাহরণ অনুসরণ করবে।

এরপর তিনি একই ধরনের কথাবার্তা দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং বললেন, “হে প্রিয় বোন, আমি তোমাকে শপথের মাধ্যমে অনুরোধ করছি যখন আমি শহীদ হয়ে যাবো তখন নিজের (জামার) কলার ছিঁড়ো না, চেহারায় আঘাত করো না অথবা আমার জন্য বিলাপ করো না।

এরপর তিনি হযরত যায়নাব (.) কে নিয়ে এলেন এবং তাকে আমার কাছে বসালেন, তারপর নিজের সাথীদের কাছে গেলেন। এরপর তিনি তাদেরকে আদেশ দিলেন তাদের তাঁবুগুলোকে পরস্পরের কাছে বাঁধার জন্য এবং খুঁটিগুলো এক সাথে বাঁধার জন্য যেন তাদের দিকে তা বৃত্ত হয়ে দাঁড়ায় এবং তিন দিক থেকে শত্রুদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়ার জন্য যেন তারা সামনের দিকেই শুধু তাদের মোকাবিলা করতে পারে

এরপর ইমাম তার তাঁবুতে ফেরত গেলেন এবং সারারাত আল্লাহর কাছে ইবাদত, দোআ এবং তওবায় কাটালেন এবং তার সাথীরাও তার অনুসরণ করলেন এবং দোআ শুরু করলেন

বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাদের দোআর আওয়াজ মৌমাছিদের গুনগুনের মত শোনা যাচ্ছিলো। তারা রুকু সিজদায়, দাঁড়িয়ে বসে ইবাদতে ব্যস্তছিলেন। প্রচুর নামায এবং শ্রেষ্ঠ নৈতিকতা ছিলো ইমাম হোসেইন (.) এর জন্য সাধারণ বিষয়। ইমাম ছিলেন সে রকম যেমন ইমাম মাহদী (.) যিয়ারতে নাহিয়াতে উল্লেখ করেছেন,

পবিত্র কোরআন যিনি পৌঁছে দেন

এবং উম্মতের যিনি অস্ত্র

এবং যিনি আল্লাহর আনুগত্যের পথে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন

শপথ ঐশী চুক্তি রক্ষাকারী

আপনি সীমা অতিক্রমকারীদের পথকে ঘৃণা করতেন

বিপদগ্রস্তদের প্রতি দানশীল

যিনি রুকু সিজদাকে দীর্ঘ করতেন

(আপনি) পৃথিবী থেকে বিরত ছিলেন

আপনি এটিকে সব সবসময় দেখেছেন তার দৃষ্টিতে যাকে তা শীঘ্রই ছেড়ে যেতে হবে।

ইক্বদুল ফারীদ’- আবু আমর আহমেদ বিন মুহাম্মাদ কুরতুবি মারওয়ানি বর্ণনা করেছেন যে, লোকজন ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (.) কে জিজ্ঞেস করলো কেন তার বাবার এত অল্প সংখ্যক সন্তান ছিলো। এতে ইমাম বললেন, “আমি এতেও আশ্চর্য হই যে তার অল্প সংখ্যক সন্তানও জন্ম নিয়েছিলো কারণ তিনি প্রতিদিন এক হাজার রাকাত নামায পড়তেন। কোথায় তিনি স্ত্রীদের সাথে সাক্ষাতের সময় পেতেন?”

[‘মানাক্বিব’-] বর্ণিত আছে যে, যখন সেহরীর সময় হলো তখন ইমাম হোসেইন (.) একটি বিছানায় শুলেন এবং তন্দ্রায় গেলেন। তারপর তিনি জেগে উঠলেন এবং বললেন, “তোমরা কি জানো আমি এখন স্বপ্নে কী দেখলাম?” লোকজন বললো, “হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান, কী দেখেছেন?” ইমাম বললেন, “আমি দেখলাম কিছু কুকুর আমাকে আক্রমণ করেছে এবং একটি সাদাকালো কুকুর তাদের মধ্য থেকে আমার প্রতি বেশী হিংস্রতা দেখাচ্ছে এবং আমি ধারণা করছি, যে আমাকে হত্যা করবে সে জাতির মধ্যে একজন কুষ্ঠরোগী হবে। এরপর আমি আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) কে দেখলাম তার কিছু সাথীর সাথে। তিনি আমাকে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় সন্তান, তুমি মুহাম্মাদ (সা.) এর বংশের শহীদ, বেহেশতের অধিবাসীরা আকাশের ফেরেশতারা তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছে, আজ রাতে তুমি আমার সাথে ইফতার করবে। তাই তাড়াতাড়ি করো, আর দেরী করো না। ফেরেশতারা আকাশ থেকে এসেছে তোমার রক্ত সংগ্রহ করতে এবং একটি সবুজ বোতলে তা সংরক্ষণ করতে।নিশ্চয়ই আমি বুঝতে পারছি যে আমার শেষ অতি নিকটে এবং এখন সময় হয়েছে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার এবং এতে কোন সন্দেহ নেই।

আযদি থেকে তাবারি বর্ণনা করেছেন, তিনি আব্দুল্লাহ বিন আলআসিম থেকে, তিনি যাহহাক বিন আব্দুল্লাহ বিন মাশরিক্বি থেকে, যিনি বলেন যে: আশুরার (দশই মহররম) রাতে ইমাম হোসেইন (.) এবং তার সব সাথীরা সারা রাত নামায, তওবা, দোআ কান্নায় কাটালেন। তিনি বলেন যে, একদল রক্ষী আমাদের পাশ দিয়ে গেল যখন ইমাম হোসেইন (.) কোরআন এর আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন,

)لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ (178) مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ(

যারা অবিশ্বাস করে তারা যেন মনে না করে যে আমরা তাদের যে সময় দিচ্ছি তা তাদের জন্য ভালো, আমরা তাদের সময় দিচ্ছি শুধু এজন্যে যেন তারা গুনাহতে বৃদ্ধি পায় এবং তাদের জন্য রয়েছে অপমানকর শাস্তি। আল্লাহ বিশ্বাসীদের সে অবস্থায় ফেলে রাখবেন না যে অবস্থায় তোমরা আছো, যতক্ষণ পর্যন্তনা ভালোর কাছ থেকে খারাপকে আলাদা করবেন।” [সূরা আলে ইমরান: ১৭৮১৭৯]

যখন প্রহরীদের মধ্যে একজন অশ্বারোহী আয়াত শুনলো সে বললো, “কাবার রবের শপথ, নিশ্চয়ই আমরা (আয়াতে উল্লেখিত) ভালো দল যাদেরকে তোমাদের কাছ থেকে আলাদা করা হয়েছে।

যাহ্হাক বলেন যে, আমি লোকটিকে চিনতে পারলাম এবং তখন বুরাইর বিন খুযাইরকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি তাকে চিনেছেন কিনা। তিনি উত্তরেনাবললেন। আমি বললাম, সে আবু হারব সাবী আব্দুল্লাহ বিন শাহর। সে বিদ্রূপকারী, একজন সীমালঙ্ঘনকারী, যদিও ভালো বংশের লোক, সাহসী খুনী। সাঈদ বিন ক্বায়েস তাকে তার কোন অপরাধের কারণে গ্রেফতার করেছিলো। বুরাইর বিন খুযাইর তার দিকে ফিরলেন এবং বললেন, “হে বদমাশ, (তুমি কি মনে করো) আল্লাহ তোমাকে ভালোদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন?” সে জিজ্ঞেস করলো তিনি কে, এতে বুরাইর তার পরিচয় দিলেন। সে বললো, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন, হে বুরাইর আমি তাহলে ধ্বংস হয়ে গেলাম?” বুরাইর বললেন, “তুমি কি তোমার বড় গুনাহর জন্য তওবা করছো? আল্লাহর শপথ, আমরা সবাই ভালোর দল, আর তোমরা সবাই খারাপ দল।সে বললো, “আমিও তোমার কথার সত্যতার সাক্ষী দিচ্ছি।যাহহাক বলেন, তখন আমি তাকে বললাম, “তাহলে কি বুদ্ধিমত্তা তোমার কল্যাণে আসবে না?” সে বললো, “আমি তোমার জন্য কোরবান হই, (যদি আমি তা করি) তাহলে কে ইয়াযীদ বিন আযরাহ আনযীর সাথে থাকবে যে বর্তমানে আমার সাথে আছে। কথা শুনে বুরাইর বললেন, “আল্লাহ তোমার অভিমত তোমার নীতি নষ্ট করুন, কারণ নিশ্চয়ই তমিু সব কিছুতে ব্যর্থ এক ব্যক্তি।যাহহাক্ বলেন যে, তখন আবু হারব ফেরত গেলো এবং সেই রাতে আমাদের প্রহরী ছিলেন আযরাহ বিন ক্বায়েস আহমাসি, যিনি অশ্বরোহীদলের অধিনায়ক ছিলেন

সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে, সে রাতে উমর বিন সাআদের দল থেকে বাইশ জন ইমাম হোসেইন (.) এর সাথীদের সাথে যোগ দিয়েছিলো

ইক্বদুল ফারীদ’- বর্ণিত হয়েছে যে উমর বিন সাআদের কাছে ইমাম হোসেইন (.) এর তিনটি প্রস্তাবের যে কোন একটি গ্রহণের অনুরোধের কথা শুনে উমর বিন সাআদের পক্ষের বত্রিশজন কুফাবাসী তাকে বললো, “আল্লাহর রাসূলের সন্তান তোমাকে তিনটি প্রস্তাবের একটি গ্রহণ করতে বলছেন, আর তুমি এতে একমত হচ্ছো না। কথা বলে তারা তাদের দল ত্যাগ করে ইমামের কাছে চলে এলো এবং তার পাশে থেকে যুদ্ধ করলো যতক্ষণ না তারা সকালে শহীদ হয়ে

(এই প্রবন্ধটি শেখ আব্বাস কোমী প্রণীত মুহাম্মদ ইরফানুল হক কর্তৃক অনুদীত নাফাসুল মাহমুম গ্রন্থ থেকে সংকলিত)

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔