ইসলামের দৃষ্টিতে ইনফাক্ব বনাম কার্পণ্য

by Rashed Hossain

লেখক: নুর হোসাইন মাজিদি

“ইনফাক্ব” মানে ‘ব্যয় করা’। কোরআন মজীদে “ইনফাক্ব”-এর কথা বলা হয়েছে, আবার “ইনফাক্ব ফী সাবীলিল্লাহ্” (আল্লাহর পথে ব্যয়)-এর কথাও বলা হয়েছে। যেখানে শুধু “ইনফাক্ব”-এর কথা বলা হয়েছে সে ক্ষেত্রেও সাধারণতঃ “আল্লাহর পথে ব্যয়” তাৎপর্য গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আসলেই কি এরূপ অর্থ গ্রহণ করা সঠিক?
ফাছাহাত্ ও বালাগ¦াতের দৃষ্টিতে এরূপ ধরে নেয়াটা সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ, আল্লাহর পথে ব্যয় বলতে নিঃস্বার্থভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ফক্বীর-মিসকীনদের দান করা সহ আরো কতক খাতে ব্যয় করা বুঝায়, যদিও তাদেরকে যা কিছু দান করা হয় আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে তাদের হক্ব বলে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে শুধু “ইনফাক্ব” বা ‘ব্যয়’ বললে এর ক্ষেত্র অনেক প্রশস্ত বুঝায় অর্থাৎ “ইনফাক্ব ফী সাবীলিল্লাহ্” সহ যে কোনো ধরনের (বৈধ কাজে) ব্যয় এবং বিনিয়োগও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যারাই চূড়ান্ত ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকতে চায় তাদেরকে ‘আমভাবে “মুত্তাক্বী” বলে উল্লেখ করেছেন এবং এ মুত্তাক্বী লোকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, তারা ব্যয় (ইনফাক্ব) করে। এরশাদ হয়েছে : “এ হচ্ছে সেই কিতাব যাতে সন্দেহপূর্ণ কিছুই নেই; এটি মুত্তাক্বীদের জন্য পথনির্দেশক যারা ইন্দ্রিয়াতীত পরম সত্তায় (আল্-গ¦ায়ব্-এ) ঈমান পোষণ করে, ছালাত্ ক্বায়ে রাখে (তাঁর উদ্দেশে আরাধনা করে) এবং আমি তাদেরকে যে রিযক্ব দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। “(সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২-৩)
এখানে নিঃশর্তভাবে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলা চাইলে এখানে يُنفقون فی سبيل الله বা يُنفقون فی سبيل الغيب বলতে পারতেন, কিন্তু তা বলেন নি, বরং শুধু يُنفقون বলেছেন।
আল্লাহ্ তা‘আলা আরো এরশাদ করেন : “(হে রাসূল!) তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যে, তারা কী ব্যয় করবে? বলুন : যা (অপরিহার্য প্রয়োজনের) অতিরিক্ত। ” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২১৯)
এখানেও নিঃশর্তভাবে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া অন্য এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে : “(হে রাসূল!) তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যে, তারা কী ব্যয় করবে? বলুন : তোমরা তোমাদের ধনসম্পদ থেকে যা-ই ব্যয় কর না কেন, তা হবে তোমাদের পিতামাতা ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের জন্য এবং ইয়াতীম, মিসকীন ও (অসহায় হয়ে পড়া) পথিকের জন্য। আর তোমরা যে কোনো উত্তম কাজই কর না কেন, নিঃসন্দে আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে অবগত। “(সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২১৫)
অন্য আয়াতে ছাদাক্বাহ্ বণ্টনের জন্য সুস্পষ্টভাবে আটটি খাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু উপরোদ্ধৃত আয়াতে এর মধ্য থেকে (দৃষ্টান্তস্বরূপ) তিনটি খাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু ছাদাক্বাহ্ বণ্টনের ক্ষেত্রে পিতামাতা ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের কথা উল্লেখ করা হয় নি যা আলোচ্য আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে সুস্পষ্ট যে, এখানে “ইনফাক্ব” বলতে কেবল ছাদাক্বাহর খাতসমূহ বুঝানো হয় নি, বরং ব্যাপক অর্থে “ইনফাক্ব” (ব্যয়)-এর কথা বলা হয়েছে। কারণ, পিতা-মাতা ও ঘনিষ্ঠ জনরা ফকির বা মিসকীন্ হলে তাদের জন্য ব্যয়ের কথা আলাদাভাবে উল্লেখের প্রয়োজন হতো না। বরং এখানে ছাদাক্বাহ্ ও গ¦ায়রে ছাদাক্বাহ্ নির্বিশেষে যে কানো বৈধ ব্যয় বুঝানো উদ্দেশ্য অর্থাৎ পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনরা সচ্ছল হলেও তাদেরকে অর্থ বা কোনো কিছু উপহার হিসেবে প্রদান করা যেতে পারে, তেমনি তাদের জন্য আপ্যায়ন বা মেহমানদারীও এর অন্তর্ভুক্ত, অন্যদিকে ছাদাক্বাহর মধ্য থেকে তিনটি খাতের উল্লেখ করা হয়েছে এটা বুঝানোর জন্য যে, ছাদাক্বাহও এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ছাদাক্বাহ্ ও গ¦ায়রে ছাদাক্বাহ্ নির্বিশেষে সমস্ত রকমের বৈধ ব্যয়ই আল্লাহ্ তা‘আলার পছন্দনীয় উত্তম কাজ।
অন্যদিকে আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট কার্পণ্য খুই অপসন্দনীয়। যারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে কার্পণ্য করে এবং ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখে আল্লাহ্ তা‘আলা কঠোরভাবে তাদের নিন্দা করেছেন। এরশাদ হয়েছে : “আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না (হে রাসূল!) তাদেরকে (সেদিনের) যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন যেদিন তা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের কপাল, পাঁজর ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে এবং (তাদেরকে বলা হবে 🙂 এ হচ্ছে তা-ই যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করেছিলে, সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তার আস্বাদন কর। ” (সূরাহ্ আত্-তাওবাহ্ : ৩৪-৩৫)
এখানে আল্লাহর পথে ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হলেও এ আয়াতের মূল তাৎপর্য হচ্ছে কার্পণ্য শাস্তির উপযুক্ত গুনাহ। আর স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করার কথা উল্লেখের কারণ, কোরআন মজীদ নাযিল্ কালে স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রাই ছিলো লেনদেনের মাধ্যম। তাই বর্তমান যুগে স্বর্ণ, রৌপ্য, কাগযী মুদ্রা ও ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স নির্বিশেষে যে কোনো কিছুর সাহায্যে সম্পদ পুঞ্জীভূত করণই এ আয়াতের আওতাভুক্ত। আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীন্ আরো এরশাদ করেন : “পরিতাপ কটাক্ষকারী পরনিন্দুকের জন্য যে ব্যক্তি সম্পদ পুঞ্জীভূত করে ও তা গণনা করে রাখে; সে ধারণা করে যে, তার সম্পদ তাকে অমর করে রাখবে। কক্ষনোই নয়, বরং অবশ্যই সে অচিরেই হুত্বামায় (হুত্বামাহ্ নামক দোযখে) নিক্ষিপ্ত হবে। “ (সূরাহ্ আল্-হুমাযাহ্ : ১-৪)
এখানে যে কটাক্ষকারী পরনিন্দুকের কথা বলা হয়েছে তা সম্ভবতঃ এ কারণে যে, সম্পদ পুঞ্জীভূতকারী কৃপণ লোকেরা তাদের পুঞ্জীভূত সম্পদের কারণে যাদের সম্পদ কম তাদের মোকাবিলায় আত্মগৌরব করে থাকে এবং অন্যদের সম্পদস্বল্পতার কারণে প্রকাশ্যে ও আড়ালে নির্বিশেষে তাদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে। আর কাফের ও ঈমানদার হওয়ার দাবীকারী নির্বিশেষে যে কোনো ধরনের কৃপণই এখানে শামিল রয়েছে।
বস্তুতঃ আল্লাহ্ তা‘আলা চান যে, ধনসম্পদ যেন কেবল কতক ধনীর কুক্ষিগত হয়ে না থাকে, বরং ছাদাক্বাহ্ প্রদান ছাড়াও যে কোনো বৈধ কাজে ব্যয়ের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন : “ …. যেন সম্পদ তোমাদের মধ্যকার ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে না থাকে। “ (সূরাহ্ আল্-হাশর্ : ৭)
বস্তুতঃ এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ধনসম্পদের হস্তান্তর ও বিকেন্দ্রীকরণ বাজারে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। আর পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে নতুন নতুন শ্রম ও পুজিবিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। আর সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণের জন্য ছাদাক্বাহ্ অগ্রাধিকারযোগ্য হলেও একমাত্র পন্থা নয়, বরং দামী খানাপিনা ও সখের দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় সহ যে কোনো বৈধ ব্যয়ই সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণে সহায়ক। সুতরাং সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট অকৃপণ অমুসলিম ব্যক্তির তুলনায়ও তথাকথিত মুসলমান কৃপণ ব্যক্তি অধিকতর অপছন্দনীয়। (২রা জুন ২০২০)###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔