পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঘটনাবলীর আলোকে আল্লাহকে স্মরণ করা

by Rashed Hossain

অনুবাদ: মাওলানা মোঃ শহীদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা

আয়াতসমূহঃ

  • আল্লাহকে স্মরণ করঃ “সুতরাং তোমরা আমাকেই স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব এবং আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও, আর আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” (সূরা বাকারাঃ ১৫২)
  • সকাল ও সন্ধ্যা আল্লাহকে স্মরণ করঃ “হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে অত্যধিক স্মরণ কর, এবং প্রভাতে ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।” (সূরা আহযাবঃ ৪১-৪২)
  • অন্তরের প্রশান্তিঃ “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির অন্তরসমূহ শান্তি পায়।” (সূরা রা’দঃ ২৮)
  • সর্বশ্রেষ্ঠ স্মরণঃ “আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর।” (সূরা আনকাবুতঃ ৪৫)
  • তওবা ও মনোযোগী হওয়া অর্থাৎ আল্লাহকে স্মরণ করাঃ “তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের ওপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তাই করতে থাকে না।” (সূরা আল ইমরানঃ ১৩৫)

হাদীসসমূহঃ

  • বিবেকের উজ্জ্ব¡লতাঃ হযরত ইমাম আলী (আ.) বলেছেনঃ “আল্লাহর যিকির করা বিবেককে আলোকিত, আত্মাকে জীবিত এবং বক্ষকে জ্যোর্তিময় করে।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৫৪৭)
  • অন্তর্দৃষ্টির উজ্জ্ব¡লতাঃ আমিরুল মুমিনিন (আ.) বলেছেনঃ “আল্লাহর স্মরণ করা অন্তর্দৃষ্টির আলোকিত ও আধ্যাত্মিকতাকে নুরানী করে।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৫৪৯)
  • আল্লাহর জিকির করা রহমত অবতীর্ণের কারণঃ ইমাম আলী (আ.) বলেছেনঃ “আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে রহমত অবতীর্ণ হয়।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৫৫০)
  • শয়তান থেকে হেফাজতঃ মাওলায়ে কায়েনাত (আ.) বলেছেনঃ “আল্লাহর জিকির করা হল দ্বীনের স্তম্ভ এবং শয়তান থেকে হেফাজত ও সুস্থ থাকা।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৫৫১)
  • আল্লাহ স্মরণ করেঃ ইমাম আলী (আ.) বলেছেনঃ “যে আল্লাহকে স্মরণ করে আল্লাহও তাকে স্মরণ করে।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৫৫২)

বিশ্লেষণঃ
ইদানিং প্রত্যেক ব্যক্তিই কোন না কোন ক্ষেত্রে মানসিক অস্থিরতায় ভোগে এবং প্রত্যেকেই চেষ্টা করে ঐ সমস্যা থেকে প্রশান্তি ও অবকাশ পেতে। এই প্রশান্তি ও অবকাশ পাওয়ার চেষ্টায় জানিনা সে কোথা থেকে কোথায় চলে যায় কিন্তু তারপরও প্রশান্তি মেলে না। তবে কুরআন ও রেওয়ায়েত এ সম্পর্কে বলে যে আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে প্রশান্তি ও অবকাশ পাওয়া যায় কিন্তু মানুষ যেহেতু আল্লাহর স্মরণ থেকে অমনোযোগী, গোনাহ ও পাপ, ধন ও দৌলতের প্রতিদ্বন্দ্বীতা ও দীর্ঘ আশার কারণে মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে বিরত রাখে। আমরা আল্লাহকে ভুলে গেলেও তিনি আমাদেরকে ভোলেন না। তিনি এতই দয়ালু ও মেহেরবান যে, আমরা তার জিকির না করা সত্ত্বেও তিনি আমাদেরকে নিয়ামত দান করেন। আল্লাহর জিকির বলতে বুঝায় যে, মানুষ কোন অবস্থায়ও আল্লাহকে ভুলবে না। মোটকথা আমরা আল্লাহকে স্মরণ করবো, যখন আমরা তাঁকে স্মরণ করবো তিনি আমাদিগকে স্মরণ করবেন। অন্তরের প্রশান্তির একমাত্র পথ আল্লাহকে স্মরণ করা।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি কারবালার বন্দীদের অসিলায় আমাদিগকে আল্লাহর জিকির করার তৌফিক দান করেন। (আমিন)

ঘটনাবলীঃ
১- এক তাছবিহ হযরত সুলাইমান (আ.)-এর হুকুমত থেকে উত্তমঃ ইদ্দাতুর রায়ী নামক পুস্তকে উল্লেখ রয়েছে যে, একবার যখন হযরত সুলাইমান ইবনে দাউদ (আ.) রাজ সিংহাসনে বসে বাতাসের মাধ্যমে উড়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর কানে এক গ্রামবাসীর তছবিহ পাঠ করার আওয়াজ আসলো।

হযরত সুলাইমান (আ.)-এর সিংহাসন ছিল তিন মাইল চওড়া ও তিন মাইল লম্বা। সিংহাসনে বিছানো কার্পেটটি ছিল সোনার সূতা দ্বারা নকশা করা। এই সিংহাসনের ওপর ছয় হাজার চেয়ার বসানো ছিল। হযরত সুলাইমান (আ.) তার মধ্যভাগে খুব জাঁকজমকের সাথে বসে ছিলেন। তাঁর নিকটবর্তী প্রথম সারিতে বসেছিল আলেমগণ, দ্বিতীয় সারিতে ছিল উজিরগণ, তৃতীয় সারিতে ছিল সেনা অধিনায়কেরা এরপর দুই সারিতে ছিল সাধারণ সেনা। এরপর বসা ছিল জিনেরা আর তাদের মাথার ওপর পাখিরা পাখনা দ্বারা ছায়া দিচ্ছিল।

বাতাস এই সিংহাসনকে যেখানে হযরত সুলাইমান (আ.) যেতে বলতেন সেখানে উড়িয়ে নিয়ে যেত। এ ধরণের এক সফরে যখন ঐ গ্রামবাসীর আওয়াজ হযরত সুলইমান (আ.)-এর শ্রুতিগোচর হলো, তিনি বললেনঃ “সুবহান আল্লাহ! কি মহাত্ম্য ঐ মহান আল্লাহর, যিনি দাউদ (আ.)-এর বংশধরকে এইরূপ সাম্রাজ্য দান করেছেন!”

বাতাস ঐ গ্রামবাসীর বাক্যকে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর কানে পৌঁছিয়ে দিল, হযরত সুলাইমান (আ.) নির্দেশ দিলেন রাজ সিংহাসনকে নিচে নামাতে। বাতাস সিংহাসনকে জমিনে নামিয়ে আনলো, হযরত সুলাইমান (আ.) ঐ গ্রামবাসীর নিকটে গিয়ে বললেনঃ যখন কোন আল্লাহর বান্দা আল্লাহর একটি তাছবিহ (এক বার সুবহান আল্লাহ) পাঠ করে এবং তাঁর দরবারে কবুল হয়ে যায় তখন এই আল্লাহর প্রশংসা ঐ হুকুমত থেকে উত্তম যা দাউদ (আ.)-এর বংশধরকে প্রদান করা হয়েছিল।

অন্য এক রেওয়ায়েতে উল্লেখ রয়েছে যে, একবার সুবহান আল্লাহ পাঠ করা এক রৌপ্যের পাহাড় আল্লাহর পথে দান করা থেকে উত্তম। মাওলায়ে কায়েনাত (আ.) এরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি একবার সুবহান আল্লাহ বলে তখন সকল ফেরেস্তা (আ.) তার ওপর দুরুদ পাঠায় আর ঐ তাছবিহ এর সওয়াব আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। (আমালুল অয়েজিন, খন্ড ১, পৃ. ২০২-২০৩, বেকরি মাওতী, খন্ড ১, পৃ. ১১৬)

২- কুরআন তেলাওয়াতের স্বাদঃ যে সকল ধর্ম যুদ্ধে রাসুল করীম (স.) অংশগ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যে একটি যুদ্ধের সময় রাসুল করীম (স.) সৈন্যদেরকে মরুভূমিতে থামতে নির্দেশ দিলেন। সৈন্যদেরকে রাতের বেলা হত্যাকারীদের থেকে রক্ষা করার জন্যে হযরত (স.) দু’জন ব্যক্তিকে পাহারা দেয়ার জন্যে নিয়োজিত করলেন। তাদের একজন ছিলেন আম্মার বিন ইয়াসির (রা.) এবং দ্বিতীয় জন ছিলেন অন্য এক সাহাবী।

সব সৈন্যরা শুয়ে পড়লো আর ঐ দ্ইুজন জেগে পাহারা দেয়ার জন্যে রাতকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগী করে নিলেন। আম্মার বিন ইয়াসির (রা.) শুয়ে ছিলেন আর তার সাথী জেগে নামাজ পড়ায় মশগুল ছিলেন। প্রথম রাকাতে সূরা হামদ পড়ার পর সূরা কাহাফ তেলাওয়াত শুরু করলেন। ঐসময় ইহুদীদের এক গুপ্তচর ওখানে এসে হাজির। সে জানতোনা সৈন্যরা ঘুমিয়ে আছে না জেগে আছে?, তাদেরকে আমরা রাতে হত্যা করতে পারবো কি পারবো না?

ঐ গুপ্তচর দূর থেকে দেখল যে কোন জিনিস স্তম্ভের মত দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অন্ধকারের জন্যে বুঝা যাচ্ছিল না যে ওটা কোন গাছ না মানুষ? এটা বুঝার জন্যে সে ওদিকে একটি তীর নিক্ষেপ করল। তীর আম্মার (রা.)-এর সাথীর উপরে এসে পড়লো কিন্তু তার মধ্যে বিন্দু পরিমাণও নড়াচড়া সৃষ্টি হল না। প্রকৃত পক্ষে সে কুরআন তেওয়াতের মোহে নিমজ্জ্বিত ছিল। ইহুদী অনুভব করল তার তীরের কোন প্রভাব পড়লো না। জানিনা তীরটি লক্ষ্যে পৌছালো নাকি পৌছলো না। তাই সে দ্বিতীয় তীরটি নিক্ষেপ করল। ঐ তীরটিও এসে ঐ নামাজীর শরীরে আরো একটি ক্ষত করল কিন্তু তারপরও তার মধ্যে কোন নড়াচড়া হল না। পরে যখন তৃতীয় তীরটি এসে তার উপর পড়ল তখন তিনি আম্মার বিন ইয়াসির (রা.)কে তার পা দ্বারা জাগালেন এবং পরে তিনি নামাজ পূর্ণ করে মাটিতে ঢলে পড়লেন।

আম্মার (রা.) সব মুসলিম সৈন্যদেরকে জাগালেন আর ঐ ইহুদী গাধায় চড়ে পালিয়ে গেল। এরপর আম্মার তার সাথীকে জিজ্ঞেস করলেন, যখন প্রথম তীরটি লাগলো তুমি কেন আমাকে জাগালেনা? সাথী বললেন, খোদার কসম আমি সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করা থেকে বিরত থাকতে চাইনি তবে যখন আমার এই বিষয়টা নিয়ে ভয় হচ্ছিল যে এমন না হয় যে পরে আমি তোমাকে জাগাতে পারব না আর দুশমন ইসলামী সৈন্যদের ওপর হামলা করে বসবে। একারণে আমি তোমাকে তৃতীয় তীর লাগার পর জাগালাম। (বেক’রে মাওতী, খন্ড ২, পৃ. ১০৫)###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔