ইসলামের দৃষ্টিতে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক

পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত শ্রেণি হল শ্রমিক শ্রেণি। মহানবী (স.) আগমন পূর্ব যুগের সভ্য সমাজসমূহে শ্রমিক যেমন মালিক শ্রেণীর হাতে নির্যাতিত হতো, আজও তেমনি তারা চরমভাবে নিস্পেষিত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিপতিদের হাতে। ইসলাম একটি পুর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে শ্রমজীবীদের সকল সমস্যার সঠিক ও ন্যায়ানুগ সমাধান দিয়েছে। মহানবী (স.)-এর ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক মতাদর্শের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের দিক হলো, তা শ্রমের মর্যাদা ও তাত্পর্যকে উজ্জ্বলতায় স্থাপন করেছে এবং মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ককে এমন অবস্থানে পৌঁছিয়েছে যা সত্যিই ঈর্ষনীয়। ইসলামে মালিকের ধারণা :‘মালিক’ শব্দটি আরবী। অর্থ অধিকারী (ঙহিবৎ, ধঢ়ঢ়ড়রহঃসবহঃ ধঁঃযড়ৎরঃু, ঢ়ৎড়ঢ়ৎরবঃড়ৎ) ইত্যাদি। তবে শ্রমিক মালিকের ক্ষেত্রে ধারণাটি ইসলামে নেই। কারণ, ইসলামী অর্থনীতিতে মালিকের পৃথক কোন অস্তিত্ব নেই। ইসলামে মনিবকে ‘রব’ বলা যেমন নিষিদ্ধ তেমনি শ্রমিককে ‘আবদ’ বলতেও কঠোর ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। উত্পাদনে মালিকের স্বাতন্ত্র্যকে ইসলাম স্বীকার করে না। আলোচ্য প্রবন্ধে মালিক বলতে নিয়োগকর্তা বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে বুঝাবে। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম ও শ্রমিক :শ্রম হলো, শারীরিক ও মানসিক কসরতের মাধ্যমে কোন কাজ অঞ্জাম দেয়া। যিনি কাজটি আঞ্জাম দেন তিনি শ্রমিক এবং যে কাজটি সম্পন্ন করা হয় তা (ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ) বা উত্পাদন। সাধারণত পুঁজিহীন মানুষ, যারা তাদের পুঁজি বিনিয়োগের উপায় না থাকায় নিজেদের গতর খেটে পেট চালান, তাদেরকে শ্রমিক ও তাদের কাজটিকে শ্রম বলা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল কাজে ও হালাল পথে শ্রম বিনিয়োগ কিছুমাত্রও লজ্জার ব্যাপার নয়। বরং এ হচ্ছে নবী-রাসূলগণের সুন্নাত। প্রত্যেক নবী-রাসূলই দৈহিক পরিশ্রম করে উপার্জন করেছেন বলে হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। মালিকের গুণাবলী :শ্রমিককে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য মালিকের বিশেষ কতিপয় গুণাবলী থাকা প্রয়োজন। যেমন ঃ সময় ও মজুরী নির্ধারণপূর্বক লোক নিয়োগ ঃ পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে মালিকের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হলো সময় ও মজুরী নির্ধারণ করে শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করা। নতুবা শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিবে এবং উত্পাদন ব্যাহত হবে। হাদীসে এসেছে, “মহানবী (স.) শ্রমিকের মজুরী নির্ধারণ না করে তাকে কাজে নিয়োগ করতে নিষেধ করেছেন (বায়হাকী)। কাজের ধরণ ও পরিধি নির্ধারণ ঃ মালিক শ্রমিককে দিয়ে কী ধরণের কাজ করাবে, কি পরিমাণ কাজ করাবে তা পূর্বেই নির্ধারণ করে নেয়া উচিত্। কারণ কোন শ্রমিককে এক কাজের জন্য নিয়োগ করে অন্য কাজ করানো জায়েজ নয়। শ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়ে টাল বাহানা না করা: শ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়ে টাল বাহানা না করা মালিকের অন্যতম দায়িত্ব। মহানবী (স.) বলেছেন, “শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে টালবাহানা করা যুলুম” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অন্যত্র বলেছেন, “ মহানবী (স.) বলেছেন, “সাবধান! মজুরের শরীরের ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার মজুরি মিটিয়ে দাও” (তিরমিযী)। শ্রমিকের মৌলিক অধিকারের যোগান দান ঃ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান ইত্যাদি সকলের মৌলিক অধিকার। শ্রমিকদের এ অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের দায়িত্ব তাদের নিয়োগকর্তার ওপর বর্তায়। মহনবী (স.) বলেছেন, “অধীনস্থদের খোরপোষ দিতে হবে” (সহীহ মুসলিম)। ইসলামে শ্রমের গুরুত্ব :আল-কুরআন সালাত কায়েমের পাশাপাশি উত্পাদন মূখী কাজে ব্যাপৃত হবার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। ইরশাদ হচ্ছে ঃ “যখন তোমাদের সালাত শেষ হয়ে যাবে, তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ (রিযক) অন্বেষণে ব্যাপৃত হয়ে যাও” (সূরা জুম‘আ : ১০)। যুগে যুগে আম্বিয়া-ই কেরাম ও সাহাবাগণ নিজ নিজ শ্রমলব্ধ উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মহানবী (স.) ভিক্ষাবৃত্তির পরিবর্তে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহের প্রতি জনৈক ভিক্ষুককে বাস্তব শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, “যে কোন দিন ভিক্ষা করবে না বলে আমার সাথে ওয়াদাবদ্ধ হবে, তার জান্নাত লাভের দায়িত্ব আমি নিলাম” (আবূ দাউদ)। শ্রমিকের গুণাবলী :শ্রমিকের এমন কতিপয় গুণাবলী থাকা প্রয়োজন যা শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক অটুট রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করবে। যেমন ঃ আমানতদারিতা ঃ শ্রমিকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অবশ্যই আমানতদারিতার সাথে সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় তাকে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহী করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “সর্বোত্তম শ্রমিক সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালী ও আমানতদার (দায়িত্বশীল) হয় (সূরা কাসাস : ২৬)। সংশ্লিষ্ট কাজের দক্ষতা ও যোগ্যতা ঃ দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজের জ্ঞান, যোগ্যতা ও দক্ষতা তার থাকতে হবে। শারীরিক ও জ্ঞানগত উভয় দিক থেকেই তাকে কর্মক্ষম হতে হবে। কাজে গাফলতি না করা ঃ ইসলাম কাজে গাফলতিকে কোনমতেই সমর্থন করে না। আল্লাহ বলেন, “দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে আর যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।” (সূরা মোতাফফিফীন : ১-৩) আয়াতের অর্থ হলো, নিজে নেয়ার সময় কড়ায় গন্ডায় আদায় করে নেয়। কিন্তু অন্যকে মেপে দিতে গেলে কম দেয়। ফকীহগণের মতে, এখানে মাপে কম বেশী করার অর্থ হলো, পারিশ্রমিক পুরোপুরি আদায় করে নিয়েও কাজে গাফলতি করা। নিজের কাজ হিসেবে করা ঃ কাজে নিয়োগ পাবার পর শ্রমিক কাজকে নিজের মনে করে সম্পন্ন করবে। অর্থাত্ পূর্ণ দায়িত্বশীলতার সাথে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে কাজটি সম্পাদন করে দেয়া তার দায়িত্ব হয়ে যায়। আখেরাতের সফলতার জন্য কাজ করা: একজন শ্রমিক তার শ্রমের মাধ্যমে যে অর্থ উপার্জন করবে তা যেন হালাল হয় এবং এর বিনিময়ে পরকালীন সফলতা লাভে ধন্য হয় তার প্রতি লক্ষ্য রাখবে। সেবার মানসিকতা নিয়ে পরম আগ্রহ ও আনন্দের সাথে কাজটি সম্পন্ন করাই হবে শ্রমিকের নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামের দৃষ্টিতে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক :মালিক-শ্রমিক পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে যে নির্দেশনা পাওয়া যায় তা হলো: শ্রমিক-মালিক ভাই ভাই : শ্রমিক মালিকের ন্যায় একজন মানুষ এ কথা স্মরণ রেখে তার প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে হবে। মহানবী (স.) বলেছেন, “যারা তোমাদের কাজ করছে তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ এদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন” (সহীহ বুখারী)। অহেতুক কষ্টের বোঝা না চাপানো: শ্রমিককে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। মহানবী (স.) বলেছেন, “তাদের জন্য কষ্টকর এমন কাজের বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দিও না। অগত্যা যদি তা করাতেই হয় তবে নিজেরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তাদেরকে সর্বতোভাবে সাহায্য করো।” সম্পর্ক হতে হবে হূদ্যতাপূর্ণ: শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক হতে হবে হূদ্যতাপূর্ণ। মহানবী (স.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের আপনজন ও আত্মীয়বর্গের সাথে যেমন ব্যবহার করে থাক তাদের সাথেও অনুরূপ ব্যবহার করবে।” ক্ষমা প্রদর্শন করবে: নিয়োগকৃত শ্রমিক বা কর্মচারী তার প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালনে ভুলবশত কোন অন্যায় করে ফেললে মালিক তার প্রতি সহনশীল হয়ে ক্ষমা প্রদর্শন করবে।

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More