গোঁড়ামি মানসিকতা হচ্ছে কুফরী ধ্যান-ধারণার বহিঃপ্রকাশ। যেমনভাবে ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে কুফরী মানসিকতার লোকেরা বংশীয়, গোত্রজ কিংবা গোষ্ঠীগত গোঁড়ামিপূর্ণ মানসিকতায় নিমজ্জিত ছিল। ধর্মান্ধ ও একগুঁয়েমি মানসিকতা তাদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা এবং দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, তারা স্বীয় পূর্বপুরুষদের তথাকথিত পৌত্তলিক আকিদা-বিশ্বাসের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে মোটেও সম্মত ছিল না। আর যদি কেউ তাদেরকে এহেন ভ্রান্ত ও গোমরাহী আকিদা পরিহার করে সত্য, ন্যায় এবং আল্লাহপ্রদত্ত হেদায়েতের পথে আহ্বান জানাত, তাহলে তারা নিজেদের গোঁড়ামি মানসিকতার বশবর্তী হয়ে উক্ত আহ্বানকে শুধু প্রত্যাখ্যানই করত না বরং আহ্বানকারীর বিরুদ্ধে ঘোর শত্রুতায় লিপ্ত হত। গোঁড়ামি মানসিকতা হচ্ছে জাহেলী উগ্রতার নামান্তর ইসলাম কখনও জাহেলী যুগে প্রচলিত উগ্রতা, হিংস্রতা, অহমিকা এবং গোঁড়ামি মানসিকতার স্বীকৃতি দেয় না; বরং এ ধরনের ধ্যান-ধারণা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে জাহেলী উগ্রতা ও গোঁড়ামি মনোভাবের প্রতি নিন্দা জানিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে,স্মরণ কর) যখন কাফিররা তাদের অন্তরে জাহেলী যুগের (আত্মশ্লাঘাজনিত) গোঁড়ামির ন্যায় গোঁড়ামিপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেছিল।”সূরা ফাতহ: ২৬
আত্মশ্লাঘা হচ্ছে মানুষের মধ্যে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হওয়া যাতে সে আত্মগরিমা ও আত্মঅহমিকার বশবর্তী হয়। আর এমন অবস্থা মানুষের মধ্যে ক্রোধ ও অহংবোধকে উস্কে দেয়; ফলে সে সুষ্ঠু বুদ্ধি-বিবেচনা এবং চিন্তা-চেতনার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ একগুঁয়েমি, একরোখা এমনকি উগ্রতা ও হিংস্রতার দিকেও ঝুঁকে পড়ে; আর যার পরিণতিতে সে গোঁড়ামি মানসিকতায় নিমজ্জিত হয় এবং তখনই তার পক্ষে সত্য ও মিথ্যা কিংবা ন্যায় ও অন্যায় যাচাই-বাছাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর এ কারণেই ইসলাম ধর্মে সর্বাবস্থায় গোঁড়ামি মানসিকতা পরিহারের আদেশ দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে তাকে আকল্ তথা জ্ঞানশক্তি দান করেছেন এবং এ জ্ঞানের মাধ্যমে বুদ্ধি-বিবেচনার আদেশ দিয়েছেন। তিনি মানুষকে ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন এবং এ ইচ্ছাশক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে যাবতীয় বিষয়াবলি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাইয়ের আদেশ করেছেন। কাজেই এখন মানুষের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হচ্ছে খোদাপ্রদত্ত এসব নেয়ামতের যথাযথ ও সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে যেকোন ধরনের জাহেলী ও গোঁড়ামি মনোভাব পরিহার করে সত্য ও ন্যায়ের পথকে বেছে নেয়া। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মানুষকে জাহেলী আত্মশ্লাঘাজনিত গোঁড়ামি পন্থা পরিহার করে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও মু’মিনদের অনুসৃত পন্থা অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। কুরআনের ভাষায়, সুতরাং, আল্লাহ্ তাঁর রাসূল ও মু’মিনদের ওপর স্বীয় প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন এবং তাদেরকে তাকওয়ার নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখলেন।সূরা ফাতহ: ২৬
এ আয়াতে বর্ণিত ত বা সাকীনাহ (আত্মিক প্রশান্তি) বলতে এমন এক অবস্থাকে বুঝায়, যখন মানুষ আত্মিক ও মানসিক দিক থেকে সবচেয়ে প্রশান্তি ও স্বস্তিকর অবস্থাতে থাকে; ফলে এ সময় মানুষ খুব সহজেই যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে সঠিক ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আল্লাহ যখন স্বীয় প্রশান্তি ও স্বস্তি অবতীর্ণের সিদ্ধান্ত নেন, তখন খোদায়ী এ নেয়ামত শুধুমাত্র রাসূলের (সা.) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাসূলের (সা.) পদাংক অনুসরণকারী ধর্মপ্রাণ মু’মিনরাও এ নেয়ামত থেকে উপকৃত হয়। কেননা, এ বিষয়টি আমাদের আকিদা-বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত; যা আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূলুল্লাহর (সা.) রেসালতের প্রতি গভীর ঈমানের পরিচয় বহন করে। বস্তুতঃ মানুষ যখন ধর্মীয় বিধি-নিষেধের প্রতি আনুগত্যশীল থাকবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই জাহেলী রীতি-প্রথা ও গোঁড়ামি মানসিকতা থেকে নিরাপদ থাকবে।