নারী অধিকারের সূত্রপাত করেছেন হযরত ফাতেমা (সা.আ)

কোন মাযহাব বা মতাদর্শকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি স্তরে সে মতাদর্শের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং মৌলিক রীতিনীতিসমূহের বাস্তবায়ন। যে কোন মাযহাব বা মতাদর্শ, সেটি ঐশ্বরিক হোক অথবা মানব রচিতই হোক এবং তা যতই পরিকল্পিত, পরিমার্জিত, পরিশোধিত ও বিজ্ঞানসম্মত হোক না কেন ? সেটি যদি মানব সমাজে বাস্তবায়ন করা না হয় বা চলমান সমাজে তার কোনো কার্যকরী ভূমিকা না থাকে, তবে তা কখনোই স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। পবিত্র ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হচ্ছে, মহান আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি যুগের জন্যই একজন নেতা বা একজন ইমাম নির্বাচন করেছেন, যিনি তাঁর শরীয়তের বাস্তবায়নকারী, ব্যাখ্যা প্রদানকারী এবং রক্ষণা বেক্ষণকারী।

আর এ ইমামগণ হচ্ছেন নবী করিম (সা.) এর পবিত্র বংশধরদের অন্তর্ভুক্ত। আর এ বেলায়েত ও ইমামতের আধার হচ্ছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কলিজার টুকরা, জ্ঞানের দরজা হযরত আলীর (আ.) স্ত্রী, বেহেশতের যুবকদের সর্দার ইমাম হাসান এবং ইমাম হোসাইনের (আ.) মাতা হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (সা.আ.)। যিনি সমগ্র বিশ্বের নারী জাতির আদর্শ, বেহেশতের নারীদের নেত্রী, পবিত্র কোরআন এবং অসংখ্য হাদীস কর্তৃক ঘোষিত নিষ্পাপ নারী।

আমরা যদি তাঁর জীবনীর দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখতে পাব যে, তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে আমাদের জন্য চরম ও পরম শিক্ষা এবং সেটি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইহলৌকিক, পারলৌকিক, আধ্যাত্মিক, ধৈর্য সংযম ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে অর্থাৎ একজন সত্যিকার মানুষের মধ্যে যতগুলো গুণ থাকা প্রয়োজন, এর সবকিছুই ছিল তাঁর মধ্যে।

বর্তমানে আমাদের দেশে বহুল আলোচিত একটি বিষয় হল নারী সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রত্যয়, যেমন নারী উন্নয়ন, নারী নীতি, নারী অধিকার, পিতার সম্পত্তিতে সম-অধিকার ইত্যাদি। যারা মুখে এসব বুলি আওড়াচ্ছেন তারা মূলত: বিভিন্নভাবে নারীদের বিভিন্ন ফাঁদে ফেলছেন। তারা নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন। এরাই একদিন নারীদের মানবসমাজ বহির্ভূত বিনোদন উপযোগী প্রাণী মনে করতো, তাদেরকে ভূত-প্রেত ভাবতো। তাদের বিকৃত রুচির পরিতৃপ্তির জন্য নারী নামের পুতুলকে কিভাবে সাজানো যায় এবং তাদেরকে ভোগের প্রসাদ হিসেবে কিভাবে তার উৎকৃষ্ট ব্যবহার করা যায়, এসব নষ্ট চিন্তা ও পরিকল্পনাকে তারা নারী অধিকার, নারী মুক্তি ইত্যাদির সুশোভন মোড়কে বাজারজাত করছে।

অথচ ইসলাম শুরু থেকেই নারীর যথাযথ প্রাপ্য সম্মান এবং প্রায় সকলক্ষেত্রেই পুরুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। আল্লাহর দৃষ্টিতে এবং তাঁর প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী নারী ও পুরুষ সকলেই সমান। কাজের ক্ষেত্র, দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিধির মাপে তাদের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও ইসলাম মানুষ হিসেবে নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদা দিয়েছে। ইতিহাসে এমন কিছু সংখ্যক মহীয়সী নারীকে দেখা যায়, যারা স্বীয় গুণে অসংখ্য পূণ্যবান পুরুষদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদাবান। তাঁরা হলেন হযরত ফাতেমা (সা.আ.), হযরত খাদিজা (আ.), হযরত মারিয়াম (আ.) ও হযরত আসিয়া (রা.)। হযরত ফাতেমা ইহকাল ও পরকালের নারীকুলের নেত্রী। হযরত ফাতেমা (সা.আ.) এর মাধ্যমেই দুনিয়ার বুকে ইমামতের ধারা চালু রয়েছে। তিনিই রাসূল (সা.) এর বংশধর রক্ষায় প্রজ্বলিত শিখা।

একজন পরিপূর্ণ আদর্শ মানুষ হিসেবে হযরত ফাতেমা (সা.আ.) প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, পরিপূর্ণতার শিখরে ওঠার জন্য নারী হওয়া বা পুরুষ হওয়া জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় কোন শর্ত নয়। তাঁর জন্মকালীন সময়ে আরবে কন্যাসন্তানকে কোন গুরুত্ব দেয়া হতো না, কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জাজনক মনে করা হতো, এমন কি জীবন্ত মাটির নিচে পুতে ফেলা হতো। কিন্ত মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ রাসূল ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের ঘরে একজন কন্যা সন্তান পাঠিয়ে নারী জাতির জন্য অশেষ সম্মান ও মুক্তির ব্যবস্থা করেছেন। নবী করিম (সা.) এর কোন জীবিত পূত্রসন্তান না থাকায় মক্কার কাফেররা তাঁকে “আবতার” বা নির্বংশ বলে বিদ্রূপ করতো। এ বিদ্রূপের জবাবে আল্লাহপাক ‘সূরা কাওসার’ নাজিল করেছেন এবং বিদ্রূপকারীদেরকেই বরং উল্টা নির্বংশ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সত্যিই যারা নবী (সা.) কে নির্বংশ বলে উপহাস করতো, সময়ের ব্যবধানে আজ তারাই নির্বংশ ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর নবী পাক (সা.) এর পবিত্র বংশধারা নিরন্তর টিকে আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ার বুকে টিকে থাকবে।

হযরত খাদিজার গর্ভকালীন সময়ে তাঁকে সাহায্য করার মত কেউ ছিলেন না। এ চরম সঙ্কটময় মূহুর্তে কোন মহিলাই তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেনি বরং বিভিন্ন ধরনের কটু কথা বলেছে। যখন তাঁর প্রসব বেদনা শুরু হলো, তখন ঘরে তিনি একাই ছিলেন। হঠাৎ তিনি ঘরে চার জন অপূর্ব লাবণ্যময়ী রমণীকে দেখতে পেলেন। তাদের অত্যুজ্জল লাবণ্যচ্ছটায় ঘর আলোকিত হয়ে উঠলো। তাঁরা বললেন আমরা আল্লাহর নির্দেশে তোমার পরিচর্যার জন্য আগমন করেছি। তিনি বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাঁদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজন বললেন, ভয় পেও না আমি সারা, ইনি আসিয়া-ফেরাউনের স্ত্রী, ইনি মরিয়ম এবং উনি কুলছুম। আমরা তোমাকে সাহায্য করার জন্য এসেছি।

জন্ম :

রাসূল (সা.) এর নবুয়্যত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পর ২০’শে জমাদিউসসানি রোজ শুক্রবার, মক্কার শুষ্ক ও প্রস্তরময় পর্বতের পাদদেশে কাবার সন্নিকটে, ওহী নাযিলের গৃহ, যে গৃহে সর্বদা ফেরেশতাগণ আসা-যাওয়া করতেন, যেখানে সকাল-সন্ধায় রাসূলের (সা.) সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের বাণী ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত হতো, ইয়াতিম নিঃস্ব ও নিপীড়িতদের আশ্রয়স্থল, হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও খাদিজার গৃহ আলোকিত করে নারীকুল শিরোমণি বেহেশতের নারীদের নেত্রী হযরত ফাতেমা (সা.) দুনিয়ায় আগমন করেন।

উপনাম :

উম্মুল হাসান, উম্মুল হোসাইন, উম্মুল মুহসিন, উম্মুল আয়েম্মা এবং উম্মে আবিহা- যার অর্থ হল পিতার মাতা। কারণ, ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে কষ্ট বা বেদনার ফলে তাঁর পিতা যেসব অস্বস্তি বা দুর্ভোগের সম্মুখীন হতেন, তা দূর করতে এবং পিতার প্রশান্তির জন্য মা ফাতেমা (সা.আ.) এত বেশি প্রচেষ্টা চালাতেন যে, তা সন্তানের জন্য মায়ের আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও ব্যথিত চিত্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

উপাধি :

সিদ্দিকাহ্‌ (সত্যবাদিনী)।

মুবারাকাহ্‌ (বরকতময়ী)।

তাহেরাহ্‌ (পবিত্র)।

জাকিয়াহ্‌ (পরিশুদ্ধতার অধিকারী)।

রাজিয়া (সন্তুষ্ট)।

মারজীয়াহ্‌ (সন্তোষপ্রাপ্ত)।

মুহাদ্দিসাহ্‌ (হাদীস বর্ণনাকারী),

বাতুল, সাইয়্যেদাতুন নিসা ও যাহরা (প্রোজ্জ্বল)

তিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে অবিচল ভাবে আল্লাহর মর্জির ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতেন এবং নির্ভরশীল ছিলেন। এজন্যই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘রাজিয়া-মারজিয়া’।

‘যাকিয়া’ নামকরণ করা হয়েছিল এজন্য যে, তিনি যেমন ছিলেন সতী-সাধ্বী, তেমনি কঠোর ত্যাগ ও সাধনা দ্বারা নিজের ইন্দ্রিয়সমূহকে নিয়ন্ত্রণ ও আয়ত্ত করে ছিলেন। দেহ, মন এবং আত্মাকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করে নিয়েছিলেন।

তিনি পার্থিব ভোগলিপ্সা ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁকে ‘বাতুল’ বলা হতো।

আর তিনি ‘সাইয়্যেদা’ নামে ভূষিত হয়েছিলেন এই কারণে যে, সাইয়্যেদা অর্থ শ্রেষ্ঠা এবং সর্দার। বস্তুতপক্ষে দুনিয়ায় তিনি যেমন নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন, তেমনি বেহেশতেও রমণীকুলের সর্দার বা রাণী।

‘যাহরা’ অর্থ কুসুমকলি। বাস্তবিকপক্ষে বিবি ফাতেমা (সা.আ.) একটি অনুপম সুন্দর সুরভিত কুসুমকলির মতই রূপে ও গুণে সুশোভিত ছিলেন।

ইতিহাসবিদ ও মুফাসসিরগণ হযরত ফাতেমা (সা.আ.) এর আরো বহু উপাধির কথা বললেও তিনি ‘ফাতেমা-তুয-যাহরা’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন।

সুত্রঃ iranmirrorbd

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More