একজন মহীয়সী নারীর সত্য কাহিনী

by Rashed Hossain

লেখক ও গবেষক: হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ আনিসুর রহমান, হিলি

এক বিত্তবান মহিলা কোন এক সৎ কাজে সমস্ত সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে আজ নিঃস্ব। তাঁর ছেলে সন্তানগুলো পরপর চলে গেছে ওপারে। পাড়া-প্রতিবেশীরা যারা সদা-সর্বদা চারপাশ ঘিরে দিত আড্ডা, করতো হাসি তামাশা, চাকর-চাকরানীতে ছিল পুরো বাড়ি ভরা, আজ অর্থ-সম্পদ না থাকায় সবাই ভিটে ছাড়া। কেউ নেই স্বামী সংসার আর দয়াময় প্রভু ছাড়া। তিনি ছিলেন সন্তানসম্ভবা। রাত্র গভীর ঘন অন্ধকার চারদিক নিস্তব্ধ নিঝুম হঠাৎ করে শুরু হয় প্রসব বেদনা। না আছে দাইমা আর না আছে পাড়া-পড়শি কিংবা আত্মীয়-স্বজন। যন্ত্রণায় কাতর রাত হয়ে গেল ভোর। ভুমিষ্ঠ হল এক জান্নাতী হুর।

কষ্ট নিয়ে পৃথিবীতে আগমন কষ্টে ভরা তার সারাটি জীবন। শিশুকালেই মাতা হারালেন আরও হারালেন আত্মীয়দের। অতি কষ্টে বড় হলেন আদরের দুলালী। সবেমাত্র অল্প বয়স; বিয়ে দিলেন পিতা। একটা পরিণত নারী কী স্বপ্ন দেখে? স্বপ্ন দেখে তার স্বামী হবে, সুখী সংসার হবে, সন্তান হবে, অঢেল সম্পদ থাকবে, ইচ্ছেমত খরচ করবে কিন্তু না, সে স্বপ্ন স্বপ্ন না আসলে দুঃস্বপ্ন। তবে হ্যাঁ এটা সত্য যে, তাঁর অঢেল সম্পদ, ভাল বাড়ি কিংবা আড়ম্বরপূর্ণ রাজপ্রাসাদ না থাকলেও, দিনশেষে দু’মুঠো খাদ্য খাবার না জুটলেও ছিল তাঁর সুখী সংসার, তাঁরা ছিলেন সুখী পরিবার। দুই ছেলে আর এক মেয়ের জন্ম দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এতটুকু সুখও যেন তাঁর কপালে সইলো না। যে বয়সে নারী সবেমাত্র সাজিয়ে গুছিয়ে নেয় তার নিজ সংসার সেই বয়সে যেন এলো এক কালবৈশাখী ঝড় সবকিছু হয়ে গেল চুরমার। এই পৃথিবীতে পিতা-ই ছিল যাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র শক্ত হাতিয়ার। যে পিতার যশখ্যাতি সারা বিশ্বব্যাপী, যে পিতার কারণে হয়েছিলেন মহীয়সী সেই পিতা কানেকানে কি যেন বললেন সঙ্গোপনে। কেঁদে উঠলেন হু হু করে হতাশায় গেল বুক ভরে, কখনও ভাবেননি এমন করে পিতাও যাবেন তাঁকে ছেড়ে। পিতা রয়েছেন বেহুঁশ, মেয়ে কেঁদে যাচ্ছে হাউমাউ করে। যখনি দু’ফোটা অশ্রু পড়েছে পিতার গায়ে সহসা-ই হুঁশ ফিরে এসেছে। চেতনা ফিরে পেয়েই দেখেন জগত জননী, বিশ্ব নন্দিনী কাঁদছে। আস্তে করে পিতা ডেকে নিলেন কাছে আবারও কি যেন বললেন কানে, এবার না কেঁদে বরং মুচকি হাসছেন। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই পিতা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। শিশুকালে মাতা হারালেন আর মধ্য বয়সে পিতা। একদিকে পিতার লাশ নিয়ে কান্নাকাটি ও শোক মাতম চলছে অপর দিক থেকে খবর আসছে তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামীর পদচ্যুত করা ও অধিকার হরণ এবং সম্পদ বেদখল করার। এ যেন এমন অবস্থা যে চারদিক থেকে শোক ও দুঃখের ঘন অন্ধকার নেমে আসছে, এক পর্যায়ে তিনি এত শোক সহ্য করতে না পেরে বলে বসলেন, ‘আমার উপর যে পরিমাণ শোক-দুঃখ আপতিত হয়েছে তা যদি প্রকাশ্য দিবালোকের উপর আপতিত হত তাহলে রাতের অন্ধকারে পরিণত হত’।

স্বীয় সম্পদ আদায়ে ও স্বামীর অধিকার ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য দরবারে উপস্থিত হয়েছেন। দাবী উত্থাপন করার পর তাঁকে দরবারের পক্ষ থেকে নতুন প্রবর্তন করা আইন শোনানো হল যে আইনের কারণে তিনি পৈত্রিক সম্পত্তির অধিকারী নন। অথচ ইতিপূর্বে এধরণের কোন আইন ছিল না। এ থেকে তাঁর আর বুঝতে বাকী রইল না যে, তাঁকে পিতার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার জন্যই এ ধরণের মিথ্যা অজুহাত তৈরী করা হয়েছে। তিনি শাসকবর্গের উপর ক্রোধান্বিত হয়ে এই বলে দরবার থেকে চলে আসলেন যে, আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন তোমাদের সাথে কথা বলবো না।

এরপর তিনি প্রতিটি দ্বারে দ্বারে তাঁর ও তাঁর স্বামীর অধিকার আদায়ের জন্য ছুটে চলেছেন। যার নিকটেই তিনি যান সে-ই বলে আপনি অনেক দেরী করে ফেলেছেন, আর সম্ভব নয় আপনার দাবী আদায় করা। তিনি বললেন, আমি আমার পিতার লাশ ফেলে রেখে কিভাবে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য আসতে পারি? এটাতো অশোভনীয় ও গর্হিত একটি কাজ। তাই আমি পিতার লাশ দাফন করার পর এসেছি আপনাদের দ্বারে আর এ কারণেই কিছুটা বিলম্ব হয়েছে তাই বলে কি আমি আমার স্বীয় অধিকার পাব না? আমার স্বামীকে আমার পিতা যে পদমর্যাদায় বসিয়েছিলেন তার অকাট্য প্রমাণ তো আপনারাই তাহলে কেন আজ সাক্ষ্য দিচ্ছেন না? তারা আবারও পূর্বেই ন্যায় উত্তর দিল আমাদের আর করার কিছু নেই আপনি ফিরে যান এই বলে জগত জননী,  বিশ্বনন্দিনীর মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে দেয়।

তিনি ভাবতে লাগলেন মানুষ কিভাবে এত অল্প সময়ে নিজেদের রং পাল্টাতে পারে! এইতো কয়েক দিন পূর্বেই তারা আমার বাবার চারপাশ ঘিরে ভিড় জমিয়ে বসে থাকতো, আমাকে, আমার স্বামী-সন্তানদেরকে কত সম্মান দেখাতো অথচ আমার পিতার জানাযাতে শরীক হওয়া অথবা আমাদেরকে সম্মান দেখানো তো দূরের কথা আমাদের সকল অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে তারা।

এক পর্যায়ে এই মহীয়সী নারী যখন সব দিক থেকে তাদের গভীর ষড়যন্ত্রের কাছে ব্যর্থ হয়ে গেলেন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ঘরে বসে থাকবেন আর কোথাও বের হবেন না। কিন্তু না, সেটাও আর হল না কে যেন এসে দরজায় কড়া নাড়ছে, ভিতর থেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? বাহির থেকে আওয়াজ আসলো, আমরা শাসকের দরবার থেকে এসেছি। ভিতর থেকে তিনি প্রশ্ন করলেন কি চান এখানে? তারা বলল, ক্ষমতাসীন শাসকের প্রতি আপনার স্বামীর সমর্থন আদায় করতে এসেছি। তিনি বললেন, আপনাদের শাসকবর্গ আমাদেরকে যেহেতু অধিকার বঞ্চিত করেছে তাই আমার স্বামী আপনাদের উপর নারাজ আপনারা আসুন। কিন্তু তারা অত্যন্ত জেদী প্রকৃতির। সমর্থন না নিয়ে যাবেই না। তাই তারা বলল, সহজে দরজা না খুললে দরজা ভেঙ্গে ফেলা হবে। তিনি তারপরও দরজা খুললেন না। এরপর তারা দরজায় লাথি মারতে শুরু করল তারপরও যখন খুলছেন না তখন দরজায় কাঠ-খড়ি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল।

দরজা ধীরে ধীরে পুড়ছে। এ যেন দরজা পুড়ছে না ঐ মহীয়সী নারীর কলিজা পুড়ছে। এক পর্যায়ে দরজায় পিতার সহচররা লাথি মারতে শুরু করলে দরজা ভেঙ্গে ঐ মহীয়সী গর্ভবতী নারীর শরীরে পড়ে। তিনি চিৎকার করে বলতে থাকে আমার গর্ভের সন্তান শেষ, আমার পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে গেছে, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো, তারা আমার সাথে কিরূপ আচরণ করছে। এদিকে তিনি বিলাপ করে কাঁদতে থাকেন আর অপরদিকে তাঁর স্বামীর গলায় দড়ি বেঁধে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে শাসকের দরবারে।
এই বয়সে এত পরিমাণ শোক ও দুঃখ যেন আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না, মনে হয় যেন কপালে সুখ বলে কিছু লেখা নেই, সুখ কি জিনিস দেখলেন না কোনদিন, সারা জীবন কাটলো দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা ও মর্মবেদনায়। ক’দিন পর তিনি গর্ভপাত ঘটা ও পাঁজরের হাড় ভাঙ্গার তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে এই নশ^র পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন পরকালের অনন্ত জীবনে।

মৃত্যুর পূর্বে অসিয়্যত করে গেছেন, তাঁকে যেন রাতের অন্ধকারে মুষ্টিমেয় কিছু লোক নিয়ে গোপনে ও গোপন স্থানে কবরস্থ করা হয়। তিনি আরও অসিয়্যত করেছিলেন যে, যারা তাঁর ও তাঁর স্বামীর অধিকার হরণ করেছে তারা যেন তাঁর জানাজায় শরীক না হয় এবং কবরে মাটি না দেয়।

কি অপরাধ ছিল তাঁর? কি অপরাধ ছিল তাঁর স্বামীর? তাদের অপরাধ কি এটাই যে, তিনি তাঁর ন্যায্য অধিকার চেয়েছিলেন? তাদের অপরাধ কি এটাই যে, তাঁরা শাসক থেকে দূরে ছিলেন? আর কে ছিলেন এই মহীয়সী নারী যে, তাদের শাসন ক্ষমতার ক্ষেত্রে এতটা গুরুত্বপূর্ণ? কি ছিল তাঁর সম্পত্তি যা এতটা মূল্যবান? আর কে-ইবা ছিল তাঁর স্বামী যাঁর সমর্থন শাসকবর্গের জন্য এতো প্রয়োজন? আর কি-ই-বা ছিল স্বামীর অধিকার যা আদায়ের জন্য দরবারে ও মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছিলেন তিনি?

এই স্বল্প পরিসরে এতগুলো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আল্লাহ যদি নেক হায়াত দান করেন তাহলে আগামী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তরসহ বিস্তারিত আলোচনা করার আশারাখি।###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔