কবরসমূহের পাশে ও বিশেষ বিশেষ স্থানে দোয়ার ফজিলত

যেভাবে আলোচিত হল সেভাবে “দোয়া’ও” শরীয়ত সম্মত ও বৈধ; বরং পছন্দনীয়। দোয়া করার আদেশের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ স্থান নির্দিষ্ট হয়নি, এমনকি বাহ্যতঃ অনুপযুক্ত পরিস্থিতিগুলোতেও আল্লাহকে স্মরণ ও দোয়া করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ: কেউ যদি কোনো মদ্যপানের অনুষ্ঠানে সম্বিত ফিরে পেয়ে তওবা করে এবং সেখানেই হাত তুলে দোয়া করে ও ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তাহলে সে নিন্দিত তো হবেই না এবং কোনো বিদআতেই জড়িত হবে না, বরং সে এক পছন্দনীয় কাজ বাস্তবায়ন করে থাকবে। “দোয়া” শরীয়ত সম্মত হওয়া ছাড়াও, নামাযের ক্ষেত্রে আমরা যেসব দলিলের কথা বললাম সেসবের আলোকে, যেসব স্থান অধিকতর ফজিলতের অধিকারী সে সবে দোয়া করাও অধিকতর মূল্যমানের অধিকারী এবং এই ফজিলতের নিমিত্তে কোনোরূপ বাধা-বিপত্তি নেই, না বুদ্ধিবৃত্তিক আর না শরঈ।
হযরত ইবরাহীম (আ.) এক পাথরের উপর দাঁড়ানোর কারণে যখন সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, সাফা-মারওয়ার মাঝে হযরত হাজার (আ.) সাঈ (দৌড়াদৌড়ি) করার কারণে সেটি যদি হজ্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, হিজরে ইসমাঈলে হযরত হাজার ও ইসমাঈল (আ.) সমাহিত হওয়ার কারণে যদি সেটি অধিকতর মর্যাদার অধিকারী হয়ে যায়, তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে দোয়া অধিকতর মূল্যমান হতে এমন কি বাধা রয়েছে?!
সাইয়্যেদ মোহসিন আমীন বর্ণনা করেন যে, শামসুদ্দীন জাযরী নামক আহলে সুন্নাতের জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব “হুসনুল হাসীন” শীর্ষক কিতাবে, ওহাবীদের অভিমতের খÐনে বলেন: “আল্লাহর রসুলের (সা.) কবরের পাশে কৃত দোয়া যদি গৃহীত না হয়, তাহলে কোথায় গৃহীত হবে?!”(কাশফুল ইরতিয়াব, পৃ. ৩৩৯)
ইবনে তাইমিয়্যা নিজেও “যিয়ারাতুল কবুর” শীর্ষক এক পুস্তিকায় অজ্ঞাতসারে কবরসমূহের পাশে দোয়া অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়কে স্বীকার করে বলেন: “সাহাবীগণ আল্লাহর রসুলের (সা.) কবরের পাশে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম দিতেন এবং তাঁরা দোয়া করার ইচ্ছা করলে তাঁর কবর শরীফের অভিমুখে দাঁড়িয়ে দোয়া করতেন না বরং কিবলামুখি হয়ে দাঁড়িয়ে দোয়া করতেন এবং শুধুমাত্র আল্লাহকেই ডাকতেন।” (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৮)
আপাততঃ আমরা কবরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে কোনোরূপ নিষেধ আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করছি না। তবে এই কথা হতে জ্ঞাত হওয়া যায় যে, সাহাবীগণ আর যাই হোক, রসুলের (সা.) কবরের পাশে দোয়া করতেন। ওহাবীগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দাবী করেন যে, এসব স্থানে দোয়া করাতে কোনোরূপ ফজিলত বা শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কিংবা এরূপ করা বিদআতও বটে। কিন্তু এখানে তারা বলছেন যে, সাহাবীগণ রসুলের (সা.) কবরের পাশে উপস্থিত হয়ে দোয়া করতেন। আর এটিই তাঁর (সা.) কবরের পাশে দোয়া করাতে অধিক ফজিলতের প্রমাণ; অন্যথা নিজ নিজ বাড়ী-ঘর ত্যাগ করে সেখানে গিয়ে দোয়া করার আর কোনো যুক্তি নেই।
অবশ্য আমরা একাধিকবার বলেছি যে, কেউ যদি দোয়া করে এবং দোয়াতে তার সমস্ত দৃষ্টি ও মনোযোগ আল্লাহর প্রতি না হয়ে বরং কবরে শায়িত ব্যক্তির প্রতি হয়, আর তাওয়াস্সুলের স্তর ডিঙ্গিয়ে গিয়ে তাকেই (কবরে শায়িত ব্যক্তি) এক স্বতন্ত্র সত্তা ও আল্লাহর সমকক্ষ জ্ঞান করে, তাহলে তা হবে শির্ক ও নিষিদ্ধ কাজ। কোনো মুসলমানই, বরং বিচারবুদ্ধির অধিকারী কোনো ব্যক্তিই এরূপ কোনো কাজকে মেনে নেবে না।
তবে ইবনে তাইমিয়্যার কথার সেই অংশ যেখানে তিনি বলছেন: “সাহাবীগণ দোয়া করার সময় কবরের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন না”, এটিও আলোচনার দাবী রাখে। কেননা, সামহুদী একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যেটি নির্দেশ করে যে, ইবনে তাইমিয়্যার কথাটিও ততোটা নিশ্চিত নয়। ঘটনাটি এরূপ:
একদা মানসুর দাওয়ানীকী “মসজিদে নবভীতে”, মালেকী মাযহাবের ইমাম “মালেক ইবনে আনাসকে” জিজ্ঞাসা করেন: “হে আবু আব্দিল্লাহ! দোয়া করার সময় আমরা কি রসুলের (সা.) কবরের দিকে মুখ করে দাঁড়াব, নাকি কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়াব?”
ইমাম মালেকের নিকট মানসুরের করা প্রশ্ন হতে উপলব্ধি করা যায় যে, এমনটি ছিল না যে, প্রত্যেক ব্যক্তিই দোয়া করার সময় কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন, বরং অনেকেই কবরের দিকে এবং অনেকেই কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন।
বাহ্যিক কথোপকথন হতে অনুমিত হয় যে, উক্ত কাজ বৈধ-অবৈধের বিষয়ে মানসুরের প্রশ্ন ছিল না; বরং তার প্রশ্ন ছিল: “কোনটি শ্রেয়তর: কিবলা মুখি হয়ে দাঁড়ানো, নাকি কবরের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো?” মালেক ইবনে আনাস উত্তরে বলেন:
“আপনি আপনার মুখমÐলকে কবরের দিক হতে ভিন্ন দিকে কেন ঘুরাবেন, অথচ রসুলে আকরাম (সা.) হচ্ছেন মহান আল্লাহর দরবারে আপনার উসিলা এবং তিনিই কিয়ামত দিবসে মহান আল্লাহর অভিমুখে আপনার আদি পিতা হযরত আদমের (আ.) উসিলা; কাজেই আপনি কবর অভিমুখে দাঁড়িয়ে তাঁর নিকট প্রার্থনা করবেন যাতে তিনি আপনার শাফায়াতকারী হন এবং তিনিও (সা.) মহান আল্লাহর নিকট আপনার তরে শাফায়াত করবেন।” (ওয়াফাউল ওয়াফা, ৪র্থ খন্ড, পৃ. ১৩৭৬)
“রসুল (সা.) আপনার ও আপনার আদি পিতা হযরত আদমের (আ.) শাফায়াতকারী হবেন” এই বাক্যের মাধ্যমে ইমাম মালেকের উদ্দেশ্য হচ্ছে এর প্রতি ইঙ্গিত করা যে, হযরত আদম (আ.) পৃথিবীতে অবরোহণের পর তওবা করার নিমিত্তে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে কতক শব্দ বা বাক্য প্রাপ্ত হন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আহলে বাইতের (আ.) নাম, আর এরই শীর্ষে ছিল আল্লাহর রসুলের (সা.) নাম এবং এসব নামের মাধ্যমে তিনি তওবা করার কারণে তাঁর তওবা গৃহীত হয়। কুরআনুল করীমও এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছে: অর্থাৎ অতঃপর আদম স্বীয় প্রতিপালকের পক্ষ হতে কতক শব্দ (বাক্য) প্রাপ্ত হন ও তওবা করেন; নিশ্চয় তিনি তওবা গ্রহণকারী ও দয়ালু। (সূরা: বাকারাহ্ (২), ৩৭তম আয়াত)
স্পষ্ট যে, আম্বিয়া-আউলিয়া (আ.) ও আমাদের আখেরী নবী করীমের (সা.) কবরসমূহের পাশে অনুষ্ঠিত দোয়া ও নামায ফজিলতের (মর্যাদা) অধিকারী; কিন্তু সাধারণ মানুষের কবরসমূহের পাশে অনুষ্ঠিত দোয়া ও নামাযে তা নেই। অবশ্য সাধারণ মানুষের কবরসমূহের পাশে অনুষ্ঠিত দোয়া ও নামায শির্কের কারণ হয় না এবং বিদআতও গণ্য হয় না।

Related posts

ইমাম রেযা’র (আ.) জ্ঞানপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More