কুরআন, হাদিস ও ঘটনার আলোকে অহংকার

by Rashed Hossain

অনুবাদকঃ মাওলানা মোঃ শহিদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা। 

আয়াতসমূহঃ

  • ১- অহংকার থেকে আশ্রয় চাওয়াঃ “এবং মুসা বলল, যারা হিসাব দিবসের বিশ্বাস করে না এমন প্রত্যেক অহংকারী থেকে আমি আমার ও তোমাদের পালনকর্তার নিকট আশ্রয় চেয়েছি।” (সূরা আল-মু’মিনঃ ২৭)
  • ২- অহংকারীর অন্তরে মোহর মারাঃ “এমনিভাবে আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী-স্বৈরাচারী ব্যক্তির অন্তরে মোহর মেরে দেন।” (সূরা আল -মু’মিনঃ ৩৫)
  • ৩- শয়তানের কাফের হওয়ার কারণঃ “এবং যখন আমি হযরত আদম (আ.)-কে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজদা করলো। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (সূরা আল বাকারাঃ ৩৪)
  • ৪- শয়তানের অহংকারঃ “আল্লাহ বললেন, আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সেজদা করতে বারণ করল? সে বললঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। বললেন তুই এখান থেকে যা। এখানে অহংকার করার কোন অধিকার তোর নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা আল আ’রাফঃ ১২, ১৩)
  • ৫- অহংকারীদের ঠিকানাঃ “অতএব জাহান্নামের দরজাসমূহ দিয়ে প্রবেশ কর, এতেই অনন্তকাল বাস কর। আর অহংকারীদের আবাসস্থল কতই নিকৃষ্ট।” (সূরা নাহলঃ ২৯)

হাদীসসমূহঃ

  • ১- অহংকার গোনাহের দিকে আহ্বান করেঃ আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) বলেছেন, “অহংকার গোনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ২, পৃ. ৪৩০)
  • ২- অহংকারী বেহেশতে যেতে পারবে নাঃ ইমাম মুহাম্মাদ বাকের ও ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন, “ঐ ব্যক্তি বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে।” (কেতাবুশ শাফী, উসুলে কাফি খন্ড ৪, পৃ. ২৭২)
  • ৩- সবচেয়ে নিন্দনীয় অহংকারঃ ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন, “সবচেয়ে নিন্দনীয় অহংকার হল লোকজনকে তুচ্ছ মনে করা এবং সত্য কথাকে নির্বোধ ও বোকামী বলে গণ্য করা।” (কেতাবুশ শাফী, উসুলে কাফি খন্ড ৪, পৃ. ২৭২)
  • ৪- কিয়ামতের দিন অহংকারীদের অবস্থাঃ ইমাম সাদেকে আলে মুহাম্মাদ (আ.) বলেছেন, “অহংকারী ব্যক্তিদেরকে কিয়ামতের দিন পিঁপড়ার আকৃতিতে সৃষ্টি করা হবে এবং লোকজনের হিসাব-নিকাস সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত মানুষের পদতলে পিষ্ট হতে থাকবে।” (কেতাবুশ শাফী, খন্ড ৪, পৃ. ২৭৩)
  • ৫- সবচেয়ে ত্রুটিঃ মাওলায়ে মুত্তাকিয়ান আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) বলেছেন, “অহংকার হল সবচেয়ে ত্রুটি।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ২, পৃ. ৪৩১)

বিশ্লেষণঃ অহংকার হল শয়তানের গুণ। আল্লাহর থেকে বঞ্চিত হওয়ার উপলক্ষ্য ও লোকজনের দুর্ভাগ্য ও অপমানিত হওয়ার বিষয়। অহংকারী শয়তানী দলের ও ইবলিসের সাথী এবং আল্লাহর নিকটে তারা অভিশপ্ত ও তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত। ইবলিস একটি সিজদা করতে অস্বীকার করায় কাফেরে পরিণত হল, তাহলে অনবরত সিজদা ত্যাগকারীদের পরিণতি কি হবে? এ বিষয় সম্পর্কে প্রত্যেক জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তির চিন্তা করা উচিৎ। ইবলিসকে তার অহংকার ও গর্বের কারণে আল্লাহর দরবার থেকে বের করে দিয়েছে এবং অভিশপ্তের শৃঙ্খল চিরদিনের জন্য তার গলায় পরিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে অহংকারী ব্যক্তি স্বীয় অহংকার ও গর্বের কারণে মনুষ্যত্ব ও মানবতার স্থানকে নষ্ট করে ফেলে।

ইমাম আলী (আ.) বলেছেনঃ সত্যিকারে মানুষের ব্যাপারে আশ্চর্য্য হতে হয় যে, যার শুরু শুক্র দ্বারা আর যার শেষ একটি দুর্গন্ধময় মৃতদেহ দ্বারা, অর্থাৎ যার শুরু ও শেষ নাপাক কিন্তু তারপরও সে অহংকার করে!
আল্লাহর কাছে দোয়া করি মুহাম্মাদ (স.) ও তাঁর বংশধরদের অসিলায় আমাদেরকে এই ঘৃণিত গুণাগুণ থেকে রক্ষা পাওয়ার তৌফিক দান করুক। (আমিন)

ঘটনাবলীঃ
১- কারুনের অহংকারঃ
কারুন হযরত মুসা (আ.)-এর খালাত ভাই। আল্লাহ তায়ালা তাকে এতই ধন-দৌলত দিয়েছিলেন যে তার ধনাগারের চাবিসমূহ একটি শক্তিশালী জনতা উঁচু করতে পারত না, অথচ এই ব্যক্তি নিজের সম্প্রদায়ের উপর জুলুম করত। তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে উপদেশ দিত যাতে সে অহংকার ও গর্ব ত্যাগ করে লোকজনের সাথে ভাল ব্যবহার করে, পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে এবং ইয়াতিম, অসহায় ও দরিদ্রদের সাথে উত্তম ব্যবহার করে। কিন্তু সে উত্তরে বলতঃ এই ধন-দৌলত আমার জ্ঞান দ্বারা অর্জিত হয়েছে (সূরা কেসাসঃ ৭৮)। হযরত মুসা (আ.) রসায়ন জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। এই জ্ঞানের কিছু অংশ ইউশা ইবনে নুনকে শিক্ষা দিয়ে ছিলেন এবং কিছু অংশ কালেব ইবনে ইউহানাকে ও কিছু অংশ কারুনকে শিক্ষা দিয়ে ছিলেন অর্থাৎ পরিপূর্ণ জ্ঞান কারো কাছে ছিল না। কিন্তু কারুন বাঁকি জ্ঞান ঐ দুইজনের নিকট থেকে অর্জন করে রসায়ন জ্ঞানের মালিক হল এবং প্রচুর ধন-দৌলত অর্জন করল। (হাসিয়ে ফারমানে আলী, পৃ. ২৬৯) কিন্তু কারুন কি একথা চিন্তা করেনি আল্লাহ তার পূর্বে ঐ লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন যারা ছিল তার থেকে শক্তিশালী ও সংখ্যাধিক? তারা আল্লাহর নির্দেশের সামনে অহংকার ও গর্ব করেছিল আর আল্লাহ তাদেরকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছেন।

একদিন কারুন তার সম্প্রদায়ের লোকজনের সামনে বেশ জাঁকজমকের সাথে হেঁটে যাচ্ছিল, যারা দুনিয়ার কয়েক দিনের জীবনকে নিয়ে ভাবতো তারা ঐ জাঁকজমক দেখে বলতে লাগল, যে ধন-দৌলত কারুনকে দেয়া হয়েছে আফসোস যদি আমাদের কাছেও থাকত। হঠাৎ আল্লাহর আযাব তার ওপর শুরু হল। এরশাদ হলঃ এবং আমি কারুন ও তার প্রাসাদকে যমিনের মধ্যে ডাবিয়ে দিয়েছি। অতএব আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন জনতা কি ছিল যে তাকে সাহায্য করবে, না সে নিজেকে সাহায্য করবে? (সূরা কেসাসঃ ৮১)

ধ্বংসলীলা ও দুর্ভাগ্যতা তাকে এমনভাবে পাকড়াও করেছিল যারা গতকাল তার সাথে হিংসা করেছিল, আজ তারা বলতে লাগল, আলহামদুলিল্লাহ, ভাল হয়েছে যে আমরা কারুনের মত ছিলাম না, তা নাহলে আমরাও অহংকার ও গর্বের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতাম। (এবরাতে আঞ্জিযেয়ে অকেয়াত, পৃ. ৫৫)

২- মাছি ও মানসুরে দাওয়ানিকীঃ
কথিত আছে যে একদিন হযরত ইমাম সাদেক (আ.) মানসুরে দাওয়ানিকীর নিকট বসে ছিলেন। তখন একটি মাছি মানসুরকে বিরক্ত করছিল। মানসুর যতবার তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল কিন্তু সে ততবার উড়ে এসে তার মুখের ওপর বসছিল, মোটকথা মাছিটি মানসুরকে হয়রান করে দিল। বিরক্ত হয়ে মানসুর বলল, হে আবা আব্দিল্লাহ (আ.)! বল মাছি দ্বারা কি উপকার হয়? কেন আল্লাহ মাছি সৃষ্টি করল?

হযরত ইমাম সাদেক (আ.) তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, আল্লাহ অবাধ্যকারীদের অপদস্থ করার জন্য মাছি সৃষ্টি করেছেন।
ইমাম (আ.)-এর উত্তর শুনে মানসুর ভীষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল, কিছু বলল না, কিন্তু চিন্তা করতে লাগল সুযোগ পেলেই যেন ইমাম (আ.) কে হত্যা করা যায়। (এক সাদ ও পাঞ্জা মাওজু আজ কুরআনে কারীম ওয়া আহাদীসে আহলে বাইত (আ.), পৃ. ৩২৭, কাশকুলে দাস্তগায়িব, খন্ড ২, পৃ. ১৯৭)###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔