ইমাম হুসাইন (আঃ) সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্যকারী

by Rashed Hossain

লেখকঃ মোঃ সাফিউর রহমান

১১ হিজরি সালে আল্লাহ হতে প্রেরিত রাসুল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর দেহত্যাগ এর সাথে সাথে মুসলিমরা ক্ষমতার ভাগ বন্টনের সুত্র ধরে বিভিন্ন দল এবং উপদলে বিভক্ত হতে থাকে।

অথচ দেহত্যাগ এর মাত্র কয়েক মাস আগে দশম হিজরির ১৮ জিলহজ্জ, ঐতিহাসিক গাদীরে খুমের ভাষণে রাসুলে পাক (সাঃ) তাঁর পরিবর্তিতে নেতৃত্বের ভূমিকাটি সম্পূর্ণ স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য বলেছিলেন, “মহান আল্লাহ হচ্ছেন আমার ওয়ালি এবং রক্ষণাবেক্ষণকারী। আমি হচ্ছি বিশ্বাসীদের ওয়ালি ও অভিভাবক। আর আমি যার নেতা ও অভিভাবক, আলীও তার নেতা ও অভিভাবক।” (সহিহ মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ:-৩৬২; সহিহ তিরমিযি, হাদীস নং:-৪০৭৮; মুসনাদে আহমাদ, ২য় খন্ড, পৃ:-৪১২;সুনানে ইবনে মাজা, ১ম খন্ড, পৃ:-৪৫; মুসতাদরাকে হাকেম, ৩য় খন্ড, পৃ:-১১৮; তারিখে ইয়াকুবী, ২য় খন্ড, পৃ:-৪৩; তারিখে তাবারী, ২য় খন্ড, পৃ:-৪২৯; সুনানে নাসাই, ৫ম খন্ড, পৃ:-১৩২; আল মুসনাদ আল-জামে, ৩য় খন্ড, পৃ:-৯২; আল মুজাম আল-কাবির, ৪র্থ খন্ড, পৃ:-১৬; কানজুল উম্মাল, ১৩ তম খন্ড,পৃ:-১৬৯; তারিখে দামেশক, ২য় খন্ড, পৃ:-৪৫।

তাঁর দেহত্যাগ এর পর বিশ্বাসীরা কাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে সেই ব্যাপারে রাসুলে পাক (সাঃ)-এর স্পষ্ট এবং প্রকাশ্য নির্দেশনা থাকার পরেও কতিপয় লোক সেই নির্দেশনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে নিজেরা নিজেদেরকে খলিফা ও শাসক ঘোষণা করতে লাগলো। তারা তাদের রাজনৈতিক ও গোত্রীয় শক্তি ব্যবহার করে মুসলিম শাসিত বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষমতায় বসলো বটে, কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম মনেপ্রাণে এই ব্যাপারটা ঠিকই জানতো যে, রাসুলে পাক (সাঃ)-এর একান্ত রক্তজ বংশধররাই হচ্ছেন প্রকৃত ইসলামের ধারক ও বাহক এবং এ কারণে তারাই হচ্ছেন শাসনক্ষমতার আসল হকদার।

একারণে মুসলমানদের একটা বড় অংশ বরাবরই হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ)কে তাদের মাওলা অথবা অভিভাবক হিসেবে মানতেন এবং ক্ষমতার জোরে বসে থাকা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীকে ততটা গ্রাহ্য করতেন না। স্বাভাবিকভাবেই এই ব্যাপারটা ছিলো সেইসব শাসকগোষ্ঠীর কাছে পীড়াদায়ক ও বিব্রতকর। তাই তারা সবসময়ই চাইতো বিভিন্নভাবে রাসুলে পাক (সাঃ)-এর একান্ত রক্তজ পরিবারের সমর্থন আদায় করতে এবং এটা করতে গিয়ে তারা রাসুলে পাক (সাঃ) এর একান্ত রক্তজ পরিবারের উপর বিভিন্নভাবে শক্তি প্রদর্শন ও চাপ প্রয়োগ করতো।

সময়ের সাথে সাথে এই অত্যাচার-নিপীড়নের মাত্রা নিয়মিতভাবে বাড়তে থাকে এবং রাসুলে পাক (সাঃ)-এর একান্ত রক্তজ পরিবারের সদস্যগণ তাদের বিচক্ষণতার সঙ্গে এই অত্যাচার-নিপীড়নকে মোকাবেলা করতে থাকেন। সেইসব অত্যাচারী জালিম শাসকেরা রাসুলে পাক (সাঃ)-এর রেখে যাওয়া সম্পদ বাগ-এ-ফিদাক এর উত্তরাধিকার থেকে তাঁর একমাত্র সন্তান হযরত ফাতিমাতুয-যাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা’কে বঞ্চিত করে সেই সম্পদ বেদখল করে নেয়। তারা হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ)-এর সমর্থন আদায়ের জন্য তাঁকে তাঁর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে বাজারে লাঞ্চিত করে এবং এতে বাধা প্রদান করায় তাঁর স্ত্রী, রাসুলে পাক (সাঃ)-এর একমাত্র কন্যা, জান্নাতের সম্রাজ্ঞী হযরত ফাতিমাতুয-যাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা’র উপর আঘাত করে তাঁর গর্ভের অনাগত সন্তানকে হত্যা করে।

এইসব ক্ষমতালিপ্সু শাসকের দল ক্ষমতার লোভে এতোটাই অন্ধ এবং জঘন্য মানসিকতার ছিলো যে তারা ছলেবলে, কৌশলে, লোভ দেখিয়ে, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কোনভাবেই রাসুলে পাক (সাঃ)-এর একান্ত রক্তজ বংশধরদেরকে তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে না পেরে অবশেষে তাঁদের কাটা মাথার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। ৪১ হিজরি সালে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাসুলে পাক (সাঃ)-এর নাতি, জান্নাতের যুবকদের সর্দার ইমাম হাসান ইবনে আবি তালিব (আঃ)-এর বশ্যতা আদায় করতে তাঁর কাটা মাথার জন্য ১০,০০০ (দশ হাজার) দিরহাম ও তার এক কন্যাকে পুরস্কার হিসেবে ঘোষণা করে। এতকিছু করার পরও যখন এইসব অবৈধ শাসক গোষ্ঠী রাসুলে পাক (সাঃ)-এর একান্ত রক্তজ পরিবারকে বাগে আনতে ব্যর্থ হয় তখন তারা বুঝতে পারে যে, তারা কখনোই তাদের এই ক্ষমতার খেলায় রাসুলে পাক (সাঃ)-এর একান্ত রক্তজ পরিবারকে সাথে পাবে না।

তাই তারা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত গল্প কাহিনির সাহায্যে, বিভিন্ন যুক্তি, ভিত্তিহীন গল্প সৃষ্টি করে নিজেদেরকে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে এবং তাদের ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে সেইসব গল্প-কিচ্ছাকে মানুষের মধ্যে কিছুটা ছড়িয়ে দিতেও সক্ষম হয়। এইভাবে যখন তারা বিভিন্ন বানোয়াট গল্প-কিচ্ছাকে হাদীসের নামে চালিয়ে দিয়ে ইসলাম বিকৃত করার খেলায় মেতে উঠে, তখনই রাসুলে পাক (সাঃ)-এর প্রাণপ্রিয় নাতি, জান্নাতের যুবকদের সর্দার ইমাম হুসাইন (আঃ) তাদের মিথ্যা গল্প-কাহিনির মুখোশে ঢাকা প্রকৃত নোংরা-নগ্ন চেহারাটা উন্মোচন করে দেন।

ইমাম হুসাইন (আঃ) তেমন কোন লোক-লস্কর অথবা সৈন্যবাহিনী ছাড়াই নিজের পরিবার এর নারী-শিশুসহ অল্প সংখ্যক কিছু অনুসারীদের নিয়ে প্রায় নিরাপত্তাহীন অবস্থায় কুফায় রওনা করেন সেইসব বানোয়াট গল্প- কিচ্ছার নায়কদের মুখোশ খুলে দেয়ার জন্যে। ইমাম হুসাইন (আঃ) কারবালায় প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার মতো শাসকরা সুযোগ পেলে কতোটা নীচে নামতে পারে।

তারা এতোটাই নীচ যে, ছয় মাসের দুধের শিশুকে জানোয়ারের মতো হত্যা করতে দ্বিধা করে না।
তারা এতোটাই নীচ যে, তারা নারী শিশুসহ মুমিন মুসলমানদের তৃষ্ণার পানি আটকাতে দ্বিধা করে না।
তারা এতোটাই নীচ যে, তারা বাচ্চা মেয়ের কান ছিঁড়ে দুল কেড়ে নিতে দ্বিধা করে না।
তারা এতোটাই নীচ যে, তারা নামাজরত মুমিনদের উপর তীর চালাতে দ্বিধা করে না।

এদেরকে নীচতার শেষ সীমায় নামার একটা সুযোগ করে দিয়ে ইমাম হুসাইন (আঃ) বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মীয় কিচ্ছা-কাহিনির পেছনের নগ্ন সত্যটাকে উন্মোচন করে দিয়েছেন।

তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, এইসব অবৈধ ক্ষমতালোভী শাসকরা যতোই ভালো মানুষ আর মুসলমান সাজুক না কেন, তাদের ভেতরটা আসলে কেমন নোংরা কালো। তাই তো আজ ইতিহাস ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার আগে ক্ষমতায় বসা অনেক অবৈধ শাসককে ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করলেও এতটুকু স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ছিলো কুলাঙ্গার ও পথভ্রষ্ট।

অথচ এই কুলাঙ্গার ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়াকে ক্ষমতায় নিয়োগকারী কে ছিল কিংবা সেই নিয়োগকারীর নিয়োগকারী কে ছিল সেটা খুঁজতে গেলেই প্রকৃত সত্যটা বের হয়ে যায়।
এভাবেই ইমাম হুসাইন (আঃ) কারবালায় নিজেকে, নিজের পরিবারকে এবং নিজের অনুসারীগণকে কোরবানি করে সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়ে গেছেন যা কেয়ামত পর্যন্ত আর বদল করা যাবে না।

এজন্যই ইতিহাসে ইমাম হুসাইন (আঃ) হয়ে থাকলেন সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্যকারী অথবা প্রকৃত ফারুকে আযম।####

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔