৯ই এপ্রিল ২০২৬ (বৃহস্পতিবার), বাদ মাগরিব শহীদ আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সাইয়্যেদ আলী খামেনায়ী’র চল্লিশা উপলক্ষে খুলনায় শোক আলোচনা সভা আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতানী’র উদ্যোগে কাসরে হুসাইনী ইমামবারগাহে অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া ইমামে জামান (আ.)-এর মাধ্যমে শোকানুষ্ঠান শুরু হয়।
শোক সভায় মূল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন, খালিশপুর হাওজা-এ-ইলমিয়া সাহেবুজ্জামান-এর অধ্যক্ষ হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ রেজা আলী যায়দী। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষা বিভাগীয় প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ সাজ্জাদ হুসাইন, অত্র প্রতিষ্ঠানের অনুবাদ ও গবেষণা বিভাগের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ড. এম,এ, কাইউম, খালিশপুর হাওজা-এ-ইলমিয়ার শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম মো. শহীদুল হক, বিশিষ্ট আইনজীবি এ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ।
ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষা বিভাগের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ সাজ্জাদ হুসাইন বলেন, ইসলামের পতাকা আমাদের জীবন থেকে অনেক বড়। আমাদের জীবন ত্যাগ করে ইসলামের পতাকা ইমামে জামানের হাতে তুলে দেওয়াই মুজাহিদের দায়িত্ব-কর্তব্য। তাই ইরানের মুজাহিদরা হাসি মুখে জীবন উৎসর্গ করে ইমাম-এ-জামানার হাতে পতাকা তুলে দিতে প্রস্তুত। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী বিশ্বের একমাত্র ধর্মীয় নেতা যাকে ‘টাইম’ এবং ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিন বারবার বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সেখানে তাঁকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার এক ইশারায় বিশ্ব তেলের বাজার ও ভূ-রাজনীতি তোলপাড় হতে পারে। অনেকেই জানেন না যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একজন বড় মাপের আধ্যাত্মিক সাধক বা আরিফ ছিলেন। তিনি ইসলামের গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন বা ইরফান-এ বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করেন, স্রষ্টার সাথে সংযোগ স্থাপনে নামাজ-রোজার পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতা অর্জন এবং দুনিয়াবি মোহ ত্যাগ করা জরুরি। তাঁর শান্ত ও ধীরস্থির আচরণের পেছনে এই আধ্যাত্মিক চর্চার বড় প্রভাব দেখেন বিশ্লেষকরা। খামেনেয়ী ‘বেলায়াত-এ-ফকিহ’ দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। এর সহজ মানে হলোঃ যতক্ষণ পর্যন্ত ইমাম মাহদী’র (আ.) পূনঃআবির্ভাব ঘটবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত একজন যোগ্য এবং ন্যায়পরায়ণ ইসলামি আইনবিদ মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেবেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর এই রাজনৈতিক ক্ষমতা আসলে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব।
এ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কোন মুসলিম দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের শত্রুতা নেই কিন্তু একমাত্র ইরানের সাথে আমেরিকা-ইসরাইলের শত্রুতা রয়েছে। কারণ ইরান একমাত্র ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকা-ইসরাইল মনে করেছিল, ইসলামের রাহবারকে হত্যা করলে ইরানের বিপ্লব ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আজ ইরান তাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে।
খালিশপুর হাউজা ইলমিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ শহীদুল হক বলেন, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, হযরত আলী (আ.) এর সাথে যারা ছিলেন তারা মুমিন ছিলেন। এই যুদ্ধ মুমিন ও মুনাফেককে চিহ্নিত করে দিয়েছে।
ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রের গবেষণা বিভাগের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা ড. মোঃ আব্দুল কাইউম বলেন, বাংলাদেশে আমেরিকা-ইসরাইলের বেতনভুক্ত আলেমরা জনগণকে বিভ্রান্তি মুলক কথা বলছে যে, সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী শাহাদাতে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইল্ইাহি রাজেউন’ বলা যাবে না, কারণ ইরানী শিয়ারা মুসলমান না। তাদের এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তারা আমেরিকা-ইসরাইলের অর্থপুষ্ঠ ব্যক্তি ও দালাল। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী প্রায়ই বলতেন, বিজ্ঞান এবং ইসলাম একে অপরের পরিপূরক। একারণেই ইরানে তাঁর শাসনামলে স্টেম সেল রিসার্চ, ন্যানো টেকনোলজি এবং মহাকাশ গবেষণায় ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছে যা অনেক রক্ষণশীল মুসলিম দেশে নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত করা হয়। খামেনেয়ীর সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ হলো, তাঁর দেওয়া একটি বিশেষ ফতোয়া। এর মাধ্যমে তিনি সুন্নিদের অপমান করা হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি মনে করেন, শিয়াদের মধ্যে যারা সুন্নিদের আবেগ নিয়ে কটুক্তি করে, তারা আসলে ইসলামের শত্রু এবং ব্রিটিশ বা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার চর। যেকারণে শিয়া নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইসলামিক জিহাদ-এর মতো সুন্নি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বছরের পর বছর ধরে সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। ভূ-রাজনীতিতে এটি একটি বিরল ঘটনা, যেখানে একজন শিয়া নেতা সুন্নিদের স্বার্থে এত বড় ঝুঁকি নেন।
মজলিসে বিশেষ অতিথি হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ রেজা আলী যায়দী বলেন, আল্লাহ স্বয়ং বলেন, “যারা আমার রাস্তায় শহীদ হয় তাদেরকে মৃত বল না তারা জীবিত। আমি তাদেরকে রিজিক দান করি”। ১৯৮৯ সালের জুনে হযরত আয়াতুল্লাহ খোমেনির (রহ.) ইন্তেকালের পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদ) আলী খামেনেয়ীকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করেন। একদিন তেহরানের “আবুজার মসজিদ”-এ যোহরের নামাজ শেষ করলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী। এরপর জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ধারিত বক্তব্য দিচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে রাখা একটি টেপ রেকর্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের পর যখন রেকর্ডারটি চেক করা হয়, তখন তার ভেতরে একটি ছোট্ট চিরকুট পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল, “ফোরকান গ্রুপের পক্ষ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উপহার।” বোঝা গেল, টেপ রেকর্ডারের ভেতরে ছিল শক্তিশালী বোমা। এই বিস্ফোরণে খামেনেয়ী’র বুক, ডান কাঁধ এবং ডান হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফুসফুস ছিদ্র হয়ে যায়, সাথে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। চিকিৎসকদের মতে, তিনি যে বেঁচে ফিরেছেন তা ছিল এক কথায় অলৌকিক।
বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শক্তিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর ডান হাতের স্নায়ু বা নার্ভগুলো পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়। ডাক্তাররা কয়েক ঘণ্টা অস্ত্রোপচার করেও হাতটি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পারেননি। এর ফলে তাঁর ডান হাতটি চিরতরে অচল বা প্যারালাইজড হয়ে যায়। তবুও এক হাত দিয়ে কাঁপিয়েছেন সারা বিশ্ব।
২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী তেহরানে শাহাদাতবরণ করেন। ২রা মার্চ ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রীয় টিভিতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই খবর নিশ্চিত করা হয়। এই ঘটনার পর ইরানে ব্যাপক শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
এই শোকসভার আয়োজনে মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ শহীদ আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী’র শিক্ষা ও মানবতার বার্তার প্রতি তাঁদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। মজলিস শেষে জিয়ারতে আশুরা এবং তাবারুক বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।

